kalerkantho

26th march banner

ভিন্নমত

সুখেরও একটা সূচক আছে!

আবু আহমেদ

১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



সুখেরও একটা সূচক আছে!

‘আমি কোথায় পাব সুখ, আমার মনে যে অসুখ’

এটা হলো একটি গানের কলি বা পঙিক্ত। গেয়েছেন আমাদের বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের একজন শিল্পী। গানটির যখন প্রথম লাইন শুনলাম, পুরো গানটি না শুনে পারলাম না। গান তো আমাদের জীবনের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। আমরা সবাই সুখের পেছনে ছুটে চলেছি, কিন্তু সুখ যে আমাদের থেকে শুধুই দূরে চলে যাচ্ছে। সুখের ব্যাখ্যা একেকজনের কাছে একেক রকম। বেশির ভাগ লোক ভুল করে টাকা-পয়সার মধ্যে সুখ খুঁজছে। কেউ বা সুখ সুন্দরীর মধ্যে সুখ নামের অনুভূতিকে লালন করছে, কেউ কিছু দিয়ে বিখ্যাত হওয়ার মধ্যে সুখের তালাশ করছে, কেউ অতীতের স্মৃতিচারণা করে সুখ পেতে চায়, কেউ পরিবারের সেবা করার মধ্যে সুখ পেতে চায়, কেউ একেবারে অতি নগণ্য জীবনের মধ্যে সুখ পেতে চায়, কেউ সারাক্ষণ আমি বড় এই ভাবনার মধ্যে সুখ পেতে চায়, কেউ প্রকৃতি দর্শন এবং প্রকৃতি নিয়ে ভাবনার মধ্যে সুখ পেতে চায়, কেউ অনেক অনেক অর্থ ব্যয়ের মধ্যে সুখ পেতে চায়, কেউ সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখার মধ্যে সুখ পেতে চায়, কেউ সারাক্ষণ সৃষ্টিকর্তার ধ্যানের মধ্যে সুখ পেতে চায়। মোটকথা সুখের তালাশই হলো জীবন এবং সুখে থাকার নামই হলো জীবন, কিন্তু আমরা যতই সুখের পেছনে দৌড়াই সুখ নামের সেই অনুভূতিটি কি আমাদের অন্তরের মধ্যে আবদ্ধ করতে পেরেছি? আমাদের মনে হয় সুখ হলো এমন এক অনুভূতি—এই আছে তো, এই নেই। তবে সুখকে জয় করতে পেরেছে তারাই, যারা দুঃখকে সুখ মনে করে, দুঃখে যারা কাঁদে এবং সেই কাঁদার মধ্যে যারা একটি তৃপ্তি অনুভব করে। সুখ মাপার কোনো যন্ত্র আবিষ্কৃত হয়নি। অনেক যন্ত্র, যেমন মিথ্যা বললে যন্ত্রে সংকেত দেবে, আবিষ্কৃত হলেও সুখ মাপার যন্ত্র আবিষ্কৃত হয়নি, হয় তো অমন যন্ত্র কোনো দিন আবিষ্কৃত হবেও না। ডাক্তারি বিজ্ঞানে মানুষের কিছু প্যাথলজিক্যাল টেস্ট করানো হয়। ওই সব টেস্টের ফল পক্ষে থাকলে ডাক্তার সাহেব বলে দেন, আপনি ভালো আছেন। ’ রোগী বলেন, ‘আমি কিভাবে ভালো আছি, আমার মনে যে শান্তি নেই। ডাক্তার সাহেব চিন্তা করেন যত লেখাপড়া করেছেন শরীর ভালো রাখার জন্য, মন ভালো রাখার জন্য তো বিদ্যা তার নেই! ডাক্তার সাহেব বলেন, আপনি একজন মনোবিদ্যার লোককে আপনার কথা বলুন। উনি মনের ওষুধ দিতে পারেন। রোগী গেলেন মনোবিজ্ঞানীর কাছে। যা শুনলেন তা হলো অবসাদ দূর করার কথা। অথবা দুশ্চিন্তা না করার কথা। বেশি দুশ্চিন্তা হলে ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে শুয়ে থাকার কথা। রোগী বুঝলেন, শরীরের অসুখ সারানো যত সহজ, মনের অসুখ সারানো অত সহজ নয়। রোগী মনের অসুখ সারানোর জন্য অনেক জায়গায় ঘুরেছেন, ধ্যান করানোর কারিগরদের কাছে গেছেন, আধ্যাত্মিক হুজুরদের কাছে গেছেন, কিন্তু রোগী মনের অসুখ থেকে মুক্তি পাননি। অবশেষে একদিন বাজারে এক লোকের সাক্ষাৎ পেলেন, লোকটি তাঁকে চিনেছে। মনের অসুখ শরীরের ওপর ভর করেছে, আগের যে চেহারা ছিল সেটা অনেকটা নিষ্প্রভ।

