kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


আওয়ামী লীগের ওপরই জনগণের ভরসা

সুভাষ সিংহ রায়

২২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



আওয়ামী লীগের ওপরই জনগণের ভরসা

দেশে-বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের মধ্যে অপেক্ষার দারুণ এক উত্তেজনা। নেতাকর্মী, সমর্থকরা অপেক্ষার প্রহর গুনছেন।

৬৭ বছরে মোট ২০টি নিয়মিত কাউন্সিল এবং আরো অন্তত তিনটি বিশেষ কাউন্সিল অধিবেশন এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়েছে; অর্থাৎ গড়ে তিন বছরে একটি। বিএনপি, জাতীয় পার্টি তো বটেই, বাংলাদেশে ডান-বাম নির্বিশেষে আর কোনো দল এভাবে প্রায় নিয়মিত কাউন্সিল অধিবেশন করতে সক্ষম হয় না। আওয়ামী লীগের একটি ঐতিহ্য হচ্ছে, এর বিভিন্ন কমিটির সভা কমবেশি নিয়মিত অনুষ্ঠিত হওয়া। দলের নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রেও আওয়ামী লীগের ঐতিহ্য হলো, কাউন্সিল কর্তৃক সর্বসম্মতিক্রমে দলের সভাপতি বা সভানেত্রী ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন। এ ব্যাপারে আগে দুই শতাধিক সদস্য নিয়ে গঠিত সাবজেক্ট কমিটিতে বিশদ আলাপ-আলোচনা হয়। কাউন্সিলই সর্বসম্মতিক্রমে দলের সভাপতি বা সভানেত্রীর ওপর কমিটির বাকি কর্মকর্তা ও সদস্যদের মনোনয়নের ক্ষমতা অর্পণ করে। ৬৭ বছরের প্রতিষ্ঠান আওয়ামী লীগ নিজেই একটি ইতিহাস। ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ নামে এর যাত্রা শুরু (১৯৪৯)। ১৯৪৮-৫২-র ভাষা আন্দোলন ও ৫৪-র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের চরম ভরাডুবি ঘটলে পরিবর্তিত অবস্থায় ১৯৫৫ সালে রূপমহল সিনেমা হলের কাউন্সিলে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দ বাদ দিয়ে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’, সংক্ষেপে আওয়ামী লীগ হয় এবং অসাম্প্রদায়িকীকরণের মাধ্যমে সবার জন্য দলের দ্বার উন্মুক্ত করা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের শুরু থেকে দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে প্রথমে দলের যুগ্ম সম্পাদক, এর কিছু সময় পর ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক (১৯৫২-১৯৫৩), ১৯৫৩-১৯৬৬ (ফেব্রুয়ারি) ১৩ বছর সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৬৬ (মার্চ)-১৯৭৪ (জানুয়ারি) পর্যন্ত আট বছর দলের সভাপতি থাকা অবস্থায় তিনি দলকে এমনই শক্তিশালী ভিত্তির ওপর গড়ে তুলেছিলেন, বাংলাদেশে এমন একটি পরিবার পাওয়া কঠিন, যে পরিবারে আওয়ামী লীগের একজন সদস্য বা সমর্থক নেই। আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল হিসেবে অনন্য। এই দলের প্রধান বৈশিষ্ট্য বাঙালির জাতীয় মুক্তি বা স্বাধীনতা অর্জনে যেকোনো ত্যাগ স্বীকারে তাঁর সর্বোচ্চ অঙ্গীকার। আরেকটি বিশেষ সম্পদ হচ্ছে আওয়ামী লীগের নিবেদিতপ্রাণকর্মী ও ইস্পাতদৃঢ় সংগঠন। বিচারপতি সায়েম তাঁর ‘At Bangabhaban : Last Phase (1988)’ গ্রন্থে স্পষ্ট করে লিখেছেন, ‘আমি যখন বঙ্গভবনে ছিলাম তখন দেখেছি রাজনৈতিক দল হিসেবে একমাত্র আওয়ামী লীগ ছাড়া রাজনৈতিক দলগুলো ক্যান্টনমেন্টে নিয়মিত যাতায়াত করত। ’ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র এক বছর ১০ মাসের মধ্যে বিরোধী রাজনৈতিক দল গঠন কিছুতেই সহজসাধ্য ছিল না। মুসলিম লীগ সরকারের রক্তচক্ষুর ভয়ে সেদিন ঢাকা শহরের কোথাও কেউ সরকারবিরোধী রাজনৈতিক কর্মী সম্মেলনের জন্য হলরুম ভাড়া বা জায়গা দিতে সম্মত হননি। অবশেষে পুরান ঢাকার কে এম দাস লেনের কে এম বশিরের (হুমায়ুন সাহেব নামে পরিচিত) ‘রোজ গার্ডেন’ বাগান বাড়িতে আওয়ামী মুসলিম লীগ জায়গা পেয়েছিল। বিশিষ্ট রাজনীতিবিজ্ঞানী অধ্যাপক হারুন অর রশিদ এক লেখায় প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ করেছেন, ‘বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশিম সমর্থক প্রগতিশীল অংশের এ কর্মী সম্মেলনের (২৩ ও ২৪ জুন ১৯৪৯) উদ্যোক্তাগণ সকলেই কি সেদিন জানতেন বা বুঝতে পেরেছিলেন ইতিহাসের কী বীজ তাঁরা সেখানে বপন করছেন? সবাই বা অনেকে না হলেও অন্তত একজন সেটি জানতেন আর তিনি হলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা ও স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ’ কারাবন্দি অবস্থায় তিনি ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম সম্পাদক। তখন বঙ্গবন্ধুর বয়স মাত্র ২৯ বছর। সুদূরপ্রসারী এক লক্ষ্য নিয়েই বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগকে গড়ে তুলেছিলেন। ১৯৫৫ সালে পুরান ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্টে বঙ্গবন্ধু সংগঠনের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করে ঘোষণা করেছিলেন, ‘...আওয়ামী লীগকে দৃঢ় সংগঠনের ওপর দাঁড় করিয়ে একটি সত্যিকার জাতীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার কাজকেই আমরা প্রধানতম কর্তব্য বলে মনে করি। ...‘ইতিমধ্যে প্রদেশের সকল জেলায় এবং শতকরা ২৫ ভাগ ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ সংগঠন হয়েছে। ইনশা আল্লাহ অদূর ভবিষ্যতে আমরা প্রদেশের সকল ইউনিয়নে এমনকি সকল গ্রামেই আওয়ামী লীগের ঝাণ্ডা উড়াতে সক্ষম হব। ’

