kalerkantho


তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার সোনার ‘মানুষ’ চাই

মোফাজ্জল করিম

৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার সোনার ‘মানুষ’ চাই

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পরশপাথর’ কবিতাটির সেই চমকপ্রদ কাহিনীটির কথা নিশ্চয়ই মনে আছে। সেই যে ‘খ্যাপা খুঁজে খুঁজে ফিরে পরশপাথর ...’ লাইনটি দিয়ে যে-কবিতাটির শুরু, সেটির কথা বলছি। খ্যাপাকে বলা হয়েছিল, পরশপাথরটি খুঁজে আনো ওই ছোট ছোট পাথরের বিশাল ডাঁই থেকে। পরশপাথরের ছোঁয়া দিয়ে তুমি যে-কোনো কিছুকে সোনা বানাতে পারবে। তবে এই বিরাট স্তূপের হাজার হাজার পাথরের নুড়ির ভেতর কোনটি যে পরশপাথর তা তোমাকে এই কষ্টি পাথর ছুঁইয়ে ছুঁইয়ে পরখ করে দেখতে হবে। বেচারা খ্যাপা সেই সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি একটি একটি করে নুড়ি তোলে আর ছোঁয়ায় কষ্টি পাথরে, তারপর সেটি পরশপাথর নয় দেখে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। এই করে করে বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়। হঠাৎ খ্যাপা লক্ষ্য করে, তার হাতের কষ্টি পাথরটি কোন ফাঁকে সোনা হয়ে গেছে। আর তার পাশে জমে উঠেছে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া বাতিল নুড়ি পাথরের পাহাড়। তার মানে? তার মানে কখন জানি তার হাতে উঠে এসেছিল পরশপাথরটি, আর তা সে আনমনে কষ্টি পাথরে ঠেকিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে বাতিল ভেবে। ফলে পরশপাথর পেয়েও পেল না খ্যাপা।

আমাদের মহামান্য রাষ্ট্রপতি ছয়জন ‘খ্যাপাকে’ লাগিয়েছেন পরশপাথর খুঁজে বের করতে। তাঁদের হাতে কোনো কষ্টি পাথর দেননি। জাতি বলছে, না দিক। আপনাদের বিবেকই আপনাদের কষ্টি পাথর। সেই কষ্টি পাথরের ছোঁয়া লাগিয়ে আমাদের জন্য আপনারা বেছে বেছে দশটি পরশপাথর তুলে দেবেন রাষ্ট্রপতির হাতে। তারপর আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, মহামান্য ব্যক্তিটি কোনো প্রকার ছলচাতুরীর (তওবা) আশ্রয় না নিয়ে, তাঁর কোটের বুক পকেট থেকে কোনো পরশপাথরের পুঁটুলি বের না করে, জাতিকে ‘এক শ পারসেন্ট হালাল’ পরশপাথরই উপহার দেবেন। জাতি যে বহু দিন ধরে আকুল প্রত্যাশা নিয়ে বসে আছে ক’টি খাঁটি পরশপাথরের জন্য।

দুই.

এমন কপাল আমাদের। দেশে এখন যেন আকাল চলছে খাঁটি মানুষের। স্বাধীনতার পরপরই একটা নাটক খুব নাম করেছিল সারাদেশে। নাটকটির নাম ছিল ‘সৎ মানুষের খোঁজে’। আসলে স্বাধীনতার আগে-পরে বলে কোনো কথা নয়। সৎ মানুষের জন্য হা-পিত্যেশ কমবেশি সব আমলেই ছিল আমাদের। তবে স্বাধীনতার পরে হঠাৎ করেই যেন তার প্রাদুর্ভাব বেড়ে গিয়েছিল। ফলে নাট্যকারকে একটা নাটকই লিখতে হয়েছিল বিষয়টি নিয়ে। অবশ্য এখনকার মত দুষ্ট লোকের বাড়াবাড়ি রকমের দুষ্টামি-নষ্টামি-ভ্রষ্টামি কোনোকালেই বোধ হয় ছিল না। এখন যে সবখানেই মিথ্যাচারের জয়-জয়কার। সাধুতা নয়, এখন অসাধুতাই যেন সর্বোত্তম পন্থা। সেটা হাটে-বাজারেই হোক, আর অফিস-আদালত-স্কুল-কলেজ-কলকারখানা-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যেখানেই হোক। এর অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে, চট জলদি বড়লোক হওয়ার প্রবণতা। এক লাফে বিশটা সিঁড়ি ডিঙ্গিয়ে দোতলায় উঠে পড়া। পাড়ার রইস্যা চোরা পারলে আমি কেন পারব না?

