kalerkantho


বিমানবন্দরে ভোগান্তির জবাবদিহি কোথায়

মো. আনছার আলী খান

৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



বিমানবন্দরে ভোগান্তির জবাবদিহি কোথায়

কাতার এয়ারলাইনসের ৬৩৮ নম্বর ফ্লাইটটি যথাসময়ে অর্থাৎ ৫টা ৩০ মিনিটে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের মাটি স্পর্শ করল। আরো ১০ মিনিট লাগল বিমান থেকে নামতে। ইমিগ্রেশনে উন্নত সেবা। ভাবলাম, দেশের উন্নয়নের ছোঁয়া বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনায় ছাপ ফেলেছে। বেশ উল্লসিত হলাম এই ভেবে যে গর্ব করার মতো মানসম্মত সেবা প্রদানে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এত দিনে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সক্ষম হয়েছে। জবাবদিহি নিশ্চিত করার মতো যেকোনো উদ্যোগকে স্বাগত জানাতেই হবে। আমাদের বিমানবন্দর নিয়ে আর কোনো সমালোচনা নেই—ভাবতেই মনটা প্রফুল্ল হয়ে ওঠে। দেশের বাইরের অনেক কিছু নিয়ে আমরা প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠি। একই সঙ্গে দেশের ভালো কাজে উৎসাহ জাগানোর বিষয়ে কার্পণ্য পরিহার অবশ্যই বাঞ্ছনীয়। এসব ভাবতে ভাবতে লাগেজ সংগ্রহের জন্য বেল্টের দিকে এগোতে থাকি। ৫ নম্বর বেল্ট থেকে লাগেজ সংগ্রহ করতে হবে। চোখে পড়ল বিমানবন্দরের ইউনিফর্ম পরিহিত কয়েকজন বেশ কয়েকটি করে ট্রলি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কাছে আসতেই লাগবে কি না জিজ্ঞেস করলেন। এড়িয়ে গেলাম তাঁদের। লক্ষ করলাম আরেকজন চাইলেও ‘দেওয়া যাবে না’ বলে সাফ জানিয়ে দিলেন। আমাকে অফার করা ও আরেকজনকে ফিরিয়ে দেওয়ার কারণ সুস্পষ্ট। তা আরো স্পষ্ট হলো যখন দেখলাম বেল্ট থেকে লাগেজ ওঠানো, ট্রলি ঠেলে কাস্টমস এলাকা অতিক্রম ইত্যাদি বিড়ম্বনা এড়াতে কিছু সাবধানী যাত্রী তাঁদের সাহায্য প্রার্থনা করছেন। তাঁরাও অ্যাসাইনমেন্ট নিশ্চিত হওয়ার পর একাধিক যাত্রীর বিশেষ সেবায় বেল্টের প্রবেশমুখের দখল নিয়ে রাজা-উজির বনে গেলেন। যাত্রীসাধারণ এসে বেল্টের পাশে দাঁড়াচ্ছে। প্রায় সব যাত্রী আসার পরও বেল্ট চলাচলের কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। কারো কারো প্রশ্ন, ভুল কোনো বেল্টের পাশে দাঁড়িয়ে আছি কি না। এর মধ্যে ঘট করে শব্দ। বেল্ট চলতে শুরু করল। এভাবে প্রায় পাঁচ মিনিট লাগেজশূন্য বেল্ট চলতে থাকল। তারপর হ্যান্ডলাগেজ যেগুলো দোহা থেকে হাতে দেওয়া হয়নি, সেগুলো একটা একটা করে আসতে থাকল। হ্যান্ডলাগেজ শেষে আসতে থাকল মেইন লাগেজ। কিন্তু আমার হ্যান্ডলাগেজটি গেল কোথায়? সেটা না পেয়ে টেনশন বাড়তে থাকল। টেনশনের কারণও সহজে অনুমেয়। বিমানবন্দরের লাগেজ নিয়ে অনেক ধরনের গল্প শোনা যায়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রমাণও পেয়েছি একবার। আমার এক নিকটজন পরিবার-পরিজন নিয়ে দেশে ফিরেছেন। সঙ্গে বেশ কয়েকটি লাগেজ। বাসায় এসে দেখা গেল একটি লাগেজ তাঁর নয়। সে লাগেজ নিয়ে সৃষ্ট বিড়ম্বনা তাঁর দেশে আসার আনন্দ বিবর্ণ করেছে। এর দায় অনেকাংশে তাঁর হলেও একজনের লাগেজ অন্যজন নিয়ে বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে যাওয়ায় কোনো বাধা না থাকার কারণেই এ বিড়ম্বনা তাঁকে পোহাতে হয়েছে। তবে হরহামেশা এ ধরনের ঘটনা ঘটে বলে শোনা যায় না। কারণ কোনো লাগেজে অবৈধ মালামাল থাকলে লাগেজ বহনকারী ফেঁসে যেতে পারেন—এ ভয়ে অবারিত সুযোগ থাকলেও লাগেজ বদলের ঘটনা তেমন ঘটে না। কিন্তু লাগেজ ছেঁড়াকাটা, এটা নিত্যদিনের ঘটনা বলেই বহুল প্রচারিত। সন্দেহজনক লাগেজ খোলার অধিকার অবশ্যই কর্তৃপক্ষ সংরক্ষণ করে। কিন্তু তারও নিয়ম-কানুন রয়েছে। কোনো একবার বাসায় ফিরে দেখি আমার লাগেজটি