kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বিতর্কেও ট্রাম্প দেখালেন কল্পনার জগতে তাঁর বাস

ম্যাথিউ কুপার

২১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



বিতর্কেও ট্রাম্প দেখালেন কল্পনার জগতে তাঁর বাস

মার্কিন রাজনীতিতে ২০১৬ সালটি আঘাতের ও নিষ্ঠুরতার বছর; যৌনতা, অর্থ ও ক্ষমতার নোংরা অনেক অভিযোগের বছর। এবার তৃতীয় ও শেষ দফার বিতর্কে এসেও দুই প্রেসিডেন্ট প্রার্থী আশা জাগাতে পারেননি।

হ্যাঁ, ডোনাল্ড ট্রাম্প আগের দুই বিতর্কের তুলনায় এবার কম উগ্র ছিলেন। তিনি হিলারি ক্লিনটনকে বলেননি, প্রেসিডেন্ট হতে পারলে তোমাকে জেলে পুরব। এবার আঘাত এসেছে অন্যভাবে। ট্রাম্প বলেছেন, নির্বাচনী ফলাফল তিনি মানবেন কি না সময় এলেই দেখা যাবে। ট্রাম্পের এমন উত্তর মার্কিন নির্বাচনের দীর্ঘ ঐতিহ্যের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। ট্রাম্প শিবিরের কেউ কেউ বিষয়টিকে সামাল দিতে গিয়ে বলছেন, ফলাফল যাই আসুক, তাঁদের প্রার্থী মেনে নেবেন। তাঁরা ট্রাম্পের এহেন আচরণে বড় দোষ দেখতে চাইছেন না। তবে ঐতিহ্যের বিপরীত স্রোতে গিয়ে ট্রাম্প তাঁর বড় চারিত্রিক ত্রুটিগুলোকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন। আসলে তাঁর বাস এমন কল্পনার জগতে, যেখানে তথ্য-উপাত্ত কাজে লাগে না। আমেরিকাকে নিয়ে তাঁর অনেক ভাবনাকেই অবাস্তব, কাণ্ডজ্ঞানহীন মনে হয়। বিশেষ করে তিনি যখন বলেন, ‘আই উইল মেইক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’। তিনি আরো বলেছেন, স্বাস্থ্যবীমার জন্য জমার প্রিমিয়াম তবে আরো বাড়ানো হোক, যাতে সবাই ওবামাকেয়ার পরিকল্পনার ব্যর্থতা হাড়ে হাড়ে টের পায়। হিলারি ক্লিনটনকে তিনি ‘ন্যাস্টি ওমেন’ বলেছেন। ইরাক মসুল নিয়ে বলতে গিয়ে ট্রাম্প মন্তব্য করলেন, মার্কিন টেলিগ্রাফ পেয়ে আইএস জঙ্গিরা আগেই সটকে পড়েছিল। পরে তিনি যোগ করেন, লড়াই সামনে আরো তীব্র হবে। মেইল হ্যাক করা প্রসঙ্গে তিনি মার্কিন গোয়েন্দাদের প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে রুশ হ্যাকারদেরই যেন সাফাই গাইলেন। ‘তুমি পুতিনের পুতুল’ হবে বলে হিলারি যখন জবাব দিলেন, ট্রাম্প চুপসে গেলেন, শিশুসুলভ ভঙ্গি করলেন।

এ-জাতীয় ভুল ট্রাম্পের বিপদ আরো বাড়িয়ে দিল। এমনিতেই এখন তাঁর প্রতিপক্ষ নানা জরিপে এগিয়ে রয়েছেন। যেই আরিজোনা রাজ্যে ১৯৫২ সালের পর ডেমোক্র্যাটরা মাত্র একবার জিতেছে, সেখানে হিলারির অবস্থান ভালো। নিউ হ্যাম্পশায়ারেও হিলারি অনেক এগিয়ে আছেন। ভার্জিনিয়ায়ও তাই। নির্বাচনে জয়লাভের কোনো আশা যদি ট্রাম্প করতে চান তাঁকে নারীদের উদ্দেশে করজোড়ে ক্ষমা চাইতে হবে। প্রমাণ করতে হবে, তিনি নারী নিপীড়ক নন। যেসব ভোটার এখনো ঠিক করে উঠতে পারেননি কার পক্ষ নেবেন, তাদেরও আশ্বস্ত করতে হবে। ট্রাম্পকে প্রমাণ করতে হবে; যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তিনি ততটা বিপজ্জনক নন, যতটা মনে করা হচ্ছে।

