kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


আওয়ামী লীগের কাউন্সিল ঘিরে উৎসাহ-উদ্দীপনা

বাহালুল মজনুন চুন্নু

২১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



আওয়ামী লীগের কাউন্সিল ঘিরে উৎসাহ-উদ্দীপনা

আওয়ামী লীগ জনগণের লীগ তথা দল হিসেবে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এ দেশের মানুষের ভাত ও ভোটের অধিকার, ভাষা ও সংস্কৃতির অধিকার, ধর্ম পালনের অধিকার এবং শোষণ-বঞ্চনা ও বৈষম্যমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করে আসছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বুঝেছিলেন, যদি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা না যায়, তবে এ দেশের মানুষের অধিকার অর্জন কখনোই সম্ভব নয়।

তাই তিনি গণতন্ত্র বিকাশের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করে গেছেন। তাঁর গণতন্ত্র যদিও কিছুটা সমাজতন্ত্রঘেঁষা, তবু এর মধ্যে উদারপন্থী গণতান্ত্রিক মতবাদের যথেষ্ট উপাদান আছে। বঙ্গবন্ধু সব সময়ই বলতেন, ‘গণতন্ত্রের বিকাশের জন্য স্বাধীনভাবে কথা বলার অধিকার থাকা দরকার। ’ তিনি সব সময় জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে ভাবতেন। সত্তরের নির্বাচনের প্রাক্কালে তিনি উদাত্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘আমাদের সংগ্রাম চলবেই। কারণ, আমাদের মূল লক্ষ্যে এখনো আমরা পৌঁছাইনি। জনগণকে ক্ষমতা অর্জন করতেই হবে। মানুষের ওপর মানুষের শোষণ, অঞ্চলের ওপর অঞ্চলের শোষণের অবসান ঘটাতেই হবে। ’ এই ঘোষণার ভেতর দিয়ে বঙ্গবন্ধু গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার কথাই বলেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগসহ সারা দেশের সর্বস্তরের মানুষ মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একক নির্দেশনায় ও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক তত্পরতা এবং দেশের মানুষকে তাদের মন্ত্রে উজ্জীবিত করতে পারার কারণেই স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রের জন্ম হয়। প্রতিষ্ঠিত হয় গণতন্ত্র। আর এভাবেই শেখ মুজিবুর রহমান, গণতন্ত্র, আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠে।