কর্ড দিয়ে লক করা। লক কেটে দেখি আমার তালাসহ একটি চিরকুট-জাতীয় ছাপানো কাগজ। নিরাপত্তার কারণে তালাটি ভাঙার বর্ণনাসহ দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে। সেটি করা হয়েছে জেএফকে এয়ারপোর্ট, নিউ ইয়র্ক থেকে। কিন্তু আমাদের এখানে যে কাটাকাটি, তা কোন কারণে হয় ও প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কর্তৃক তা হয় কি না সে আশঙ্কা যাত্রীসাধারণের। এ কারণেই নিজের লাগেজ না পাওয়া পর্যন্ত সব যাত্রীই দুশ্চিন্তায় থাকেন। অপলক নেত্রে তাকিয়ে থাকেন বেল্টের দিকে। দূর থেকে যেন চিনতে পারা যায় এ কারণে প্রায় প্রত্যেকেই নিজ নিজে লাগেজ চিহ্নিত করে রাখেন বিভিন্নভাবে। বেল্ট ঘুরছে ঘণ্টা পার হয়ে গেল। কিন্তু যাত্রীর ভিড় কমছে না। কারণ কেউ একটিও পাননি। কেউ পেয়েছেন আংশিক। এর মধ্যে প্রায় ১৫ মিনিট আবার শূন্য বেল্ট ঘুরতে থাকল। একটি লাগেজও নেই। তাহলে কি সব শেষ! এর মধ্যে বিমানবন্দরের ভিআইপি মশার অত্যাচার এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। নানা যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ কোনো এক যাত্রী উত্তেজিত হয়ে বেল্টের ওপর দিয়ে ব্যালান্স করে হাঁটতে হাঁটতে লাগেজ প্রবেশমুখে উঁকি মেরে চিত্কার করে উঠলেন। গালাগাল দিতে থাকলেন কর্তৃপক্ষকে। আমার তিনটির মধ্যে দুটি পাওয়া গেছে। আমার স্ত্রীর শখের লাগেজটির কোনো খবর নেই। তাঁর মুখের দিকে তাকাতে পারছি না। এক রাত, এক দিন উড়ে এসে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত অবস্থায় শেষমেশ তার লাগেজটি ছাড়াই বাসায় ফিরতে হবে কি না—এ টেনশন বর্ণনা করার মতো নয়। নাতি-নাতনিদের বাহারি উপহারসামগ্রী সব কিছুই তো ওটার মধ্যে। মাঝেমধ্যেই যাত্রীসাধারণ সমস্বরে চিত্কার করে উঠছে। কয়েকজন বিদেশি অসহায়ের মতো একে অপরের দিকে চাওয়া-চাওয়ি করছে। স্ত্রীকে আশ্বস্ত করব, না শত শত যাত্রীকে আশ্বস্ত করার মতো কোনো ভূমিকা রাখার প্রচেষ্টা নেব—এটা ভেবে বিলম্বের কারণ ব্যাখ্যা করার মতো কাউকে খুঁজতে লাগলাম। ব্যর্থ হয়ে এক বন্ধুকে ফোন করলাম। কথা হলো তাঁর সঙ্গে। কিছুক্ষণের মধ্যে আমার মোবাইল ফোনে এক অপরিচিত কণ্ঠে আমার অবস্থান জানতে চাওয়া হলো। কোনো এক ট্রাভেল এজেন্সির দুই যুবক এসে সমস্যা শুনলেন। আমরা ‘লস্ট অ্যান্ড ফাইন্ড’ কাউন্টারে এলাম। দায়িত্বশীল কাউকে পেলাম না। একজন ট্রাফিক হেলপারকে পেয়ে সমস্যার কথা জানানো হলো। তিনি ফোনে ট্রাফিক অ্যাসিস্ট্যান্টের সঙ্গে কথা বলে জানালেন, ১০ মিনিটের মধ্যে সব লাগেজ পাওয়া যাবে। আমি নিজে কথা বলতে চাইলে তাঁর স্যারকে ধরিয়ে দিলেন। আমাকেও জানানো হলো একই খবর। তাঁর সাক্ষাত্প্রার্থী হতে চাইলে এড়িয়ে গেলেন। ভেবে পেলাম না জবাবদিহির ক্ষেত্রে পালিয়ে বেড়ানো কেন? সমস্যা হতেই পারে। দেশে-বিদেশে সফরকারী মানুষগুলোর কাছে সমস্যার প্রকৃত ব্যাখ্যা দেওয়া হলে তাঁরা বুঝবেন না কেন? লাগেজ হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত একজন দায়িত্বশীল মানুষেরও কি যাত্রীদের মুখোমুখি হওয়ার আগ্রহ বা সাহস হয় না? দোহা থেকে অতিসাধারণ শ্রেণির যাত্রী বলেই কি কর্তৃপক্ষের এ অবহেলা? তা-ই বা বলি কিভাবে, স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমানের নাটবল্টু খোলা রেখে যাঁরা দেশের ইতিহাসের চাকা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো অপরাধ করেন, তাঁদের কাছে লাগেজ হ্যান্ডলিংয়ের টুকটাক ঘটনা তো নস্যি। তাহলে কি গোলেমালে যায় যত দিন বলে চিরকাল পার পাওয়া যাবে? কোনো দিন যদি ৫০০ অতিষ্ঠ যাত্রী ওই একজনের সুরে সুর মিলিয়ে পালিয়ে বেড়ানো দায়িত্বশীলদের খুঁজতে শুরু করেন দেশের মর্যাদার কী হবে সেদিন!

বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি বা পর্যটনশিল্পের বিকাশের জন্য বিমানবন্দরের আধুনিক সুবিধাদি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে শুধু কোটি কোটি টাকার রাডার ক্রয় কিংবা আধুনিক যন্ত্রপাতি ক্রয়ই কি যথেষ্ট? বিদেশের এমন কোন বিমানবন্দর রয়েছে যেখানে যাত্রীদের লাগেজ পেতে আধাঘণ্টার বেশি সময় প্রয়োজন হয়? কর্তৃপক্ষ নিশ্চয়ই এর কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারবে না। আর পারবে না বলেই পালিয়ে থাকা।

বিমানবন্দরের সমস্যাটি পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের মতো সমস্যা নিশ্চয়ই নয়। বিডিআর বিদ্রোহ সামলানোর মতো ঘটনাও এটা নয়। মতিঝিলের হেফাজতি সমস্যাও এটা নয়। জঙ্গি দমন করার মতো ঘটনা তো নয়ই। তাহলে বিমানবন্দরের এ সমস্যার মতো ছোট ছোট সমস্যা, যা সাধারণ মানুষের মনে বিরক্তির সৃষ্টি করে, মানুষের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, দেশের ভাবমূর্তি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তা সমাধান কি জরুরি নয়? এসব সমস্যা সমাধানে নিশ্চয়ই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বা কোনো মন্ত্রীর নির্দেশনা জারির প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন শুধু নিজ নিজ কাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করার বোধোদয়। সেবাদানে নিয়োজিত ব্যক্তির নিজ কাজে আগ্রহ সৃষ্টি খুবই জরুরি বিষয়।

সেবাদানে এক ধরনের তৃপ্তি অনুভূত হয়। তা যে স্বর্গীয় অনুভূতি হতে পারে, তা চর্চার মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব। একদিকে সেবাদানের জন্য রুটি-রুজির ব্যবস্থা, অন্যদিকে সেবাদানে স্বর্গীয় অনুভূতি। কাজেই সেবা প্রদানকারী সব কর্তৃপক্ষ নিজের ও দেশের সার্বিক উন্নয়নে তার দায়িত্বটি শতভাগ সন্তুষ্টির মাধ্যমে সম্পন্ন করে স্বস্তির জবাবদিহি নিশ্চিত করবে—এ প্রত্যাশা ভুক্তভোগী সেবাপ্রত্যাশীদের।

 

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব

khanvhi@gmail.com


মন্তব্য