kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


টেকসই উন্নয়নের জন্য আর্থিক খাতে সুশাসন প্রয়োজন

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ

১৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



টেকসই উন্নয়নের জন্য আর্থিক খাতে সুশাসন প্রয়োজন

বাংলাদেশে বর্তমান অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও এর বৈশিষ্ট্যগুলো বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশ স্বাধীন হয় তখন এই ছোট্ট ভূখণ্ডে, যেখানে প্রাকৃতিক সম্পদ পর্যাপ্ত নয়, অথচ এক বিশাল জনগোষ্ঠীর বসবাস, এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কিছু অর্থনীতিবিদ বাংলাদেশকে Test case of Development আখ্যায়িত করেন; অর্থাৎ উন্নয়নের চ্যালেঞ্জগুলো ছিল অনেক এবং অত্যন্ত কঠিন, যেটা দেশ পরিচালনাকারীদের জন্য একটি বিশেষ পরীক্ষা।

অর্থাৎ তাঁদের দক্ষতা, কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা কী করে বাংলাদেশকে একটি viable, অর্থাৎ টেকসই রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলা যায়। নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে ৪৫ বছরে বাংলাদেশ শুধু টেকসই রাষ্ট্রেই পরিণত হয়নি, একটি Model case of Development, অর্থাৎ উন্নয়নকামী দেশের জন্য বাংলাদেশ একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে পরিচিত। উন্নয়নের কিছু সামষ্টিক সূচক, যেমন প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, মাথাপিছু আয়, রপ্তানি, রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ—এগুলো দেখে বাংলাদেশের উন্নয়নের ঊর্ধ্বগতি সম্পর্কে কিছুটা ইতিবাচক চিত্র পাওয়া যায়। কিন্তু এগুলো দেখে আমাদের আত্মতুষ্টি নিয়ে থাকা ঠিক নয়। উন্নয়নের প্রকৃতি ও সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাবগুলো পর্যালোচনা করে আমরা বিশেষ দুটি জিনিস লক্ষ করি। প্রথমত, উন্নয়নের সুফলগুলো তৃণমূল পর্যায়ে যথাযথভাবে পৌঁছাচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিগত আয় ও জীবনযাত্রার মানের বৈষম্য দিন দিন প্রকটতর হচ্ছে। বিশেষ এক শ্রেণির ধনীর তুলনায় উচ্চ মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা দিন দিন কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে নিম্নবিত্ত, যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ তারা দিন দিন অসম উন্নয়নের নেতিবাচক ফল ভোগ করছে। সেই সঙ্গে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা যায়, সেটি হলো বাংলাদেশের উন্নয়নপ্রক্রিয়া বিকেন্দ্রীকরণ না করার ফলে যেটুকু উন্নয়ন হয়েছে সেগুলোর বেশির ভাগ সুফল পাচ্ছে ঢাকা শহরসহ কয়েকটি নগর ও তত্সংলগ্ন স্থান। এটার তাৎপর্য হচ্ছে উন্নয়নের সুফল, দেশের সম্পদ, অর্থ-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, এমনকি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণগুলো কিছু কিছু স্থানে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে; যেটার ফল থেকে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষ বঞ্চিত। এই নিবন্ধে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জগুলো আলোচনা করতে চাই।

প্রথমেই আর্থিক খাতের বিষয়টি নেওয়া যায়। দেশের অন্যান্য খাতের তুলনায় কয়েক বছর আগেও ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকলাপ ছিল সুসংহত ও সুনিয়ন্ত্রিত; যার ফলে উৎপাদনশীল খাতে ও বাণিজ্যে, সেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার ফলে প্রবৃদ্ধি সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু ইদানীং সুশাসনের অভাব, দুর্নীতি ও আইনসিদ্ধ কাজ না করার ফলে অনেক ব্যাংক, বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় বিপর্যয় নেমে এসেছে। বিভিন্ন আর্থিক কেলেঙ্কারি উদ্ঘাটনের আগে যথাযথ তদারকি ও মনিটরিংয়ের অভাব ও ঘটনাপরবর্তী সময়ে দ্রুত, সময়োচিত, দৃশ্যমান ও যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়ার ফলে ব্যাংকিং খাত ‘দুষ্টচক্রে’ নিপতিত হচ্ছে। ২০০৮ সালে বিশ্বমন্দার মূল কারণ ছিল আর্থিক খাতে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক খাতে, অনিয়ম ও দুর্নীতি। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনশীল খাতসহ কর্মসংস্থান, বাণিজ্য—সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল এবং বিশ্বব্যাপী সেটা ছড়িয়ে পড়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক সরকারের সহযোগিতায় যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার ফলে এই সংকটের প্রভাব থেকে বাংলাদেশ মুক্ত থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের আবাসন খাত থেকে শুরু হয়ে বিনিয়োগ, ব্যাংক, ইনস্যুরেন্স ও পুঁজিবাজারে এর সর্বগ্রাসী প্রভাব পড়েছিল দুটি বিশেষ কারণে। একটি হলো আইনের দুর্বলতা ও পরিপালনের শিথিলতা এবং দ্বিতীয়ত, কম সুদের হার। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনাকারীদের লোভ, যা অনৈতিক ও অগ্রহণযোগ্য কার্যকলাপ উৎসাহিত করে। বাংলাদেশের বিষয়টি পর্যালোচনা করলে উপরোক্ত বিষয়গুলোর তাৎপর্য অনুধাবন করা যায়। এখানেও আইন ও নীতির দুর্বলতা ও ব্যাংক কর্তৃক বিভিন্ন বিধিমালা যথাযথভাবে পরিপালন না করা পরিলক্ষিত হয়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে দুর্নীতি। বাংলাদেশে আরো বিশেষ একটি মাত্রা যোগ হয়েছে, সেটা হলো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ; যেটা কফিনের ওপর শেষ পেরেকটুকু মারার মতো, যেটা আর্থিক খাতের Good Governance, অর্থাৎ সুষ্ঠু নিয়ন্ত্রণের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করেছে।