স্বাধীন দেশকে গণতান্ত্রিক ধারায় নিয়ে যেতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে সংবিধানের মূলনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয় গণতন্ত্রকে। সংবিধানের এগারো নম্বর অনুুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে। ’ সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় স্বাধীন দেশে প্রতিষ্ঠিত হয় গণতন্ত্র। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরেও গণতন্ত্রের চর্চা হতে থাকে। বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক ছিল গণতন্ত্রকে টেকসই করার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। কিন্তু দুর্ভাগ্য, একটি দুষ্টচক্র এর ভুল ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের হীন প্রয়াস চালায়। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যার মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের টুঁটি চেপে ধরা হয়েছিল। গণতন্ত্রের পরিবর্তে সামরিক শাসনের জাঁতাকলে দেশে বিরাজ করছিল অরাজক সামরিকতন্ত্র। মহান স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের মূলমন্ত্রে দীপ্ত আওয়ামী লীগকে ভেঙে ফেলার ষড়যন্ত্র চলে। কিন্তু সাধারণ মানুষের বিপুল সমর্থনে মহীরুহ হয়ে ওঠা আওয়ামী লীগকে কোনো ষড়যন্ত্র টলাতে পারেনি। ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের ১৩তম সম্মেলনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনাকে তাঁর অনুপস্থিতিতে দলের সভানেত্রী নির্বাচন করা হয়। এর মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা যেন বঙ্গবন্ধুকে ফিরে পেয়েছিল। তিনি দেশে ফিরে এসে দলীয় পতাকা হাতে নিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকেই কেবল পুনরুজ্জীবিত করেননি, গণতন্ত্র পুুনরুদ্ধারের সংগ্রামকেও এগিয়ে নিয়ে গেছেন দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে। তাঁর নেতৃত্বে সমগ্র এশিয়ার ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক আন্দোলন ও সংগ্রামের ইতিহাসে আওয়ামী লীগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায় সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। দীর্ঘ প্রায় তিন যুগ ধরে নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে, জেল-জুলুম-নির্যাতন ভোগ করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা গণমানুষের দল হিসেবে আওয়ামী লীগের যে ঐতিহ্য বিরাজমান, সেটি রক্ষা করে চলেছেন।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও দার্শনিকরা প্রায়ই বলেন, নেতৃত্ব প্রদান সহজ কাজ নয়। নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য চাই বিশেষ কিছু গুণাবলি। বার্ট্রান্ড রাসেল বলেছেন, ‘নেতাকে আত্মবিশ্বাস, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতা ও সার্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতার অধিকারী হতে হয়। ’ কিথ ডেভিস বলেছিলেন, ‘একজন নেতার মধ্যে বুদ্ধিমত্তা, পরিপক্বতা ও উদারতা, অভ্যন্তরীণ প্রেষণা এবং মানবীয় দিক থাকতে হয়। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার মধ্যে এসব গুণ প্রবলভাবে বিদ্যমান। তাঁর নেতৃত্বগুণেই আওয়ামী লীগ দীর্ঘ একুশ বছরের সংগ্রামের পর ১৯৯৬ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে দেয়। এরপর দ্বিতীয় মেয়াদে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে গণতন্ত্র ও সুশাসনের ভিত দৃঢ়তর করতে সক্ষম হয়। ভারতীয় পণ্ডিত কৌটিল্য তাঁর ‘অর্থশাস্ত্র’ বইয়ে সুশাসন বলতে বুঝিয়েছিলেন, আইনের শাসন, জনবান্ধব প্রশাসন, যৌক্তিক ও ন্যায়ভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং দুুর্নীতিমুুক্ত প্রশাসন। বর্তমান সরকার শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সেই সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। এ জন্য তাঁকে নানা চড়াই-উতরাই পাড়ি দিতে হয়েছে। এখনো তিনি অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল উদার গণতান্ত্রিক ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ে তোলার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। যার ফলে বাংলাদেশ আজ মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে। একসময় কবি শামসুর রাহমান আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ বনপোড়া হরিণীর মতো আর্তনাদ করে। ’ সেই আক্ষেপ দূর করে দিয়েছেন জননেত্রী শেখ হাসিনা তাঁর ক্যারিসমেটিক নেতৃত্বগুণে। তাঁর দক্ষতাপূর্ণ যোগ্য ব্যবস্থাপনার কল্যাণে উন্নয়নের মহাসড়কে অবস্থান করে বাংলাদেশ এখন স্বপ্ন দেখছে উন্নত বিশ্বের কাতারে পৌঁছার।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা যেমন সফল, ঠিক তেমনি তিনি সফল দলীয় সভানেত্রী হিসেবেও। তাঁর নেতৃত্বে দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের চর্চা অব্যাহত রয়েছে। তিনি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দলটির অবস্থান দেশ ও জাতি এবং একই সঙ্গে বিশ্ববাসীর কাছে প্রমাণ করেছেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর নির্দেশ ও সুদূরপ্রসারী দিকনির্দেশনায় দলটির নিবেদিতপ্রাণ কর্মীরা, বিশেষ করে তৃণমূলের কর্মীরা আওয়ামী লীগকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। ২০তম কাউন্সিল নিয়ে তৃণমূল থেকে শুরু করে সর্বস্তরের নেতাকর্মীর মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা বিরাজ করছে। এ কথা সুবিদিত যে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল নেতাকর্মীদের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রচর্চাকে শাণিত করে দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে এগিয়ে নেয়। আওয়ামী লীগের কাউন্সিল দলের নেতৃত্বের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন করে নতুন নেতৃত্ব বাছাই, সংযোজন-বিয়োজনের মাধ্যমে গঠনতন্ত্রকে সময়োপযোগী এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যৎ নীতি-পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে থাকে। এই প্রক্রিয়াটির মধ্যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সবগুলো উপাদান নিহিত রয়েছে। এবারের কাউন্সিল কর্তৃক নির্বাচিত নেতৃত্ব আগামী ২০১৯ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি ও রণকৌশল নির্ধারণ, বিরোধী দলগুলোকে মোকাবিলাসহ সরকারের উন্নয়নমূলক কাজ এগিয়ে নিতে অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে। তাই যোগ্য নেতৃত্ব বাছাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময়ের স্রোতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বৃহৎ এই কল্যাণকামী রাজনৈতিক দলে ইতিমধ্যে বেশ কিছু আগাছাস্বরূপ হাইব্রিড তথা সংকর রাজনীতিক তথাকথিত দলীয় নেতাকর্মীর ভিড় জমছে। এরা দলের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব সৃষ্টি, বেফাঁস মন্তব্য, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ইত্যাদি কুকর্মের মাধ্যমে দলীয় ইমেজ নষ্ট করার পাঁয়তারা করছে। তবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে কাউন্সিল সেই সব আগাছা উপড়ে ফেলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী শিক্ষিত, যোগ্য, সৎ, দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের নির্বাচিত করে, দীর্ঘ ৬৭ট্টি বছর ধরে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার মাধ্যমে দেশকে সমৃদ্ধির সোপানে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ আরো গতিশীল করে তুলবে—এটাই এখন জনগণের প্রত্যাশা। আমরা আশা করি, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বরাবরের মতো এবারও তাঁর যোগ্য নেতৃত্ব ও দক্ষ দিকনির্দেশনা দিয়ে গণতন্ত্রের অভিযাত্রাকে প্রবহমান রাখবেন। মৌলবাদ-জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে দেশের মানুষকে নিয়ে যাবেন সেই কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে, যে গন্তব্যের পথ দেখিয়েছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

 

লেখক : সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়;

সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ

 


মন্তব্য