kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


এমসিকিউ, সৃজনশীলতা ও পরীক্ষাভীতি

মাছুম বিল্লাহ

১১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



এমসিকিউ, সৃজনশীলতা ও পরীক্ষাভীতি

অতি সম্প্রতি আন্তশিক্ষা বোর্ড সূত্র থেকে জানা যায়, ২০১৭ সাল থেকে এমসিকিউয়ে কমছে ১০ নম্বর। আর সেই ১০ নম্বর বাড়ছে সৃজনশীল অংশে।

আগে এমসিকিউয়ের জন্য বরাদ্দ ছিল ৪০ মিনিট। এখন ৩০টি এমসিকিউয়ের জন্য বরাদ্দ ৩০ মিনিট। ফলে সৃজনশীল অংশে ১০ মিনিট সময় এখান থেকে বেড়েছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তকেও স্বাগত জানাতে চাই। আগে পরীক্ষার সময়ের মধ্যেই অপটিক্যাল মার্ক রিডার বা সংক্ষেপে ওএমআর ফরম পূরণ করতে হতো। এখন পরীক্ষা শুরু হওয়ার ১৫ মিনিট আগেই দুই অংশের ওএমআর ফরম দেওয়া হবে। ফলে শিক্ষার্থীদের আরো ১০ মিনিট সময় সাশ্রয় হবে। এতে মোট ২০ মিনিট বেশি সময় পাওয়া যাবে। আগে এমসিকিউয়ের উত্তর জেনে বৃত্ত ভরাটের জন্য শিক্ষার্থীরা বসে থাকত। এখন এমসিকিউয়ে সময় কমে যাওয়ায় বসে থাকার সময় পাবে না, ফলে দেখাদেখি করার সুযোগও কমে আসবে। আর আসন্ন টেস্ট পরীক্ষায়ও স্কুল-কলেজগুলোকে পুনর্বণ্টন অনুযায়ী পরীক্ষা নিতে হবে। এতে শিক্ষার্থীরা পুরো ব্যাপারটি আয়ত্ত করারও সময় পাবে।

সৃজনশীল প্রশ্নের প্রথম অংশটি জ্ঞান স্তরের বা সহজ বা নিতান্তই স্মৃতিনির্ভর। প্রশ্নটি স্মৃতিনির্ভর হলেও তা যেন অর্থবহ ও শিক্ষণীয় হয়। এ-জাতীয় প্রশ্নের দ্বিতীয় অংশ হচ্ছে অনুধাবন স্তরের প্রশ্ন, এর মাধ্যমে শিক্ষাক্রমের আওতায় পাঠ্য বইয়ের বিষয়বস্তু অনুধাবন করার ক্ষমতা যাচাই করা হয়। পাঠ্য বইয়ের বিভিন্ন ঘটনা বা বিষয়বস্তুর বিবরণ দেওয়া থাকে। এ ধরনের প্রশ্নে সরাসরি পাঠ্য বইয়ের অনুরূপ বিবরণ জানতে চাওয়া হয় না। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীকে বিষয়বস্তু সম্পর্কে নিজের ভাষায় ব্যাখ্যা বা বর্ণনা দিতে বলা হয়। প্রশ্নের তৃতীয় অংশটি হচ্ছে প্রয়োগ স্তরের প্রশ্ন। সৃজনশীল প্রশ্নের এ অংশটি ভালো মানের উদ্দীপকের ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ উদ্দীপক যদি খুব মানসম্পন্ন হয়, তবে প্রয়োগ দক্ষতার প্রশ্নটি প্রণয়ন করা সম্ভব।

সৃজনশীল প্রশ্নের চতুর্থ অংশ হচ্ছে উচ্চতর দক্ষতার প্রশ্ন। এ স্তরের প্রশ্নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর বিচার-বিবেচনা করার দক্ষতা, কোনো বিষয় বা ঘটনা বিশ্লেষণ করার দক্ষতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা ইত্যাদি যাচাই করা হয়। এ প্রশ্নের উত্তর করার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য পাঠ্যপুস্তকে থাকবে এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য নতুন পরিস্থিতিতে ব্যবহার করে শিক্ষার্থী তার বিচার-বিশ্লেষণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও মূল্যায়ন দক্ষতা প্রকাশের সুযোগ পাবে।

প্রকৃত সৃজনশীলতা ও পাবলিক পরীক্ষাগুলোয় চালু সৃজনশীলতার মধ্যে ব্যবধান থেকেই যাচ্ছে। তার পরও বহুনির্বাচনী বা এমসিকিউয়ের চেয়ে প্রচলিত সৃজনশীল প্রশ্ন অনেক উন্নত মানের। শিক্ষার্থীদের মান যাচাই ও মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এটি অনেকটাই উন্নততর। কোনো কিছু পাঠ থেকে লিখতে গেলে সেই একই ধরনের অন্য কোনো লেখকের লেখার রেফারেন্স তুলে ধরা, তার সঙ্গে তুলনা করা, সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য তুলে ধরা, সঙ্গে নিজের মতামত ব্যক্ত করা বিষয়গুলো সৃজনশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত। এ বিষয়গুলো সৃজনশীলতার উল্লেখযোগ্য উপাদান। কিন্তু আমাদের সৃজনশীলতা শিক্ষার্থীদের একেবারেই পাঠ্য বইয়ের মধ্যে বন্দি করে ফেলেছে, বাইরের বইপড়ার কোনো ধরনের উৎসাহ প্রদানের ব্যাপার নেই এখানে। পড়ার অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান কাজে লাগানোর যে কথা বলা হয়েছে, তা এখনো গাইড বই বা প্রাইভেট পড়ানির্ভর।

এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় নম্বর পুনর্বণ্টনে মাল্টিপল চয়েস কোশ্চেন বা বহুনির্বাচনী প্রশ্ন থেকে ১০ নম্বর কমিয়ে তা সৃজনশীল প্রশ্নে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে এখন থেকে সৃজনশীল অংশে আরো একটি বেশি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে শিক্ষার্থীদের। নম্বর পুনর্বণ্টনের পাশাপাশি সময়ও পুনর্বণ্টন করা হয়েছে। এমসিকিউ অংশের জন্য বরাদ্দ সময় থেকে ১০ মিনিট কমিয়ে সৃজনশীল অংশের জন্য সমপরিমাণ সময় বাড়ানো হয়েছে। এতে দুশ্চিন্তা ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। তারা দেড় বছর ধরে পুরনো নিয়মেই পরীক্ষা দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে। ফলে হঠাৎ করেই বাড়তি ১০ মিনিটের মধ্যে একটি সৃজনশীল প্রশ্নের বেশি উত্তর দেওয়ার নিয়ম ঘোষণায় সন্দিহান হয়ে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। সরকার বিষয়টিকে আরো আগে জানালে সবার জন্য ভালো হতো। গত মে মাসে শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রচলিত পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে শিক্ষাবিদ, শিক্ষা বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। সেখানেই এই সিদ্ধান্ত হয় যে এমসিকিউয়ের নম্বর তুলে দিতে হবে। তবে কাজটি ধীরে ধীরে করতে হবে। তাই মন্ত্রণালয় প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে এবার ১০ নম্বর কমানোর কথা বলছে, এটি শিক্ষার্থীদের জন্য খারাপ নয়, ভালো।

 

লেখক: ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত এবং

সাবেক ক্যাডেট কলেজ শিক্ষক

masumbillah65@gmail.com


মন্তব্য