তিন.

রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে যে পরিচালকরা নিয়োজিত থাকেন, অর্থাৎ রাজনীতিবিদরা, তাঁরা সব কালে, সব দেশে, সবচেয়ে স্মার্ট কিসিমের মানুষ। তাঁরা জনগণকে এক ছটাক গুড়-মিছরি না দিয়েও কৌশলে মিছরির ছুরি চালিয়ে জনগণের কলজে এফোঁড়-ওফোঁড় করতে পারঙ্গম। এরা নিজেদের পেটের ভেতর কয়েক কেজি নিম-নিশিন্দা রেখেও মুখে সব সময় শরবতের নহর বইয়ে দিতে পারেন। অথচ পাবলিকের পায়ের ঘাম মাথায় ফেলে (কষ্ট বেশি হলে এমনটিই হবার কথা) গড়ে তোলা ‘পাব’ (অর্থাৎ পানশালা) সব সময় ‘লিক’ করে চুটিয়ে পান করেন নেতা-ফেতারা। অসহায় পাবলিক শুধু দাঁত কেলিয়ে হাসতেই জানে।

আর গণতান্ত্রিক দেশে নেতাদের মসনদ আরোহণের একটি স্বীকৃত পদ্ধতি হচ্ছে নির্বাচন। নির্বাচনে জয়লাভের জন্য রাজনীতিবিদরা ধনী-গরীব, উন্নত-অনুন্নত প্রায় সব দেশে নানাবিধ কৌশল-অপকৌশল প্রয়োগ করে থাকেন। আগে আমরা ভাবতাম, নির্বাচনে সূক্ষ্ম-স্থূল কারচুপি, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, জ্বালাও-পোড়াও ইত্যাদি বোধ হয় শুধু আমাদের, অর্থাৎ বিশ্বসভায় আমরা যারা অনেকটা অপাংক্তেয়-অস্পৃশ্য, সেই তথাকথিত অনুন্নত অশিক্ষিত গরীব দেশগুলোর ‘মনোপলি’। ট্রাম্প সাহেবরা তাদের দুনিয়া-কাঁপানো নির্বাচনে অনেক বিষয়ে আমাদের ‘ওভার ট্রাম্প’ করে দেখিয়ে দিলেন কারচুপি কাকে বলে, কত প্রকার ও কী কী। আমরা দেখছি আন্দোলনের আগ্নেয়গিরিতে তাদের দেশেও এখন যে কোনো সময় অগ্ন্যুত্পাত হতে পারে। মন্দ কী। বিলিয়নস অ্যান্ড বিলিয়নস ডলারের যুদ্ধাস্ত্র আমাদের মত দেশের কাছে বিক্রি করে তারাই শুধু চিরকাল বগল বাজাবেন, আর আমরা মুখে আঙ্গুল পুরে চুষব তা হয় না। আন্দোলন-জ্বালাও-পোড়াও এবং, ইনশাআল্লাহ, আমাদের দেশে অচিরেই আশা করি, যে-অস্ত্রটিকে ‘অবসলিট্’ ঘোষণা করা হবে, সেই হরতাল প্রযুক্তিও রপ্তানি করে টু-পাইস আমরাও কামাব। ভেবে দেখুন, আমাদের দেশের কারখানায় তৈরি প্যান্ট-শার্ট পরে, আমাদেরই হরতাল নামক ট্রেডমার্ক অস্ত্র নগরে-বন্দরে, স্কুল-কলেজে, শিল্প কারখানায় বেশুমার ব্যবহার করবেন তাঁরা, আর আমরা বসে বসে ‘রয়ালটির’ টু-পাইস কামাব। হ্যাঁ, রয়ালটি তো আমাদের দিতেই হবে। কারণ পাট-জামদানি-শীতলপাটি-ইলিশ মাছ-ন্যাংড়া আম ইত্যাদির মত এইসব নতুন নতুন রপ্তানিপণ্যের অবিষ্কারক তো আমরাই।

