kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


আন্দোলন নয় দেশের কল্যাণে কথা বলুন

ড. নিয়াজ আহম্মেদ

১৭ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



আন্দোলন নয় দেশের কল্যাণে কথা বলুন

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৭ অনুচ্ছেদে সমাবেশের স্বাধীনতায় বলা রয়েছে ‘জনশৃঙ্খলা বা জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধানিষেধ সাপেক্ষে শান্তিপূর্ণভাবে ও নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হইবার এবং জনসভা ও শোভাযাত্রায় যোগদান করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে। ’ এখানে একদিকে সভা-সমাবেশ করার অধিকারের কথা বলা হয়েছে, অন্যদিকে আবার যুক্তিসংগত বাধানিষেধের কথাও রয়েছে।

অর্থাৎ রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর বা হুমকি হতে পারে এমন কোনো সভা-সমাবেশ করা থেকে রাষ্ট্র আমাদের নিবৃত্ত করে। এটি এ কারণে কাম্য, যদি তা না হতো তাহলে সমাজে এক অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হতো, যা কোনোভাবেই মানা যেত না। স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের সভা-সমাবেশ করার অধিকার থাকবে—এমনটিই স্বাভাবিক, তবে তা আইনি কাঠামোর মধ্যে হতে হবে। এমন বিধান অন্যায় ও অযৌক্তিক আন্দোলন থেকে জনগণকে দূরে রাখার পথ তৈরি করে, নাগরিকদের আন্দোলন করার পেছনে যুক্তি খুঁজতে এবং জনগণকে কল্যাণ ও হীতকর  আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করে।

রাস্তা বন্ধ করে সমাবেশ করার গতানুগতিক ধারা থেকে আমরা অনেকটা বেরিয়ে আসতে পারলেও রাস্তায় মিছিল আর শোভাযাত্রা থেকে আমরা এখনো মুক্ত নই। আন্দোলনের প্রসঙ্গ এলেই আমাদের সামনে সহিংস ও অহিংস আন্দোলনের কথা এসে যায়। সাধারণত মনে করা হয় ন্যায়, যৌক্তিক ও জনস্বার্থে  যেকোনো বিষয়ের আন্দোলন অহিংস। জনগণ সরাসরি অংশগ্রহণ না করলেও অধিকাংশের মৌন সমর্থন থাকে। কিন্তু যদি কোনো কারণে এর সঙ্গে এক বা একাধিক ব্যক্তির ক্ষুদ্র স্বার্থ যুক্ত হয় তখন তা হালে পানি পায় না। যাদের দ্বারা এমন আন্দোলন শুরু এবং ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়া তাদের অহিংস হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। আবার যত বিপদ আসুক না কেন সহিংস হওয়া কোনো কোনো আন্দোলনের ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। সম্প্রতি রামপালে বিদ্যুেকন্দ্র স্থাপন নিয়ে বিরোধীদের আন্দোলনের একটি ধরন ছিল সাইকেল শোভাযাত্রা। এ এক অন্য রকম প্রতিবাদ। আমাদের ধারণা, তাদের প্রতিবাদের ভাষা অহিংস ছিল। কিন্তু তারা তা করতে পারেনি। প্রতিবাদ করতে না পারার জন্য যে প্রতিবাদ তারা প্রেস ক্লাবে করেছে তাও অহিংস ছিল। অন্যদিকে ভবদহের জলাবদ্ধতা বহুদিনের। যশোরের মণিরামপুরের মানুষ একত্র হয়েছিল প্রতিবাদ করতে, এ থেকে মুক্তি পেতে এবং প্রতিকার চাইতে। তাদের সমাবেশও অহিংস ছিল। কিন্তু পুলিশের লাঠিপেটা খেতে হয়েছে।

বিগত দিনগুলোয় যত রাজনৈতিক আন্দোলন হয়েছে তার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও আন্দোলন পুরোপুরি সহিংস ছিল বিধায় হালে মোটেও পানি পায়নি। ফলে এখন এমন এক অবস্থা তৈরি হয়েছে যে যৌক্তিক আন্দোলনেও এখন মানুষের অংশগ্রহণ ও  সমর্থন পাওয়া মুশকিল। কারণ হলো ভেবেচিন্তে আন্দোলনের দিকে পা না বাড়ানো।