এ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে হলে আমাদের দ্রুত আর্থিক খাতের যথাযথ সংস্কার করতে হবে। সেখানে থেমে থাকলেই হবে না। কেননা সংস্কার এর আগেও অনেক হয়েছে। কিন্তু সেগুলোর সুষ্ঠু বাস্তবায়ন হয়নি। আমাদের প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পরিহার ও দক্ষ-সৎ মানুষের মাধ্যমে কর্ম সম্পাদন। আমেরিকার সমস্যা উত্তরণে সরকার বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে bail out করার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রচুর অর্থ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ সরকারের পক্ষ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ইনস্যুরেন্স প্রতিষ্ঠান ও আবাসন mortgage কম্পানিকে অর্থ দিয়ে উদ্ধার করা হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষে এ ধরনের কার্যকলাপ করা অত্যন্ত দুরূহ, এর কারণ আমাদের অর্থের অপ্রতুলতা। আর্থিক খাতের উদ্ধার ছাড়াও বাংলাদেশ সরকারের আরো দায়িত্ব রয়েছে, যেমন দেশের জনগণের আর্থসামাজিক উন্নয়ন। দেখা যাচ্ছে যে বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকটের কারণগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমানের আর্থিক খাতের সংকটের কিছুটা সামঞ্জস্য থাকলেও বাংলাদেশের সমস্যা সমাধানের পথ একই রকম হতে পারে না।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে ধারণা পেতে হলে বিশ্বের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থার তিনটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আলোচনা করা যেতে পারে। প্রথমত, আমেরিকা সংকট থেকে কিছুটা বেরিয়ে আসতে পারলেও ইউরোপ ও বিশ্বের অন্যান্য দেশ তেমনভাবে পারেনি। আমেরিকার আবাসন খাতটি মূলত পুনর্বাসন করা হয়েছে সরকারি সহায়তায়। এখানে ব্যক্তি অথবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের চেয়েও সরকারি বিনিয়োগ অনেক বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের আবাসন খাতের অর্থায়ন সাধারণত হয় Mortgage পদ্ধতিতে, সেখানে অর্থায়নের সম্পূর্ণ গ্যারান্টি ও উৎস সরকারি খাত। বাংলাদেশের আবাসন খাতে মন্দা থাকলেও এ ধরনের Mortgage পদ্ধতিতে অর্থায়ন ও সরকারের গ্যারান্টি খুব একটি কঠিন বিষয়। বিশ্বের আরো একটি অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হলো ইউরোপের মন্দা ও অধিকাংশ দেশের আর্থিক সংকট। ইউরোপীয় ইউনিয়নের জটিল অর্থনৈতিক সম্পর্ক ব্যবস্থার কারণে মন্দা থেকে বেরিয়ে আসতে গ্রিস, ইতালি, পর্তুগাল—এসব দেশের অনেক ঝুঁকি পোহাতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা World Bank, IMF-এর শর্তের সঙ্গে অনেক সময় European Central Bank (ECB)-এর নীতি ও শর্তাবলির সংঘাত সৃষ্টি হয়। এর ফলে সার্বভৌম দেশগুলোর ওপর অযৌক্তিক কিছু কর্মপরিকল্পনা ও শর্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ভূমিকা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এসব সংস্থা অনেক সময় তাদের গতানুগতিক তত্ত্ব ও নির্দিষ্ট কিছু মডেলের ভিত্তিতে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর ওপর কর্মপরিকল্পনা ও শর্ত দিয়ে দেয়। অনেক সময় সেটা দেশের স্বার্থের উপযোগী নয়। বাংলাদেশের আর্থিক সংস্কারপ্রক্রিয়ায় এ রকম উদাহরণ রয়েছে। এশিয়ান ক্রাইসিস বলে যেটা পরিচিত, সেটার প্রভাব ও তা মোকাবিলা করার যেসব কর্মপরিকল্পনা বিভিন্ন দেশ গ্রহণ করেছিল সেগুলো পর্যালোচনা করে এখন প্রতীয়মান হচ্ছে যে IMF ও বিশ্বের অন্যান্য বহুজাতিক সংস্থার পরামর্শ তেমন ফলপ্রসূ হয়নি। বাংলাদেশে এখন যেটা প্রয়োজন, সেটা হলো এযাবৎ আর্থিক খাতে যেসব সংস্কার হয়েছে সেগুলো যুগের প্রয়োজনে পুনর্বিন্যাস করা এবং আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার করা। বিশেষ করে ব্যাংক, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, পুঁজিবাজার, ইনস্যুরেন্স খাত ও ক্ষুদ্রঋণ খাতের সমন্বয়ে একটি Comprehensive ও সংহত নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ মুদ্রাবাজার ও পুঁজিবাজারের সঙ্গে যেখানে সম্পর্ক রয়েছে সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংক ও পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক উভয়ের ভূমিকা সমন্বয় ও সুসংহত করা প্রয়োজন। আর একটি উদাহরণ হলো, যদি কেউ একটি ব্যাংকের পরিচালক হন, তবে তিনি অন্য কোনো ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান অথবা কোনো ইনস্যুরেন্স কম্পানির পরিচালক হবেন না, এটাই হলো কাম্য। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান আইনে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। এর ফলে সম্প্রতি ঋণ ও আর্থিক সুবিধাদি স্বল্পসংখ্যক লোক বা ব্যক্তির কাছে চলে যাচ্ছে। যেটা Financial-Inclusion-এর যা লক্ষ্য সেটা অর্জন করার পথে বাধা সৃষ্টি করছে।

