kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সাদাকালো

চীনা প্রেসিডেন্টের ঢাকা সফরের নানামাত্রিক তাৎপর্য

আহমদ রফিক

২০ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



চীনা প্রেসিডেন্টের ঢাকা সফরের নানামাত্রিক তাৎপর্য

আধুনিক চিন্তার প্রচলিত প্রবাদ—‘রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। ’ অর্থাৎ বিরোধিতা একসময় সহযোগিতায় রূপান্তরিত হওয়া বিচিত্র কিছু নয়।

বাংলাদেশ-চীনের রাজনৈতিক-কূটনৈতিক ক্ষেত্রে এমন উদাহরণ টানা চলে। তবে ব্যতিক্রমও আছে যেখানে সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে অনেক অনেক বছর কেটে যায়, মনে হয় ভাঙা সম্পর্ক বুঝি আর জোড়া লাগবে না। যেমন হিন্দি-চীনি ভাই ভাই সম্পর্ক ভাঙনের জের এখনো শেষ হয়নি।

পঞ্চাশের দশকে পাকিস্তানি পূর্ববঙ্গের প্রগতিবাদী মহলে, বিশেষ করে তারুণ্যে চীনা বিপ্লব ও নয়া জনগণতান্ত্রিক মতাদর্শের প্রতি আকর্ষণ ছিল যথেষ্ট, যা ষাটের দশকে ব্যাপক হয়ে ওঠে। মস্কো-পিকিং দ্বন্দ্ব তা উসকে দেয় বিভাজনের রাজনীতিকে কেন্দ্র করে। আর পঞ্চাশের দশকে শীর্ষস্থানীয় দুই চীনা নেতার ঢাকা সফর রাজনৈতিক চঞ্চলতার কারণ হয়ে ওঠে।

স্বল্প দিন স্থায়ী যুক্তফ্রন্ট সরকারের আমলে ও এর অগ্র-পশ্চাৎ সময়ে চীন সম্পর্কে পূর্ববঙ্গীয় রাজনীতির যে উষ্ণতা, তা ছিল প্রধানত মতাদর্শগত, বাণিজ্যিক বা কূটনীতিক নয়। কারণ পূর্ববঙ্গ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যা অধ্যুষিত প্রদেশ হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় শাসনের কেন্দ্রস্থল ছিল পাঞ্জাব ও সিন্ধু প্রদেশ। এবং পশ্চিম পাকিস্তানের ভূ-রাজনৈতিক সীমান্ত-গুরুত্ব ও সেখানে কেন্দ্রীয় শাসন প্রতিষ্ঠিত থাকার কারণে চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের রাষ্ট্রিক-কূটনৈতিক-বাণিজ্যিক সম্পর্কগুলো রাজধানীকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে। এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকে পূর্ববঙ্গ-পূর্ব পাকিস্তান। পাক-মার্কিন ঘনিষ্ঠতার বিপরীতে চীন বরাবরই চেয়েছে সীমান্ত রাষ্ট্র পাকিস্তানের সঙ্গে রাজনৈতিক সুসম্পর্ক নিশ্চিত রাখতে। সিল্ক রুটের দক্ষিণে তা ঘটেও।

এরপর বিশ্বরাজনীতির নানামুখী টানাপড়েন, চীনা রাজনীতির প্রবল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতায় নমনীয়তা, পিংপং কূটনীতি, চীন-ভারত-মস্কো-পিকিং দ্বন্দ্বের মতো ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিতে ও কিছু অভ্যন্তরীণ কারণেও চীনের বৈশ্বিক রাজনীতি-কূটনীতির গুণগত পরিবর্তন ঘটে, ঘটে ঘরে বাইরে। আর এই পরিস্থিতির টানে ও পূর্ববঙ্গে জাতীয়তাবাদী চেতনার উগ্রতার মূল্যায়নে ও ভারতীয় প্রভাবের বিরোধিতার টানে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে চীনের পাকিস্তানের পক্ষ সমর্থন ও স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রিক স্বীকৃতিতে বিরোধিতা। জাতীয়তাবাদীরা এ ব্যাপারে তাদের প্রতিক্রিয়াও ব্যক্ত করেছে সে সময় এবং পরেও।

 

দুই.

