kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


কারিগরি শিক্ষায় আরো গুরুত্ব দিতে হবে

ড. মো. মোয়াজ্জেম হোসেন খান

১৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



কারিগরি শিক্ষায় আরো গুরুত্ব দিতে হবে

অবশেষে ২০১০ সালে আমরা একটা যুগোপযোগী শিক্ষানীতি পেয়েছি। অবশেষে এ জন্য বলছি যে এর আগে বঙ্গবন্ধুর আমলে ১৯৭৩ সালে শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হয়েছিল ড. কুদরাত-এ-খুদার নেতৃত্বে গঠিত আমাদের দেশের প্রথম শিক্ষা কমিশনের সহায়তায়।

এ শিক্ষানীতিতে বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিল। এতে প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত করা হয়েছিল, যাকে ফাংশনাল এডুকেশন নামে অভিহিত করা হয়েছিল। এ শিক্ষানীতিতে বৈষম্যহীন ও সাম্প্রদায়িকতামুক্ত শিক্ষার কথা বলা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু এ শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ঘাতকরা তাঁকে সে সুযোগ দেয়নি। জিয়া ক্ষমতা দখল করে অন্য অনেক কিছুর মতো এ শিক্ষানীতিকে নির্বাসনে পাঠান। এরপর বহু শিক্ষা কমিশন হয়েছে। কিন্তু তা কখনো আলোর মুখই দেখেনি, বাস্তবায়ন তো দূরের কথা। একমাত্র ২০০৯ সালে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসে আধুনিক যুগোপযোগী এক শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে, যা বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন। এ শিক্ষানীতিতে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছুটা অসংগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। সরকার প্রতিটি জেলায় কমপক্ষে একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রতিটি উপজেলায় অন্ততপক্ষে একটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার বাস্তবায়ন এর মধ্যেই অনেকটা এগিয়েছে। কিন্তু বৃত্তিমূলক শিক্ষার ক্ষেত্রে তেমন তৎপরতা চোখে পড়ছে না। এ ক্ষেত্রে যুব উন্নয়ন কেন্দ্রসহ আগের কিছুসংখ্যক প্রতিষ্ঠানেই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলছে। এ কর্মসূচি বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন। আমাদের প্রস্তাব হচ্ছে, আমাদের দেশের সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদের কেন্দ্রে একটি করে মোট সাড়ে চার হাজার বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। শহর এলাকায় বেশ কিছু প্রশিক্ষণকেন্দ্র আছে। প্রয়োজনে আরো স্থাপন করা যেতে পারে। নার্সিং, প্যারামেডিক্যাল, মেডিক্যাল টেকনোলজি ইনস্টিটিউট যেমন আরো স্থাপন করতে হবে, ঠিক তেমনিভাবে রেল, নৌ ও সমুদ্রপথের জন্য জনশক্তি প্রশিক্ষণ একাডেমি, ইনস্টিটিউট, বিশ্ববিদ্যালয়, অনুষদ ইত্যাদি জরুরি ভিত্তিতে গড়ে তুলতে হবে। আমাদের দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নতুন শাখাগুলোর ওপর নতুন নতুন বিভাগ, অনুষদ খুলতে হবে। মোটকথা, আমাদের বিপুল জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তর করার জন্য দেশব্যাপী বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-কারিগরি-বৃত্তিমূলক শিক্ষার এক সুসমন্বিত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে। জমি বাঁচানোর তাগিদে আমাদের দেশের সব স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুই শিফট, প্রয়োজনে তিন শিফট চালু করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কিছু ইনভেন্টরিসহ ২০ থেকে ৩০ শতাংশ অতিরিক্ত শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগ দিলেই চলবে বলে আমরা মনে করি। ভুলে গেলে চলবে না যে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষায়ই আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ নিহিত রয়েছে।  

