kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


নিষ্প্রভ ব্রিকসে আশার আলো বিমসটেক

অনলাইন থেকে

১৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



অষ্টম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো ভারতে। হাজির রাশিয়া, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিলের রাষ্ট্রপ্রধানরা।

একই সঙ্গে বিমসটেক দেশগুলোর প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন বাংলাদেশের প্র্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্র ও সরকারপ্র্রধানরা। ভারতের গোয়ায় এ যেন চাঁদের হাট। সম্মেলন শেষ পর্যন্ত বড় কিছু না দিলেও আশাবাদী ব্রিকস নেতারা। নরেন্দ্র মোদি থেকে শুরু করে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং, রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিন—সবাই একসঙ্গে থাকার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন। শি চিনপিং বিশ্বজুড়ে বিদ্যমান মন্দার প্রকোপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, কিছু দেশ মুক্ত অর্থনীতির বদলে বিশ্বায়নের রাস্তায় বাঁধ দেওয়ার চেষ্টা করছে, তাতে নতুন বিপদ তৈরি হচ্ছে। তাই হাল ছাড়া যাবে না।

পাঁচ সম্ভাবনাময় অর্থনীতিকে নিয়ে ব্রিকস পশ্চিমের বিকল্প মঞ্চ হিসেবে আবির্ভূত হওয়ায় এর সাফল্য নিয়ে আশাবাদী অনেকেই। আয়তন, জনসংখ্যা, বাণিজ্য, জিডিপি ইত্যাদির নিরিখে ব্রিকস আগামী দিনের আন্তর্জাতিক অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠবেই—এমনই ব্যাখ্যা বিশেষজ্ঞদের। সমস্যা হচ্ছে, গত পাঁচ বছরে ব্রিকসের দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য বিশেষ বাড়েনি। ২০১৫ সালে যার পরিমাণ ছিল ২৫ হাজার কোটি ডলারের কম, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ১ শতাংশেরও কম। তাই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাণিজ্যের পরিমাণকে দ্বিগুণ করার কথা বলেছেন। চীনও প্রস্তাব দিয়েছে, মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল তৈরি হোক। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে চীনের সঙ্গে ভারতসহ অন্য দেশগুলোর অস্বাভাবিক বাণিজ্য ঘাটতি। মুক্ত বাণিজ্য করতে গিয়ে নিজেদের দেশের বাজার আরো বেশি করে চীনা পণ্যে ভরে উঠবে—অন্য দেশগুলোর এমন আশঙ্কা তাই অমূলক নয়।

কয়েক বছর আগে মূলত উন্নত অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে দরকষাকষি করা ও আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের মতো মঞ্চে উন্নয়নশীল দেশগুলোর পক্ষে সোচ্চার হতে ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, রাশিয়া ও ব্রাজিল ‘ব্রিকস’ গঠন করে। এই পাঁচটি দেশের জনসংখ্যা গোটা বিশ্বের অর্ধেক। গঠনের সময় দেশগুলোর অর্থনীতির আকারও ছিল বিশ্বের মোট অর্থনীতির এক-চতুর্থাংশ। তবে গত পাঁচ বছরে পাঁচ দেশের কারোরই অর্থনীতি বিশেষ উজ্জ্বল হয়নি।

বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম তেলভাণ্ডার রয়েছে রাশিয়ায়। কিন্তু ২০১৪ সালের গ্রীষ্ম থেকে অশোধিত তেল ও গ্যাসের দাম প্রায় ৫৫ শতাংশ পড়ে যাওয়ায় সরাসরি আক্রান্ত হয়েছে মস্কো। অন্যদিকে বিশ্ববাজারে পণ্যসামগ্রীর দামের পতনের প্রভাব পড়েছে ব্রাজিলে। পরিস্থিতিকে ব্যবহার করে সংসদীয় অভ্যুত্থান ঘটিয়ে দিউমা রুসেফকে সরিয়ে মাইকেল তেমার এখন অনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। অর্থনৈতিক সংকটে আক্রান্ত দক্ষিণ আফ্রিকাও সরকারি হিসাবেই বেকারত্বের হার ২৫ শতাংশ, যা প্রকৃতভাবে আরো বেশি হবে। চীনের অর্থনীতিও সংকুচিত হচ্ছে। ভারতের প্রবৃদ্ধির হার বর্ধনশীল হলেও বিনিয়োগ ও উৎপাদন আশানুরূপ নয়। এর মধ্যেই কিছু কিছু বিষয়ে ভারতের চীনবিরোধী অবস্থান, চীন বা রাশিয়ার সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক সহযোগিতা, এনএসজিতে (পারমাণবিক সরবরাহকারী গ্রুপ) অন্তর্ভুক্তি নিয়ে চীনের ভারতবিরোধিতার মতো কূটনৈতিক প্রশ্নে মতান্তরের কারণে ব্রিকসের ভবিষ্যৎ নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন কেউ কেউ।