আন্দোলন নির্দিষ্ট স্থানে সভা-সমাবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে অহিংস হওয়ার সুযোগ কমে যায়। যখন নির্দিষ্ট গণ্ডির বাইরে রাজপথে হরতাল-অবরোধের দিকে ধাবিত হয় তখন অহিংস হতে বাধ্য। কেননা এখানে আন্দোলনকারীদের নিয়ন্ত্রণভার তাদের হাতে কম থাকে বা একেবারেই থাকে না। যারা আন্দোলন করেন তাঁরা এমনটিও ভাবতে পারেন যে আন্দোলন সহিংস হলেই ভালো। দ্রুত ফল পাওয়া যায়। অতীতে সফল হওয়া ছিল একমাত্র কাম্য। গত কয়েক বছরে অতীতের ধারণার মধ্যে ছেদ ধরেছে। এখন আন্দোলন করলেই ফল পাওয়া যায় না; বিশেষ করে যদি তা হয় অযৌক্তিক। সহিংস ও অহিংস আন্দোলন মোকাবিলা করার কৌশল ও ধরনের মধ্যেও পরিবর্তন এসেছে। দুই পক্ষ যখন সমান সমান তখন কেউ কাউকে ছাড় দিতে চায় না। তখন আন্দোলনকারীদের পরাজয় হয়। এটি চরম সত্য, আমাদের মতো দেশে অহিংস আন্দোলন করে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অন্যায়ের প্রতিকার পাওয়া যায় না। কোনো ইস্যুতে বড় বিতর্কের আয়োজন কিংবা দ্রুত সমস্যা সমাধানের চেষ্টায় আমরা নেই। পেশাজীবী, রাজনৈতিক দল কিংবা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর আন্দোলনের দিকে তাকালে আমরা এখন লক্ষ করি, অতীতের তুলনায় আন্দোলন আর বেশি দিন টিকছে না। আন্দোলন জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের অভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে কিংবা আন্দোলন দানা বাঁধার জন্য সহায়ক উপাদানগুলো ক্রিয়াশীল হতে পারে না বা হতে দেওয়া হয় না। কোনো ইস্যুতে মানসম্মত ব্যাখ্যা পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্তের মাধ্যমে উপস্থাপন না হওয়ার কারণে আন্দোলনে পক্ষ-বিপক্ষ তৈরি হয়, ভাঙন দেখা দেয়। একজন সঠিক বলছে তো অন্যজনের অবস্থান বিপরীত। এমনকি প্রযুক্তিগত বিষয়েও আমরা এমনটি লক্ষ করি।

রাজনীতিতে সহিংস আন্দোলনের স্থান পাকাপোক্ত হওয়ার সম্ভাবনা এখন ক্ষীণ। যৌক্তিক কারণে অহিংস আন্দোলন হলে আমরা মেনে নিতে পারি। কিন্তু যখন বিনা কারণে সহিংস তখন কিভাবে মেনে নেওয়া। অতীত থেকে এমন শিক্ষা নিয়ে আমরা পরিশীলিত  হতে পারি। এতে রাজনীতি ও আন্দোলন দুটিই পরিশীলিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। রাজনীতি পরিশীলিত হতে হলে আমাদের নিদেনপক্ষে অহিংস হতে হবে। আন্দোলন তো এমন, যা রাজনীতিকে পরিশীলিত করার পথ উন্মুক্ত করে। মান তৈরি করা এবং নিয়মনীতি মেনে চলতে উদ্বুদ্ধ করে। শুধু নিজে কিছু পাওয়ার জন্য নয়, রাষ্ট্রকে কিছু দেওয়ার জন্যও হতে পারে আন্দোলন। নাগরিক হিসেবে আমার প্রতি যেমন রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে তেমনি রাষ্ট্রের প্রতি রয়েছে আমার দায়বদ্ধতা। এমন ধারণা থেকে সভা-সমাবেশের স্বাধীনতাকে ভাবতে হবে যেন কোনোভাবে আমি স্বাধীনতাকে খর্ব না করি। এমনকি রাষ্ট্রও যেন আমার স্বাধীনতাকে সমানভাবে মূল্য দেয়। আমাদের নজর রাখতে হবে, আন্দোলন কখন সহিংসতায় মোড় নেয়। তখন দেশের কল্যাণের কথা ভেবে বন্ধ করতে হবে আন্দোলন ।

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

neazahmed_2002@yahoo.com


মন্তব্য