kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মনের কোণে হীরে-মুক্তো

আপন প্রাণ আপন ঘ্রাণ ষাটের ঢাকার খোশ বয়ান

ড. সা’দত হুসাইন

১৫ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



আপন প্রাণ আপন ঘ্রাণ ষাটের ঢাকার খোশ বয়ান

কবি শহীদ কাদরীর স্মৃতিচারণা করেছেন দেশের প্রথিতযশা কবি-সাহিত্যিকরা। বেশির ভাগ লেখক ‘বিউটি বোর্ডিংয়ের জম্পেশ আড্ডার সঙ্গে ষাটের দশকের ঢাকার হৃদয়গ্রাহী ছবি এঁকেছেন।

স্মৃতিজাগানিয়া এসব লেখা পড়ে আমিও নিজের অজান্তে পৌঁছে গিয়েছিলাম ষাটের ঢাকায়। মনে হয়েছে সেটি ছিল একটি আলাদা জগৎ, আজকের ঢাকার সঙ্গে যার কোনো মিল নেই। স্মৃতিচারণাকারী লেখকদের মূল উপজীব্য ছিল শহীদ কাদরী : তাঁর জীবন, কর্মকাণ্ড এবং সৃষ্টি। এর ফাঁকে ফাঁকে উঠে এসেছে ঢাকার খণ্ডিত চিত্র। এই চিত্রগুলো রোমান্টিক, আবেগ আচ্ছাদিত, যা তখনকার ঢাকা ও আমাদের ছাত্রজীবনের স্মৃতি রোমন্থনের আগ্রহ প্রবলভাবে জাগিয়ে দেয়। আমি ষাটের দশকের একেবারে প্রথম থেকে শুরু করছি।

নোয়াখালী জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করায় বন্ধুবান্ধব ও মুরব্বিদের অনেকেই বুদ্ধি দিয়েছিলেন আমি যেন ঢাকা কলেজে ভর্তি হই। এর আগে খোকন (ইঞ্জিনিয়ার ফজলুল আজিম) ছাড়া আমাদের পাড়া, লইয়ার্স কলোনির কেউ ঢাকা কলেজে পড়াশোনা করেনি। আমার বড় ভাই ও পাড়ার অগ্রজ ছাত্ররা স্কুলের পড়া শেষ করে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়াশোনা করেছে। ঢাকায় আজিমের ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন ছিল, আমার নিকট আত্মীয় ঢাকায় ছিল না। বাবার হাত ধরে আমি কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য ১৯৬১ সালে ঢাকায় এলাম। বাবার শরীরের অবস্থা ভালো ছিল না। তিনি লিভারের রোগী ছিলেন, তাঁকে দেখলেই খুব অসুস্থ মনে হতো। এত অসুস্থ বাবা বিরাট একটা ঝুঁকি নিয়ে আমার কলেজে ভর্তির জন্য ঢাকায় এসেছিলেন। হয়তো আমার পরীক্ষার ফল তাঁকে পরম উত্ফুল্ল করেছিল, যদিও আমাদের পরিবারের রীতি অনুযায়ী এর কোনো বাহ্যিক প্রকাশ ছিল না। আমাকে নিয়ে বাবা রায় সাহেব বাজার (রাইস্যা বাজার) এলাকায় মাওলানা রুহুল আমিন নামে এক ভদ্রলোকের বাসায় উঠেছিলেন। এক কিংবা দুই দিন আমরা সে বাসায়  ছিলাম, খাওয়াদাওয়া বাইরে করেছি।

ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়ে বাবার সঙ্গে নোয়াখালী ফিরে এলাম। এর সপ্তাহদুয়েক পর একা ঢাকায় এসে কলেজের সাউথ হোস্টেলে উঠলাম। নিচতলার একটি কক্ষে আমার সিট। রুম নম্বর, যত দূর মনে পড়ে, ৩০৪। সুবোধ বালকের মতো ক্লাসে যাওয়া-আসা করি। মন দিয়ে পড়াশোনা করি। আমার ঘুরে বেড়ানোর জায়গা নিউ মার্কেট, এলিফ্যান্ট রোড, বর্তমান মিরপুর রোডের পূর্ব পাশের দোকানপাট। এলিফ্যান্ট রোডের অনেক জায়গা তখনো ফাঁকা। কাঁচাঘরে ছোট ছোট হোটেল, রান্না করা বড় বড় চিংড়ি সাজিয়ে রাখা হতো। নিউ মার্কেটের গোল অংশটি ছিল পাকা, এর উত্তর পাশের বিস্তীর্ণ জায়গাজুড়ে কাঁচাবাজার। দোকানগুলো সব টিনের। তবে বেশ উঁচু কাঠামোর। ঢাকা কলেজের সাউথ হোস্টেল থেকে নিউ মার্কেট যাওয়ার পথ পুরো বস্তিঘরে ভর্তি। একটি বা দুটি ছোট এক তলা বাড়ি ছিল। বাকি সব বাঁশ-টিনের ঘর। বর্ষাকালে রাস্তা কাদাজলে ভরে থাকত। এর মধ্যেই খুব সাবধানে কষ্ট করে আমরা হেঁটে নিউ মার্কেট যেতাম। বিকেল-সন্ধ্যায় কমনরুমে ক্যারাম খেলে, খবরের কাগজ পড়ে আমাদের সময় কাটত। বাইরে যোগাযোগের মূল জায়গা ছিল পলাশীস্থ ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি হোস্টেল। আজিম সেখানে থাকত। তার সঙ্গে একদিন সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে (এসএম হল) গিয়েছিলাম, তৌফিক-ই-এলাহীর (বর্তমান জ্বালানি উপদেষ্টা) কাছে। তার কাছ থেকে পুরনো বই কেনার জন্য। বই কিনে সাউথ হোস্টেলে ফিরে এসেছিলাম। হোস্টেলে আরো কয়েকজন নামকরা মেধাবী ছাত্রের সঙ্গে বকশীবাজারে (জয়নাগ রোড) অবস্থিত ‘ইস্ট পাকিস্তান সেকেন্ডারি এডুকেশন বোর্ডে’ গিয়েছিলাম, ইতিহাস ও অঙ্কে সারা দেশে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ার কারণে প্রদত্ত পুরস্কার সংগ্রহের জন্য। এখানে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আমার সতীর্থদের মধ্যে সর্বোচ্চ মেধাবী ছাত্রদের সঙ্গে সেদিন দেখা হয়েছিল। দু-একজনের সঙ্গে সে পরিচয় পরবর্তীকালে গভীর হয়েছিল।