তবে ওই যে আগে যেমন বলেছি, বাস্তবে রাজনৈতিক হাওয়ার অদলবদল খুবই স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে বিবেচ্য। সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার পতন, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের একচেটিয়া বিশ্বশাসন, চীনা অর্থনীতির বিস্ফোরক বিস্তার, ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও পুঁজির ব্যাপক প্রসার (সম্প্রতি বিবিসির সংবাদে প্রকাশ, চীনা বিলিয়নেয়ারের সংখ্যা মার্কিনিদের টপকে গেছে), চীনা বাণিজ্যের বিপুল বৈশ্বিক প্রভাব, বর্তমান রুশ শাসনযন্ত্রের সঙ্গে চীনা সদ্ভাব ইত্যাদি ঘটনা বিশ্বরাজনীতির নয়া মেরুকরণ ঘটিয়ে চলেছে। লাল চীনেরও চরিত্রবদল ঘটে গেছে।

চীন এখন সন্তর্পণে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ছত্রচ্ছায়ায় তার রাজনৈতিক অবস্থান সুদৃঢ় করার চেষ্টায় আছে। নানা দিক বিচারে ওয়াশিংটন-পেইচিং দ্বন্দ্বই এখন বিশ্বে সর্বাধিক আলোচিত বিষয়। আর এ পরিপ্রেক্ষিতে নানা রাজনৈতিক ইস্যুতে পুতিন-শি চিনপিংয়ের নেপথ্যে কৌশলগত কূটনৈতিক করমর্দন কোনো অভাবিত ঘটনা নয়।

চীন অবশ্যই লক্ষ করেছে ওয়াশিংটন রাজনীতি সু চিকে সামনে রেখে কী কৌশলে মিয়ানমারে তাদের প্রভাব নিশ্চিত করেছে, যা চীনাদের জন্য অস্বস্তিকর। একইভাবে তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভারত-মার্কিন সামরিক সহযোগিতা চুক্তি, যা ভারতীয় নিরপেক্ষ বিদেশনীতির খোলনলচে পাল্টে দেওয়ার মতো বিস্ময়কর ঘটনা। এরই মধ্যে চীন সাগরে নৌ-আধিপত্য নিয়ে চীনের তিক্ত অভিজ্ঞতা। ভূ-রাজনৈতিক পারস্পরিকতায় চীনের অপেক্ষাকৃত নতুন নেতৃত্ব খুব হিসাব করে সতর্ক পদক্ষেপে এগিয়ে চলেছে। উগ্রতা, দ্রুততা, তড়িঘড়ি পদক্ষেপ সে ক্ষেত্রে অবাঞ্ছিত। রাজনৈতিক অঙ্গনে চীন বরাবরই ধীরস্থির পদক্ষেপে চলতে অভ্যস্ত। এটা নিঃসেন্দেহ চীনা বৈশিষ্ট্য। ভূ-আধিপত্যের চেয়ে রাজনৈতিক-বাণিজ্যিক-অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারে বিশ্বাসী চীনা কূটনীতি।

এ ছাড়া অন্যতম চীনা বৈশিষ্ট্য তাদের আপন সংস্কৃতির প্রতি অবিশ্বাস্য আত্মকেন্দ্রিক মুগ্ধতা মূলত চীনা বৈশিষ্ট্যের গর্ববোধ নিয়ে। সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণে বিশ্বাসী হওয়া সত্ত্বেও জাতিগত শোভিনিজম চীনাদের মধ্য প্রবল ও তা নিঃশব্দে বহমান। অবশ্য তুলনা টানতে রুশি শোভিনিজমও একেবারে অস্বীকার করার মতো নয়। জাতিগত শোভিনিজম কমবেশি অনেক জাতির মধ্যে রয়েছে; তা তারা রাজনীতির যে দর্শনে বা মতাদর্শে বিশ্বাসী হোক না কেন। যেমন ইংরেজ, ফরাসি বা জার্মান জাতি। এ এক অদ্ভুত স্ববিরোধিতা।

এর অর্থ সমাজতান্ত্রিক বা গণতান্ত্রিক যে মতাদর্শই একটি রাষ্ট্র ও জাতিকে প্রভাবিত করুক না কেন, জাতীয় স্বার্থ সেখানে সর্বাধিক প্রাধান্য পায়। সেখানে থাকে বৈশ্বিক স্বার্থের বিবেচনা, কখনো কোনো কোনো ক্ষেত্রে আঞ্চলিক স্বার্থও বিবেচ্য বিষয় হয়ে ওঠে। আর সে হিসাবে পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনীতি পরিচালিত হয়ে থাকে। এককথায় জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক স্বার্থের পথ ধরে বিশ্ব রাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতিতে যতটা সম্ভব ছাড় দেওয়া। এ ব্যাপারে চীন অনন্য। এবং কোনো কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, তা চীনা কূটনীতির অনন্য বৈশিষ্ট্য।

তিন.

