kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


নতুন উচ্চতায় চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক

ফরিদুল আলম

১৫ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



নতুন উচ্চতায় চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক

প্রায় তিন দশক পর বর্তমান বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ সফরে এসেছেন। ঢাকায় পৌঁছেই প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করলেন।

দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাসে এই প্রথম বিশাল অঙ্কের অর্থনৈতিক সহায়তার পাশাপাশি স্বাক্ষরিত হলো এতগুলো চুক্তি এবং সমঝোতা স্মারক। এই অঞ্চলের দুটি বৃহৎ অথচ রাজনৈতিক আদর্শের দিক দিয়ে পরস্পর বিপরীতমুখী শক্তি চীন ও ভারতের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা যেকোনো দেশের জন্যই কঠিন বিষয়। সেদিক দিয়ে সবচেয়ে আশার কথা হচ্ছে, বর্তমানে চিরবৈরী দুটি দেশ ভারত ও চীন পারস্পরিক অর্থনৈতিক স্বার্থের দিক দিয়ে একই মেরুতে অবস্থান করছে এবং চীন তার ঙহব Belt, One Road বা ওবোর নীতির অধীনে বর্তমানে ৬০টির বেশি দেশের সঙ্গে পারস্পরিক অর্থনৈতিক স্বার্থে যুক্ত থাকলেও এ কথা নিঃসন্দেহে ধারণা করা যায় যে প্রতিবেশীদের মধ্যে তাদের সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার ভারত ও বাংলাদেশ। এর মূল কারণ দুটি—দেশ দুটির বর্তমান রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রেক্ষাপটে চমৎকার বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং BCIM-EC (বাংলাদেশ, চীন, ভারত, মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর)-এর মাধ্যমে এই অঞ্চলের ভূ-কৌশলগত সুযোগ কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক পরিসরে তার অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক প্রভাবকে বৃদ্ধি করা। বাংলাদেশের জন্য সুখের বিষয় হচ্ছে, এ ক্ষেত্রে ভারত-চীন নিজেদের মধ্যকার ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব নিজেরাই একরকম মিটিয়ে নিয়েছে। ১৯৬২ সালে চীন-ভারত সীমান্ত যুদ্ধের পর নব্বইয়ের দশক থেকে দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কের উন্নতির ধারা শুরু হলেও এর সবচেয়ে ইতিবাচক দিকটি ফুটে উঠেছে ভারতে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে। নরেন্দ্র মোদি দায়িত্ব গ্রহণের তিন মাসের মধ্যে চীনের প্রেসিডেন্ট শি ভারত সফর করেন এবং এর আট মাসের মধ্যে মোদির পাল্টা চীন সফরের মধ্য দিয়ে তাঁদের সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে। তাতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির পূর্বমুখী নীতি সম্প্রসারণের জন্যও নবদিগন্তের সূচনা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট শির এই সফরের মধ্য দিয়ে চীনের পক্ষ থেকে ওবোরে বাংলাদেশকে যুক্ত করার আগ্রহের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন কার্যত বাংলাদেশকে চীনের আরো নৈকট্য লাভে সহায়তা করবে। এর ফলে সিল্ক রোড ফান্ড (ওবোরে যুক্ত দেশগুলোর জন্য চীনের সরকারি বিনিয়োগ তহবিল) থেকে স্বল্প সুদে বাংলাদেশ ঋণ পাওয়ার পাশাপাশি চীনের কৌশলগত এশীয়, ইউরোপীয় ও আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ স্বার্থ সংরক্ষণে পররাষ্ট্রনীতিকে আরো ঢেলে সাজাতে পারবে। চীনা প্রেসিডেন্টের এই সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের গুরুত্ব নতুনভাবে উঠে এসেছে।

শি চিনপিংয়ের সফর শুরুর আগের দিন দেশটির উচ্চপর্যায়ের একটি বেসরকারি প্রতিনিধিদল ঢাকায় আসে এবং Chinese Council for Promotion of International Trade (CCPIT)-এর অধীনে ওই দিন বেসরকারি পর্যায়ে বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগের অংশ হিসেবে এফবিসিসিআইয়ের সঙ্গে ১৮৬ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা বাংলাদেশে কোনো দেশের সর্বোচ্চ পরিমাণ বৈদেশিক বিনিয়োগ। এর মাধ্যমে কেবল সরকারি পর্যায়ে নয়, বেসরকারি পর্যায়কে এ ধরনের সহযোগিতায় যুক্ত করার মাধ্যমে চীন বাংলাদেশের সঙ্গে এক ব্যাপক সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রতিষ্ঠা করল। শির সফরের আগের দিন গণভবনে চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এই সফর দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগসহ অন্যান্য খাতে নিবিড় সহযোগিতার নতুন যুগের সূচনা করবে। অন্যদিকে ঢাকায় পৌঁছে চীনের প্রেসিডেন্ট এক বিবৃতিতে বলেছেন, বাংলাদেশকে তাঁর দেশ দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এক গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার মনে করে। বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দুই নেতার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তাতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নানা দিক আলোচিত হয়। উভয় পক্ষ এই বৈঠককে অত্যন্ত ফলপ্রসূ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এরপর দুই নেতার উপস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে দুই ডজনেরও বেশি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়।