লোকটি প্রথমেই বললেন, আপনার এ হাল হলো কেন? রোগী বলল, আমার যে অসুখ। লোকটি বললেন, কী অসুখ? রোগী বলল, মনের অসুখ। এবার লোকটি হেসে দিলেন, আরে ভাই, এটা একটা অসুখ নাকি। আপনি যে কারণে এবং যেভাবে মনের অসুখে ভুগছেন, সে রকম তো আমাদের দেশের লাখ লাখ লোক ভুগছে। আজ থেকে মনে করুন, আপনার কোনো অসুখ নেই। আজ থেকে ভাবুন, আপনি কারণে-অকারণে ডাক্তারের কাছে যাবেন না। আজ থেকে আপনি ঘুমের ওষুধজাতীয় ট্যাবলেট সেবন বন্ধ করুন। নিজের শান্তির জন্য আপনার সৃষ্টিকর্তার কাছে আশ্রয় চান, পারলে স্ত্রীকে নিয়ে কক্সবাজার বেড়িয়ে আসুন, আর সাধারণ কাজকর্ম থেকে নিজেকে দূরে রাখবেন না। মনে রাখবেন, আপনি মনের যে অসুখে ভুগছেন বলে মনে করছেন, সে রকম অসুখ আপনার আশপাশের সবার আছে, অন্য সুখী লোকদের প্রতি লক্ষ করুন। তারা কিভাবে কোথায় সুখ পাচ্ছে, সেটা দেখুন। ডাক্তার-ট্যাবলেট-হাসপাতাল আপনাকে সুখ দিতে পারবে না, বরং এরা একত্রে মিলে আপনার যেটুকু সুখ আছে, তা-ও কেড়ে নেবে।

ভাবুন, আপনার কোনো রোগ নেই, আপনি ঠিক আছেন। আর রোগ থাকলেই বা কী, আরো চিন্তা করে আপনি কি মনের রোগকে দূর করতে পারবেন? তারপর লোকটা ‘ভালো থাকুন’ বলে মনের কষ্টে ভোগা রোগীর সামনে থেকে চলে গেল। আর মনের রোগী ভাবতে লাগল—লোকটা তো ঠিকই বলেছে। শারীরিক কোনো বড় রোগ না থাকা সত্ত্বেও নিজেকে মনের রোগী ভাবা তো একটা বোকামিই বটে। এই মনের রোগী অনেক ডাক্তারের কাছে গিয়েছে, অনেক ধ্যানের চর্চা করেছে, অনেক পানিপড়া পান করেছে। কিন্তু ওই সব তার মনের রোগকে সারাতে পারেনি, বরং বিনা মূল্যে পাওয়া বাজারের এই লোকটার কথাই তার মনঃপূত হয়েছে। ঘরে গিয়ে ঘুমের সব ট্যাবলেট, অবসাদ দূরীকরণের ওষুধ, ভিটামিন—সবই ফেলে দিলেন। কাজকর্মে মন দিলেন। প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখতে গ্রামের কোনো স্থানে বের হয়ে পড়েন, গ্রামের বাড়িতে গিয়ে রোদপড়া পুকুরে গোসল করেন, বাড়ির পাশে খোলা আকাশের নিচে লম্বা টেবিলে বসে রৌদ্রস্নাত সকালে এক কাপ চা পান করেন। মানুষের সঙ্গে মন খুলে কথা বলেন। অন্য লোকের সুখ দেখে নিজের কল্পনার জগতে নিজেকেও সুখী ভাবতে থাকেন। একটা কুঁড়েঘর, একটা ওঠান, এক জোড়া গরু, এক কৃষক, এক কিষানি, ঘরের সামনে ছোট জায়গায় একটি সবজিক্ষেত। কিষান-কিষানি দুজনেই পড়ন্ত বিকেলে সবজিক্ষেতে পানি দেয়। দূর থেকে মনের এই রোগী দেখতে থাকে। ভাবে ওরা কত সুখী। সূর্য ডুবে গেলে ঘরে চলে যায়। নিজ হাতের চাষ করা সবজি, পুকুর থেকে তোলা মাছ দিয়ে রান্না করা তরকারি খেয়ে শুয়ে পড়েন। শোয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঘুম এসে যায়। ওঠেন সেই ফজরের সময়। বাড়ির কাছের মসজিদ থেকে মুয়াজ্জিনের আজানের সময়। তাদের ঘরে কোনো ওষুধের বোতল নেই। ড্রয়ারে ট্যাবলেট নেই। তাদের কোনো প্রেশার নেই। ডায়াবেটিস নেই। তারা কত সুখী। আর আমি নরম বিছানায় শুয়ে থাকি, কিন্তু ঘুম আসে না, আসলেও সেই ঘুম আসতে অনেকক্ষণ সময় লেগে যায়। পাতলা ঘুম, রাতে কয়েকবার উঠি, আবার শুইলে ঘুম আসতে অনেক সময় লেগে যায়। জীবনটা যেন কৃত্রিমতায় ভর্তি। পুরো জীবনকে করে ফেলেছি ওষুধমুখী। এখন তো আর ওষুধ ছাড়া যাবে না। ডাক্তার বলেছেন, ওষুধ ছাড়লে বিপদ আছে। ভয়ে ওষুধ ছাড়িও না। প্রাকৃতিক জীবনের কথা চিন্তা করি। কিন্তু আমি যে সেই জীবন থেকে অনেক আগেই অনেক দূর চলে এসেছি। ভাবি আমাদের বাপ-দাদাদের কথা। তখন তো অত ডাক্তার-হাসপাতাল আর ওষুধ ছিল না। তাঁরা তো ৯০-১০০ বছর বেঁছেছিলেন, তাঁরা কিভাবে ডাক্তারি চিকিৎসা ছাড়া এত বছর আয়ু পেলেন!

