kalerkantho


ইসলামবিদ্বেষী ট্রাম্প কী করবেন আফগানিস্তানে?

বার্নেট আর রুবিন

৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ইসলামবিদ্বেষী ট্রাম্প কী করবেন আফগানিস্তানে?

আফগানিস্তান আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীদের স্বর্গরাজ্য থাকবে না—এ লক্ষ্য অর্জনে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে ভালো কৌশল হবে কূটনৈতিক ও সামরিক কৌশল গ্রহণ। আপাতত আফগান সরকার ও দেশটির কৌশলগত সম্পদগুলো রক্ষা করতে হবে।

মধ্য মেয়াদে আমাদের প্রয়োজন দেশটির নাজুক রাজনৈতিক কাঠামো স্থিতিশীল করা এবং সশস্ত্র বাহিনীগুলোকে প্রশিক্ষিত ও তহবিলসমৃদ্ধ রাখা। আর দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হতে হবে এমন এক স্বনির্ভর আফগান অর্থনীতি, যার সংযুক্তি থাকবে ওই অঞ্চলের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গেও।

মধ্য মেয়াদের অর্জনগুলো ছাড়িয়ে এগোতে হলে শুধু তালেবান নয়, পাকিস্তানসহ আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গেও রাজনৈতিক সমঝোতায় আসতে হবে। আর এ সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে তুরুপের তাস হিসেবে মার্কিন বাহিনীকে এমনভাবে সেখানে রাখতে হবে, যারা যেকোনো মুহূর্তে দেশে প্রত্যাবর্তনের জন্য প্রস্তুত থাকবে।

এখন অনেক আমেরিকান ও আফগান সাময়িকভাবে আশা করছে, তালেবানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও আফগান সরকারের অবস্থান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জোরদার করবেন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদন মতে, ট্রাম্প গত ডিসেম্বরে আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানির সঙ্গে টেলিফোনে আলাপকালে আরো মার্কিন সৈন্য পাঠানোর বিষয়টি তোলেন। ট্রাম্প পাকিস্তানকেও এই বলে চাপ দিতে পারেন, তোমরা আফগান তালেবানকে আর সমর্থন দেবে না; সেই সঙ্গে আফগানিস্তানে তালেবানের বিরুদ্ধে সামরিক অবস্থান জোরদার তো করতেই হবে। অবশ্য এ কৌশল গত ১৫ বছরের তুলনায় এখন বেশি কাজ করবেই—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।

নিজের বাচালতার খেসারত দিতে গিয়ে ট্রাম্প এখন যে বিরূপ পরিস্থিতির মোকাবিলা করছেন, তা তিনি শেষমেশ সামাল দিতে সক্ষম হবেন ধরে নিয়ে বলছি, আফগানিস্তানের ব্যাপারে তিনি ২০১৫ সালে যে অবস্থান ব্যক্ত করেছিলেন, তাতে যেন অটল থাকেন।

তিনি সিএনএনের ক্রিস কুমোকে বলেছিলেন, ‘আফগানিস্তানে বিশৃঙ্খলা চরমে এবং আমরা সে সংকটে জড়িয়ে ভয়াবহ ভুল করেছি। ...ইচ্ছা যদি না-ও করে, আমাদের সৈন্য ফেরত আনা উচিত। ’