তা মার্কিন মুল্লুকের সাম্প্রতিক নির্বাচন নিয়ে যতই ঠাট্টা-তামাশা করি না কেন, সেখানকার নির্বাচনের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের অদক্ষতা বা সরকারি প্রশাসনযন্ত্রের পক্ষপাতিত্ব নিয়ে কিন্তু কোনো কথা শোনা যায়নি। বুদ্ধিজীবী মহল বা মিডিয়া ওই দেশে অবশ্যই প্রকাশ্যে কোনো না কোনো দলের লেজুড়বৃত্তি করে থাকে। এটা নীতিগতভাবে ওই ‘স্পয়েল সিস্টেমের’ দেশে একটি স্বীকৃত ব্যাপার। এতে দোষের কিছু নেই। যে যাকে বা যে দলকে পছন্দ বা অপছন্দ করে, তার পক্ষে-বিপক্ষে প্রকাশ্যে কথা বলুক না, তাতে ক্ষতি কী। বরং এতে করে যুদ্ধটা জমে ভালো। আমাদের দেশের মতো ‘দু’দিল বান্দা কলমা চোর, না পায় শ্মশান, না পায় গোর’, কিংবা ডুডুও খাব, টামাকও খাব—এ রকম মোনাফিকি তারা করে না। তবে তারা সবাই চায়, তাদের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যেন সর্বাবস্থায় নিজ নিজ নিরপেক্ষতা বজায় রাখে।

আর আমাদের সমস্যাটা ওইখানেই। আমাদের নির্বাচন কমিশনের কাছে দেশবাসীর প্রত্যাশ্যা—একজন ফিফা রেফারি বা টেস্ট ম্যাচের আম্পায়ারের নিরপেক্ষতা ও পক্ষপাতহীনতা। বরং সেই প্রত্যাশা আরও বেশি। কারণ ফুটবল বা ক্রিকেটের রেফারি/আম্পায়ার জনসমক্ষে শপথ গ্রহণ করে দায়িত্বের জোয়াল কাঁধে তুলে নেন না, যা একজন প্রধান নির্বাচন কমিশনার/নির্বাচন কমিশনার করে থাকেন। আমাদের দুঃখ হয়, যখন দেখি আমাদের এই শ্রদ্ধেয় পদধারীদের অনেকেই তাদের দেহে মেরুদণ্ডের উপস্থিতির প্রমাণ দেন কেবল মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে শপথবাক্য উচ্চারণের সময়; এরপর যেন কোনো অদৃশ্য জাদুকরের জাদুদণ্ডের ছোঁয়ায় তারা লজ্জাবতী লতার মত মিইয়ে পড়েন। তাদের তুলনা তখন মেরুদণ্ডহীন জেলিফিশ।

আমরা সোয়া হালি জেলিফিশ নয়, আমরা চাই সোয়া হালি মেরুদণ্ডী প্রাণী, বীর্যবান, সাহসী, সৎ ও নিরপেক্ষ মানুষ, যাদের কাছে জাতীয় স্বার্থ, আর্থিক ও নৈতিক সততা, নিরপেক্ষতা থাকবে সব কিছুর ঊর্ধ্বে। আমরা এবার এমন একটি নির্বাচন কমিশন চাই, যা নিয়ে আমরা এবং আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধররা গর্ব করবে। সেই কমিশন প্রাণিত হবে, চালিত হবে, তাড়িত হবে কেবল তাদের বিবেক দ্বারা। কোনো ‘পরাশক্তির’ রক্তচক্ষু বা ভয়ভীতি-প্রলোভন দ্বারা নয়। সেই কমিশন এমন সৎসাহসের অধিকারী হবে যেন অন্যায় প্রতিরোধ করতে তারা যে কোনো সময় নির্দ্বিধায় পদত্যাগ করতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হবে না। আর যদি ‘অমুক আমাকে এই পদে বসিয়েছেন তার কথা ফেলি কেমনে’, কিংবা ‘আমি তো মনে মনে অমুক দলেরই লোক, তাদের স্বার্থ তো সুকৌশলে আমাকে দেখতেই হবে, তা কিল দ্য স্নেক, ব্রেক নট্ দ্য স্টিক বা নতুন কোনো সুইমিং ইন দ্য রিভার নট টাচিং দ্য ওয়াটার পদ্ধতিতেই হোক’—এ ধরনের মানসিকতা যদি থাকে, তবে দোহাই আপনার/আপনাদের, এই কুরসিটাকে আর কলঙ্কিত করবেন না। আমরা মেরুণ্ডহীন জো হুকুম-জাঁহাপনা, সব ঠিক হ্যায় মার্কা কমিশনের কাণ্ড-কারখানা অনেক দেখেছি, ইনাফ ইজ ইনাফ, আর না। এবার আমরা সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ দেখতে চাই মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের গঠিত নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে।

চার.