এদিক-ওদিক ঘোরাফেরা না করে মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করে ১৯৬১ সাল কাটিয়ে দিয়েছিলাম। ১৯৬২ সাল থেকে বছরভিত্তিক বোর্ড ফাইনাল পরীক্ষা প্রচলিত হয়। আমি প্রথম বছরের ফাইনাল পরীক্ষায় খুব ভালো ফল করে হোস্টেল-কলেজে সবার বিশেষ সুদৃষ্টিতে চলে এলাম। এ সময় শুরু হলো শিক্ষা আন্দোলন (১৯৬২)। কলেজে মাঝেমধ্যেই ধর্মঘট চলে; ক্লাস বন্ধ থাকে। এ সুযোগে হোস্টেলের চৌহদ্দি পেরিয়ে এক অগ্রজ সতীর্থের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় হাজির হলাম। প্রথম দিকে শুধু মিটিংয়ের বক্তৃতা শুনে হোস্টেলে ফিরে আসতাম। কয়েক দিন পর মিছিলে যাওয়া শুরু করলাম। এভাবেই ঢাকার পথঘাট চেনা শুরু হলো। মিছিলটি আমতলা থেকে বের হয়ে রেলওয়ে হাসপাতালের সামনে দিয়ে গুলিস্তান যেত। এরপর নবাবপুর, বংশাল, বাহাদুর শাহ পার্ক, পাটুয়াটুলী দিয়ে সেন্ট্রাল জেল, নাজিমুদ্দিন রোড ও চানখাঁরপুল হয়ে আমতলায় ফিরে আসত। বক্তৃতা দেওয়া নেতারা হাততালি দিয়ে আমাদের অভ্যর্থনা জানাতেন। আমাদের আনন্দের সীমা থাকত না। শোভাযাত্রার মাধ্যমে ঢাকার পথঘাট চিনতে শুরু করলাম। আরো চিনলাম সিনেমা হল। কলেজের প্রথম বছরে ভয় ছিল সিনেমা দেখতে গেলে অনেক সময় নষ্ট হবে, পড়াশোনার ব্যাঘাত ঘটবে, পরীক্ষার ফল ভালো হবে না। প্রথম বর্ষের ফল অতিমাত্রায় ভালো হওয়ায় সে ভয় কেটে গেল। গুলিস্তান, নাজ, নিশাত, সাবিস্তান, রূপমহল, নাগরমহল, মুন সিনেমায় প্রায়ই সিনেমা দেখতে শুরু করলাম। পুরান ঢাকার দোকানপাট, নামকরা ভবনগুলো দেখে আমার বেশ ভালো লাগল। আমার বদ্ধমূল ধারণা হয়েছিল যে যেহেতু প্রথম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষায় আমার ফল খুব ভালো, তাই এখন আমি ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতে পারি, বিভিন্ন বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানে যেতে পারি। পড়াশোনা একটু কম হলেও চলবে।

দ্বিতীয় বর্ষের ফল ততটা ভালো না হলেও সামগ্রিক ফল হতাশাব্যঞ্জক হলো না। মেধাতালিকায় প্রথম ১০ জনের মধ্যে আমার স্থান হলো। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হলাম। হল নির্বাচন ও ছাত্ররাজনীতিতে জড়িয়ে পড়লাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্যেক ছাত্রের মূল পরিচয় সংজ্ঞায়িত হয় হলের মাধ্যমে। সে মূলত কোনো হলের ছাত্র, যাবতীয় প্রশাসনিক কাজ হল কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে সম্পন্ন হয়। যেসব ছাত্রছাত্রী হলে বসবাস করে, তারা হলের আবাসিক ছাত্র, যারা নিজ বাসায় বা অন্যত্র থেকে পড়াশোনা করে তারা হলের অনাবাসিক বা সংযুক্ত (Attached) ছাত্র। হল নির্বাচনে এরা সবাই ভোটার। দুই ধরনের ছাত্রছাত্রীই নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারে। ছাত্রসংগঠনের সক্রিয় কর্মী হিসেবে আমাদের দায়িত্ব ছিল ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে থাকা ছাত্রদের বাসায় গিয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা। আমাদের প্রার্থীর পক্ষে ভোট চাওয়া।

