kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মার্কিন নির্বাচন ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

৯ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



মার্কিন নির্বাচন ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা

ওয়াশিংটনের সাদা বাড়িটিতে আগামী জানুয়ারিতে চার বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট হিসেবে কে প্রবেশ করতে যাচ্ছেন, তা নির্ধারিত হবে ৮ নভেম্বর। সেদিন মার্কিন দেশের ভোটারদের ভোটে নির্বাচিত হবেন দুই প্রার্থীর মধ্যে একজন—হিলারি ক্লিনটন অথবা ডোনাল্ড ট্রাম্প।

মার্কিন দেশে আর কোনো নারী রাজনীতিতে এতখানি উচ্চতায় এ পর্যন্ত উঠে আসতে পারেননি, যতখানি হিলারি ক্লিনটন পেরেছেন। যদি তিনি আগামী নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে নির্বাচিত হতে পারেন, তবে তিনিই হবেন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট।

অন্যদিকে রিপাবলিকান পার্টির মনোনীত প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে মূলত একজন ধনী ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত থাকলেও বাইরের দুনিয়ার মানুষজন তাঁর নামের সঙ্গে পরিচিত মাত্র দেড় বছর ধরে, যখন তিনি নিজ দলে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে অবতীর্ণ হন। তবে তিনি দ্রুতই বিশ্বব্যাপী খ্যাতির চেয়ে অনেক বেশি ভীতি সৃষ্টি করেই পরিচিতি কুড়িয়েছেন। তাঁকে নিয়ে খোদ নিজ দলেই ভয় আছে, যুক্তরাষ্ট্রে তো আছেই। মার্কিন সমাজ নির্বাচনকালে সব সময়ই দোদুল্যমানতার দোলাচলে দুলতে থাকে। এবারও বেশ কিছু বিষয়ে রিপাবলিকানদের দিকে পাল্লা কিছুটা ভারী হওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশেষত অভিবাসীদের নিয়ে রিপাবলিকানরা মার্কিন জনমতের কাছে একটু বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিবাসীদের সুযোগ-সুবিধা সংকোচন, অনেকটা হটিয়ে দেওয়ার মতো হাঁকডাকও দিচ্ছেন। ফলে হিলারির তুলনায় রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের বিবেচনায় যথেষ্ট দুর্বল প্রার্থী হওয়া সত্ত্বেও ট্রাম্প অভিবাসীবিরোধী জনমত সৃষ্টি ও ধরে রাখায় এখনো একটি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন, হিলারি সেই স্থানে থাকলে অনেক আগেই পিছলে পড়ে যেতেন। ভোটারদের কত শতাংশ হিলারির পররাষ্ট্রনীতি পছন্দ করে ভোট দেবেন তার স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সহজ নয়। আবার ট্রাম্পের উগ্র চিন্তাভাবনাকে সমর্থন করে কত শতাংশ ভোটার ভোট দেবেন সেটিও বলা মুশকিল। তবে সাধারণ প্রবণতাটি নেতিবাচকের দিকে হেলে আছে বলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য বলছে। হিলারি ক্লিনটনের ইতিবাচক গুণাবলির কারণে তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পেছনে ফেলে দিয়ে ওয়াশিংটনের সাদা বাড়িটিতে উঠতে পারেন—এটি অনেকেই বিশ্বাস করেন।

