kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা

মিল্টন বিশ্বাস

৯ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা

২০ সেপ্টেম্বর ‘ডেভেলপমেন্ট অ্যাওয়ার্ড ফর আইসিটি’ পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। বাংলাদেশের মানুষের জন্য ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ উদ্যোগ বাস্তবায়নে অসামান্য অবদান ও প্রতিযোগিতামূলক টেকসই উন্নয়নের একটি হাতিয়ার হিসেবে আইসিটির প্রতি অঙ্গীকার ও অসাধারণ নেতৃত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ জয়কে এ পুরস্কার দেওয়া হয়।

১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় এলে জয়ের প্রযুক্তিবিষয়ক নিজস্ব অভিজ্ঞতা বাংলাদেশকে ডিজিটাল বিশ্বের সড়কে চলতে উৎসাহ দেয়। সে সময় থেকে তিনি শেখ হাসিনাকে পরামর্শ দিচ্ছেন। ফলে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হয়েই শেখ হাসিনা তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সরকারের প্রশাসনকে গতিশীল করাসহ আইটি সেক্টর উন্নয়নে কম্পিউটারের ব্যাপক প্রচলন ও স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীকে প্রযুক্তি বিষয়ে নিরন্তর প্রাণিত করার কর্মসূচি গ্রহণ করেন। এ জন্য তিনি বলেছেন, ‘জয়ের কাছ থেকেই আমি কম্পিউটার চালানো শিখেছি। এ জন্য সে আমার শিক্ষক। শুধু তা-ই নয়, তথ্যপ্রযুক্তির সামগ্রিক উন্নয়নের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের দরিদ্র মেহনতি মানুষ থেকে সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে স্বয়ম্ভরতা অর্জনের যে জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে, তার মন্ত্র এসেছে জয়ের কাছ থেকে। এমন সন্তানের মা হতে পেরে আমি গর্বিত। ’

আসলে আমরা বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি উদ্দীপিত মুহূর্ত যাপন করছি। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর বদৌলতে বিস্তৃত পরিসরে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট সংযোগ আমাদের যোগাযোগ ও শিক্ষার ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, তথ্যপ্রযুক্তির অবারিত প্রবাহের সুযোগে ভালো কাজের পাশাপাশি সাইবার ক্রাইম ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। জঙ্গিবাদের প্রসারে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। জঙ্গি সংগঠনগুলো যোগাযোগ ও অর্থ সংগ্রহ করে থাকে নেট ব্যবহার করে। অবশ্য সরকারের আইনিব্যবস্থাও সক্রিয় এসব অপরাধ প্রতিরোধে। প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর পুত্র জয়ের মতো ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর স্বপ্নদ্রষ্টার বিরুদ্ধেও সাইবারে অপপ্রচার চলছে। কখনো কখনো তাঁদের উভয়কে হত্যার ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের যৌক্তিক সমালোচনা প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার। কিন্তু নোংরামি কোনোমতেই মেনে নেওয়া যায় না।

২.

‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বলতে বোঝায় দেশের সব নাগরিককে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারার সক্ষমতা তৈরি করা। উপরন্তু তার চারপাশে এমন একটি পরিবেশ গড়ে তোলা, যাতে তার জীবনধারাটি যন্ত্রপ্রযুক্তি ও জ্ঞানভিত্তিক বাংলাদেশের অনন্য নিদর্শন হিসেবে প্রতিভাত হয়। এরই মধ্যে শিক্ষাসহ সরকারি-বেসরকারি ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কলকারখানা ও সেবাকে ডিজিটাল করা হচ্ছে। এতে দেশের মানুষের জীবনধারা ডিজিটাল যুগে পদার্পণ করেছে। তবে মনে রাখতে হবে, আমাদের কৃষিভিত্তিক সমাজের সাংস্কৃতিক মান ডিজিটাল যুগের স্তরে উন্নীত করা একটি কঠিন কাজ। তার জন্য সঠিক নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা দরকার। জয়ের দিকনির্দেশনায় শেখ হাসিনা সে কাজটি সুনিপুণ পরিকল্পনায় বাস্তবায়ন করে চলেছেন। মনে রাখতে হবে, এ দেশে আমরা সর্বপ্রথম শেখ হাসিনার মুখেই ডিজিটাল বাংলাদেশ ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির কথা শুনেছি। তাঁর নেতৃত্বেই সম্পন্ন হয়েছে ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপান্তরের ইতিহাস।