এমন এক রাজনৈতিক পরিবেশে চীন-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক সময় অতিক্রম করেছে। এক সময়কার ভিন্ন পরিবেশেও বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সমিতির সচলতা বা কার্যক্রম একেবারে বন্ধ হয়নি। কালক্রমে চীন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক-রাষ্ট্রনৈতিক সম্পর্কের গতিশীলতা লক্ষণীয় পর্যায়ের হয়ে ওঠে। সেতু থেকে স্থাপত্য কমপ্লেক্স পর্যন্ত চীনা অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহযোগিতার প্রসার ঘটেছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশের বাজার চীনাপণ্যে সয়লাব হওয়ার বিষয়টি অভাবিত হলেও সত্য। ভারত ও মালয়েশিয়াকে হটিয়ে বাংলাদেশি বাজারের বেশির ভাগ দখল করে নিয়েছে চীন, ছোট্ট আলপিনও তাতে অংশীদার। এর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে চীনের অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং প্রযুক্তি ও কারিগরি সহায়তা। ক্ষুদ্রতম পণ্যের রপ্তানি থেকে বৃহৎ প্রযুক্তি নিয়ে চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। একদা এ দেশে সস্তা সুদৃশ্য জাপানি পণ্য ছিল প্রবাদপ্রতিম বিষয়, এখন চীনাপণ্য সেই কাতারে। দামে সস্তা জিনিসের গুণগত মান নিয়ে মানুষের মনে সন্দেহ সত্ত্বেও ব্যবহারের জনপ্রিয়তায় কমতি দেখা যায় না। তাই কারো কারো ধারণা, বাংলাদেশে বড়সড় ক্ষেত্রে চীনা প্রযুক্তির ব্যবহারে সতর্কতা প্রয়োজন। মনে হয়, চীনা প্রযুক্তি এ ক্ষেত্রে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। বরং পাশ্চাত্য প্রযুক্তিই ক্ষেত্র বিশেষে বাংলাদেশের জন্য দুর্গতির কারণ হয়েছে।

সব কিছু হিসাব মেলানোর পরও সম্প্রতি ঢাকায় চীনা প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সংক্ষিপ্ত সফর অতীব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়েছে। শুধু চীনা স্টাইলে প্রেসিডেন্টকে লাল কার্পেট অভ্যর্থনায় তা শেষ হয়নি। কূটনৈতিক মহল, রাজনৈতিক মহল, এমনকি গণমাধ্যমেও সফর সম্পর্কে উষ্ণতার প্রকাশ ঘটেছে। এতে শুধু শিষ্টাচারের প্রকাশই ঘটেনি, অর্থনৈতিক প্রয়োজনের দিকটিরও প্রাধান্য লক্ষ করা গেছে। সম্ভাব্য সহযোগিতার ক্ষেত্র নিয়ে গণমাধ্যমগুলো সোচ্চার। দিন দুই ধরে দৈনিকের পাতায় শুধু চীনাবার্তা, চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ।

এ বিষয়ে চীনা গণমাধ্যমের উষ্ণতাও লক্ষ করার মতো, হয়তো এ সফরের গুরুত্ব বিবেচনা করে। ভারতীয় গণমাধ্যমের সতর্ক প্রকাশ লক্ষ করার মতো। এ সফরের গুরুত্ব নানা কারণে। তা যেমন একদিকে অর্থনৈতিক-প্রযুক্তিগত, তেমনি অন্যদিকে রাজনৈতিক-কূটনৈতিক গুরুত্বের। ১৯৮৬ সালে সেই কবে চীনা প্রেসিডেন্ট লি জিয়াননিয়ান বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। তারপর প্রায় তিন দশক সময় পার করে ঢাকায় এলেন শি চিনপিং।

এ ছাড়া বিবেচ্য, বর্তমান প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিক-রাজনৈতিক-রাষ্ট্রনৈতিক গুরুত্ব, অবশ্য তাঁর স্বদেশে। তিনি চীনা কমিউনিস্ট পার্টির একজন শীর্ষস্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের চেয়ারম্যান। তা ছাড়া চীনের বর্তমান উন্নয়নে যে নয়া নেতৃত্বের গতিশীল ভূমিকা রয়েছে, সেখানে শি চিনপিংয়ের রয়েছে বিশেষ অবস্থান। এসব বিবেচনায় এ সফর দ্বিপক্ষীয় তো বটেই, বাংলাদেশের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। আন্তর্জাতিক ঘটনাবলির বিশ্লেষকদের তেমনই অভিমত।

এখন বড় প্রশ্ন, বাংলাদেশ চীনা প্রেসিডেন্টের এ সফরের নানামাত্রিক তাৎপর্য কতটা নিজ স্বার্থে কাজে লাগাতে পারবে। প্রথমত এ সফর উপলক্ষে যে ২৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে তাতে করে বিশাল পরিমাণ চীনা বিনিয়োগ বাংলাদেশে আসবে। তা থেকে লাভবান হওয়া তথা আপন স্বার্থপূরণের ক্ষমতা ও দক্ষতা বাংলাদেশের কতটা আছে সেটাও বিবেচ্য বিষয়। বাংলাদেশ এ সম্পর্কে কতটা সচেতন যে বিষয়টিও কম তাৎপর্য বহন করে না। কারণ চুক্তির সফল বাস্তবায়নে বাংলাদেশের পক্ষে তিনটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ—যেমন ক্ষমতা, দক্ষতা ও স্বচ্ছতা। এ সত্য বাংলাদেশ কতটা জানে ও বোঝে তা হবে সফলতার নির্ধারক। তাই চীন থেকে বিশাল কিছু প্রাপ্তি নিয়ে মাতামাতির সুযোগ নেই। বাঙালি আবেগপ্রবণ জাতি। তাই এ কথাগুলো বলা মূলত সচেতনতা ও সতর্কতার কথা মনে রেখে। যেকোনো চুক্তিতে জাতীয় স্বার্থ কতটা পূরণ হতে পারে, সেটাই বড় বিবেচনার বিষয়। তাই এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটা বাস্তবায়িত হতে পারে সেটা দেখার বিষয়।

