kalerkantho


জঙ্গিবাদ ও উপমহাদেশের ভূ-রাজনীতির ভবিষ্যৎ

মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মদ আলী শিকদার পিএসসি (অব.)

১০ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



জঙ্গিবাদ ও উপমহাদেশের ভূ-রাজনীতির ভবিষ্যৎ

কয়েক সপ্তাহ ধরে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে উত্তপ্ত অবস্থা বিরাজ করছে এবং বাগ্যুদ্ধ ও প্রোপাগান্ডা যুদ্ধ চলছে সমানতালে। ১৮ সেপ্টেম্বর জম্মু ও কাশ্মীরের উরি সীমান্তে ভারতের সেনাছাউনিতে পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন আক্রমণ করে এবং তাতে ভারতের ১৮ জন সেনা সদস্য নিহত হন। পাল্টা হিসেবে ২৮ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে নিয়ন্ত্রণরেখা অতিক্রম করে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের অভ্যন্তরে ঢুকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সার্জিক্যাল স্ট্রাইকে ভারতীয় নীতির একটা প্যারাডিম শিফট বা বড় পরিবর্তন বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে উপমহাদেশের ভূ-রাজনীতির সমীকরণ কি নতুন দিকে বাঁক নিচ্ছে, নাকি অন্য কিছু। অথবা উপমহাদেশের ভূ-রাজনীতির ভবিষ্যৎ কী? নতুন কোনো বিন্যাসের দিকে ধাবিত হলে তার স্বরূপ কেমন হবে? এসব প্রশ্নের পূর্ণ উত্তরের জন্য অবশ্যই আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। পরিস্থিতি এখন যে পর্যায়ে, তাতে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যদি আরেকটি যুদ্ধ হয়, তাহলে সেটি আগামী দিনের ভূ-রাজনীতির ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলবে। আর যদি যুদ্ধ না হয়, তাহলেও এ পর্যন্ত যা ঘটেছে তাতে এবং সম্প্রতি নিয়ন্ত্রণরেখা অতিক্রম করে ভারতীয় সেনা অভিযানের জের ধরে উপমহাদেশের ভূ-রাজনীতির হিসাব-নিকাশ ও  চিত্র যে একটা নতুন রূপ পাবে, তা প্রায় নিশ্চিত করেই বলা যায়। ভারত কর্তৃক নিয়ন্ত্রণরেখা অতিক্রম করাকে প্যারাডিম শিফট হিসেবে যে কারণে দেখা হচ্ছে তা হলো—উরি সেনাছাউনিতে ১৮ সেপ্টেম্বর যে সন্ত্রাসী আক্রমণ হয়েছে গত ১৬-১৭ বছরে এর চেয়েও বড় ধরনের অনেক আক্রমণ ভারতের জাতীয় নিরাপত্তাকে ভয়ানক হুমকির মধ্যে ফেলেছে পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বা এবং জইশ-ই-মোহাম্মদের মতো জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা। কিন্তু সেসব ঘটনার একটির বেলায়ও ভারতীয় সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণরেখা অতিক্রম করে কোনো অভিযান চালায়নি। এবার ব্যতিক্রম ঘটেছে।

কেন এই প্যারাডিম শিফট, তার একটা মূল্যায়ন পাওয়া যায় ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সাবেক উপপ্রধান বি. রমন কর্তৃক রচিত The Kaoboys of R & AW গ্রন্থে।

তিনি লিখেছেন, ১৯৪৭ সালের পর থেকে নিকট প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টার প্রায় ৭০ শতাংশ নিয়োজিত করা হয় পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য। কিন্তু ফল শূন্য। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান যেখানে ছিল, এখনো সেখানেই আছে। বি. রমন মন্তব্য করেছেন, সমপরিমাণ প্রচেষ্টা অন্যান্য প্রতিবেশীর বেলায় করা হলে উপমহাদেশের পরিস্থিতি আজ ভিন্ন হতো। সাম্প্রতিক কয়েক বছরে ভারতের অভ্যন্তরে ও আফগানিস্তানে ভারতের দূতাবাস ও কনস্যুলেট ভবনে  পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন কর্তৃক একের পর এক আক্রমণের পরও নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় এসে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য আগ বাড়িয়ে যেসব বাড়তি পদক্ষেপ নিয়েছেন, তার সবগুলোর ফলই শূন্য। তাই হয়তো ভারত এবার আগের অবস্থান পরিবর্তন করেছে এবং নিয়ন্ত্রণরেখা অতিক্রম করে জনচাপে সেনা অভিযান চালিয়েছে। তাই প্রশ্ন উঠেছে, এখান থেকে আমরা এখন কোন দিকে ধাবিত হতে যাচ্ছি।