বাংলাদেশের অগ্রগতির ইতিহাস এখন সমৃদ্ধ। দেশের প্রতিটি সূচকে এগিয়ে আছি আমরা। শেখ হাসিনার সরকারের তৃতীয় মেয়াদের এই মুহূর্তে আমরা দেখতে পাচ্ছি, বর্তমান সরকারের সাড়ে সাত বছরে মাথাপিছু আয় বেড়েছে, জিডিপিও বেড়েছে। প্রত্যাশিত গড় আয়ু ৬৪.৫ থেকে ৭০ হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের সব সূচকেই উন্নতি হয়েছে। উন্নতি হয়েছে সামাজিক নিরাপত্তার। ব্যাপকভাবে বেড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদন। চার হাজার ৫৮৩ মেগাওয়াট থেকে সেটি ১৩ হাজার ২৮৩ মেগাওয়াট হয়েছে। অন্যদিকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিকাশ হয়েছে ব্যাপকভাবে। মোবাইল ব্যবহারকারী দ্বিগুণ হওয়া, ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ১২ লাখ থেকে সোয়া চার কোটি হওয়াসহ সব খাতেই আমাদের সম্মুখগতি দৃশ্যমান। বাংলাদেশের অতীত ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এ রাষ্ট্রের সরকারপ্রধানদের মধ্যে আর কেউ ডিজিটাল রূপান্তর বা জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ার ক্ষেত্রে তত্ত্বীয় বা প্রায়োগিক কোনো কাজ করেননি। সব দেশেই মহান নেতারা দেশের অগ্রগতিকে সামনে নিয়ে যান। শেখ হাসিনা আমাদের সেই রাষ্ট্রনায়ক। তাঁর নেতৃত্বেই বাংলাদেশে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্পূর্ণ হতে চলেছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেমন এ দেশের স্বাধীনতার রূপকার, তেমনি ‘আধুনিক’ ও ‘ডিজিটাল’ ‘জ্ঞানভিত্তিক’ বাংলাদেশ শেখ হাসিনার হাতেই গড়ে উঠেছে। এ বিষয়ে তাঁর অবদান সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে।  

৩.

আওয়ামী লীগ সরকার সব নাগরিকের জন্য ‘প্রযুক্তি বিভেদমুক্ত ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার পথে অনেক দূর এগিয়েছে। গ্রামের স্কুলের ডিজিটাল ক্লাসরুম থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত এলাকায় বসে সরকারি তথ্য জানার অসাধারণ সব সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ধারণার বদৌলতে। প্রকৃতপক্ষে প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় এই ধারণা প্রচলনের পুরো কৃতিত্ব নিতে পারেন সহজে। কারণ তিনি আধুনিক বিশ্বে শ্রেষ্ঠ প্রযুক্তির শহরে লেখাপড়া করে এসেছেন। তাঁর পরামর্শেই ইন্টারনেট সুবিধা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে এক হাজার ইউনিয়ন পরিষদের অপটিক্যাল ফাইবার ফোন নেটওয়ার্ক স্থাপন করার কাজ শুরু হয়েছে। পোস্ট-ই-সেন্টার রুরাল কমিউনিটি ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর গ্রামীণ ডাকঘর নির্মাণপ্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন হতে চলেছে। উল্লেখ্য, সম্প্রতি বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক টেরেস্ট্রিরিয়াল কেবলের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে। ফলে গ্রাহকরা নিরবচ্ছিন্নভাবে ইন্টারনেট সুবিধা ভোগ করতে পারছেন। এর মধ্যেই ৫৬টি জেলা ফাইবার অপটিক সংযোগের আওতায় এসেছে। যার ফলে বিস্তৃত এলাকায় দ্রুততর ইন্টারনেট সুবিধা পাওয়া যাবে। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ একদল মানুষকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সচেতন করে তুলেছে। অন্যদিকে তার (শাহবাগের) প্রতিক্রিয়ায় আরেক দল মানুষ প্রগতি থেকে ছিটকে পড়েছে। মানুষের চেতনা নির্মাণে প্রযুক্তির কার্যকারিতা বিবেচনার বিষয়টি গুরুত্ববহ। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার অনুসারে ২০২১ সালের লক্ষ্য হলো ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’। এ জন্য ২০১৩ সালে মাধ্যমিক স্তর ও ২০২১ সালকে টার্গেট করে প্রাথমিক স্তরে আইটি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ১৯৯৬ সালে গঠিত ও জোট সরকারের আমলে নিষ্ক্রিয় করা প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক টাস্কফোর্স সক্রিয় ও কার্যকর এখন। দেশের বিভিন্ন স্থানে হাই টেক পার্ক, সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক, আইসিটি ইনকুবেটর ও কম্পিউটার ভিলেজ স্থাপন করা হচ্ছে।   