সংযুক্ত ছাত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করতে গিয়ে সারা ঢাকা আমাদের চষে বেড়াতে হয়েছে। আমরা গাড়ি ব্যবহার করিনি, পুরো যোগাযোগ রিকশায় করতে হয়েছে। ঢাকা শহরের যে পরিধি ছিল তাতে যোগাযোগের জন্য রিকশাই যথেষ্ট ছিল। যোগাযোগের ক্ষেত্রে দক্ষিণের সীমা ছিল সদরঘাট, ইসলামপুর, লালবাগ, রোকনপুর, নর্থ ব্রুক হল রোড, হৃষিকেশ দাস লেনসহ পুরান ঢাকা। পুবের সীমানা ছিল গোপীবাগ, রামকৃষ্ণ মিশন রোড, শাহজাহানপুর, মালিবাগ, শান্তিবাগ, কমলাপুর, খিলগাঁও ইত্যাদি। উত্তরের ঢাকা আমাদের কাছে সীমাবদ্ধ ছিল মগবাজার হয়ে তেজগাঁও এয়ারপোর্ট পর্যন্ত। তেজগাঁও শিল্প এলাকাও আমাদের দৃষ্টিতে ঢাকার চৌহদ্দির বাইরে ছিল। কারওয়ান বাজার, তেজতুরী বাজার, মনিপুরীপাড়া অবশ্য ঢাকা শহরের অন্তর্ভুক্ত মনে করতাম। ধানমণ্ডি আবাসিক এলাকা ও এর সামান্য আশপাশের এলাকা যেমন ঝিকাতলা, মধুবাগ, রায়েরবাজার ইত্যাদি ছিল সাধারণ নাগরিকদের কাছে ঢাকার পশ্চিম সীমা। মিরপুর, মোহাম্মদপুর, কামরাঙ্গীরচর, যাত্রাবাড়ী, মাতুয়াইল, গুলশান, কচুক্ষেত, ইব্রাহিমপুর সাধারণ নাগরিকদের কাছে ঢাকার সংলগ্ন এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল।

উপর্যুক্ত যে এলাকাগুলো সাধারণ মানুষের চোখে ঢাকা শহরের অন্তর্ভুক্ত ছিল সে জায়গাগুলোর বৈশিষ্ট্য ও জনজীবন সম্পর্কে আলোচনা সীমিত রাখছি। ষাটের ঢাকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় যে জায়গাটির নাম প্রথমেই বলতে হয় তা হলো নিউ মার্কেট। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা—সবাই এখানে ভিড় জমাত। ছিমছাম দোকানপাট বৃত্তাকারে সাজানো। দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় প্রায় সব জিনিস পাওয়া যেত অনায়াসে। পাশে কাঁচাবাজার। তখনো সেখানে পাকা ভবন হয়নি। গোলবৃত্তের দ্বিতীয় অংশেও কোনো দোকানপাট হয়নি। এটি ছিল একটি ফাঁকা জায়গা। নিউ মার্কেটের ভেতরটা একবারে যানমুক্ত, মানুষ নির্বিঘ্নে হাঁটাচলা করতে পারত। ক্রেতা-বিক্রেতার সমাগমে নিউ মার্কেট সারা দিন সরগরম থাকত। ঢাকা শহরের এমন কোনো লোক বোধ হয় নেই যে নিউ মার্কেটে আসেনি। কোনো লোক যদি বলত, ‘আপনাকে কোথায় যেন দেখেছি?’ তাহলে কোনো চিন্তা না করে মুহূর্তেই উত্তর দিতে পারতেন, ‘আর কোথাও না হলে নিশ্চয় নিউ মার্কেটে দেখেছেন। ’ কথাটি বোধ হয় মিথ্যা ছিল না।

ঢাকায় তখন সুনির্দিষ্ট সিটি সেন্টার ছিল না। গুলিস্তানকে সিটি সেন্টার বলা হলেও আসলে সিটি সেন্টার হিসেবে এর প্রাসঙ্গিকতা ছিল না। পুরো ঢাকা শহর এক অর্থে ছিল আমাদের হাতের মুঠোয়। সকাল-বিকেল রিকশায় ‘এটাস্ড কন্টাক্ট’ করলে এক দিনে প্রায় আধা ঢাকা শেষ হয়ে যেত। ট্রাফিক জ্যাম বলে কিছু ছিল না, বড়জোর তিন দিনে আমরা পুরো ঢাকা ঘুরে হলের অনাবাসিক ছাত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ পর্ব শেষ করে ফেলতাম। এক মাথা থেকে আরেক মাথায় যেতে ৪০-৪৫ মিনিটের বেশি সময় লাগত না। এসএম হল থেকে মালিবাগ, পুরানা পল্টন, সেগুনবাগিচা, রামকৃষ্ণ মিশন রোড, হাটখোলা, সদরঘাট, শেখ সাহেব বাজার, আজিমপুর, ধানমণ্ডি, তেজতুরী বাজার কিংবা ইস্কাটনে কোনো আত্মীয় বা বন্ধুবান্ধবের বাসায় যাওয়ার আগে একবারও চিন্তা করিনি সেখানে যেতে কত সময় লাগবে। এক বেলা রিকশা নিয়ে ঘুরলে তিন-চারটা জায়গায় বেশ কিছু কাজ শেষ করে ফিরে আসা যেত। এখন গাড়ি নিয়েও দিনে এক জায়গার বেশি যাওয়া যায় না। গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, হোটেল, মন্ত্রিপাড়া, সেন্ট্রাল ঢাকায় অবস্থিত ছিল। আমরা অবশ্য এগুলোয় তেমন যাওয়া-আসা করতাম না।

