kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


আসাদ ও তাঁর সাহায্যকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের মামলা হচ্ছে কি?

গাজীউল হাসান খান

১১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



আসাদ ও তাঁর সাহায্যকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের মামলা হচ্ছে কি?

সিরিয়ায় গণবিরোধী আসাদের সরকারি বাহিনী এবং বিদ্রোহী সৈন্যদের অর্ধ দশক স্থায়ী গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটানোর জন্য গত মাসে এক সপ্তাহের অস্ত্রবিরতি ঘোষণা করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অব স্টেট জন কেরি এবং রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সার্গেই লেভরভ শান্তিকামী বিশ্ব কিংবা বিশ্ব মানবতার চাপে তাদের মধ্যে (বৃহৎ শক্তি) বিরাজিত বর্তমান স্নায়ুযুদ্ধের কথা ভুলে সে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিলেন।

তখন তাদের মূল লক্ষ্য ছিল সিরিয়ার জনবহুল দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী আলেপ্পোর দুই লাখ ৭৫ হাজার আটকে পড়া অভুক্ত, তৃষ্ণার্ত ও চিকিৎসাসেবাবঞ্চিত সাধারণ নাগরিককে অবশ্যম্ভাবী মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করা। কিন্তু আসাদ ও তাঁর তথাকথিত উদ্ধারকর্তা রাশিয়া চায়নি জাতিসংঘের পাঠানো ত্রাণসামগ্রী বিপন্ন মানুষের কাছে পৌঁছুক। আসাদের আশঙ্কা ছিল বিদ্রোহী সৈন্যদের আলেপ্লোয় স্থায়ী হতে দিলে তিনি তাঁর পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী হারানো ভূমি পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবেন না। সে ক্ষেত্রে সিরিয়া ভেঙে যেতে পারে এবং বিদ্রোহীদের হাতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো চলে যেতে পারে। তাই বিদ্রোহী সৈন্য এবং জঙ্গিবাদী আল নুসরার সহাবস্থানের অভিযোগে আসাদ ও তাঁর ত্রাণকর্তা রাশিয়া যুদ্ধবিরতিকে দীর্ঘায়িত না করে সরকারবিরোধীদের ওপর আক্রমণ আবার চালু করে। বিদ্রোহী সৈন্য ও আল নুসরাসহ বিভিন্ন জঙ্গি গ্রুপের সহাবস্থানকে নীরবে মেনে নেওয়ার অভিযোগে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করে। আসাদ ও রুশ চক্র থেকে শুধু জাতিসংঘের পাঠানো ত্রাণসামগ্রীর বহরের ওপরই নয়, ব্যারেল-বোমাসহ বিভিন্ন মারণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে আলেপ্পোর পূর্বাঞ্চলের হাসপাতাল, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা এবং বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রের ওপর। তার পাশাপাশি আসাদ বারবার বিদ্রোহী সৈন্যদের কাছে হারানো বিভিন্ন অঞ্চল পুনরুদ্ধারের ঘোষণার কথা পুনর্ব্যক্ত করে যাচ্ছেন। সে অবস্থায় আটকে পড়া আলেপ্পোর পূর্বাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় কী পরিমাণ শিশু, নারী ও বৃদ্ধ মানুষ মারা গেল তাতে তাঁর কোনো পরোয়া নেই।