প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থেকে টেকসই আর্থসামাজিক উন্নয়ন করা সম্ভব নয়। তাই বর্তমান সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে ২০২১ সালের মধ্যে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। গত সাড়ে সাত বছরে ব্যাংকিংসহ সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, সেবা প্রদান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি—প্রতিটি ক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির প্রয়োগ নিশ্চিত করা হয়েছে। সব বয়সী জনগণ এই প্রযুক্তি গ্রহণ করেছে। প্রতিটি ইউনিয়নে ইন্টারনেট সার্ভিস ও তথ্যসেবাকেন্দ্র চালু আছে। এগুলো থেকে প্রতি মাসে ৪০ লাখ গ্রামীণ মানুষ ই-সেবা নিচ্ছে। ইন্টারনেটের গতি বাড়ানো ও ব্যয় কমানো হয়েছে। ইন্টারনেট গ্রাহকসংখ্যা সাত গুণ বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় চার কোটিতে উন্নীত হয়েছে। ১৫ কোটি মোবাইল সিম বাংলাদেশে ব্যবহূত হচ্ছে। থ্রিজি মোবাইল ফোন চালু হয়েছে। গ্রাহকরা ভিডিওকল করাসহ উন্নত ডিজিটাল সেবা পাচ্ছে। মোবাইল ফোন প্রযুক্তি ব্যবহার করে আখচাষিদের আখ সরবরাহ ও বিল প্রাপ্তি (ই-পুর্জি), বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির বিল পরিশোধ, রেলওয়ে টিকিট ক্রয়, বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স আনয়ন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি নিবন্ধন, মোবাইল মানি অর্ডার, বিভিন্ন সেবার ডেটলাইন অবহিতকরণ ইত্যাদি সেবা চালু করা হয়েছে। সরকারি দপ্তরের ই-মেইলের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান, অনলাইন আয়কর রিটার্ন দাখিল, অনলাইন ট্যাক্স ক্যালকুলেটর ক্রমান্বয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।  

৪.

এভাবেই আওয়ামী লীগের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুসারে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। অন্যদিকে শেখ হাসিনা ‘১০ টাকা’ কেজি চাল খাওয়ানোর কথা বলেছিলেন ১৯৯৬ সালে। ২০১৬ সালে ৫০ লাখ মানুষ তাঁর সেই ওয়াদার বাস্তবায়ন দেখেছে কুড়িগ্রাম থেকে। আইনিপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে খালেদা জিয়াকে সেনানিবাস থেকে বের করা ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় কার্যকর হওয়ায় বর্তমান সরকারের ওপর জনগণের আস্থা আরো বেড়েছে। আর সজীব ওয়াজেদ জয়ের ‘ডেভেলপমেন্ট অ্যাওয়ার্ড ফর আইসিটি’ পুরস্কার প্রাপ্তি সব অর্থে সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে সাফল্যকে স্বীকৃতি দেওয়া। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর অগ্রগতি রোখার ক্ষমতা কারো নেই।

লেখক : অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ এবং পরিচালক, জনসংযোগ, তথ্য ও প্রকাশনা দপ্তর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

writermiltonbiswas@gmail.com


মন্তব্য