সব শেষে ব্যাংকিং খাতের ক্রমবর্ধমান Default loan-এর প্রতি আলোকপাত করা যেতে পারে। বিপুল পরিমাণ অনাদায়ী ঋণের জন্য ব্যাংকিং খাতে একটি সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। ঋণ প্রদানে সুদের হার না কমা, আমানতের সুদের নিম্নহার এবং সর্বোপরি ব্যাংকের Spread পরিমাণ না কমা, অনাদায়ী ঋণের প্রভাব। ব্যাংকগুলোর Governance, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, ব্যবস্থাপনা, তদারকি—এসব বিষয়ে দুর্বলতার কারণেই আর্থিক খাতে সংকট বেড়ে চলছে। এরই সঙ্গে বেড়ে চলেছে দুর্নীতি, অদক্ষতা, রয়েছে স্বচ্ছতার অভাব। Hallmark কেলেঙ্কারি, বিসমিল্লাহ গ্রুপ কেলেঙ্কারি, বেসিক ব্যাংকের অনিয়মসহ এ ধরনের অন্যান্য ঘটনা উদ্ঘাটিত হলেও সময়োচিত দৃশ্যমান ও যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়ার ফলে ব্যাংকিং সেক্টর একটি দুষ্টচক্রের ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছে। এটি একটি অশনিসংকেত। এই সমস্যা থেকে বেরিয়ে না এলে আমাদের প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, আয় বৃদ্ধি, সমতাভিত্তিক উন্নয়নসহ মহৎ উদ্দেশ্যগুলো ব্যাহত হবে। আর্থিক খাতের মতো একটি টেকনিক্যাল ক্ষেত্রকে রাজনৈতিক ও নেতিবাচক আমলাতন্ত্রের প্রভাব থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত করতে হবে।

বাংলাদেশ একটি যুগ সন্ধিক্ষণে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের জোয়ার আনতে হলে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোকে শক্ত অবস্থান নিতে হবে এবং তদারকি আরো সুদৃঢ় করতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে যে অত্যধিক নিয়ন্ত্রণ অথবা শিথিল নিয়ন্ত্রণ কোনোটাই কাম্য নয়, আমাদের দুটির মধ্যেই ভারসাম্য বজায় রেখে নীতিমালা ও প্রবিধান প্রস্তুত করে তা পরিপালন নিশ্চিত করতে হবে। কাজটি সম্ভব হবে যদি সদিচ্ছা নিয়ে দক্ষ, সৎ ও উদ্যমী ব্যক্তিদের নিয়ে আমরা এগিয়ে যাই।

 

লেখক : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও বর্তমানে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক


মন্তব্য