পুরান ঢাকায় আমাদের যাতায়াত অনেক বেশি ছিল। এসএম হল থেকে ১০ আনা (বর্তমানের ৬৫ পয়সা) ভাড়ায় রিকশা নিয়ে আমরা দুই বন্ধু, কখনো তিন বন্ধু, নাজিমুদ্দিন রোড, সেন্ট্রাল জেল, শরত্গুপ্ত রোড ধরে মৌলভীবাজার, পাটুয়াটুলী চলে যেতাম। ঘুরে ঘুরে ছোট ছোট কেনাকাটা করতাম, হেঁটে হেঁটে কখনো রথখোলা, কখনো শাঁখারীপট্টি চলে যেতাম। এরপর ইসলামপুরে সাইনু পাহলোয়ানের দোকানে মোরগ পোলাও অথবা জনসন রোডের মাথায় দিল্লি মুসলিম হোটেলে মোগলাই খেয়ে আবার হলে ফিরে আসতাম। মাঝেমধ্যে রাত ৯টা-১০টার দিকে শুধু মোরগ পোলাও খাওয়ার জন্য বেশ কয়েকটি রিকশা নিয়ে দলেবলে সাইনু পাহলোয়ানের দোকানে যেতাম। পুরান ঢাকার সঙ্গে সেন্ট্রাল ঢাকার হল-হোস্টেলের সম্পর্ক ছিল এতই নিবিড়। আজকাল পুরান ঢাকা আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে গেছে। গড়ে উঠেছে উত্তরা, নিকুঞ্জ, বসুন্ধরা, বারিধারা, গুলশান, বনানী, নিকেতন নিয়ে উত্তর ঢাকা। ষাটের দশকে গুলশান-বনানী ছাড়া অন্য এলাকাগুলোর অস্তিত্ব ছিল না। গুলশান-বনানীরও তেমন গুরুত্ব ছিল না। এখন ভয়াবহ ট্রাফিক জ্যামের কারণে অবস্থা এমন হয়েছে যে বিয়ে, জানাজা বা কুলখানির অনুষ্ঠান ছাড়া উত্তর ঢাকার বাসিন্দারা ধানমণ্ডি, মোহাম্মদপুর যেতে চায় না। ধানমণ্ডির বাসিন্দারাও উত্তর ঢাকায় আসতে চায় না। এখানে বলা প্রাসঙ্গিক হবে যে ষাটের দশকে মোহাম্মদপুর, মিরপুরেও আমরা যেতাম না। এগুলো বিহারি অধ্যুষিত এলাকা ছিল। আমাদের পরিচিত কোনো বাঙালি এসব এলাকায় বসত গড়েনি। বসতি হিসেবে শ্যামলী, কল্যাণপুর, আগারগাঁওয়ের অস্তিত্ব ছিল না বললেই চলে। ১৯৭০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে লাহোর সিভিল সার্ভিস একাডেমি থেকে ঢাকায় ফিরে এলে আমাদের শেরে বাংলানগরে কেন্দ্রীয় সরকারের একটি গেস্টহাউসে (বর্তমানে প্ল্যানিং কমিশন চত্বর) ওঠানো হয়েছিল। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আমরা নিজ উদ্যোগে সেই গেস্টহাউস ছেড়ে ৪৮ কাকরাইলে প্রভিন্সিয়াল সার্কিট হাউসে চলে আসি।

