kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বাকস্বাধীনতার নিয়ন্ত্রণ ও মৌলিক অধিকার

এ এম এম শওকত আলী

১৭ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



বাকস্বাধীনতার নিয়ন্ত্রণ ও মৌলিক অধিকার

অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে জাতীয় সংসদে বিদেশি সাহায্যপুষ্ট এনজিওগুলোর নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত বিষয়ে নতুন ধারা সংযোজিত হয়েছে। এ তথ্য গত ৭ অক্টোবরের একটি দৈনিকের প্রধান খবর ছিল।

আলোচ্য খবরটি কিছু এনজিওসহ আইন বিশেষজ্ঞরা মেনে নেননি। তাঁরা এর বিপক্ষে মত প্রকাশ করেছেন। নতুন ধারা সংযোজনসংক্রান্ত বিষয়ে এ খবরে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও জানা গেছে। এ বিষয়ে বিল প্রণয়নের সময় সংশ্লিষ্ট কিছু বেসরকারি সংস্থাকে সম্পৃক্ত করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় ওই সব সংস্থাকে আশ্বাস দেওয়া হয় যে তাদের মতামত অগ্রাহ্য করা হবে না। একটি সংস্থার মতে, এ আশ্বাস শেষ পর্যন্ত কার্যকর করা হয়নি। মূল বিলটি গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে যখন প্রথম প্রণীত হয়, তখন নতুন ও বিতর্কিত ধারাটি বিলে ছিল না বলে একটি সংস্থা দাবি করেছে। আরো জানা যায় যে ওই সংস্থা একপর্যায়ে ‘সংসদ নিরীক্ষণ’ বা ‘Parliament Watch’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। এ প্রতিবেদনে বিল আলোচনায় ‘স্বল্পসংখ্যক সংসদ সদস্যের উপস্থিতি ও অংশগ্রহণ’ ছাড়াও বিরোধী দলকে ‘কথিত’ বিরোধী দল এবং ‘পুতুলের শো’ ইত্যাদি বলা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে কিছু সংসদ সদস্য ওই সংস্থার শাস্তি দাবি করেন। প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে যে এ ধরনের প্রতিক্রিয়া আইন মন্ত্রণালয়কে প্রভাবিত করার ফলেই নতুন ধারাটি সদ্য অনুমোদিত আইনে সংযোজন করা হয়। কথায় বলে, প্রাচীন রোমান বা গ্রিসের প্রথায় স্বতঃসিদ্ধ বিষয়টি হলো—‘আইন তা-ই হবে, যা আইনপ্রণেতা বলবেন। ’ যেকোনো স্বাধীন দেশে এমনটি হওয়া প্রত্যাশিত নয়। কারণ সব ধরনের আইন সংবিধানে বর্ণিত ধারার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তাই সুদূর অতীতের প্রথা এ ক্ষেত্রে অচল বা অকার্যকর হওয়ার কথা। জানা যায় যে নতুন ধারা সংযোজন করা হয় বিলটি যখন সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটিতে চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। এর বিরুদ্ধেও একটি বেসরকারি সংস্থা বিলটিকে ‘কালো আইন’ এবং ‘স্বৈরাচারমূলক’ বলে অভিহিত করে। এ প্রতিবাদ গত ১৮ মে করা হয় বলে জানা গেছে।

নতুন ধারা সম্পর্কে কিছু আইন বিশেষজ্ঞও মত প্রকাশ করেছেন। তাঁদের একজনের মতে, এ ধারা সংবিধানে বর্ণিত মৌলিক অধিকারের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। এ ছাড়া এ ধারার ফলে সরকারের অসহনশীলতার বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছে। এ ধরনের অসহিষ্ণুতা গণতন্ত্র বিকাশের অন্তরায়। এর ফলে নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। এ বিষয়ে অন্য একজন আইনজীবীও মত প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে—এক. নতুন ধারা প্রস্তাবিত আইনের মূল বিষয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ বা অপ্রাসঙ্গিক; দুই. বিলটির বিষয়ে আদালতে মামলা করা হলে তা বাতিল হবে; তিন. সংবিধান বা আইনের বিষয়ে সমালোচনা না হলে ভবিষ্যতে কিভাবে সংশোধনী আনা হবে। প্রকাশিত সংবাদের প্রথমার্ধে একটি এনজিওর নির্বাহী প্রধানের প্রতিক্রিয়া প্রাধান্য পেয়েছে। তাঁর মতে, একটি গণতান্ত্রিক দেশের নাগরিক হিসেবে যেকোনো গণতান্ত্রিক সংস্থার বিষয়ে প্রশ্ন করার অধিকার তাঁর রয়েছে। ‘আমি যদি এসব সংস্থার সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে না পারি, তাহলে আমার গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুণ্ন বা বিঘ্নিত হবে’ বলে তিনি দৃঢ় মত প্রকাশ করেন। এ ছাড়া তিনি আরো বলেন, নতুন ধারাটি একটি বিপজ্জনক নজির বা দীর্ঘমেয়াদে গণতন্ত্রের বিকাশ বাধাগ্রস্ত করবে। আরো জানা যায় যে কয়েক দিনের মধ্যেই এনজিওগুলো নিজেরা আলোচনা করে এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবে। সবার তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে বলা যায় যে মূল কথা হলো, নতুন বিধিনিষেধ সংবিধানে বর্ণিত মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। গণতান্ত্রিক বিকাশের জন্যও এ ধারা প্রধান অন্তরায়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, এ বিতর্ক আরো চলবে এবং শেষ পর্যন্ত আদালতে যায় কি না এবং ফল কী হয় তা-ই হবে জানার বিষয়।

