kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বহে কাল নিরবধি

ওবামা ও যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির সীমাবদ্ধতা

এম আবদুল হাফিজ

১০ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ওবামা ও যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির সীমাবদ্ধতা

সৌদি-মার্কিন বিরক্তিকর সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে যখন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আটলান্টিক ম্যাগাজিনে প্রকাশিত তাঁর এক নিবন্ধে সৌদি ও অন্যান্য আরব দেশকে খোঁচা দিয়ে তাদের মুফ্তখোর (Free rider) বলেছেন। ওবামার অভিযোগ যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের দাক্ষিণ্যস্বরূপ প্রদত্ত বিধ্বংসী অস্ত্র-সরঞ্জামে নির্ভর করে নিজেদের সমস্যার সমাধান খোঁজে।

প্রত্যাশিতভাবে মুফ্তখোর অভিধাটি ব্যবহার করে তিনি ওয়াশিংটনের উপসাগরীয় আরব মিত্রদের উগ্র আবেগকে উসেক দিয়েছেন। এ কথা ঠিক যে উল্লিখিত আরব রাষ্ট্রগুলো প্রতিটি সংকটে মার্কিন শক্তির ওপর নির্ভর করেছে, যেমনটি এই সময়েও ইয়েমেনে আরব নেতৃত্বাধীন অভিযানে তারা যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির ওপর নির্ভরশীল। তবে এ কথাও কম সত্য নয় যে পশ্চিমা কোয়ালিশনের ইরাক ও সিরিয়া অভিযানে আরবদের অবদানও অপরিসীম।

তা সত্ত্বেও সৌদি ও আরব-মার্কিন সম্পর্ক অনেক সমস্যায় কণ্টকিত। ওবামার আরবদের সম্পর্কে ‘মুফ্তখোর’ মন্তব্য অনেক সমস্যার কণ্টকিত সম্পর্কের মাত্র একটি দিক। সময় এসেছে যখন সৌদি ও আরব রাষ্ট্রগুলোর উচিত ওবামার এই দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে পারা। এবং বর্তমান অস্বস্তিকর সম্পর্কের অবসান ঘটিয়ে নিজেদের সত্যিকারের অবস্থান শনাক্ত করা। এমনটি করার প্রয়োজন হয়েছে এ জন্য যে সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্য ও আরববিশ্বকে নিয়ে ওবামা একটি তাত্পর্যপূর্ণ বক্তব্য রেখেছেন। তিনি বলেছেন যে সৌদি আরব ও ইরানের উচিত মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে নিজেদের প্রভাবাধীন অঞ্চলকে অংশীদারির ভিত্তিতে ভাগ করে নেওয়া এবং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ভরকেন্দ্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে স্বীকৃতিদান প্রেসিডেন্ট ওবামার বিদায়ী অভিলাষ।

কিন্তু তাতে ওবামার মুফ্তেখারের’ হুল ফোটানো মন্তব্যের প্রাসঙ্গিকতা থেকেই যাচ্ছে এবং তার জোর আলোচনা এখনো চলছে। বিশেষ করে লিবিয়া অভিযানে যেখানে ওবামা বলেছিলেন যে ইউরোপ ও উপসাগরীর আরব রাষ্ট্রপুঞ্জ লিবিয়ার বিরুদ্ধে শুধু উসক্ানিদাতার ভূমিকায়ই ছিল। কিন্তু আসলে লিবিয়ার অভিযানের কোনো মূল্য দিতে তারা প্রস্তুত ছিল না। ওবামার একটি সাক্ষাৎকারের সময় সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী সাংবাদিক জেফরি গোল্ডবার্গ ওই প্রবণতা বোঝাতে ওই সাক্ষাৎকারে free rider অভিধাটির জুতসই প্রয়োগ করেন।

ওবামাও অভিধাটি পছন্দ করেন; পরে মধ্যপ্রাচ্য আলোচনায় অভিধাটি তার স্থায়ী স্থান করে নেয়। ওবামা তাঁর সাক্ষাৎকারে লিবিয়া অভিযানের চিত্র তুলে ধরেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ওই অভিযানে ইউরোপীয় ও আরব সহযোগিতা-সাহায্য খুবই প্রয়োজন ছিল। লিবিয়া অভিযানে সম্পদ লুণ্ঠনে আরবরা যতটা উৎসাহী ছিল যুদ্ধোত্তর সময়ে ভূমিকা পালনে তারা সে উৎসাহ বা পারদর্শিতা প্রদর্শন করতে পারেনি বলে ওবামার প্রচুর অভিযোগ। লিবিয়ার যুদ্ধোত্তর বিশৃঙ্খলার জন্য আরবদের ছাড়াও ওবামা ফরাসি প্রেসিডেন্ট সারকোজি ও ব্রিটেনের ডেভিট ক্যামেরনকে দোষারোপের চাবুক থেকে অব্যাহতি দেননি।