গণমাধ্যমে একটা বিশুদ্ধ নির্বাচনের কথা প্রায়ই বলতে শোনা যায়। ভাবখানা যেই দলের পক্ষে তাঁরা বলছেন, সেই দলের নির্বাচনের ইতিহাস খুবই সমৃদ্ধ। এমনকি বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর আওয়ামী লীগের চরম দুর্দশাগ্রস্ত সময়েও খুনিদের মদদপুষ্ট শাসকরা আওয়ামী লীগকে নির্বাচনী মোকাবিলায় ভয় পেয়েছিল। সেই সময় নির্বাচন হলে আবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে আসবে—এ রকম একটা আশঙ্কা ছিল মওলানা ভাসানীরও। যে কারণে তিনি বলেছিলেন, ‘নির্বাচন হইলে হানাহানি-কাটাকাটি হইবে। ইহা শান্তিপ্রিয় জনগণ চায় না। এ ধরনের নির্বাচনে ইতিপূর্বে যাহারা ক্ষমতায় গিয়াছিল...আবার তাহারাই ক্ষমতায় আসিবে। ’ বিশিষ্ট লেখক মহিউদ্দিন আহমেদ ‘বিএনপি সময় অসময়’ গ্রন্থে স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছেন, ‘‘মৃত মুজিবকে মোকাবিলা করার জন্য ৪ আগস্ট (১৯৭৬ ) ইতিপূর্বে জারি করা রাজনৈতিক দলবিধি সংশোধন করা হয়। প্রথমে জারি হওয়া দলবিধিতে ছিল, ‘ক্ষতিকর কার্যকলাপে’ লিপ্ত কোনো সংগঠনকে নিবন্ধন দেওয়া হবে না। ” ৪ আগস্টের সংশোধনীতে ক্ষতিকর কার্যকলাপের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলা হয়, ‘কোনো জীবিত বা মৃত ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ সৃষ্টি বা উৎসাহিত করিবার জন্য পরিকল্পিত হয় কিংবা এই রূপ শ্রদ্ধাবোধ সৃষ্টি বা উৎসাহিত করিতে পারে বলিয়া সম্ভাবনা হয়েছে। ’ বুঝতে পারা যায়, বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সৃষ্ট আওয়ামী লীগকে নিয়ে স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীর কি রকম ভয় ছিল তা বুঝতে পারা যায়। বর্তমান সভানেত্রীকে নিয়েও স্বৈরাচারীদের ও তাদের অনুসারীদের দারুণ ভয়। ১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনা স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের (১৯৮১ সালের ১৬ মে) আগের দিন পত্রিকায় সংবাদ ছিল ‘শেখ হাসিনার আগমন প্রতিরোধ কমিটি তাদের কর্মসূচি আপাতত স্থগিত করেছে। ’ বাংলাদেশের এখনকার রাজনীতিও বলে দেয় সেই প্রতিরোধ কমিটির কুশীলবরা এবং উত্তরসূরিরা এখনো সক্রিয়। আওয়ামী লীগের আজকের নেতাকর্মীরা যেন ভুলে না যান, দলটি কত দুর্গমগিরি কান্তার মরু পথ পাড়ি দিয়ে ৬৭ বছরে এসে পৌঁছেছে। ১৯৮১ সালের ৫ মে বিশ্বখ্যাত নিউজ উইক পত্রিকায় বক্স আইটেমে শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘জীবনের ঝুঁকি আছে এটা জেনেই তিনি বাংলাদেশে যাচ্ছেন। ’ শুধু ১৯৮১ সালে নয়, ২০০৭ সালের ৭ মে আবারও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশে ফিরে এসেছিলেন। তখনো কোনো ষড়যন্ত্র তাঁর গতিপথ রুদ্ধ করতে পারেনি।