সরকার গবেষণা কার্যক্রমের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এটা শুভ লক্ষণ। শিক্ষানীতিতেও গবেষণার কথা বলা হয়েছে। আমরা মনে করি যে টেকসই উন্নয়নের জন্য গবেষণা অপরিহার্য। চীনাদের মতো আমাদের দেশের বিদ্যমান গবেষণাগারগুলোর খোলনলচে পাল্টে ফেলতে হবে। বসাতে হবে সর্বাধুনিক সব যন্ত্রপাতি। একই সঙ্গে সর্বশেষ প্রযুক্তিনির্ভর আরো নতুন নতুন গবেষণাগার গড়ে তুলতে হবে। উৎপাদনের সঙ্গে গবেষণার সরাসরি সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। অনুৎপাদনশীল  খাতগুলোয় বরাদ্দ হ্রাস করে গবেষণা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে মহাজোট সরকারের বিগত আমলের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল শিক্ষকদের জন্য পৃথক ও উচ্চতর বেতন কাঠামো প্রদান করার। কিন্তু সরকার সে প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গেছে বলে এখন মনে হচ্ছে। স্বৈরাচার বুঝতে অক্ষম, কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক সরকার কেন এ সত্য বুঝতে পারছে না যে মানুষ গড়ার একজন কারিগরকে যদি হাঁড়ির চিন্তা করতে হয়, তাহলে তিনি ভালো পড়াতে-শেখাতে পারেন না; তাঁকে টিউশনি তথা কোচিং-বাণিজ্যের কথা ভাবতে হয় বৈকি। আমরা মনে করি যে মানুষ গড়ার কারিগরদের জন্য উচ্চতর বেতন কাঠামো দেওয়া হোক এবং কোচিং-টিউশনি চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হোক। ভারত সরকার (বিগত বিজেপি সরকার) এটা অনেক আগেই করেছে। আমলারা তখন সর্বোচ্চ বেতনের দোহাই দিয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। গণতান্ত্রিক সরকার তখন বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে বিভিন্ন ভাতার আকারে শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধি করে নতুন উচ্চতর বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করেছে। উপমহাদেশে,  এমনকি শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানও শিক্ষকদের জন্য পৃথক ও উচ্চতর বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করেছে। আমাদের দেশেও একমাত্র গণতান্ত্রিক সরকারই এটা করতে পারে। আমলারা বা অন্যান্য পেশার লোকজন বাধা দিলে সরকারকে তা মোকাবিলা করেই এগোতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে যে তারাও শিক্ষকদের কাছেই লেখাপড়া শিখে মানুষ হয়েছে, জিন-ভূতের কাছে নয়। সরকারের দৃঢ় অবস্থানই এ ক্ষেত্রে অপরিহার্য ও প্রত্যাশিত পরিবর্তন আনতে পারে।

শিক্ষাক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতির মচ্ছব চলছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা এখন প্রায়ই ঘটতে দেখা যাচ্ছে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঘুষের বিনিময়ে চাকরি প্রদানসহ হেন কাজ নেই, যেখানে ঘুষ দিতে হয় না। সরকার নিয়োগের ক্ষেত্রে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক কমিশন গঠন করতে চেয়েছিল। কিন্তু কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহল তা ভণ্ডুল করে দেয়। এ ক্ষেত্রে আমলা-শিক্ষক-রাজনীতিবিদ এ রকম একটা অসৎ চক্র কাজ করছে বলে আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। আমরা মনে করি যে একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক সরকার কারো অন্যায্য আবদার মেনে নিতে পারে না; কোনো কায়েমি স্বার্থের কাছে নতি স্বীকার করতে পারে না। শিক্ষাব্যবস্থায় জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার স্বার্থে যা যা করা দরকার সরকার তা করবে—জনগণ এটাই প্রত্যাশা করে। এ ক্ষেত্রে শৈথিল্যের কোনো অবকাশ নেই। একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিতকরণে এর কোনো বিকল্প থাকতে পারে না।        

লেখক : সাবেক সভাপতি, অর্থনীতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

moazzem_hossainkhan@yahoo.com

 


মন্তব্য