এ কথা কমবেশি সবাই জানে যে আমাদের সংবিধানের তৃতীয় অংশে জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। সংবিধানের ৩৯ ধারায় চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার বিষয়টিও বর্ণিত। এ ধারার প্রথম অংশে বলা হয়েছে, ‘চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল। ’ তবে অন্যান্য মৌলিক অধিকারের মতো এ স্বাধীনতা নিরঙ্কুশ নয়। কারণ সংশ্লিষ্ট ধারায় দ্বিতীয় অংশে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রসমূহের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা বা নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধানিষেধ সাপেক্ষে (ক) প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার এবং (খ) সংবাদ ক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল। ’ এ ধারার দ্বিতীয় অংশের মূল বিষয়টি হলো—চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাকস্বাধীনতার বিষয়ে সংবিধান কর্তৃক নির্দিষ্ট কয়েকটি ক্ষেত্রে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধানিষেধ সাপেক্ষেই প্রত্যেক নাগরিকের স্বাধীনতা বা মৌলিক অধিকার সংরক্ষিত হবে। বলা যায়, যেসব ক্ষেত্রে সংবিধানে নির্দিষ্ট করা হয়েছে, তার প্রতি ক্ষেত্রে কমবেশি আইন বলবৎ রয়েছে। যেমন—রাষ্ট্রের নিরাপত্তা। এ বিষয়ে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড সংশ্লিষ্ট আইনে দণ্ডনীয়। দুই. বিদেশি রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের বিষয়ে কী আইন আছে, তা নির্দিষ্টভাবে জানা নেই। তিন. জনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য একাধিক আইন রয়েছে। চার. শালীনতা ও নৈতিকতা রক্ষার বিষয়েও হয়তো আছে। পাঁচ. আদালত অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনার বিষয়েও আইন রয়েছে। সবই বহুদিনের আইন। এসব ক্ষেত্রে মামলাও দায়ের করা হয়।

স্বভাবতই প্রশ্ন করা যায় যে সংবিধান দ্বারা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রগুলোর বিষয়ে বর্তমানে বলবৎ অন্যান্য আইন থাকা সত্ত্বেও কী যুক্তিতে বিদেশি সাহায্যপুষ্ট এনজিও-সংক্রান্ত আইনে নতুনভাবে ধারাটি সংযোজন করার প্রয়োজন হলো। প্রকাশিত সংবাদের প্রথমেই বলা হয়েছে যে সংবিধান বা সাংবিধানিক সংস্থা সম্পর্কে ‘শত্রুতামূলক’ ও ‘অপমানজনক’ কোনো মন্তব্য করলে তা দণ্ডনীয় অপরাধ বলে গণ্য হবে। সংবিধান ও সাংবিধানিক সংস্থা সম্পর্কে আলোচ্য সাংবিধানিক ধারায় যেসব ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে, এগুলো তার মধ্যে নেই। ধারণা করা যায় যে সংবিধানপ্রণেতারা জেনেশুনেই গণতান্ত্রিক বিকাশের স্বার্থে এসব ক্ষেত্রের বিষয়ে কোনো ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করেননি। সংবিধানের ব্যাখ্যা কখনো আক্ষরিক হতে পারে না। এর অন্তর্নিহিত বাণীও এ ব্যাখ্যায় আমলে নিতে হবে। বলা বাহুল্য, এ ধরনের ব্যাখ্যা আদালতও দিয়ে থাকেন। আলোচ্য সংবাদে বলা হয়েছে যে নতুন বিলের লক্ষ্য হলো, এনজিওবিষয়ক ব্যুরোকে এনজিওদের পরিদর্শন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়নের বিষয়ে শক্তিশালী করা। যদি তা-ই হয়, তাহলে বিদ্যমান আইনের এসব বিষয়ে অসম্পূর্ণতাকে চিহ্নিত করতে হবে। কিন্তু তা করা হয়েছে বলে মনে হয় না। এ কারণেই প্রতিক্রিয়া ব্যক্তকারী একজন আইনজীবী নতুন ধারাকে অপ্রাসঙ্গিক বলে আখ্যায়িত করেন। তাঁর মতে, এনজিও কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতার নিশ্চয়তা প্রদানের ওপরই নতুন ধারায় গুরুত্ব দিলে ভালো হতো। কিন্তু তা করা হয়নি। অন্য প্রশ্নটি হলো, একমাত্র বিদেশি সাহায্যপুষ্ট এনজিওগুলোর ক্ষেত্রে এ ধরনের আইন প্রণয়ন করা হলো কেন?