এখন তো অবস্থা এমনই যে লোক যত ধনী, তার রোগ তত বেশি। কারণ হলো তিনি খান বেশি, একটু শরীর খারাপ হলে ডাক্তারের কাছে ছুটে যান। ডাক্তার বলেন, হাসপাতালে ভর্তি হয়ে সব চেকআপ করিয়ে নিন। এভাবে এই ধনী লোকটা প্রতি ছয় মাস অন্তর অন্তর চেক করানোর আবর্তে প্রবেশ করে যান। একসময়ে দেখা গেছে, দেশীয় ডাক্তার-হাসপাতাল তাঁর কাছে আর সুবিধা মনে হচ্ছে না। তিনি চলে গেলেন সিঙ্গাপুর। সেই যে গেলেন, এরপর যেতেই থাকলেন। পরের ১০ বছর সিঙ্গাপুর-স্বদেশ যাওয়া-আসার মধ্যে কাটিয়ে দিয়েছেন। এত দিনে ওষুধের ধাক্কায় সেই ধনী লোকের শরীর আরো ভেঙে পড়েছে। অর্থ দিয়ে উন্নত চিকিৎসা করিয়ে কোনো লাভ হয়নি। বরং শেষ দিনগুলো তাঁর খুব কষ্টের গেছে। অথচ এই ধনী লোকটির গ্রামের বাড়িতে তাঁর ফেলে আসা আত্মীয়স্বজন আরো দীর্ঘদিন বেঁচেছিল। বেশি চিকিৎসা করানোতে বিপদ আছে। অর্থকড়ি থাকা ভালো। তবে যাঁরা ভাবেন অর্থকড়ি তাঁদের ভালো থাকতে দেবে—এ ধারণা যে কত বড় ভুল তা তো আমরা চোখ খুললেই দেখতে পাচ্ছি। ভালো থাকাও একটা কিসমত। সবাই ভালো থাকতে পারে না। মানুষ যেমন তার কাজকর্মকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, তেমনি ভালো থাকার ব্যাপারটিকেও আয়ত্তে আনতে পারে না। সৃষ্টিকর্তা মেহেরবানি করে যাকে ভালো দেন, তিনি ভালো থাকবেন। আপনি-আমি যে ভালো থাকতে চাচ্ছি, সেই দরখাস্তটাও তাঁর কাছেই দিতে হবে।

ওপরে আমি বলেছি, সুখ মাপার কোনো মাপকাঠি নেই। সুখ একেকজনের কাছে একেক রকমের। কেউ দরিদ্র থেকেও ধনী লোকটার থেকে অনেক বেশি সুখী। এমন কোনো যন্ত্র আজতক বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করতে পারেননি, যেটা দিয়ে সুখকে পরিমাপ করে বলে দিতে পারবেন যে এই লোকটা ওই লোকটা থেকে বেশি সুখী। ব্লাড প্রেশারের যন্ত্র ব্যবহার করে সবার জন্য আমরা রক্ত প্রবাহের একটা প্রেশার চেক করে নিয়ে বলে দিচ্ছি—ওনার থেকে ওনার প্রেশার বেশি। কিন্তু সুখ মাপার ক্ষেত্রে সে রকম যন্ত্র ব্যবহার করার কথা শুনলে মানুষ হাসবে। তবে সমাজবিজ্ঞানীরা সুখের সূচক নির্মাণ করার জন্য কিছু বিষয়কে আমলে নিয়েছেন। তাঁরা সুখের প্রতিটি উপাদানের জন্য একটা নম্বর প্রয়োগ করেন। যেমন ১০০-এর স্কেলে ধনসম্পদের জন্য সর্বোচ্চ এত নম্বর, ভালো দাম্পত্য জীবনের জন্য এত নম্বর, ভালো ছেলে-মেয়েদের জন্য এত নম্বর, ভালো পরিবেশের জন্য এত নম্বর, বয়সের জন্য এত নম্বর, ভালো স্বাস্থ্যের জন্য এত নম্বর। সব নম্বর যোগ করে তাঁরা বলেন, এই ব্যক্তি ওই ব্যক্তি অপেক্ষা বেশি সুখী। তবে সুখের এই পরিমাপ সর্বত্র গ্রহণযোগ্যতা পায়নি, পাবেও না।

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য