kalerkantho


বািংলাদেশ-চীন সম্পর্ক উত্তরোত্তর আরো গভীর হবে

জাং শিয়াও

১৬ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



বািংলাদেশ-চীন সম্পর্ক উত্তরোত্তর আরো গভীর হবে

চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফর নানা কারণেই তাত্পর্যবহ। চীনা প্রেসিডেন্টের এই রাষ্ট্রীয় সফর ঐতিহাসিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ।

সর্বশেষ ১৯৮৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট লি জিয়ানিয়ান বাংলাদেশ সফরে গিয়েছিলেন। এরপর কেটে গেছে তিন দশক। চীনের আর কোনো প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশে যাননি। তাই শি চিনপিংয়ের এই সফর নিয়ে বাংলাদেশে তো বটেই, চীনের তরফেও অনেক প্রত্যাশা কাজ করে।

চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক বরাবরই সৌহার্দ্যের, বন্ধুত্বের। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দুই দেশের নেতারা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সুবাদে পরস্পরের আরো কাছাকাছি আসার সুযোগ পান। ২০১৪ সালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথকভাবে চীন সফর করেন; একজন নভেম্বরে, অন্যজন জুনে। পৃথক এই সফরের কর্মসূচির অংশ হিসেবে তাঁরা চীনা প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। দুই দেশের নেতারাই পরস্পরকে আশ্বস্ত করেন, চীন ও বাংলাদেশের সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ করার অবকাশ রয়েছে এবং তার প্রয়োজনও আছে।

কারণ এই ঘনিষ্ঠতার সুবাদে, সহযোগিতার সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় সম্ভাবনার নতুন নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে। ২০১৫ সাল অর্থাৎ গত বছর চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট লিউ ইয়ানডং সরকারি সফরে বাংলাদেশে যান। তাঁর এই সফরকালীন কর্মসূচির কল্যাণে দুই দেশের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক আগের চেয়েও জোরদার হয়।

শি চিনপিংও আগে বাংলাদেশ সফর করেছেন। তবে তাঁর ওই সফর ছিল ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে, ২০১০ সালে। এবার প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর সফর চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ককে যে নতুন স্তরে উন্নীত করবে—এ নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।

চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার দেশ। এদিক থেকে হিসাব করলে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ চীনের তৃতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ দিনে দিনে বাড়ছে। বিভিন্ন চীনা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের বিভিন্ন অবকাঠামোগত প্রকল্প বাস্তবায়নে অবদান রাখছে। তাই চীনের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরের পর বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরো জোরদার যে হবে তা বলাই বাহুল্য। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন আরো বেগবান করার লক্ষ্যে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেন বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তাও অস্বীকার করা যাবে না।

চীনা প্রেসিডেন্টের সফরকালে শুক্রবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দুই নেতার উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ২৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়; যার ১৫টি সমঝোতা স্মারক, ১২টি ঋণ ও রূপরেখা চুক্তি। এ ছাড়া চীনের অর্থায়নে ছয়টি প্রকল্পের ফলক উন্মোচন করেন তাঁরা। এগুলো হলো কর্ণফুলী নদীর বহুমুখী টানেল, খুলনা ও চট্টগ্রামে ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি বিদ্যুেকন্দ্র, ন্যাশনাল ডাটা সেন্টার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট ও শাহজালাল সার কারখানা। এর ফলে বাংলাদেশের আরো অনেক মানুষের জন্য নতুন নতুন কর্মসংস্থানেরও সুযোগ তৈরি হবে।

ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় বাংলাদেশ চমৎকার স্থানে রয়েছে। এর একদিকে বঙ্গোপসাগর। এ ছাড়া ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে দেশটির রয়েছে সীমান্তের ভাগাভাগি। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ চীনের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী দেশই শুধু নয়, বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডরেরও অন্যতম অংশ। চীন তাদের সমসাময়িক পররাষ্ট্রনীতির আলোকে এই অঞ্চলের দেশগুলোয় বিনিয়োগ বাড়াতে চাইছে। বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলে এই দেশগুলোর মধ্যে ভৌত অবকাঠামোগত যোগাযোগ যেমন আগের তুলনায় সহজ হবে, তেমনি তৈরি হবে সহযোগিতার নতুন নতুন সম্ভাবনা।

চীন বড় অর্থনীতির দেশ, সেই তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান অনেক অনেক পেছনে। তার পরও বাংলাদেশকে অবহেলা করার কোনো অবকাশ নেই। বরং আমাদের স্বীকার করতেই হবে যে শিল্প খাতে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ফলে চীনেরও অনেক লাভ হচ্ছে, বাংলাদেশের যে হচ্ছে তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশ জনসম্পদে সমৃদ্ধ এক দেশ। তাই আশা করা যায়, চীনের শ্রমঘন শিল্পগুলোর অংশবিশেষ ভবিষ্যতে বাংলাদেশে স্থানান্তরিত হবে।

বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলে চায়না অর্থনৈতিক শিল্প পার্ক গঠন করার লক্ষ্যে চলতি বছরের জুন মাসে দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। তার কয়েক মাসের মধ্যেই চীনা প্রেসিডেন্টের এই বাংলাদেশ সফর। শি চিনপিংয়ের সফরকালে দুই ডজনেরও বেশি চুক্তি ও সমঝোতা প্রকল্প স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা জানা গেছে। আশা করা যায়, অদূর ভবিষ্যতেও আরো চীনা বিনিয়োগ বাংলাদেশে প্রবেশ করবে। অবকাঠামো উন্নয়ন ও উৎপাদনে চীনের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অন্যদের কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ আগে থেকেই সড়ক যোগাযোগসহ বিভিন্ন খাতে চীনা প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের সদ্ব্যবহার করছে, নিঃসন্দেহে ভবিষ্যতে তা আরো বাড়বে।

চীন ও বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে সম্পর্ক বরাবরই সৌহার্দ্যের। চীনা প্রেসিডেন্টের এই সফর দুই দেশকে আরো কাছাকাছি আসার সুযোগ করে দিয়েছে। পারস্পরিক আস্থা ও বোঝাপড়া এখন আরো বাড়বে। দুই দেশেই সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নতুন নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।

এ ছাড়া বাংলাদেশি তরুণ-তরুণীদের মধ্যে চীনা ভাষা শেখার আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে। তাদের অনেকে উচ্চশিক্ষার জন্য চীন আসছে বা আসার পরিকল্পনা করছে। এভাবেও বাংলাদেশের মানুষ সত্যিকারের চীনকে জানা ও বোঝার সুযোগ পাচ্ছে। চীন অর্থনীতিতে এগিয়েছে। এই অগ্রসরমাণতা তাদের দায়িত্বও বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ উন্নয়নের সুফলের ভাগ অন্যদেরও দিতে হয়। আর এই সুযোগই বাড়িয়ে দিয়েছে চীনা প্রেসিডেন্টের সফর।

এ ছাড়া এই অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ক স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করা গেলে ইউরোপ-এশিয়ার সংযোগ স্থাপনের কাজটিও চীনের জন্য সহজতর হবে। চীনের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চার ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। তবে রপ্তানিনির্ভর দেশ হিসেবে নিজেদের অস্তিত্ব ধরে রাখার কাজটি আগামী দিনগুলোয় সহজ নাও থাকতে পারে। অনেকে চীনে এসে পুঁজি খাটিয়ে চীনা পণ্য বহির্বিশ্বে বিক্রি করছে। তবে চীনে শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় তাদের অনেকেই এখন উদ্বিগ্ন। ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, এমনকি ভারতের মতো দেশেও তারা নিজেদের বিনিয়োগ সরিয়ে নেওয়ার উপায় খুঁজে বেড়াচ্ছে।

চীনের ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ গঠন ও বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার করিডর স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি সামনে রাখলে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট শির এই সফর ইতিহাসের অন্যতম মাইলফলক হয়ে থাকবে। এখানে প্রেসিডেন্টের একটি বক্তব্য আমি উদ্ধৃত করতে চাই। তিনি ২০১৫ সালে বলেছিলেন, ‘চায়না অ্যান্ড বাংলাদেশ হ্যাভ নাথিং বাট ফ্রেন্ডশিপ, ট্রাস্ট অ্যান্ড কো-অপারেশন’। এবার চীনা প্রেসিডেন্ট নিজে বাংলাদেশ সফর করে বন্ধুত্ব, বিশ্বাস ও সহযোগিতার এই বন্ধনকে আরো বলিষ্ঠ করলেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, ভবিষ্যতেও চীন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরো উন্নত করার লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসবে।

 

লেখক : পেইচিংয়ের কমিউনিকেশন ইউনিভার্সিটি অব চায়নায় বেঙ্গলি স্টাডিজ বিষয়ের প্রভাষক। মিস জাং শিয়াও এর আগে কমিউনিকেশন ইউনিভার্সিটি অব চায়না ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর ডিগ্রি নেন। তাঁর ইংরেজিতে লেখা নিবন্ধটি প্রকাশ করেছে চীনের ওয়েবসাইট গ্লোবালটাইমসডটসিএন

 


মন্তব্য