স্মরণ করা যায় যে বিদেশি সাহায্যপুষ্ট এনজিওগুলোর জন্য সর্বপ্রথম ১৯৭৮ ও পরবর্তী সময়ে ১৯৮২ সালে আইন করা হয়। এসব পূর্ববর্তী আইন অনুযায়ী নিবন্ধনের জন্য এনজিও ব্যুরোর দ্বারস্থ হতে হয়। ব্যুরোর বিষয়টি হলো—একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার ছাড়পত্র না হলে নিবন্ধন দেওয়া হয় না। এ ছাড়া বিদেশি সাহায্যের উৎস ও বার্ষিক সম্ভাব্য বাজেট বিবরণও এ ব্যুরোই অনুমোদন করে। এত সব কড়াকড়ি সত্ত্বেও নতুন ধারার প্রয়োজনের যুক্তিসংগত কোনো কারণ নেই।

আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটির প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায় (অনুচ্ছেদ ৩) যে কয়েকটি সম্ভাব্য গুরুতর অপরাধ দমনের লক্ষ্যে পূর্ববর্তী দুটি আইন রদ করে নতুন আইনের খসড়া প্রণীত হয়। অপরাধগুলো হলো—এক. অর্থপাচার (Money Laundering), দুই. সন্ত্রাসী কার্যক্রমে সরাসরি অংশগ্রহণ, তিন. দেশি-বিদেশি সন্ত্রাসী কার্যক্রমে অর্থায়ন, চার. স্বেচ্ছাধর্মী কার্যক্রমের নামে নিজস্ব বা পারিবারিক কোনো কর্মকাণ্ড পরিচালনা, পাঁচ. অন্য কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা, ছয়. কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য পাঁয়তারা করা। বলা বাহুল্য, যে কয়টি অপরাধ বা সম্ভাব্য অপরাধ আলোচ্য রিপোর্টে বর্ণিত হয়েছে, তার সব কয়টির জন্য প্রচলিত পৃথক আইন বা পূর্ববর্তী আইনে প্রয়োজনীয় বিধান রয়েছে। নতুন প্রণীত আইনের সর্বাধিক বিতর্কিত বিষয় হলো, বিলের ১৪ দফার দ্বিতীয় লাইনে উল্লিখিত ‘জঙ্গিবাদ’ শব্দটির আগে ‘সংবিধান এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে বিদ্বেষমূলক ও অশালীন কোনো মন্তব্য বা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড’ বিষয়াবলি সন্নিবেশিত করা। উল্লেখ্য, রাষ্ট্রবিরোধী আইন বহু যুগ আগে থেকেই বিদ্যমান আইনে রয়েছে। এ নিয়ে অনেক মামলাও হয়েছে। নতুন বিষয় হলো, সংবিধান ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। সব দেশেই সংবিধান নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা হয় এবং জনমতের দাবিতেই সংবিধান প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হয়। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিচার বিভাগই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। বিচার বিভাগ নিয়ে অবমাননামূলক কার্যক্রমের বিরুদ্ধে আইন রয়েছে। মামলাও হচ্ছে, শাস্তিও হচ্ছে। অন্য প্রতিষ্ঠান হলো—এক. নির্বাচন কমিশন এবং দুই. পাবলিক সার্ভিস কমিশন। এগুলোর দোষত্রুটি কম নয়। এ নিয়ে বক্তব্য দেওয়া যাবে না কেন? বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের প্রতিকারও অন্য আইনে রয়েছে।

 

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা


মন্তব্য