kalerkantho


এপার-ওপার

রাষ্ট্রপতি হওয়াই লক্ষ্য মুলায়মের

অমিত বসু

২০ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



নির্মাণ শুরু ১৬৩১-এ, শেষ ১৬৫৩-তে। ২২ বছর ধরে তিলে তিলে গড়ে তোলা তাজমহল।

২০ হাজার শ্রমিকের প্রাণপাত পরিশ্রম। বুখারার ভাস্কর, সিরিয়া, পারস্যের ক্যালিগ্রাফার, পাথর কাটিয়েরা বেলুচিস্তানের। তদারকিতে খোদ সম্রাট শাহজাহান। আর কিছুতে কম নেই। মমতাজকে বাঁচাতেই হবে। সে যেন না মরে। আল্লাহ মেহেরবান। না, মমতাজ মরেননি। প্রেমিক শাহজাহানও জীবিত। তাঁদের অস্তিত্ব আজও সেই মিনারের অণু-পরমাণুতে। কালের কপোলতলে শুভ্র সমুজ্জ্বল তাজমহল যমুনা কিনারে একইভাবে দাঁড়িয়ে। পূর্ণিমার রাতে তাজমহলে এসে বসলে অতি বড় পাষণ্ডও প্রেমিক বনে যাবে। উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব রাজধানী লক্ষেৗ ফেলে তাজমহলে ছুটতেন হবু স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে। সেটা আর হয় না। কাজের চাপে চিঁড়েচ্যাপ্টা। রাজনীতির ঘটনাপ্রবাহে মনও বদলাচ্ছে। মাথার ওপর বাবা মুলায়ম সিং যাদবের স্নেহচ্ছায়া কতটুকু। ছেলেকে ভালোবাসেন কতটা। নাকি সব কিছু ওজন করেন রাজনীতির দাঁড়িপাল্লায়। না হলে ছেলেকে ফেলে ভাই শিবপাল সিং যাদবের হাত ধরবেন কেন। অখিলেশ অনেক আগেই টের পেয়েছিলেন চাচা শিবপালই তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার চেঁছেছুলে সাফ করে দিচ্ছেন। তাঁকে ছুড়ে ফেলতে না পারলে তাদের সমাজবাদী পার্টিতেই পচন ধরবে। দলের সভাপতির পদ থেকে সরিয়ে, মন্ত্রিত্ব কেড়ে শিবপালকে দেউলে করেছিলেন অখিলেশ। ভেবেছিলেন, ছেলের কল্যাণে বাবা নিশ্চয়ই সিদ্ধান্তটা মেনে নেবেন। হলো তার উল্টো। পিতা পুত্রের ডানাই ছাঁটলেন নির্মমভাবে। মুলায়মের নির্দেশে শিবপাল দলের সভাপতির পদ ফিরে পেলেন। আগের মন্ত্রীর চেয়ারে গিয়েও বসলেন। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে অখিলেশের মানটা কোথায় রইল।

ছেলের এত বড় ক্ষতি যে কোনো বাবা করতে পারেন আগে জানা ছিল না অখিলেশের। এবার সার কথাটা বুঝেছেন, রাজনীতিতে সবই স্বার্থের চাকায় ঘুরছে। তিনি একাধিকবার উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। ওই চেয়ারে আর আসক্তি নেই। আরো বড় কিছু চান। সেটা অবশ্যই প্রধানমন্ত্রিত্ব। স্বপ্নের সিঁড়ি ভেঙে তা আয়ত্ত করা কি সম্ভব। অন্য সব খেলার চেয়েও রাজনৈতিক ক্রীড়ার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। খেলা কখন কোন দিকে ঘুরবে কে বলতে পারে। আঞ্চলিক দল সমাজবাদী পার্টির নেতা মুলায়মকে হেলাফেলা করা যায় না। অনেকবার প্রধানমন্ত্রীর আসনের কাছাকাছি পৌঁছেও ফিরে এসেছেন। শেষ চালের ভুলে সব গোলমাল। এখন তিনি আরো পরিণত। বেখেয়াল রাজনীতির অঙ্কে শূন্য পাবেন না কখনোই।

