kalerkantho


এপার-ওপার

পাঞ্জাবের যন্ত্রণামুক্তি নির্বাচনে

অমিত বসু

২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



কী করে এমন পারে। বাস্তবের সঙ্গে অভিনয়কে মিলিয়ে দিতে।

বানানো গল্প বিশ্বাস্য করে তুলতে। তোলপাড় বলিউড, আলিয়া ভাটের অভিনয় সৌকর্যে। টিপসেল টাউনে আশ্চর্য আবির্ভাব। অনেকে বলছে, হবে না, কার মেয়ে দেখতে হবে তো। অভিনয় জগতের অন্যতম ইনটেলেকচুয়াল মহেশ ভাটের কন্যা। সেটাই কি সব। আলিয়ার নিজের খোঁজ যে নিজেই। মাত্র ২৩ বছর বয়সে সবাইকে ছাপিয়েছেন। দর্শক একবাক্যে বলেছে, জবাব নেই আলিয়া, চালিয়ে যাও। ‘ফিল্মফেয়ার’-এর নির্বাচনে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী। ‘উড়তা পাঞ্জাব’ ছবিতে তাঁকে দেখে অন্য কাউকে ভাবেনি পুরস্কার কমিটি। আলিয়া ঝড় তুলেছেন পাঞ্জাবে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ সিং বাদল বিচলিত। ছবিটির বিষয় যে পাঞ্জাব। সেখানকার অন্ধকারের খোঁজ। সবুজ রাজ্য বলেই পরিচয় পাঞ্জাবের। কৃষি বিপ্লবে অভূতপূর্ব সাফল্যের নজির। চাল, গম, ডাল, ভুট্টা থেকে শাকসবজির হরিৎ সমুদ্র। পাঞ্জাবকে দেখেই অন্য রাজ্য চাষে বিবর্তন আনতে শিখেছে। গর্বের বেলুনটা ফুটো করেছে ‘উড়তা পাঞ্জাব’। সেখানে দেখা যাচ্ছে, কী দুরবস্থা পাঞ্জাবি যুবসমাজের। চাষে আর আশা নেই। হাইব্রিড শস্যের উৎপাদন চড়চড়িয়ে বাড়তে বাড়তে এক জায়গায় থমকেছে। এটাই ‘ক্রমহ্রাসমান উৎপন্ন বিধি। ’ জমি জবাব দিয়েছে। উৎপাদনের ক্ষমতা হারিয়েছে। শিল্প তেমন গড়ে ওঠেনি। অর্থনীতিতে চিড়। নতুন প্রজন্ম বাঁচার রাস্তা খুঁজছে, পাচ্ছে না।

১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর পাঞ্জাব বিভক্ত। অর্ধেক পাকিস্তানে, বাকিটা  ভারতের। দুই পাঞ্জাবের যোগাযোগ নিবিড়। এখন ড্রাগ চালাচালিতেও অসুবিধা নেই। সীমান্তরক্ষীদের খুশি করে বা পাশ কাটিয়ে ড্রাগ দেওয়া-নেওয়া। সেটা বিদেশে রপ্তানি করে বিপুল উপার্জন। পাঁচ লাখের ড্রাগের প্যাকেট বিক্রি পাঁচ কোটিতে। এমন সহজে, এত রোজগার কোথায়। যুবসমাজ ছুটছে সেদিকে।

কৃষকদের আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটছে। পাঞ্জাবিরা বাঙালিদের মতো ভাতের ভক্ত নয়। রুটি পছন্দ। গমের আটার রুটি থেকে মকাইয়ের রুটি ভালোবাসে। তার সঙ্গে শর্ষের শাক, এটুকু পেলেই খুশি। তাও না জুটলে যন্ত্রণা তো বাড়বেই। আবাদ করে ফসল না উঠলে ঋণের বোঝা বাড়ে। নিরন্ন মানুষ ধারকর্জতে ডুবে বাঁচবে কিভাবে। বাধ্য হয়ে মৃত্যুতে মুক্তির খোঁজ। ‘উড়তা পাঞ্জাব’ ছবিতে রাজ্যের চালচিত্রটা স্পষ্ট। ছবি প্রদর্শন বন্ধ করার চেষ্টা কাজে আসেনি। আসামির কাঠগড়ায় মুখ্যমন্ত্রী।

আলিয়া পাঞ্জাব সরকারকে শান্ত করতে শাহরুখ খানের সঙ্গে করেছেন একটি অবিস্মরণীয় ছবি। নাম ‘ডিয়ার জিন্দেগি’। এখানে আলিয়ার প্রেম হারানোর যন্ত্রণা। মনোরোগের ডাক্তার শাহরুখের সংস্পর্শে এসে ভালো হয়ে যাওয়া। মৃত্যু নয়, জীবনটাই বড়। সে কৃষক হোক বা কিশোরী। ঠিকঠাক পরামর্শ পেলে মৃত্যুকে রুখতে পারে অনায়াসে। উন্নত চাষবাসে বিজ্ঞান-প্রযুক্তির যেমন দরকার, তেমনি প্রয়োজন বাস্তবমুখী হওয়া। অন্তহীন লোভে অতিরিক্ত প্রাপ্তির স্বপ্নে বিভোর হওয়াটাও ঠিক নয়।