ভারত-পাকিস্তান সংকট সমাধানে আলোচনা, ডায়ালগ, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সম্প্রদায়ের আহ্বান গত প্রায় ৭০ বছরে কোনো ফল দেয়নি। আঞ্চলিক ফোরাম সার্ক গঠিত হওয়ার পর কিছুটা আশার সঞ্চার হয়। কিন্তু কিছুই হয়নি। ৩০-৩১ বছরের মাথায় এসে ১৯৮৫ সালে গঠিত হওয়া সার্ক বেঁচে থাকবে কি না সে প্রশ্ন এখন সবার মুখে। সংকট মূলত দুটি জায়গায়। পাকিস্তানের অভ্যন্তরে মিলিটারি ও মোল্লাতন্ত্র এবং কাশ্মীর সংকট। পাকিস্তানের অভ্যন্তরে সব সেক্টরে শুভ শক্তির প্রতিনিধিদের কোনো স্থান নেই, সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত মিলিটারি ও মোল্লাতন্ত্রের হাতে, যাদের ভীষণ উন্মাদনায় পেয়ে বসেছে। তাদের মতে, হিন্দু ভারতের কবল থেকে জিহাদের মাধ্যমে কাশ্মীরকে মুক্ত করতে হবে, ভারত ও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে হবে এবং আফগানিস্তান হতে হবে পাকিস্তানের করতলগত ও ক্লায়েন্ট স্টেট। এহেন দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ভারত, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে পাকিস্তান রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সন্ত্রাসী-জঙ্গি তত্পরতা অব্যাহতভাবে চালাচ্ছে, যে সত্য এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত ও অকাট্য তথ্য-সাক্ষ্য দ্বারা প্রমাণিত। পাকিস্তানের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতির উন্নতির কোনো সম্ভাবনা নেই।

দ্বিতীয় সংকট কাশ্মীরকে ঘিরে। বলতেই হবে কাশ্মীরের জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে এবং সংকট সমাধানে ভারত যথেষ্ট  করতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে ব্যর্থতার দায় ভারত এড়াতে পারে না। ১৯৪৮ সালে গৃহীত জাতিসংঘের রেজ্যুলেশন অনুসারে ভারত গণভোটের আয়োজন করেনি। বৃহত্তর রাজনীতি, অর্থনীতি, শিল্প, বাণিজ্য, সংস্কৃতির সঙ্গে কাশ্মীরের জনগণকে সংযুক্ত ও একত্র করতে পারেনি ভারত। কেন পারেনি, সে উত্তর ভারতকে খুঁজতে হবে। অন্যদিকে ১৯৪৮, ১৯৬৫ ও ১৯৯৯ সালে কাশ্মীরকে ঘিরে পাকিস্তানের আগ্রাসী সামরিক অভিযান এবং ভারতের অভ্যন্তরে জঙ্গি-সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কাশ্মীর সমস্যার সমাধানের পথকে আরো জটিল ও কঠিন করে ফেলেছে। বলা যায়, শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ প্রায় রুদ্ধ। পরিস্থিতি যেখানে এসে দাঁড়িয়েছে তাতে শুধু ভারত-পাকিস্তান নয়, পুরো উপমহাদেশের নিরাপত্তা এখন ভয়ানক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। জুম্ম ও কাশ্মীরের জম্মু হিন্দুপ্রধান অঞ্চল আর কাশ্মীরে প্রায় ৯৮ শতাংশ মুসলমান। প্রশ্ন হলো, মুসলমান অধ্যুষিত কাশ্মীর যদি স্বাধীন রাষ্ট্র হয়, তাহলে কি সমস্যার সমাধান হবে? পণ্ডিত ও বিশ্লেষকরা এ প্রশ্নে ভীষণ দ্বিধান্বিত ও শঙ্কিত। ১৯৪৭ সালে একবার ধর্মের ভিত্তিতে উপমহাদেশ ভাগ হওয়ার ফলে যে রক্তগঙ্গা বয়ে গেছে তার জের ও ধারাবাহিকতা এখনো থামেনি। থামার কোনো লক্ষণও নেই। গঙ্গা, ভাগীরথী, ঝিলাম নদীতে বাহিত সে রক্ত কার, হিন্দু না মুসলমানের? এই প্রশ্ন যাঁরা করেন, মূলত তাঁরাই এই রক্তের জন্য দায়ী। একই ইস্যুতে ৭০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও মানুষের রক্ত আর ঝরতে দেওয়া যায় না। তাই কাশ্মীর মুসলমান অধ্যুষিত, শুধু এ কারণে আলাদা রাষ্ট্র হওয়ার আগে চিন্তাশীল মানুষকে ভাবতে হবে। ভারতের অভ্যন্তরে প্রায় ২০ কোটি মুসলমান রয়েছে, তাদের ওপর এই ঘটনার ভয়ানক রেশ পড়তে পারে অথবা এর ডোমিনো ইফেক্ট বা প্রভাবে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ, তিন রাষ্ট্রেরই অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে আরো বড় ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিতে পারে। সুতরাং কাশ্মীর সমস্যার সমাধান কখন, কিভাবে হবে,  তা এখন এক মহাকঠিন বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সহজ উত্তর কারো কাছে নেই।

