kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ঔষধশিল্পের বিপুল সম্ভাবনা

মুহাম্মদ ফারুক খান এমপি

১৯ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ঔষধশিল্পের বিপুল সম্ভাবনা

বাংলাদেশের ওষুধ আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হওয়ায় রপ্তানি চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। রপ্তানি বাজার দিন দিন প্রসারিত হচ্ছে।

এতে বাড়ছে দেশের আয়। বর্তমানে ৮৭টিরও বেশি দেশে বাংলাদেশের তৈরি ওষুধ ও কাঁচামাল রপ্তানি হচ্ছে। আর চলতি সময়ে সবচেয়ে বেশি দেশে রপ্তানি হচ্ছে বাংলাদেশের ওষুধ।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, দেশে সর্বমোট ২৬৯টি অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ প্রস্তুতকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বছরে ২৪ হাজার ব্র্যান্ডের ১২ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকার ওষুধ ও ওষুধের কাঁচামাল উত্পাদন করছে। আর দেশীয় চাহিদার প্রায় ৯৭ শতাংশ ওষুধই বর্তমানে স্থানীয়ভাবে উত্পাদিত হচ্ছে। মানসম্পন্ন ওষুধ উত্পাদনকারী ৪২টি কম্পানির উত্পাদিত বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ওষুধ ও ওষুধের কাঁচামাল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপান, ইতালি, কোরিয়া, মালয়েশিয়া, সৌদি আরবসহ ৮৭টি দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে।

দেশে ঔষধশিল্পের বিকাশে প্রয়োজনীয় মেধা, দক্ষতা, ইনোভেটিভ ধারণা, জ্ঞান ও প্রযুক্তি আমাদের দেশে রয়েছে। নব্বইয়ের দশকের পর থেকে কিছু প্রতিষ্ঠান ইনসুলিন, হরমোনস, ক্যান্সার প্রতিষেধক ইত্যাদি প্রস্তুত করতে শুরু করে। তবে বিদেশের বাজারে ওষুধ রপ্তানি করা সহজসাধ্য বিষয় নয়। উন্নত পরিবেশে মানসম্মত ওষুধ প্রস্তুত করতে না পারলে বিদেশের বাজার দখল করা সম্ভব নয়। ২০১২-১৩ অর্থবছরে ওষুধ রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৪ শতাংশ। ওষুধ খাতে যথেষ্ট গবেষণা ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে।

বিশ্বখ্যাত জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সাময়িকী ল্যানসেট তার সাম্প্রতিক সংখ্যায় বলেছে, স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য রহস্যের মতো। কারণ স্বাস্থ্যসেবায় কম বরাদ্দ, দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও ব্যাপক দারিদ্র্য সত্ত্বেও গত চার দশকে স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের অর্জন ব্যতিক্রমী। পাঁচ বছরের কম বয়সীদের জীবন রক্ষা, মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি, টিকাদান কর্মসূচি, যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলোয় বাংলাদেশের সাফল্যের কাহিনী উল্লেখযোগ্য। ল্যানসেটের সম্পাদক রিচার্ড হর্টন বলেছেন, স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশ নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। এটি একটি জাতির সাফল্যের ইতিহাস। পৃথিবী এ সাফল্য দেখছে। এ স্বীকৃতি শুধু ল্যানসেট নয়, দিয়েছে জাতিসংঘও। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের সাফল্যের কারণেই জাতিসংঘ অধিবেশনে এ বিষয়ে বক্তব্য দিতে অনুরোধ জানানো হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে।

বাংলাদেশের একসময় বার্ষিক চাহিদার ৮০ শতাংশ ওষুধ বাইরের দেশ থেকে আমদানি করতে হতো, সেখানে এখন আমদানি হয় মাত্র ৩ শতাংশ। একসময় বিদেশি কম্পানিগুলো এ দেশের ওষুধের বাজারের ৭৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করত। সেখানে এখন তারা নিয়ন্ত্রণ করে মাত্র ৭ শতাংশ।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ২০২১ সাল নাগাদ ওষুধ রপ্তানি থেকে বাংলাদেশের আয় প্রায় শতভাগ বেড়ে ৬০০ কোটি ডলারে উন্নীত হবে। সরকার সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বাজার ও পণ্য বহুমুখীকরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। সে পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ওষুধ রপ্তানি বাড়াতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশ সরকার। প্রতিবছরই রপ্তানির ও দেশের সংখ্যা বাড়ছে। দেশে উত্পাদিত ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে বিশ্বের ১৬০টি দেশে।

দেশের অনেক কম্পানিই এখন আন্তর্জাতিক মানের ওষুধ তৈরি করছে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর সার্টিফিকেশন সনদও পেয়েছে বেশ কিছু কম্পানি। এ কারণে ওসব দেশসহ অন্যান্য দেশে ওষুধ রপ্তানি পর্যায়ক্রমে বাড়ছে। বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) জন্য ২০৩৩ সাল পর্যন্ত ওষুধের মেধাস্বত্বে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডাব্লিউটিও) ছাড়ের সুযোগ রয়েছে। এটাকে কাজে লাগাতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকেও ঔষধশিল্প বিকাশে সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে। তারা জানান, বর্তমান উত্পাদন ক্ষমতা আর বিশ্ববাজারের সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে ওষুধ রপ্তানিতে এশিয়ার শীর্ষে উঠে আসবে বাংলাদেশ।

বর্তমান সরকারের নীতিমালা ঔষধশিল্প বিকাশের সহায়ক। জাতীয় শিল্পনীতিতে এ শিল্পকে অগ্রাধিকার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। রপ্তানিমুখী অন্যান্য শিল্পের মতো ঔষধশিল্পও কর অবকাশ সুবিধা পাচ্ছে। এ শিল্পের প্রসারের লক্ষ্যে ওষুধ তৈরির কাঁচামালে শুল্কহার আগের চেয়ে কমানো হয়েছে। দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় উত্পাদন পর্যায়ে মূল্য সংযোজন কর হার

কমানো হয়েছে। এসব কর প্রণোদনার পাশাপাশি জীবন রক্ষাকারী বেশ কিছু  ওষুধ আমদানিতে ব্যাপক শুল্ক ছাড়  দেওয়া হয়েছে। এসব কর প্রণোদনা দেওয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশীয় ঔষধশিল্পের উত্পাদন খরচ কমানো, যাতে  করে এ শিল্পের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়ে।

লেখক : আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও সাবেক মন্ত্রী, বাণিজ্য, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও  পর্যটন মন্ত্রণালয়


মন্তব্য