প্রিন্স তুর্কি আল ফয়সল, যিনি সৌদি গোয়েন্দা প্রধান ছিলেন এবং এখন গুরুত্বপূর্ণ সৌদি থিংক ট্যাক কিং ফয়সল সেন্টারের প্রধান, ওবামার সমালোচনাকে নাকচ করে তাঁকেই সরাসরি আক্রমণ করেছেন। আরব নিউজ ও আল শারব আল আসওরাতে প্রকাশিত তাঁর নিবন্ধে তিনি বলেছেন, না মি. ওবামা, আমরা অবশ্যই ফ্রি রাইডার নই। অতঃপর তিনি তাঁর নিবন্ধে এ ক্ষেত্রে সৌদি অর্জন তালিকাবদ্ধ করেন। এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে সৌদি গোয়েন্দা তত্পরতার অবদান, যা একাধিক সন্ত্রাসী পরিকল্পনাকে নস্যাৎ করে যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যকে নিরাপত্তা দিয়েছে। তাঁর দাবি যে দায়েসের বিরুদ্ধে কোয়ালিশন গঠনে আরব রাষ্ট্রপুঞ্জের অগ্রণী ভূমিকা ছিল। সৌদি নেতৃত্বাধীন ইয়েমেনে আলহেইতেবিরোধী যুদ্ধের অন্তর্ভুক্ত ছিল অনেক রাজনৈতিক সংস্কার এবং মানবাধিকার রক্ষার পদক্ষেপ। যুক্তরাষ্ট্রের সৌদিবিরোধী উষ্মা সত্ত্বেও দেশটি এখনো যুক্তরাষ্ট্রের জনগণকে মিত্র হিসেবেই গণ্য করে।

আসলে প্রিন্স তুর্কির ফ্রি রাইডার অভিধা খণ্ডনের প্রচেষ্টা ফোকাসে এনেছে ওবামার পরীক্ষিত মিত্রকে ‘ফ্রি রাইডার’ বলে উপহাস। খুব সহজে মার্কিনিরা তুচ্ছ ছুতায় পুরনো বন্ধুকে ছুড়ে ফেলতে পারে। তবে ওবামার উপসাগরীয় আরব মিত্রদের সমর্থনকে তুচ্ছতাচ্ছিল্যের কারণ হতে পারে এই যে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্র সাম্প্রতিক বছরগুলোয় তাদের অবস্থান নির্ধারণ করতে পেরেছে।

কিন্তু সাংবাদিক গোল্ডবার্গ ফ্রি রাইডার সম্পর্কে তাঁর ধারণায় অনেক কিছু বুঝিয়েছেন। প্রিন্স তুর্কির কিছু ক্রোধ উৎসারিত হয়ে থাকতে পারে ওবামার সৌদি সামাজিক প্রগতির অভাব ও দেশটির অর্থের ওপর নির্ভরশীল ওহাবিজমের প্রসারসংক্রান্ত বক্তব্যে।

ইন্দোনেশিয়ায় বেড়ে ওঠা ওবামার কাছে ইসলাম অপরিচিত নয়। ওবামার বর্ণনায় পাওয়া যায়, কী করে আরেকটি মুসলিম দেশে নতুন চেতনার অভ্যুদয়, যা সৌদি ওহাবিজম, যার সঙ্গে পরিচয় তার রাজনৈতিক জীবনে। তিনি মনে করেন, সে ইসলামে যান্ত্রিক নিয়মের নিগড় আছে কিন্তু তা আবেগ-অনুভূতিবিহীন। তবে প্রিন্স তুর্কি বহির্বিশ্বকে আশান্বিত করেন যে মারদাঙ্গা চরমপন্থী মতাদর্শ শিগগিরই পরিত্যক্ত হবে। কেননা আমাদের ইসলামের মৌলিক নির্যাসকে ছিনতাই করা হয়েছে।

২০ হাজার শব্দসংবলিত মার্কিন বিদেশনীতির খসড়া প্রস্তুত, তার অন্তর্নিহিত থিম, খসড়াটির স্বচ্ছতা ও বোধগম্যতা, যাতে ওবামা গর্ববোধ করেন। এতদসত্ত্বেও যে মার্কিন সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা আছে। ওবামার সিরিয়া মুক্ত করার বিগত ২০১৩ সালের ৩০ আগস্টের দুর্লভ মুহূর্তটি তার অবমুক্তির সময়, যখন তিনি মিলিটারির হস্তক্ষেপের যুক্তিকে খণ্ডন ও নাকচ করে দেন।

ওবামার বাস্তববাদ অনেক সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্টের চেয়েও প্রখর। তিনি উপলব্ধি করেন যে শুধু সত্যিকার হুমকির মুখেই সামরিক হস্তক্ষেপ সফল হয়। ওবামার মন্তব্য হয়তো কখনো আসত না, উপসাগরীয় আরব মিত্রদের জন্য মৃদুই হতো, যদি কায়রোর মতো ভাষণের শ্রোতামণ্ডলীর সামনে তিনি তাঁর বক্তব্য দিতে পারতেন।

 

লেখক : সাবেক মহাপরিচালক, বিআইআইএসএস


মন্তব্য