সিরিয়ার যুদ্ধে এ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ নিহত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু তাতে আসাদের কোনো অনুশোচনা নেই। তিনি চান সমগ্র সিরিয়ার পূর্ণাঙ্গ দখল এবং ক্ষমতায় তাঁর ষোলো আনা অবস্থান। আর সিরিয়ার একনায়কোচিত এ ব্যর্থ শাসককে ক্ষমতায় ধরে রাখার জন্য ইরান ও রাশিয়া চালিয়ে যাচ্ছে বিশ্বনিন্দিত অমানবিক প্রচেষ্টা। এ প্রচেষ্টার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আসাদকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও রাশিয়ার প্রভাববলয় শক্তিশালী করা। শুধু তা-ই নয়, ইরান চায় উত্তর-পশ্চিম আফগানিস্তান থেকে ইরাক, সিরিয়া ও ইয়েমেনে তাঁর শিয়া ইসলামী প্রভাব বৃদ্ধি করে সামরিক শক্তিকে মজবুত করতে। অন্যদিকে বিশ্ব রাজনীতি, বাণিজ্য ও সামরিক ক্ষেত্রে তাঁর প্রভাব বৃদ্ধি করতে রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য মেনে নিতে রাজি নয়। তাতে সিরিয়ার জনগণ বহিঃশক্তির অস্ত্রের আঘাতে নিহত হোক কিংবা দেশ ছেড়ে চলে যাক, তাতে তাদের কারোরই কিছু যায় আসে না। সে কারণে শান্তিকামী বিশ্ববাসী সিরিয়ার নিরীহ জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ করে দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়াসহ বৃহৎ শক্তিকে দায়ী করে চলেছে। সে অপরাধবোধ ও দায়িত্বজ্ঞান থেকে শেষ পর্যায়ে এসে যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ায় আবার যখন তত্পর হয়েছে এবং ইসলামী দেশগুলো নিয়ে বিভিন্ন জোট গঠন করেছে, তখন ইরান ও রাশিয়া এ অঞ্চলে তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠার জন্য নতুন আঙ্গিকে গণবিরোধী শাসক বাশার আল আসাদকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করা শুরু করে। শুধু আইসিস নয়, সিরিয়ায় বিদ্রোহী সৈন্যদের ওপর জঙ্গি বিমান থেকে বোমাবর্ষণ শুরু করে। এতে শুধু ক্ষয়িষ্ণু স্নায়ুযুদ্ধ চাঙ্গা হয়ে ওঠেনি বরং সিরিয়ার গৃহযুদ্ধকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বলে ওয়াকিবহাল মহলের বিশ্বাস। একসময়ের সমাজতান্ত্রিক ও শান্তিবাদী রাষ্ট্র রাশিয়া (সোভিয়েত শাসনামলে) বর্তমানে আলেপ্পোয় হাসপাতালসহ বাস্তুভিটা ত্যাগীদের বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্র ও জনবসতিপূর্ণ এলাকায় ব্যারেল-বোমা বিস্ফোরণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