স্বাধীনতার পর, বিশেষ করে আশির দশক থেকে, ঢাকার আয়তন দ্রুত বেড়েছে। একমাত্র দক্ষিণ ছাড়া সব দিকে শহরের বিস্তৃতি ঘটেছে। সবচেয়ে বেশি বিস্তৃতি ঘটেছে উত্তর দিকে। বলা যায়, ঢাকা এখন পাঁচটি অঞ্চলে বিভক্ত : দক্ষিণ ঢাকা, সেন্ট্রাল ঢাকা : পূর্ব, পশ্চিম এবং উত্তর ঢাকা পূর্ব ও পশ্চিম। দক্ষিণ ঢাকাকে পূর্ব-পশ্চিম দুই ভাগে ভাগ করলে অঞ্চলের সংখ্যা হবে ছয়। শহরের লোকসংখ্যা বেড়েছে অভূতপূর্ব দ্রুতগতিতে। বর্তমানে এ সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। বিস্তৃত শহর সাম্প্রতিককালে নগরে পরিণত হয়েছে। ‘প্রভিন্সিয়াল শহর’ পরিণত হয়েছে ‘কসমোপলিটন মেট্রোপলিসে’, যেখানে নাগরিকরা নৈর্ব্যক্তিক। নিজের কাজে সদাব্যস্ত। নিজের ধান্ধায় নিবেদিতপ্রাণ। এক অঞ্চলে কী হচ্ছে অন্য অঞ্চলের লোক সাধারণভাবে তা বুঝতে পারে না। খবর জানে গণমাধ্যম বা সামাজিক মাধ্যমে। বড়জোর ট্রাফিক জ্যাম দেখে। হঠাৎ ঠাণ্ডা বাতাস গায়ে লাগলে যেমন দূরে চলা ঝড়বৃষ্টির ইঙ্গিত পাওয়া যায়, ট্রাফিক জ্যাম থেকে বোঝা যায়, শহরের কোথাও গণ্ডগোল হয়েছে। আরো অধিক তথ্য পাওয়া যায় টেলিভিশনের স্ক্রলে। উত্তর ঢাকায় বাস করা আমার মতো অনেক লোক আছে, যারা হয়তো ১৫-২০ বছরে পুরান ঢাকা বা দক্ষিণ ঢাকায় যায়নি। আসলে কোর্ট-কাছারিতে কাজ না থাকলে বা লঞ্চ-স্টিমারে ভ্রমণের প্রয়োজন না হলে সেন্ট্রাল বা উত্তর ঢাকার লোক দক্ষিণ ঢাকায় যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করে না।

সত্যি বলতে কি, পাড়া-মহল্লায় একে অপরের বাসায় যাওয়া-আসাও এখন সামাজিক রীতির বাইরে চলে গেছে। সমৃদ্ধি, প্রযুক্তি আর আত্মকেন্দ্রিকতা আমাদের বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত করেছে। ষাটের ঢাকার আন্তরিকতা, একাত্মবোধ, সামষ্টিক সাংস্কৃতিক তৎপরতা হারিয়ে গেছে। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এখন পেশা, আত্ম-তরক্কির হাতিয়ার। আমরা যারা দীর্ঘ সময় ধরে ঢাকায় বাস করছি, ষাটের ঢাকাকে তারা ভয়ানকভাবে ‘মিস’ করি। জানি, ষাটের ঢাকা আর ফিরে আসবে না। তবু প্রশ্ন জাগে, সে ঢাকার মূল সুর, মূল ভাবনাও কি চিরতরে হারিয়ে যাবে?

 

লেখক : সাবেক মন্ত্রিপরিষদসচিব ও পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান


মন্তব্য