যুক্তরাষ্ট্রের আট হাজার ৪০০ জন সৈন্য এখন আছে আফগানিস্তানে এবং আফগান নিরাপত্তা বাহিনীসহ রাষ্ট্রের আরো কিছু নির্বাহী কাজে বছরে প্রায় ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় করতে হয়। মনে হয় না ট্রাম্প প্রশাসন এত বড় ব্যয়ের নীতি ধরে রাখবে। কারণ তারা আগামী ১০ বছরে রাষ্ট্রের ব্যয় সাড়ে ১০ ট্রিলিয়ন ডলার হ্রাস কিভাবে করা যায় তা বিবেচনা করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মদদ না নিয়ে আফগানিস্তান তখনই স্থিতিশীল থাকতে পারবে যখন প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান তালেবানকে সহায়তা দেবে না। এটি নিশ্চিত করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কঠিন। কারণ স্থলপথে আফগানিস্তানে ঢোকার জন্য পাকিস্তানকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন পড়ে। আর ইরান দিয়ে ঢোকা তো অসম্ভব। ২০১১ সালে রাশিয়া আফগানিস্তানের উত্তর সীমান্ত দিয়ে কিছু সরঞ্জাম ঢোকার অনুমতি দিয়েছিল। এখন হয় তারা এ ধরনের সহযোগিতাদানে অস্বীকার করবে, নয় চড়া বিনিময়মূল্য দাবি করবে। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আফগানিস্তান কি ন্যাটোর চেয়েও বড় কিছু!

ইসলামাবাদের স্বভাবে পরিবর্তন আনার যেকোনো চেষ্টা ভালো কাজ করে দেশটির সব ঋতুর বন্ধু চীনকে কাজে লাগানো গেলে। পেইচিংয়ে আমার সঙ্গে গত ডিসেম্বরে আলাপকালে চীনা কর্মকর্তারা বলেছিলেন, আফগানিস্তান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রকে চীন যথারীতি সহযোগিতা করে যাবে, দক্ষিণ চীন সাগর, উত্তর কোরিয়া কিংবা কোনো বাণিজ্যিক বিষয় এখানে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। তবে ‘ওয়ান চায়না’ নীতিকে চ্যালেঞ্জ করার যে কৌশল নিয়ে ট্রাম্প এগোচ্ছেন, তাতে তিনি অবিচল থাকলে আফগানিস্তানসহ আরো অনেক বিষয়ে মার্কিন-চীন সহযোগিতামূলক সম্পর্কের ইতি ঘটবে।

ইচ্ছা না থাকলেও মার্কিন সৈন্য উপস্থিত রেখেই আফগান সংকট থেকে মুক্তি খুঁজতে হবে। তালেবানবিরোধী আফগানরা মার্কিন বাহিনীকে বরাবরই নিরাপত্তাদানকারী মিত্র হিসেবে দেখে এসেছে, দখলদার হিসেবে নয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি কত দিন থাকবে? একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট যখন বিশ্বাস করেন, ‘ইসলাম হেইটস আস’—অর্থাৎ ইসলাম আমাদের ঘৃণা করে এবং তিনি মুসলমান শরণার্থীদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পথটি বন্ধ করে দেন, তাঁর ওপর আফগান মুসলিমরা কিভাবে ভরসা রাখবে?

বন্দিদের গুয়ানতানামো বে কারাগারে পাঠানো আবারও শুরু করা, আটক বন্দিদের ওপর নিপীড়ন চালানো, বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি আরো বাড়ানো, আফগানদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে না দেওয়া কিংবা ইসরায়েলে মার্কিন দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তরের মতো উদ্যোগ নেওয়া হলে আফগানিস্তানে কাজ করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরো কঠিন হয়ে যাবে।

আফগান পরিস্থিতিকে একদিন ‘ম্যাস’ বলে মন্তব্য করেছিলেন ট্রাম্প, অবস্থার আরো চরম অধঃপতন হবে তিনি যদি তাঁর অগ্রাধিকার নীতিতে শুধু আমেরিকাকেই শীর্ষে রাখেন। আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, চীন, ভারত, রাশিয়া, ইরান ও পাকিস্তানের ওপরও। তাই সবাইকে সঙ্গে রেখেই যুক্তরাষ্ট্রকে এগোতে হবে।

 

লেখক : নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অন ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের আফগানিস্তান-পাকিস্তান রিজিওনাল প্রগ্রামের পরিচালক। লিখেছেন নিউ ইয়র্ক টাইমসে


মন্তব্য