সিরিয়ার নিরীহ ও নিরস্ত্র জনগণের বিরুদ্ধে এ অবস্থা চালিয়ে যাওয়ার অপরাধে গণবিরোধী বাশার আল আসাদ ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে অর্থাৎ আসাদের মদদদাতাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধবিষয়ক আদালতে ‘যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ’ এনে মামলা দায়ের করার দাবি তুলেছে বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদী মানুষ। তার পরও রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী লেভরভ বলেছেন, বর্তমান অবস্থায় সিরিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠা অসম্ভব! এর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে লেভরভ যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেছেন, সিরিয়ায় যুদ্ধরত সরকারবিরোধী বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে আল নুসরা একটি, যারা জঙ্গিবাদী হিসেবে চিহ্নিত। তারা শুধু সিরিয়াকে আসাদের কবল থেকে মুক্তই করতে চায় না, তারা চায় সিরিয়াকে সুন্নি মতবাদে বিশ্বাসী একটি ইসলামী রাষ্ট্র হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে। যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের অভিযোগকে শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অন্তরায় বলে মনে করে। তাদের মতে, স্বৈরাচারী আসাদের অবর্তমানে সিরিয়াবাসী তাদের দেশে প্রথমে একটি গণতান্ত্রিক ও প্রতিনিধিত্বশীল ব্যবস্থা কায়েম করতে চায়। যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক প্রভাবশালী মহল মনে করে, গৃহযুদ্ধ কিংবা কোনো যুদ্ধই সিরিয়া সমস্যার কোনো শান্তিপূর্ণ সমাধান দিতে পারবে না। অর্থাৎ সামরিক সংঘর্ষের পথে সিরিয়া সমস্যার সমাধান হবে না। তার জন্য চাই ঘনিষ্ঠ ও শক্তিশালী কূটনৈতিক উদ্যোগ ও অব্যাহত প্রচেষ্টা। কূটনৈতিকভাবে সিরিয়া সমস্যার সমাধান খুঁজে পেতে ব্যর্থ হলে সিরিয়া ভেঙে কয়েক টুকরো হতে পারে। তাতে শান্তি আসবে না; বরং বর্তমান গৃহযুদ্ধ আরো দীর্ঘায়িত হবে। তখন সিরিয়া জনমানব বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। কারণ সিরিয়ার সংঘর্ষে পরস্পরবিরোধী বহু জঙ্গি গ্রুপ জড়িত। একবিংশ শতাব্দীতে সিরিয়া সমস্যা একটি অত্যন্ত জটিল ও অভাবনীয় বিষয়। সে কারণে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে জন কেরি ভেঙে যাওয়া যুদ্ধবিরতিকে আবার বহাল করে শক্তিশালীভাবে কূটনৈতিক উদ্যোগের সূচনা করতে চেয়েছিলেন। এ ক্ষেত্রে একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানে পৌঁছার আগ পর্যন্ত বাশার আল আসাদ কিভাবে ক্ষমতায় থাকবেন তা আবার ভেবে দেখা যেতে পারে বলে পশ্চিমা গণতান্ত্রিক বিশ্ব মত প্রকাশ করেছে।

