kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

এপার-ওপার

কাবেরী বিবাদ

অমিত বসু

১২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



জ্বরে কাহিল জে জয়ললিতা। হাত-পায়ে ব্যথা।

সঙ্গে ডিহাইড্রেশন। অনুরাগীরা দিশাহারা। আম্মার কোনো কষ্ট সইতে পারে না। বাসভবনের সামনে মেডিক্যাল বুলেটিনের প্রতীক্ষা। রোগশয্যায় কাজের বিরাম নেই। মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন, শরীরের তোয়াক্কা না করেই। নিজের রাজ্য তামিলনাড়ুর যেন কোনো ক্ষতি না হয়। উন্নয়ন নয় অধিকার। উৎপাদনশীলতায় রাজ্যটা ভারতের এক নম্বরে। ফালতু রাজনীতির ফাঁদে শ্রমদিবস নষ্ট নয়। বিরোধী দল ডিএমকে হরতাল ডাকলেও সব কল-কারখানায় কাজ। অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ খোলা। হরতালের কারণটা উড়িয়ে দেওয়ার মতো না হলেও সব থামিয়ে প্রতিবাদ জানানোটা মানতে পারেন না জয়ললিতা। পাশের রাজ্য কর্ণাটক কিছুতেই কাবেরীর জল দেবে না। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশেও অনড়। চাষের  হাহাকারেও নীরব। জয়ললিতার আরজি ছিল, তোমরাও নাও, আমাদেরও দাও। নদীটা যখন দুই রাজ্যে বইছে, ভাগাভাগিটা সমান হলেই ভালো। যদি একটু কম দাও, তাও চলতে পারে। তাই বলে একেবারে দেবে না, সেটা কী করে হয়। এটা তো জুলুম। কর্ণাটক শোনেনি সে কথা। সে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধিরামাইয়া আরো এক ধাপ এগিয়ে, বিধানসভার বিশেষ অধিবেশন ডেকে, শাসক-বিরোধী সদস্যদের দিয়ে না-টা অনুমোদন করিয়েছেন। সব বিধায়ক এক বাক্যে বলেছেন, না, আমরা তামিলনাড়ুকে এক ফোঁটা জল দেব না। কাবেরী আমাদের হৃদয়। হৃদয় ছিঁড়ে দেওয়ার মতো উদার আমরা নই।

জল না দেওয়ার সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক মাত্রা দিতে কর্ণাটকও হরতাল ডেকেছে। তামিলনাড়ুর মতো সে হরতাল শান্তিপূর্ণ হয়নি। রাস্তায় রাস্তায় আগুন জ্বলেছে। যানবাহন পুড়েছে। সরকারি ক্ষতি বেড়েছে। চুপ থেকেছেন মুখ্যমন্ত্রী। যারা বিশৃঙ্খলার জন্য দায়ী, তাদের শাস্তিও দেওয়া হয়নি। নৈরাজ্য সৃষ্টিতে শাসক-বিরোধী দলের সমান ভূমিকা। কেউ কারো থেকে কম যায় না।

দক্ষিণ ভারতের পাশাপাশি দুই রাজ্য কর্ণাটক আর তামিলনাড়ুর মধ্যে কাবেরী নিয়ে বিবাদ দীর্ঘদিনের। মীমাংসা নেই, শুধু সংঘাত। কর্ণাটকের প্রধান দুই নদী কৃষ্ণা ও কাবেরী। উত্তরে কৃষ্ণার উপনদী ভীমা, ঘটপ্রভা, মালাপ্রভা, তুঙ্গভদ্রা, বেদবতী। দক্ষিণে কাবেরীর উপনদী হেমবতী, সিমসা, আর্কাবতী, লক্ষণাতীর্থ ও কবিলী। কৃষ্ণা, কাবেরী পূর্বদিকে বয়ে গিয়ে বঙ্গোপসাগরে মিলেছে। কৃষ্ণা গেছে পাশের রাজ্য অন্ধ্র প্রদেশের মধ্য দিয়ে। কৃষ্ণা নিয়ে অন্ধ্র প্রদেশের সঙ্গে কর্ণাটকের কোনো বিরোধ নেই। কাবেরী তামিলনাড়ু দিয়ে গিয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। তামিলনাড়ুর ৭৬০ কিলোমিটার জুড়ে কাবেরী। এই নদীর ওপরই তামিলনাড়ুর ভরসা। পশ্চিম ঘাটে পর্বতমালা থেকে বেরোনো আরো নদী আছে। এসব নদীতে সারা বছর জল থাকে না। একমাত্র বর্ষার বৃষ্টিতে প্রাণ পায়। বাকি সময়টা মরা। ভেলনার, পোয়েল, সুরুলি, গৃণ্ডার, ভাইপার, ভালপারাই, বর্ষালি নদী। বর্ষা না নামলে এসব নদী হেঁটে পার হওয়া যায়। সব ঋতুতে তামিলনাড়ুকে বাঁচিয়ে রাখে কাবেরী। কর্ণাটক জল না ছাড়ায় কাবেরী মরুভূমি। বাস্তবতা বিচার করেই সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছেন কাবেরীর ছয় হাজার কিউসেক জল কর্ণাটক যেন তামিলনাড়ুকে দেয়। বেঁকে বসেছে কর্ণাটক। তারা জানিয়েছে, এক ফোঁটা জলও দেওয়া যাবে না।