তবে পাকিস্তান যদি মিলিটারি ও মোল্লাতন্ত্রের কবল থেকে বের হয়ে আসতে পারত, তাহলে এ অঞ্চলের জনগণের মধ্যে যে সংযোগ ও সম্প্রীতি গড়ে উঠত তাতে নিশ্চয়ই কাশ্মীর সমস্যারও একটা সমাধান বের হয়ে যেত। কিন্তু পাকিস্তান সে পথে আসছে না। তাই পাকিস্তানকে মাইনাস করেই উপমহাদেশের ভূ-রাজনীতির নতুন বিন্যাসরেখা রচিত হচ্ছে এবং তার ব্যাপক সম্ভাবনাও সৃষ্টি হয়েছে। এরই মধ্যে পাকিস্তানকে ছাড়াই কয়েকটি সম্ভাবনাময় আঞ্চলিক ফোরাম গঠিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে BCIM-EC, অর্থাৎ বাংলাদেশ, চীন, ইন্ডিয়া, মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর। সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক ফোরাম BIMSTEC, অর্থাৎ Bay of Bengal Initiative for Multi Sectoral Technical and Economic Co-operation, এখানেও পাকিস্তান নেই। এই সংস্থার সদস্য দেশ হলো—বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, মিয়ানমার, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ড। ২০১৪ সালে কাঠমান্ডুতে গত সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে পাকিস্তান সার্ক কানেকটিভিটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপাল স্বাক্ষর করে পরিপূর্ণ কানেকটিভিটি চুক্তি, দেশের আদ্যক্ষর দ্বারা যার নামকরণ করা হয়েছে BBIN অর্থাৎ বাংলাদেশ, ভুটান, ইন্ডিয়া ও নেপাল। BBIN-এর কার্যক্রম এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। BBIN ভবিষ্যতে প্রসারিত হয়ে শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, মিয়ানমারকে যুক্ত করে সার্কের  বিকল্প হিসেবে দাঁড়িয়ে যাওয়ার অপার সম্ভাবনা রয়েছে। এরই মধ্যে পাকিস্তান ছাড়া সার্কের অন্য সব দেশ সড়ক, রেল ও স্যাটেলাইট কানেকটিভিটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এ মাসের মাঝামাঝি ভারতের গোয়ায় BRICS শীর্ষ সম্মেলনের সাইডলাইনে BIMSTEC শীর্ষ সম্মেলন হবে। সেখানে আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির নতুন বিন্যাসের চিত্র আরো পরিষ্কার হবে। সম্প্রতি ভারত, বাংলাদেশ, ভুটান, মালদ্বীপ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা দিল্লিতে একত্র হয়ে দক্ষিণ এশিয়া উপ-আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা ইংরেজিতে সংক্ষেপে SASEC গঠন করেছে। এরই মধ্যে তারা ২০১৫-১৬ মেয়াদের জন্য উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এই কর্মসূচির জন্য ৭.৭ বিলিয়ন ডলারের উন্নয়ন ফান্ড প্রদানের ঘোষণা দিয়েছে। যেভাবে এগোচ্ছে, তা বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ এশিয়া বা উপমহাদেশের ভূ-রাজনীতিতে পাকিস্তানের তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে না।

অনেকে মনে করেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে স্বাধীন হওয়া মধ্য এশিয়ার মুসলমানপ্রধান দেশগুলো পাকিস্তানের জন্য বিকল্প হিসেবে কাজ করবে। কিন্তু সেখানেও সমস্যা সৃষ্টি হয়ে আছে। কারণ, পাকিস্তান হয়ে ভারতের সঙ্গে আফগানিস্তান সড়ক যোগাযোগের প্রস্তাব দিলে পাকিস্তান তা প্রত্যাখ্যান করে। জবাবে আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি বলেছেন, সে ক্ষেত্রে আফগানিস্তান হয়ে পাকিস্তানকে মধ্য এশিয়ায় যাওয়ার সংযোগ সড়ক ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। পাকিস্তান কর্তৃক আরোপিত সন্ত্রাস-জঙ্গি কর্মকাণ্ডের জন্য আফগানিস্তান এখন পাকিস্তানের বৈরী রাষ্ট্র। আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির সমীকরণে পাকিস্তানের একমাত্র ভরসা এখন চীন। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চীন পাকিস্তানকে সুবিধা প্রদানের চেষ্টা করবে। তবে সে চেষ্টার মাথায় সীমানা বেঁধে দেবে BIMSTEC, BCIM-EC এবং BRICS-এর মতো সংঘগুলো। রাশিয়া এখনো এ ক্ষেত্রে ভারতের জন্য ভারসাম্য রক্ষাকারী হিসেবে কাজ করবে। সুতরাং পাকিস্তান যদি উগ্র ধর্মান্ধ সংকীর্ণ দর্শন থেকে বের হতে না পারে এবং অভ্যন্তরীণভাবে  মিলিটারি ও মোল্লাতন্ত্রের কবল থেকে মুক্ত হতে না পারে, তাহলে বৈশ্বিক ও উপমহাদেশের ভূ-রাজনীতির বাস্তবতায় পাকিস্তান ক্রমেই আরো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।

লেখক : কলামিস্ট ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

sikder52@gmail.com


মন্তব্য