পশ্চিমা বিশ্বের মতো মধ্যপ্রাচ্যেও শীত নেমে আসতে শুরু করেছে অত্যন্ত নীরব দ্রুততায়। তদুপরি শুধু আলেপ্পোয় নয়, ধ্বংসপ্রাপ্ত সিরিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে রয়েছে খাদ্য, পানীয়, বিদ্যুৎ ও চিকিৎসাসেবার চরম অভাব। যোগাযোগব্যবস্থাও অনেক জায়গায় ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, বিধ্বস্ত সিরিয়াকে গড়বে কারা? সবাই সিরিয়ার দখল নিয়ে ব্যস্ত। বরং তাকে আরো ধ্বংস করার জন্য প্রতিযোগিতামূলকভাবে মাঠে নামছে ক্রমে ক্রমে। সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে তুরস্ক সীমান্ত ঘেঁষে একটি ‘নিরাপদ জোন’ গড়ে তোলার জন্য তুরস্ক এ অঞ্চলের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যুদ্ধরত কুর্দি যোদ্ধা এবং বিশেষ করে আইসিস জঙ্গিদের বিতাড়িত করেছে। সিরিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তুরস্ক এখন একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ। কারণ তুরস্কের সীমান্তের অভ্যন্তরে রয়েছে কয়েক লাখ সিরীয় শরণার্থী। তুরস্কের ওপর আসাদ বাহিনীর সামান্যতম উসকানিমূলক হামলা এখন এক বিশাল যুদ্ধের জন্ম দিতে পারে। তবে তুরস্ক সীমান্তের দিকে সৈন্য পাঠানোর মুরোদ আসাদের মোটেও নেই। যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ায় শান্তি আলোচনার ব্যাপারে রাশিয়ার ওপর ভয়ানকভাবে ক্ষুব্ধ ও হতাশ। রাশিয়া যুদ্ধবিরতি ভেঙে আসাদের পক্ষ হয়ে আলেপ্পোর অবরুদ্ধ এলাকায় জঙ্গি বিমান থেকে হামলা চালানোর অভিযোগ উঠেছে। সে হামলায় অসংখ্য শিশুসহ অনেক নিরস্ত্র ও অসহায় মানুষ নিহত হচ্ছে। ত্রাণসামগ্রী আলেপ্পোর গভীর অভ্যন্তরে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। জঙ্গি বিমানের আঘাতে সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি ও আশ্রয়স্থল ধ্বংস করা হচ্ছে। এ পথে সমস্যার সমাধান হতে পারে না। এবং শান্তিও আসতে পারে না। আলেপ্পোয় যুদ্ধাপরাধ চলছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতিসংঘের বিদায়ী মহাসচিব বান কি মুন। তাঁর সঙ্গে সুর মিলিয়ে গণতান্ত্রিক বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ গণবিরোধী আসাদ ও তাঁর সমর্থনকারীদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধবিষয়ক আদালতে অবিলম্বে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মামলা করার দাবি জানিয়েছে। এ দাবি দিনে দিনে আরো জোরদার হচ্ছে। সিরিয়ার প্রায় দুই কোটি (সর্বশেষ শুমারি অনুযায়ী এক কোটি ৮০ লাখ) মানুষের মধ্যে অর্ধেকের বেশি এখন তুরস্ক, লেবানন ও জর্দান ছাড়াও ইউরোপের বিভিন্ন আশ্রয় শিবিরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ১৫ হাজার শিশুসহ প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ নিহত হয়েছে গত পাঁচ বছরে। সিরিয়ার জনসংখ্যার প্রায় ৭০ শতাংশ নাগরিক সুন্নি মতাবলম্বী মুসলিম। সিরিয়ার কুর্দি সম্প্রদায়ও সুন্নি মতাবলম্বী। অন্যদিকে মাত্র ১১ শতাংশ হচ্ছে বাশার আল আসাদের আলাওয়াইট শিয়া সম্প্রদায়ের মানুষ। অথচ দেশটির প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠই হচ্ছে আলাওয়াইট শিয়াপন্থী, খ্রিস্টান ও আসাদের ঘনিষ্ঠ অনুসারী। এক কথায় বলতে গেলে শাসক আসাদসহ তারাই সিরিয়ার সব ক্ষমতার অধিকারী। দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প-কারখানার অধিকাংশই তাদের হাতে। বহু আগে থেকেই দেশে একটি বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণি গড়ে তুলেছিলেন আসাদ। এই বিশেষ সুবিধাভোগী ও অগণতান্ত্রিক শক্তির বিরুদ্ধেই গড়ে উঠেছিল সাধারণ মানুষের সংগ্রাম। সে সংগ্রামের কারণেই সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে দেশ ছাড়া করেছে আসাদের সরকার। গুঁড়িয়ে দিয়েছে বিশাল জনপদ। আসাদবিরোধী সৈন্যরা ‘ফ্রি-সিরিয়ান আর্মি’ গঠন করে তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল। পরে, অর্থাৎ এখন থেকে দু-তিন বছর আগে তুরস্ক, সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের অস্ত্র দিয়ে এবং প্রশিক্ষণ দিয়ে সাহায্য করা শুরু করেছিল। কিন্তু আসাদের স্বৈরাচারী সরকার উত্খাতের জন্য তারা এ পর্যন্ত নিজেদের দেশ থেকে পদাতিক সৈন্য পাঠাতে সম্মত হয়নি। এ ক্ষেত্রে আফগানিস্তান কিংবা