ট্রাম্পের বিপরীতে হিলারি ক্লিনটন ছিলেন সংযত, তিনি জেনে-বুঝে প্রস্তুতি নিয়েই যেন এসেছিলেন। তাঁর কোনো কোনো উত্তর শুনে মনে হয়েছে, তিনি মুখস্থ করেই এসেছেন। যেমন—‘কেমন দেশ হবে আমাদের?’ প্রশ্ন করে নিজেই হিলারি উত্তর দেন : ‘ডোনাল্ডের ধারণা নারীদের ছোট করতে পারলেই পুরুষের লাভ। ’ নারী নির্যাতন ইস্যুটি এবারের নির্বাচনে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্যাতিত নারীদের প্রতি সহমর্মিতা দেখানোর কাজটি হিলারি যেখানে দক্ষতার সঙ্গে করলেন, অভিযোগ খণ্ডানোর বেলায় ট্রাম্পকে খুব অসহায়, দুর্বল দেখাল।

ট্রাম্প প্রথম ও দ্বিতীয় বিতর্কের মঞ্চে হেরেছেন। তাই লা ভেগাতে তৃতীয় তথা অন্তিম বিতর্ক ছিল ট্রাম্পের শেষ সুযোগ। ট্রাম্প আগাগোড়াই বলে এসেছেন, এবারের নির্বাচনটি  ‘রিগড’ হবে, অর্থাৎ বিরোধীপক্ষ এবং সংবাদমাধ্যম তাঁকে হারাতে নাকি ষড়যন্ত্র করে রেখেছে। যদি সত্যিই কারচুপির ব্যাপারে ট্রাম্প নিশ্চিত হয়ে থাকেন, নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছেন না কেন? আসলে ট্রাম্প বুঝে গিয়েছেন এলোপাতাড়ি মন্তব্য এবং বিশেষ করে যৌন নিপীড়নের ঘটনা জনসমক্ষে আসায় তাঁর অবস্থা বেশ বেসামাল।

বুধবারের এই বিতর্কই ছিল ট্রাম্পের জন্য সম্ভবত শেষ সুযোগ, যা কাজে লাগানো গেলে সর্বোচ্চসংখ্যক ভোটারের কাছে তিনি পৌঁছাতে পারতেন। হিলারির দুর্বলতাও তো কম নেই। এই অস্ত্রটিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা ট্রাম্প করতে পারতেন। ট্রাম্প একজন মেধাবী টিভি ব্যক্তিত্ব। আপন কারিশমার জোরে রিপাবলিকান দলের জনসভায় তিনি বিপুল সমাবেশ ঘটাতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু বিতর্কের লড়াইয়ে তিনি প্রতিপক্ষের সামনে যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারেননি। সম্ভবত প্রস্তুতিতেও খামতি ছিল। কথা প্রসঙ্গে একবার মুখ ফুটে তো বলেই ফেললেন, সারা দিন তাঁর কেটেছে কেবল টিভি দেখে। হিলারির দুর্বলতা ছিল। কিন্তু প্রাসঙ্গিক বিভিন্ন বিষয়ের তথ্যে সমৃদ্ধ হয়ে সাবেক এই পররাষ্ট্রমন্ত্রী যাবতীয় দুর্বলতা আড়াল করতে পেরেছেন।

বুধবার রাতের বিতর্কে ট্রাম্প মুসলমান ও কৃষ্ণাঙ্গ জাতিগোষ্ঠীর মানুষদের অভিবাসন ও নিরাপত্তা দেয়াল তোলা প্রসঙ্গে বলেছেন, এখানে আমাদের দেশে ‘ব্যাড হোমব্রে’ তথা কিছু খারাপ লোক  রয়েছে। এ-জাতীয় আলটপকা কথা বলেও ট্রাম্প নিজের বিপদ নিজে ডেকে এনেছেন। আর বিপদটা এত বড় যে ‘গো-হারা’ নির্বাচন করে তাঁকে বিদায় নিতে হবে। ট্রাম্প নিজেও একজন ‘ব্যাড হোমব্রে’ শুধু নন, তিনি সবচেয়ে বড় ‘লুজার’ও।

 

লেখক : নিউজউইক সাময়িকীর সাংবাদিক  সূত্র : নিউজউইক


মন্তব্য