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতার যে ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে তার বাস্তবায়ন বহুলাংশেই নির্ভর করে ভারত-চীন সম্পর্কোন্নয়নের ওপর। দেশ দুটি এখন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নয়ন ছাড়াও BCIM-EC, BRICS এবং চীনের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত Asian International Investment Bank (AIIB)-এর সদস্য। বাংলাদেশও এআইআইবির সদস্য হয়েছে, যার বেশির ভাগ অর্থের জোগান হয়েছে চীন সরকারের তরফ থেকে। এর মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার দেশসহ বিশ্বব্যাপী উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে চীনের নিবিড়ভাবে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা, অবকাঠামো খাত, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থা, রেল যোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি, সামুদ্রিক অর্থনীতি এবং সন্ত্রাসবাদ দমনে পারস্পরিক সহযোগিতা। এগুলো যতটুকু চীনকে লাভবান করবে, নিঃসন্দেহে তার চেয়ে অনেক বেশি লাভবান করবে বাংলাদেশকে। এখানে চীনের স্বার্থ একটাই, আর সেটা হচ্ছে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সক্ষম করে তোলা, যার মধ্য দিয়ে পাশ্চাত্যের বৈষম্যমূলক রাজনীতি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তে একটি পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। দেশটি রাজনৈতিকভাবে কমিউনিস্ট ভাবধারার হলেও অর্থনৈতিক উদারীকরণের এই সময়ে এসে পাশ্চাত্যের দেশগুলোকে চোখে আঙুল দিয়ে তাদের স্বার্থান্বেষী উদারীকরণ নীতিগুলো তুলে ধরে সত্যিকারার্থে কিভাবে একটি পারস্পরিক অংশগ্রহণমূলক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা যায় সেই চেষ্টায় নিয়োজিত রয়েছে। এতে পাশ্চাত্যের অনেক দেশের চক্ষুশূল হলেও চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক শক্তি তাকে সবার কাছে অপরিহার্য করে তুলেছে। আর এর সুফল আসতে শুরু করেছে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে।

স্বাধীনতার পর দুই দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু হতে সময় নিলেও যখন থেকে এই সম্পর্কের সূচনা হয় তার পর থেকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। বাংলাদেশ সরকার জিয়াউর রহমানের সময় থেকে চীনকে কেন্দ্র করে পূর্বমুখী কূটনৈতিক ধারার সূচনা করলেও নানা ধরনের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় এর সাফল্য লাভ সম্ভব হয়নি। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকেই মূলত পূর্বমুখী কূটনীতি একটি নতুন ধারার দিকে অগ্রসর হয়। প্রধানমন্ত্রী চীনের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন ধারা সৃষ্টির অংশ হিসেবে ২০১০ সালের মার্চে দেশটি সফর করেন এবং সেই সময় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কোন্নয়নের মূল ক্ষেত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এ ক্ষেত্রে মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্র বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে বিশাল সমুদ্রসম্পদ লাভের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের প্রভাব সমুদ্র অর্থনীতি তথা সামুদ্রিক সম্পদ এবং পণ্য পরিবহনে বাংলাদেশকে এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। সেই সঙ্গে চীন তার ওবোর নীতির মাধ্যমে তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থাপনাকে বিশ্বব্যাপী সম্প্রসারণের যে পদক্ষেপ নিয়েছে এই অঞ্চলের (BCIM-EC) মাধ্যমে তার সফল বাস্তবায়ন করতে গেলে বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে সেটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাই এখানে চীন তার নিজের স্বার্থেই আমাদের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের যে প্রচেষ্টা নেবে, এর মধ্য দিয়ে দরকষাকষির মাধ্যমে প্রকৃতভাবে আমাদের অনেক লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে। একইভাবে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি দূর করার বিষয়ে আমাদের সক্ষমতা এ ক্ষেত্রে কাজে আসতে পারে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, যেখানে চীনের কুনমিং থেকে পেইচিংয়ের বিমানপথের দূরত্ব চার ঘণ্টা, সেখানে কুনমিং থেকে মাত্র দুই ঘণ্টায় চট্টগ্রামে আসা যায়, যা চীন-বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত-চীন, ভারত-মিয়ানমার এবং বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ককে আরো ঘনিষ্ঠ করবে, যার মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলে একটি কার্যকর আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব এবং এর মধ্য দিয়ে বিশ্বরাজনীতির একটি নতুন মেরুকরণেরও সম্ভাবনা থেকে যায়।

পরিশেষে ঐতিহাসিকভাবে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের সূচনা দুই হাজার বছরেরও আগের। দুই দেশের মানুষের মধ্যকার যোগাযোগের ইতিহাস অনেক প্রাচীন হলেও উন্নয়নের ক্ষেত্রে পারস্পরিক নৈকট্য তেমনটা ঘটেনি। অবশ্য চীন বরাবরই বাংলাদেশের উন্নয়নে তাদের সহায়তার হাতকে প্রসারিত করেছে। এবার আরো বেশি ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়নে চীনের এই এগিয়ে আসার একটাই উদ্দেশ্য—বাংলাদেশ এখন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে অনেক স্থিতিশীল এবং এ দেশে চীনের বিনিয়োগ আপাতত নিরাপদ। এই বাস্তবতাকে উপলব্ধি করার দায়িত্ব আমাদের, আর আমরা যদি তা করতে পারি, তবে আমাদের অফুরন্ত সম্ভাবনার দ্বার একের পর এক উন্মোচিত হতে থাকবে। চীনের প্রেসিডেন্ট আজ সকালে ভারতের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করবেন। ভারতের গোয়ায় আজ শুরু হচ্ছে দুই দিনব্যাপী ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। সেখানে ভারত ও চীন ছাড়াও যোগ দেবেন ব্রাজিল, রাশিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানরা। ব্রিকস উদ্যোগ সফল হলে সেটিও বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে।

 

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

mfulka@yahoo.com


মন্তব্য