একটি কথা উল্লেখ করা দরকার। বাংলাদেশ কেন, সব দেশের মানুষই বোধ হয় রাজনৈতিকভাবে কোনো না কোনো দলের সমর্থক। এটা স্বাভাবিক। কারণ সমাজে বসবাস করলে সমাজের আচার-আচরণ, রীতিনীতি একজন মানুষকে স্পর্শ করবেই। আর রাজনীতি তো রাজার নীতি। তা সেটা ন্যায়নীতিহীন বা প্রেমপ্রীতিবিবর্জিত হোক, অথবা সুনীতির ধারকবাহকই হোক। রাজনীতির সুবাতাস বা মন্দ বাতাস একজন নাগরিককে স্পর্শ করবেই। কথা হচ্ছে, সেই বাতাসের স্পর্শে কেউ আরামে আ-হ বলবে, না যন্ত্রণায় উঃ বলে চিত্কার দেবে, তা নির্ভর করে বাতাসের সঞ্চালক ও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের ওপর। কিন্তু যে ব্যক্তি সর্বাবস্থায় নিয়ন্ত্রক মহোদয়ের মনোরঞ্জনের জন্য গ্রীষ্মের মলয় সমীরণে যেমন, তেমনি অগ্নিকুণ্ডে নিপতিত হয়েও কেবল ‘আহা, কী আনন্দ আকাশে বাতাসে’ বলে উড়ুনি দোলাতে দোলাতে গান গায়, বুঝতে হবে সে দলকানা বা দলদাস। বাংলাদেশ এসব আগাছায় ভরপুর। এরা প্রায়শই বাহ্যত ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানে না (বোধ হয় গিলে খায়!) টাইপের মনে হলেও আসলে পাকা ঘুঘু। এরা যে-কোনো অবস্থায় একবার সুঁই হয়ে ঢুকতে পারলে হলো, ফাল হয়ে বের হবেই। তাতে দেশের বারটা বাজল, না চৌদ্দটা বাজল তাতে তাদের কিচ্ছু যায় আসে না। অতএব নির্বাচন কমিশন বলুন আর অন্য যে কোনো দায়িত্ব বলুন, এসব স্বার্থান্ধ সম্বন্ধে সাধু সাবধান।

আর আরেক শ্রেণী আছে, যারা পানির মত। তাদের কোনো আকার নেই, আকৃতি নেই, রং নেই, গন্ধ নেই। এদের যে পাত্রে রাখবেন সেই পাত্রের আকার ধারণ করবে। নিজের ইচ্ছা বলে কিছু নেই। এরা চিরকাল হিজ মাস্টার্স ভয়েস। যো হুকুম জাঁহাপনার দল এরা। এদের কাছ থেকে জাতি কোনো দিন বড় কিছু আশা করতে পারে না। নিজের হাতের তালু কচলানো ও ‘বসের’ পদসেবা ব্যতীত এরা আর কিছু জানে না। তালু কচলাতে কচলাতে তাদের হাতের রেখা মুছে গেছে, আর অহর্নিশ পদসেবা পেয়ে পেয়ে বসের পদযুগল হয়ে গেছে ময়দার কাই।

উপসংহার : সৎ মানুষের খোঁজে যারা হ্যারিকেন-টর্চ-মশাল ইত্যাদি জ্বালিয়ে, বাটি চালান দিয়ে, ময়দানে, বনে-জঙ্গলে নেমে পড়েছেন, তাদের জন্য আন্তরিক শুভকামনা। আপনাদের ও মহামান্য রাষ্ট্রপতির ওপর জাতি গভীর আস্থা স্থাপন করেছে। আমরা বিশ্বাস করি, আপনারা সেই আস্থার মর্যাদা দেবেন।

 

লেখক : সাবেক সচিব, কবি

mkarim06@yahoo.com


মন্তব্য