কর্ণাটকে রাজত্ব করছে কংগ্রেস। ২০১৩ সালে বিধানসভা নির্বাচনে তাদের ফল ভালোই ছিল। ২২৪টি আসনের ১২২টি ছিনিয়ে নিয়েছিল। বিজেপি পেয়েছিল মাত্র ৪০। জনতা দল এসও ৪০। বাকি অন্যরা। এক বছর পর ২০১৮ সালে ফের নির্বাচন। সব দলই মেপে পা ফেলছে। কাবেরীর সঙ্গে রাজ্যের সেন্টিমেন্ট জড়িয়ে। কাবেরীর জল আটকে রাখাটা অনুচিত—এ কথাটা কেউ বলবে না। বললে সব ভোট মাঠে মারা যাবে। নির্বাচনে আঙুল চুষতে হবে। দিল্লিতে কেন্দ্রীয় সরকার চালাচ্ছে বিজেপি। তারা কাবেরী নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য করছে না। কংগ্রেসও চুপ। দুই জাতীয় রাজনৈতিক দল যদি সমাধানের চেষ্টা না করে, কে করবে।

তামিলনাড়ু নিয়ে বিজেপি-কংগ্রেসের মাথাব্যথা নেই। সেখানে সবেমাত্র নির্বাচন শেষ হয়েছে। বিপুল ভোটে জিতে এআইডিএমকে নেত্রী জে জয়ললিতা ফের মুখ্যমন্ত্রী। এটা নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রম। তামিলনাড়ুতে বরাবর দুই আঞ্চলিক দল এআইডিএমকে আর ডিএমকের মধ্যে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়। একবার এ তো পরের বার সে। এবার সেটা হয়নি। পর পর দুইবার জিতে মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতা। রাজ্যে বিজেপির কোনো অস্তিত্ব নেই। কংগ্রেস কোনো রকমে টিকে আছে। আমিলনাড়ু দখল করা যে কোনো দিনই সম্ভব নয়, সেটা তারা ভালো করে জানে। তামিলনাড়ু আঞ্চলিক দলের হাতে আছে, থাকবে। কাবেরীর জল দিয়ে জয়ললিতাকে খুশি করতে গেলে কর্ণাটকে ছিটকে যেতে হবে। সে রাজ্যের মানুষ আর কোনো দিন ফিরেও তাকাবে না।

বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ ও কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী কাবেরী প্রশ্নে মৌন। জানেন মুখ খুললেই বিপদ। তাঁরা মানেন, এটা অন্যায়। ন্যায্য পাওনা থেকে তামিলনাড়ুকে বঞ্চিত করার কোনো অধিকারই কর্ণাটকের নেই। জেনেবুঝে এড়িয়ে যাওয়াটা আরো অন্যায়। গা বাঁচাতে তাঁরা বারবার একটা কথাই বলছেন, এটা রাজ্যের ব্যাপার। দুই রাজ্যকে আলোচনা করে ঠিক রাস্তা বের করতে হবে। কেন্দ্রীয় সরকারের কিছুই করার নেই। সাংবিধানিক নিয়মে নদী রাজ্যের বিষয়। কেন্দ্রীয় সরকার হস্তক্ষেপ করতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও নিরুপায়। আইনে তাঁর হাত-পা বাঁধা। একমাত্র সুপ্রিম কোর্ট কিছু করতে পারত। তারাও পারছে না। তাদের নির্দেশ উড়িয়ে দিচ্ছে কর্ণাটক। কর্ণাটক সরকারও জানে, নদী নিয়ে শেষ কথা বলার অধিকার সুপ্রিম কোর্টেরও নেই। কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধিরামাইয়া সে কথাটা প্রকাশ করতেই জানিয়েছেন, বিচারব্যবস্থার প্রতি আমাদের সম্পূর্ণ আস্থা আর শ্রদ্ধা আছে। কাবেরী সম্পর্কে তাদের নির্দেশ মানাটা তবু সম্ভব নয়। বাস্তবতার বিচারে সেটা কার্যকর করা যাচ্ছে না। ১৯৯১ সালে মুখ্যমন্ত্রী বাঙ্গারাপ্পা, ২০০২ সালে মুখ্যমন্ত্রী এম এস কৃষ্ণ একইভাবে কাবেরী ইস্যু ধামাচাপা দিয়েছেন। সংবিধান সংশোধন করে নদী ইস্যুকে কেন্দ্রীয় সরকারের এখতিয়ারে আনতেও কোনো দল রাজি নয়। তারা জানে, ক্ষমতা পেলেও ব্যবহার করা যাবে না। নিরপেক্ষ থাকাটা অসম্ভব। বিষয়টা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। মানুষের বিরুদ্ধে যাওয়ার সাধ্য কার। রাজ্যের ওপর অপছন্দের সিদ্ধান্ত কেন্দ্র চাপাবে কী করে। কর্ণাটককে চটিয়ে তামিলনাড়ুকে জল দেওয়া মানে খাল কেটে কুমির আনা। কর্ণাটককে চিরদিনের মতো হাতছাড়া করা।

রাজনীতি জনপ্রিয়তানির্ভর। মানুষ কী চাইছে সেটা বুঝেই সিদ্ধান্ত। সেটা ভুল হলেও ঠিক। কারো ক্ষতিতেও কিছু যায় আসে না। দলের লাভ-ক্ষতিটাই বড়। তা অগ্রাহ্য করে তামিলনাড়ুর দিকে হেলে পড়লে ন্যায়বিচার হবে ঠিকই, দলের কী হাল হবে। কংগ্রেস বা বিজেপিকে বাঁচানোর দায়িত্ব কি জয়ললিতা নিতে পারবেন?

লেখক : কলকাতার সাংবাদিক


মন্তব্য