kalerkantho


‘ট্রাম্প আমাদের প্রেসিডেন্ট নন’

ড. মাহবুব হাসান

১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



‘ট্রাম্প আমাদের প্রেসিডেন্ট নন’

আমেরিকার নির্বাচনের সময় সবাই ভেবেছিল ট্রাম্প গো-হারা হারবে। তিনি হেরেছেনও ভোটের হিসাবে।

জনগণ হিলারিকেই নির্বাচিত করেছে। আর ইলেকটোরাল সিস্টেম নির্বাচিত করেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। এখন এ দেশের সাধারণ মানুষ ধন্দের মধ্যে পড়ে ভ্যাবাচেকা খেয়েছে। দিলাম হিলারিকে ভোট, বিজয়ী হলো ট্রাম্প! এই ধন্দ কাটিয়ে উঠতে সময় লাগেনি তাদের। তারা তাই ফুঁসে উঠেছে। ২০ জানুয়ারি ট্রাম্পের শপথের দিনই ওয়াশিংটন ডিসিতে প্রতিবাদী মানুষেরা জড়ো হয়ে স্লোগান দিয়েছে ‘ট্রাম্প তুমি আমাদের প্রেসিডেন্ট নও’ বলে।

ট্রাম্প যে আদপেই আমেরিকার বৃহত্তর জনগণের প্রেসিডেন্ট নন, তা কি নতুন করে প্রমাণের প্রয়োজন আছে? তিনি ৩০ লাখ ভোট কম পেয়েছেন হিলারি ক্লিনটনের চেয়ে। ভোট কম পেয়েও কী করে জেতা যায় সেই ম্যাকানিজমই তো তৈরি করে রেখে গেছেন আমেরিকার আদি নেতারা। যখন তাঁরা সংবিধান রচনা করছিলেন তখন তাঁদের সংখ্যা ১৩, মানে আদি ১৩ রাজ্য।

তাঁদের নিয়েই ফেডারেশন। এখন তো ৫০টি রাজ্য। দেশের ব্যাপ্তি বেড়েছে কিন্তু সিস্টেমের পরিবর্তন আসেনি।

এখানে জনগণের ভোটের তেমন কোনো মূল্য নেই। মূল্যবান হচ্ছে স্টেটগুলো, যারা ভোট দিয়েছে ১৯ ডিসেম্বর, ৩০ লাখ ভোট কম পেয়ে যিনি ইলেকটোরাল ভোটে বিজয়ী হয়েছিলেন, সেই ট্রাম্পকে। তারা হিলারিকেও ভোট দিতে পারত কিন্তু দেয়নি। কারণ কী? কারণ হতে পারে হিলারি নারী...। এটাও একটা বড় কারণ বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে।

আমেরিকান পুরুষরা যে নারীবিদ্বেষী তার প্রমাণ দেওয়া খুবই সহজ। ব্রিটিশ উপনিবেশের শাসন থেকে মুক্ত হতে তারা কি না করেছে। ব্রিটেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে স্বাধীন হওয়ার পরও তারা ভুলতে পারেনি যে তারা ব্রিটিশের রক্ত বহন করছে। স্বাধীনতাযুদ্ধে কি কেবল পুরুষরাই জীবন দিয়েছে, নারীর জীবন কি বিনষ্ট হয়নি? অথচ ১১ বছর ধরে সংবিধান রচনার সময় একবারও মনে হয়নি যে নারীদের অধিকার তাদেরই সমান। তাদেরও রাইট আছে ভোটার হওয়ার ও ভোট দেওয়ার। ব্রিটিশের বিরুদ্ধে বিপ্লবী সেনাবাহিনীর নেতৃত্বদানকারী এবং বিজয়ী জেনারেল জর্জ ওয়াশিংটন থেকে শুরু করে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত রাজনৈতিক নেতারা নারীদের ভোটার করেননি।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বিদায়ী প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ইচ্ছা করলে এই বিতর্কিত রেজাল্ট স্থগিত করতে পারতেন। কারণ নির্বাচনে রাশিয়া হ্যাক করেছিল এটা প্রমাণিত সত্য। সেই সত্যটি তিনি তাঁর দলের পক্ষে ক্যাশ করেননি। কেন? কারণ নির্বাচনী ট্র্যাডিশন তিনি ভাঙতে চাননি।