আঞ্চলিক দলের নেতা হয়েও যে প্রধানমন্ত্রী হওয়া যায়, সেটা প্রমাণিত। অনেকেই হয়েছেন। যদিও তাঁরা কেউই চেয়ার ধরে রাখতে পারেননি। তাতে কিছু যায় আসে না। এক দিনের জন্য প্রধানমন্ত্রী হওয়াটাই ছিল তাঁদের কাছে বিশাল জয়। দেশের সরকার-শীর্ষে ২৪ ঘণ্টা বসাটাই কী কম কথা। মুলায়মও জানেন, ছলে-বলে-কৌশলে প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারটা দখল করতে পারলেও বেশি দিন ধরে রাখতে পারবেন না। তাঁর দল সমাজবাদী পার্টি নিশ্চয়ই কেন্দ্রে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করতে পারবে না। দুই জাতীয় দল কংগ্রেস-বিজেপিও গরিষ্ঠতা না পেলে আঞ্চলিক দলের সমর্থনের দরকার হবে। সেই সময় ফাটকা খেলার সুযোগ। দাঁও মারতে পারেন মুলায়ম। ঘোলা জলে মাছ ধরে প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারটা হাতানো সম্ভব। মুলায়মের সবচেয়ে বড় গুণ তিনি শুচিবায়ুগ্রস্ত নন। ছোঁয়াছুুঁয়ির বাছবিচার নেই। সব দলের সঙ্গেই সখ্য বজায় রাখতে পারেন। যেটা অন্য কোনো আঞ্চলিক দলের নেতার পক্ষে সম্ভব নয়। তাঁরা ভেবেচিন্তে বন্ধু করেন। নীতি-আদর্শ সমাধিস্থ করে সাফল্যের ইমারত গড়তে চান না। মুলায়ম তা নন। কংগ্রেস-বিজেপির সঙ্গেও তাঁর সমান সৌহার্দ্য। বলা যায় না, কাকে কখন কাজে লাগে।

সংসদীয় নির্বাচনের এখনো অনেক দেরি। বাংলাদেশ-ভারতে একই সময়ে, ২০১৯ সালে। তাই বলে বড় খেলোয়াড়রা সময়ের জন্য বসে থাকেন না। এই যে এক মাস আগে রিও ডি জেনেইরোর অলিম্পিক শেষ হলো। প্রতিযোগীরা কি বসে পড়ল। না, পরের অলিম্পিকের জন্য প্রস্তুতি এখনই শুরু করে দিয়েছে। মুলায়মও সময় নষ্ট করতে চান না। তার আগে উত্তর প্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনটিকে তিনি পাখির চোখ করেছেন। হাতে মাত্র ছয় মাস। তার পরই এসপার-ওসপার। মুলায়মের সমাজবাদী পার্টি ক্ষমতায় থাকবে কি না বলে দেবে মানুষ। ভাই শিবপাল সিং যাদবের পুনর্বাসনে দলটা ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। শিবপাল ঠিকই করে ফেলেছিলেন, অখিলেশকে শিক্ষা দিতে আলাদা দল গড়বেন। তাই যদি হতো তো সাড়ে সর্বনাশ। ভাঙা দলের নেতা হয়ে মুলায়ম কি পারতেন দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য দর-কষাকষি করতে। তাঁর দলই কি পারত উত্তর প্রদেশে ক্ষমতায় টিকে থাকতে।

প্রধানমন্ত্রিত্বের বিকল্পও খুঁজে রেখেছেন মুলায়ম। তিনি জানেন, কংগ্রেসের যা অবস্থা, বিজেপিকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করাটা কষ্টকল্পনা। নরেন্দ্র মোদির ফের প্রধানমন্ত্রী হওয়াটা অসম্ভব কিছু নয়। তাহলে মুলায়মের কী হবে। দেশের শীর্ষে পৌঁছানো কি আর হয়ে উঠবে না। তাঁর দ্বিতীয় লক্ষ্য রাষ্ট্রপতির পদটা। ২০১৭ সালের ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অবসর নেবেন প্রণব মুখার্জি। তার আগে উত্তর প্রদেশের নির্বাচন। তাতে যদি বিজেপিকে ভালো ফল করতে সাহায্য করা যায় কৃতজ্ঞতাস্বরূপ, তারা রাষ্ট্রপতি পদটা মুলায়মকে দিলেও দিতে পারে। কী হবে সেটা পরের কথা। চেষ্টা করতে দোষ কী। রাষ্ট্রপতি হওয়াটাও তো কম কথা নয়। দেশের এক নম্বর নাগরিক। সাংবিধানিক শীর্ষে। এখন বিজেপির সেবায় নিবেদিতপ্রাণ মুলায়মের স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ভাবার সময় কোথায়।

 

লেখক : কলকাতার সাংবাদিক


মন্তব্য