অভ্যন্তরীণ বিষয়টি যেমন মূলত বাংলাদেশের জন্য জরুরি, তেমনি চীনের জন্য এ বিনিয়োগের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তার বৈদেশিক তথা বৈশ্বিক রাজনীতির দিকটি। বড় কারণ যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে চীনকে কোণঠাসা করতে বা ঘিরে রাখতে চাইছে, তার বিপরীতে চীনের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি তার মুক্ত অবস্থান নিশ্চিত করা—স্থলে-জলে, বিশেষ করে জলপথে, ভারত মহাসাগরীয় জলসীমায়। আমার ধারণা, এ বিশেষ প্রয়োজনেই চীন এখন বাংলাদেশকে কাছে পেতে চায়, বিশেষত যে বাংলাদেশের সঙ্গে রয়েছে ভারত ও মিয়ানমারের স্থল-জল সীমান্ত সম্পর্ক ও নৈকট্য।

স্মরণযোগ্য, ঢাকায় চীনা প্রেসিডেন্টের কিছু ইতিবাচক বক্তব্য, যা চীনা সংবাদমাধ্যমেও সমান তাৎপর্যে প্রকাশিত। চীনা প্রেসিডেন্ট বলেছেন, চীন এ দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোয় একসঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। তাঁর আরো বিশ্বাস, ‘বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক ভবিষ্যতে উত্তরোত্তর আরো গভীর হবে। ’ উল্লেখ্য, শি চিনপিং চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকাকালে ২০১০ সালে ঢাকা সফর করেছিলেন। তখন ও এবার উভয় সফরে তাঁর ইতিবাচক বক্তব্য ও বাংলাদেশের উন্নয়নে আগ্রহ বাংলাদেশ ও রাজনৈতিক মহল রেখাপাত করেছে। তবে এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশকে মনে রাখতে হবে, চীনা রাজনীতির পূর্বাপর সূক্ষ্ম ও রহস্যজনক দিকটি। একদা চীন রাষ্ট্র ও প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাইয়ের সঙ্গে ভারত ও নেহরুর কি গভীর সৌহার্দ্য সম্পর্কই না ছিল, যা পরবর্তীকালে এক আঘাতে ভেঙে চুরমার। অবশ্য এখন বিশ্ব রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেকটাই ভিন্ন।

মনে রাখতে হবে, বর্তমান বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে আনার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে চীনা রাজনীতি। সে দাবার ছকে বাংলাদেশ বড়ে হলেও এর গুরুত্ব কম নয়। কম নয় বাংলাদেশের ভূ-সামুদ্রিক অবস্থান। চীনের বহু কথিত ‘এক অঞ্চল এক পথ’ (‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’) গঠনের রাজনৈতিক তাৎপর্যে বলাবাহুল্য বাংলাদেশ একটি খুঁটি। চীন-বাংলাদেশ-ভারত-মিয়ানমার করিডর গঠনে চীনের রাজনৈতিক প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। তবে এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব কয়টি দেশই লাভবান হবে বলে চীন মনে করে। এ বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের একটি সমঝোতা স্মারকও স্বাক্ষরিত হয়েছে। চীনের নিরাপত্তা ক্ষেত্রে বিষয়টি খুবই গুরুত্ব বহন করে। এ বিশেষ লক্ষ্যেই কি প্রেসিডেন্ট শির ঢাকায় ঝটিকা সফর? অবশ্য অন্যান্য সমঝোতা স্মারকের গুরুত্বও কম নয়, অন্তত বাংলাদেশের জন্য। বাংলাদেশ কি পারবে এসব ক্ষেত্রে সর্বাধিক সুবিধা আদায় করে নিতে? কূটনৈতিক দর-কষাকষিতে বাংলাদেশ যে যথেষ্ট দক্ষ নয়, দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কে তা স্পষ্ট। এদিকে থেকে চীন অনেক বেশি দক্ষ খেলোয়াড়।

 

লেখক : কবি, গবেষক ও ভাষাসংগ্রামী


মন্তব্য