তবে গোয়ায় ব্রিকস সম্মেলন শেষে পাঁচ রাষ্ট্র ঘোষণা করেছে, বিশ্বজুড়ে চলা আর্থিক মন্দা দ্রুত কাটাতে তারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবে। নিজেদের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ আরো বাড়ানো হবে। পাঁচ দেশের জোটের ‘সম্ভাবনা ও সহজাত শক্তি’র যেকোনো পরিবর্তন হয়নি, তা-ও জোরের সঙ্গে বলেছেন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীনের প্রেসিডেন্ট। পাকিস্তানকে কোণঠাসা করতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যখন যথারীতি সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়েছেন তখন শি চিনপিং সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, বিশ্ব অর্থনীতিও বিপদে। শি চিনপিং বলেন, ২০০৮ সালের ঋণ সংকট থেকে বিশ্ব অর্থনীতি এখনো পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি এবং পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া ‘এখনো টলমলে’। তবে পাঁচ দেশের গোষ্ঠীর সম্ভাবনা ও সহজাত শক্তি অপরিবর্তিত রয়েছে এবং দূর-ভবিষ্যতেও থাকবে উল্লেখ করে শি চিনপিং বলেন, সম্পদ, বাজার ও শ্রমশক্তি যেহেতু বদলায়নি, ভয়ের কিছু নেই। দূর-ভবিষ্যতে ব্রিকস ভালো করবে—এমন আশাবাদই ব্যক্ত করে চীন।

ভারতের তরফে হতাশার দিক হলো, দেশটি চাইছিল উন্নয়নশীল দেশগুলো মিলে একটি ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি বা অর্থনীতির মূল্যায়ন সংস্থা তৈরি করুক। কারণ মোদি সরকারের অন্দর মহলের মত হচ্ছে, বিশ্বের তিনটি প্রধান মূল্যায়নকারী সংস্থা ফিচ, স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওরস ও মুডিজ পশ্চিমের উন্নত অর্থনীতিগুলোর প্রতি বেশি সদয়। তারা ভারতের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতি সম্পর্কে বরাবর নেতিবাচক মনোভাব নেয়। ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি তৈরির বিষয়ে সম্মেলনে মোটের ওপর সহমত তৈরি হলেও চীনের আপত্তিতে এবার এই চুক্তি সম্ভব হয়নি। চীনের যুক্তি হচ্ছে, মূল্যায়নকারী সংস্থার পেছনে কোনো সরকার থাকলে তার বিশ্বাসযোগ্যতা থাকবে না। এ পরিস্থিতিতে বিষয়টির খুঁটিনাটি দিক নিয়ে আরো আলোচনা হবে বলে ঠিক হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে গোয়ায় ব্রিকস সম্মেলনে একমাত্র আশার আলো হলো, বাংলাদেশসহ বিমসটেক গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে ব্রিকসের যোগাযোগ তৈরির প্রয়াস। যেখানেই ব্রিকস সম্মেলন হয়, আশপাশের দেশগুলোকে সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেই অনুযায়ী ভারতের আমন্ত্রণে বঙ্গোপসাগর ঘিরে থাকা সাতটি দেশ বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারকে নিয়ে তৈরি বিমসটেক (বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টিসেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন) গোষ্ঠীর রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানরা গোয়ায় উপস্থিত হন। এই দুটি গোষ্ঠীর মধ্যে যোগাযোগের ফলে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য ক্ষেত্রে সহযোগিতা, পরিকাঠামোয় লগ্নি আরো বাড়বে বলেই অর্থনীতিবিদরা আশা করছেন।

 

সূত্র : এই সময়, আনন্দবাজার, গণশক্তি ও বর্তমান পত্রিকার বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন অবলম্বনে


মন্তব্য