২০ জানুয়ারি ডেমোক্র্যাটদের প্রতিবাদী মিছিলের পর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ নতুন ইতিহাসের সূচক বলে ধারণা করা যায়। কিন্তু ২১ জানুয়ারির নারীদের প্রতিবাদ মিছিলটিকে ইতিহাসের পাতায় নতুন রাজনৈতিক ডাইমেনশনে পৌঁছে দিয়েছে। কারণ অতীতে এ রকম প্রতিবাদী মিছিল হয়েছে, তবে তা এতটা ব্যাপকতা পায়নি। তা ছিল সীমিত পরিসরেই। কিন্তু এবার যেন প্রাণের তাগিদে পথে নেমে এসেছেন নারী ও পুরুষরা। তাঁরা যেমন ডেমোক্র্যাট তেমনি ননপলিটিক্যাল সাধারণ মানুষও, যাঁরা ভেবেছেন তাঁদের ভোটগুলো চুরি করা হয়েছে।

নারীদের নিয়ে ট্রাম্পের কটূক্তি এবং তাঁর নোংরা অভিব্যক্তি জাগ্রত নারীসমাজকে উত্ত্যক্ত করেছে বলেই মনে হয়। ওয়াশিংটন ডিসিতে তারা দুই লাখ নারীর জমায়েতের অনুমতি পায়। কিন্তু ২১ জানুয়ারি দেখা গেল সেখানে পাঁচ লাখেরও বেশি নারী-পুরুষ উপস্থিত। গোটা বিশ্বেই নারীর পাশে এসে পুরুষরাও প্রতিবাদের ঝাণ্ডা নিয়ে দাঁড়িয়েছে। এবং তার সংখ্যা ৩ মিলিয়ন (৩০ লাখ) বলে পত্রিকাগুলো উল্লেখ করেছে। এই যে ৩০ লাখ মানুষের প্রতিবাদ তা কি ট্রাম্প প্রশাসনে কোনো রকম ভাবান্তরের জন্ম দেবে? আপাতত সাদা চোখে তার কোনো নমুনা দেখা যাচ্ছে না। তবে ভেতরে তাদের কাঁপুনি লেগেছে বলেই মনে হয়।

আমার ধারণা, ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের ও গোষ্ঠীর স্বার্থের স্বপ্নে বিভোর হয়ে যেসব ভুল সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন, যা আমেরিকার জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে মেলে না। বরং তিনি অন্তঃসারশূন্য বর্ণবাদিতার লাগাম ধরে ভেবেছেন যে সাদারা তাঁকে ভোট দিয়েছেন এবং তিনি তাঁদেরই জন্য নতুন গ্রেট আমেরিকা প্রতিষ্ঠা করবেন। সে লক্ষ্যেই কট্টর বর্ণবাদী কাউকে কাউকে তাঁর ক্যাবিনেটে জায়গা দিয়েছেন। কংগ্রেস কমিটিও তাঁকে সেই সুযোগের পথ খোলাসা করে দিয়েছে। কিন্তু সেটাই তো শেষ নয়, কংগ্রেস শুনানিতে ছেড়ে দিয়ে দেখতে চায় এই ব্যবসায়ী কতটা যেতে পারেন, কতটা যান। রাশ টানতে তাঁরা জানেন। কারণ তাঁরাই আমেরিকার রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার নিয়ামক শক্তি। প্রেসিডেন্ট সেখানে কেবল তাঁর প্রত্যাশাগুলো তুলে ধরতে পারেন। কিছু নির্বাহী ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের আছে, যা প্রয়োগেরও ক্ষমতা তাঁর আছে। কিন্তু পরে তারও অনুমোদন নিতে হয় কংগ্রেস থেকে।

আজ এটা ভাবলে হবে না যে মাত্র ৩০ লাখ মানুষের প্রতিবাদ সেদিন ঘটেছিল রাজপথে, আসলে তাদের পেছনেও ছিল মিছিলে না-আসা কয়েক কোটি ভোটারের সমর্থন-সহযোগ। সেই নীরব প্রতিবাদীদের কি দেখতে পাবে আমেরিকান শাসকগোষ্ঠী?

 

লেখক : আমেরিকাপ্রবাসী সাংবাদিক ও কবি


মন্তব্য