হিলারি ক্লিনটন নির্বাচিত হলে পৃথিবীব্যাপী গণতন্ত্র ও শুভ চিন্তার জয় হবে বলে সবাই মনে করছেন। সে ক্ষেত্রে পৃথিবীব্যাপী এ মুহূর্তে জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদের যে আতঙ্ক বিরাজ করছে, তা কাটিয়ে ওঠা সহজ হতে পারে। হিলারি তাঁর অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতির যে ধারণা দিচ্ছেন, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থসামাজিক ক্ষেত্রেও ওবামা পরিচালিত নীতির হুবহু মিল  থাকবে—এমন কিন্তু নয়। বরং তিনি তাঁর মতো করেই দেশ পরিচালনা করবেন, যা মার্কিনিদের হতাশ করার মতো হবে না। কেননা দীর্ঘদিন থেকে হিলারি মার্কিন রাজনীতি ও অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত আছেন। অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প সুযোগ পেলে বর্তমানের মতো কথাবার্তা বললে, হঠকারী সিদ্ধান্ত সেভাবে নিলে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ঠাণ্ডা মাথায় নিরসনের চেষ্টা না করলে কিংবা উসকে দিলে পৃথিবীব্যাপী ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে—সেই আশঙ্কা অনেকেই দূর থেকে করছেন। বিশেষত মুসলিমবিদ্বেষী বা বিরোধী যেসব কর্তাবার্তা তিনি বলছেন, তাতে মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দূরত্ব বাড়া ছাড়া অন্য কোনো সুযোগ থাকবে না। নির্বাচনের আগে ভোটের রাজনীতি বলে একটা কথা রয়েছে। তিনি আমেরিকান নাগরিকদের মধ্যে একটা সস্তা অভিবাসনবিরোধী ভীতির উত্থান ঘটিয়ে তরুণ ও বয়স্কদের ভোট পাওয়ার কৌশল হিসেবেই এই ইস্যুটিকে সম্মুখে এনেছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প এককভাবে বিধ্বংসী কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারবেন না। ক্ষমতায় যাওয়ার পর ভোটের আগের অনেক কিছুই ভুলে যাওয়া হয়, বাদ দেওয়া হয়। ট্রাম্পও তেমন কাজ করতে পারেন। তাহলে এমন হঠকারী ইস্যু মার্কিন মুলুকে ভোটের বাজারে বিকোচ্ছে কিভাবে সেটি মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। তার পরও ট্রাম্পের ওপর কতটা ভরসা রেখে মার্কিনিরা কিংবা বিশ্বব্যবস্থা চুপ থাকতে পারবে—সেটি বলা কঠিন। তবে পৃথিবীতে এখন জঙ্গিবাদ এবং সন্ত্রাসবাদসহ নানা ভয়ংকর সমস্যা যেমন জটিল আকার ধারণ করছে, একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভুত্বকে চ্যালেঞ্জ করার মতো নতুন নতুন শক্তির অভ্যুদয় ঘটছে। মার্কিনিদের অবস্থা অপ্রতিরোধ্য নয়, সেই জায়গায় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি, নীতি ও কৌশল কী হবে, কী হলে সবার মঙ্গল হবে, স্বার্থ অক্ষুণ্ন থাকবে, জঙ্গিবাদকে অকার্যকর করা যাবে, বিশ্বসভ্যতাকে শুধু রক্ষা করাই নয়, সবার জন্য বাসযোগ্য, সভ্যতার চেতনাপন্থী রাখা যাবে—সেটিই বড় সংগ্রাম। সেই সংগ্রামে হিলারি, নাকি ট্রাম্প—কার ওপর নির্ভর করা যাবে সেই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। ট্রাম্প জিতলে ভয় বাড়বে, হিলারি জিতলে কমবে—এমন ধারণার অবস্থান থেকে পৃথিবীকে উদারবাদীরা যতটা স্বস্তি দিতে পারে, রক্ষণশীলরা কেবল বিপরীতটাই পারে—এই শিক্ষাটিই পৃথিবীকে নিতে হবে, যারা মার্কিন মুলুকের নির্বাচন নিয়ে ভাবেন, তাঁদের নিজ নিজ দেশ নিয়েও ভাবতে হবে। সর্বত্রই সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদের প্রভাব বাড়ছে। দৃশ্যমান হচ্ছে। এ থেকে মুক্ত থাকার সচেতনতা নিজেদেরও দেখাতে হবে। তবেই পৃথিবী এবং আগামী দিনগুলো হবে শান্তিপ্রিয় মানুষের।

 

লেখক : অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

patwari54@yahoo.com


মন্তব্য