ইরাকের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে রাজি হয়নি যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরোধী বর্তমান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। তিনি চেয়েছিলেন সিরিয়াবাসীই তাদের নিজেদের সংগ্রামের মাধ্যমে আসাদকে উত্খাত করুক। ইরাকের পুনরাবৃত্তি তিনি ঘটাতে সম্মত হননি। এতে সিরীয় বিদ্রোহী সৈন্য ও সংগ্রামী জনগণ সংগঠিত হয়ে শেষ পর্যন্ত যখন রাজধানী দামেস্কসহ সিরিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র আঘাত হানে, তখনই আসাদ সাহায্য চান শিয়াপন্থী ইরানের কাছে। বিদ্রোহীদের আক্রমণ ঠেকাতে এ বিরোধে অংশ নেয় ইরান ও লেবাননের শিয়াপন্থী হিজবুল্লাহ গেরিলা বাহিনী। ইরান আসাদের হয়ে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন প্রভাববলয় সৃষ্টি করার জন্য আরব, অনারব ও ইঙ্গ-মার্কিন জোটের বিরুদ্ধে রাশিয়ার সঙ্গে একটি বিশেষ সমঝোতায় উপনীত হয়। এবং সে সমঝোতাই বাশার আল আসাদকে সিরিয়ার রাজনৈতিক  ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদের হাত থেকে রক্ষা করে। রাশিয়া অর্থ, অস্ত্র এবং এমনকি জঙ্গি বিমান দিয়ে আসাদের সরকারি বাহিনীর মদদ জোগাতে শুরু করে, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বর্তমান সিরিয়া সংকটকে একবিংশ শতাব্দীর কলঙ্ক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অনেকে বলেছে, বিশ্বের পরাশক্তিগুলো এবং তথাকথিত গণতান্ত্রিক বিশ্ব সিরিয়ার জনগণের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে ব্যর্থ করেছে। সিরিয়ার অর্ধেকের বেশি মানুষকে পরিণত করেছে গৃহহীন, দেশহীন এবং সর্বস্বহারা শরণার্থীতে। কথিত আছে যে দামেস্ক পৃথিবীর একটি প্রাচীনতম নগরী এবং সিরিয়া একটি প্রাচীনতম সভ্যতার অধিকারী দেশ। অথচ এক ব্যক্তির কারণে সে দেশ, সে জনগোষ্ঠী ও সভ্যতা আজ সব গৌরব হারাতে বসেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কোনো জনগোষ্ঠীর জাতীয় জীবনে এমন বিপর্যয় আর কখনো নেমে আসেনি। যুক্তরাষ্ট্র কিংবা রাশিয়ার বৃহৎ শক্তি হিসেবে বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর জন্য এবং তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য ইরাক ও সিরিয়ার মতো প্রাচীন সভ্যতার অধিকারী দেশকে ধুলায় মিলিয়ে যেতে দেওয়া যায় না। এবং সে কারণেই মধ্যপ্রাচ্যে উগ্রবাদী ও জঙ্গিবাদীদের সৃষ্টি হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। তবে এ সামগ্রিক বিষয়টিরই একটি পরিসমাপ্তি টানা প্রয়োজন। নিরাপত্তা পরিষদের দেখা উচিত কী করে রাশিয়া এখনো আসাদের গণবিরোধী বাহিনীকে প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা পাঠিয়ে সাহায্য করছে? আর কোন শক্তিতেই বা বারবার শান্তির পথ পরিহার করে যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব অকার্যকর করে দিচ্ছে? এ কারণেই সিরিয়ার বর্তমান সমস্যা সমাধানে রাশিয়ার সঙ্গে শান্তি আলোচনা আপাতত স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ অবস্থায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন সিরিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় বলিষ্ঠ উদ্যোগের প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেছে। কমিশনের হাইকমিশনার এ ব্যাপারে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের ভেটো প্রয়োগ করার ক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। এসব বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে না পারলে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় সাধারণ সদস্য রাষ্ট্রের ভূমিকাও অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বর্তমানে একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, অন্যদিকে জাতিসংঘ মহাসচিবের দায়িত্বের মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে অনেক কিছুই আপাতত ঝুলে পড়েছে। কিন্তু তাতেও শক্তিশালী কূটনৈতিক প্রচেষ্টা যেন থেমে না থাকে। কারণ সিরিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বর্তমানে কূটনৈতিক সমাধানের কোনো বিকল্প হতে পারে না।

লন্ডন থেকে

লেখক : বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক

gaziulhkhan@gmail.com


মন্তব্য