সর্বস্তরের মানুষকে সচেতন করার দায়িত্ব সরকারের। সেটা না পারলে রাজনৈতিক বিপর্যয় শাসকদলের। অভিযোগ, শাসকদলের নেতারা মানুষকে লোভের দিকে ঠেলেছেন নিজেদের লাভের আশায়। অবৈধ  লেনদেনে তাঁরাও যুক্ত। ৪ ফেব্রুয়ারি পাঞ্জাবের ১১৭টি বিধানসভা আসনের ভোটে তারই ছায়া। সরকার থাকবে না যাবে ঠিক হবে ভোটে। নির্বাচনী ফল ১১ মার্চ। সেদিনই প্রকাশ সিং বাদল জানতে পারবেন জনতার রায়। মুখ্যমন্ত্রিত্ব গেলে তাঁর বিরুদ্ধে নতুন সরকারের আক্রমণ তীব্র হবে। প্রকাশের  রাজনীতি সংকটের মুখে পড়বে।

২০১২ সালে শিরোমণি আকালি দল বিজেপির সঙ্গে মিশে সরকার গড়েছিল। আকালিরা একা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ১১৭ আসনের মধ্যে তারা পায় ৫৬। বিজেপির হাতে ছিল ১২টি। তাদের সঙ্গে জোট বেঁধে সরকার গড়েন শিরোমণি আকালি দল বা এসএডি নেতা প্রকাশ সিং বাদল। এসএডির থেকে ১০টি আসন কম পেয়ে ক্ষমতা থেকে দূরেই ছিল কংগ্রেস। হাতে পাওয়া ৪৬টি আসন নিয়ে বিজেপির জায়গায় তারাই এসএডির সঙ্গে মিলে সরকার গড়তে পারত। সেটা করেনি। তাদের রাজনৈতিক দূরত্ব অনেক। এসএডি বরাবরই বিজেপির সঙ্গী। দিল্লির কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকারেরও শরিক।

এবার কংগ্রেস উঠেপড়ে লেগেছে ক্ষমতা দখল করতে। পাঞ্জাবে কংগ্রেসের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অমরিন্দার সিংকে সরিয়ে টেনে এনেছে নতুন নেতাকে। যাঁকে এনেছে তিনি নীতিবাদী নন, সুযোগসন্ধানী। অঙ্ক কষে রাজনীতি করেন। যেখানে সুবিধা সেখানে তিনি। দল বা নীতির বিচার নেই। লাভ ষোলো আনা হলেই হলো। ছিলেন বিজেপির সংসদ সদস্য। সংসদ সদস্য পদে ইস্তফা দিয়ে ছুটেছিলেন আম আদমি পার্টি বা আপের শিবিরে। দিল্লির আপ মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের সঙ্গে সেকি দহরম-মহরম। পাঞ্জাবে তিনিই যে আপের নেতৃত্বে থাকবেন সেটা তখন নিশ্চিত। আচমকা আপের হাত ছেড়ে বেরিয়ে যোগ দিলেন কংগ্রেসে। সদর্পে ঘোষণা করলেন কংগ্রেসই আমার আসল দল। নানা কারণে তাদের থেকে দূরে ছিলাম। আবার কাছে এলাম। কংগ্রেসকে পাঞ্জাবে ক্ষমতায় বসিয়েই ছাড়ব।

তিনি আর কেউ নন, ক্রিকেটার নবজিত সিং সিধু। ভারতীয় দলে জায়গা পেয়েও নিজেকে প্রমাণ করতে পারেননি। মাঠ ছেড়ে ক্রিকেট কমেন্ট্রি বক্সে ঢুকেছেন। যাঁকে পছন্দ তাঁকে তুলেছেন, অপছন্দের ক্রিকেটারদের আছড়ে ফেলেছেন। কথায় কথায় ক্যামেরার সামনে হাসির ঝড় তুলেছেন। হাসির কারণ মানুষের বোধগম্য হয়নি। যেখানে হাসার কারণ নেই সেখানেও হো-হো করে সিধু হাসছেন।

এমন হাসির রাজাকে নেতৃত্বের পদে বরণ করেছে কংগ্রেস। সমস্যাজর্জরিত পাঞ্জাব আজ কাঁদছে। সিধুর হাসি তাদের ব্যঙ্গ করবে, না সান্ত্বনা দেবে, স্পষ্ট নয়। নির্বাচনে জয়ের শেষ হাসিটা কে হাসবেন দেখা যাবে ১১ মার্চ। সিধুর সুবিধা তিনি হারলেও হাসতে পারেন।

 

লেখক : কলকাতার সাংবাদিক


মন্তব্য