আওয়ামী লীগ সব সময় অগ্রবর্তী চিন্তা বা কর্মসূচি জনগণের সামনে নিয়ে আসতে পারে। যেমন—বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ১৯৬৪ সালের কাউন্সিল অধিবেশনে আওয়ামী লীগের যমুনা নদীর ওপর সেতু নির্মাণের প্রস্তাব, ১৯৭০ সালের কাউন্সিলে মহকুমাগুলোকে জেলায় উন্নীত করার প্রস্তাব; ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে শেখ হাসিনার পদ্মা সেতু ও চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীতে টানেল নির্মাণের পরিকল্পনা ঘোষণা, শেখ হাসিনার ‘ভিশন ২০২১’ ডিজিটাল বাংলাদেশ ইত্যাদি। আমরা ভালো করেই জানি, সংগঠনগতভাবে আওয়ামী লীগ নিজেই অনেক ঐতিহ্যের অধিকারী। আওয়ামী লীগ তার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে সব সময় জাতির মধ্যে ঐকতান সৃষ্টি করতে পেরেছে। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র চার মাস ১৯ দিনের মাথায় ছাত্রলীগের জন্ম দিয়েছিলেন। আজ আমাদের নতুন মানুষ, নতুন সময়, নতুন ভাবনাচিন্তা। যে ছেলে বা মেয়ের বয়স ২০ বছর, আট বছর আগেও সে স্কুলে ভুল ইতিহাস পাঠ করেছে। প্রকৃতার্থে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর টানা ২১ বছর ছিল ইতিহাস দখলের ইতিহাস। আজ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়; কিন্তু ঘাপটি মেরে থাকা অপরাজনীতির লোক রয়েছে অনেক। এদের নিশ্চিহ্ন করতে পারে সাংস্কৃতিক জাগরণ।

নতুন প্রজন্মের সামনে নতুন সময়ের মতো করে আওয়ামী লীগকে উপস্থাপন করাটাও খুব জরুরি। নিশ্চয় এসব নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের বেশ ভাবনাচিন্তা আছে। এরই মধ্যে অনেক কাজও হয়েছে; আরো অনেক কিছু করার আছে। কেননা প্রান্তিক বিচ্যুতি হলেও দলের বেশ কিছু বিচ্যুতি জনগণের কাছে ধরা পড়েছে। আওয়ামীবিরোধী শক্তি তিলকে তাল করে উপস্থাপন করে, যা জনমনে বিভ্রান্তির জন্ম দিচ্ছে। মনে রাখা দরকার, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াশীলরা অতীতের যেকোনো সময়ে বেশি সক্রিয়। তাই আওয়ামী লীগকে অনেক বেশি সচেতন থাকতে হবে। আওয়ামী শব্দ এসেছে ‘আওয়াম’ থেকে আর আওয়াম অর্থ জনগণ। মানুষ আশা করে, জনগণের চিন্তা-চেতনা ধারণ করে এবারের কাউন্সিলের ঘোষণাপত্রে আওয়ামী লীগ নতুন চিন্তার সংযোজন ঘটাবে। আমরা ভালো করেই জানি, বাঙালি জাতি সব সময়ই চেষ্টা করেছে স্বীয় জাতিসত্তাকে সমুন্নত রেখে স্বাধীন জীবনযাপনের। জনগণের ভরসা একমাত্র আওয়ামী লীগের ওপর।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

suvassingho@gmail.com


মন্তব্য