kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


নিরাপদ খাদ্য কি এখনো অনিশ্চিত

এ এম এম শওকত আলী

৯ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



নিরাপদ খাদ্য কি এখনো অনিশ্চিত

সেপ্টেম্বর মাসের ২৪ তারিখে একটি দৈনিকের প্রধান খবর ছিল, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা এখনো বহুদূরে। এ খবরের মন্তব্যে বলা হয়েছে যে আইন, বিধি প্রণয়নসহ নিরাপদ খাদ্য সংস্থা স্থাপন করা হলেও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রধান বাধা হলো ওই সংস্থার জনবলের অপ্রতুলতা।

স্মরণ করা যেতে পারে যে ২০০০ সালের প্রথমার্ধের আগে এ দেশের খাদ্যনীতিতে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার বিষয় খুব অল্প গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০০০ সালের প্রথমার্ধে আবার খাদ্যনীতি প্রণীত হওয়ার সময় নিরাপদ খাদ্য বিষয়টি গুরুত্ব পায়। অতীতের সব খাদ্যনীতিতে সর্বাধিক গুরুত্ব খাদ্যনিরাপত্তাকেই দেওয়া হয়। তবে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার বিষয়ে ওই সময় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাহায্যপুষ্ট একটি কারিগরি সমীক্ষা সম্পাদন করার উদ্যোগও গ্রহণ করা হয়। দুজন বিদেশি পরামর্শকসহ দুজন বাংলাদেশি পরামর্শকও এ লক্ষ্যে নিয়োগ করা হয়। এ বিষয়ে উদ্যোগী মন্ত্রণালয় ওই সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ছিল। কারণ সরকারি কর্মসম্পাদন বিধির আওতায় নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার দায়িত্ব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ছিল। ফেব্রুয়ারি ২০০৯ সালে প্রণীত বিধিমালায়ও নিরাপদ খাদ্যসংক্রান্ত বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বলা হয়েছে যে জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে ভেজাল খাদ্য ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সুরক্ষা সম্পর্কিত খাদ্যের বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধিক্ষেত্রভুক্ত। কিন্তু বাস্তবে ১৯৫৯ সালে নিরাপদ খাদ্য সম্পর্কিত আইনে খাদ্যে ভেজাল নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর ন্যস্ত করা ছিল। অধিক্ষেত্রভুক্ত এ দ্বৈততা নিয়ে কেউ কোনো সময় মাথা ঘামায়নি।

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের স্যানিটারি ইন্সপেক্টররা নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। এ ক্ষেত্রেও দুর্বলতা ছিল প্রচুর। প্রয়োজনীয় জনশক্তির অভাব ছাড়াও অন্যান্য দুর্বলতার বিষয় ছিল উপযুক্ত প্রশিক্ষণের অভাবসহ পরীক্ষাগার ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। অন্যদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে এ দায়িত্ব দিলেও একই ধরনের দুর্বলতা তাদেরও ছিল। এ ছাড়া জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে তারা থানা বা উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালসহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা নিয়ে এত ব্যস্ততা তাদের ছিল যে বাজারে কী ধরনের খাদ্য বিপণন হচ্ছে তা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের ওপর ছেড়ে দিয়ে তারা নিশ্চিত ছিল। অন্যদিকে নিরাপদ খাদ্যের বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়েরও দায়িত্ব ছিল। এ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট বা বিএসটিআই। কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ছিল এবং এখনো আছে কীটনাশক অতিমাত্রায় ব্যবহার রোধসহ সার, বীজের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ করা। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনসহ বিপণন প্রক্রিয়ায় অনেক ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। উৎপাদনের ক্ষেত্রে নিম্নমানের কিছু সারের ব্যবহার, তা ছাড়া অতিমাত্রায় কীটনাশক ব্যবহার মানবস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এ কথা অনেকে অনেক সময় বিশেষ করে বলেছেন। এ ছাড়া পানিতে আর্সেনিকের মাত্রাও ঝুঁকিপূর্ণ। আর্সেনিকের মাত্রা সেচের পানিতে বেশি হলে তা খাদ্যশস্যে প্রবেশ করতে পারে। এ নিয়ে অতীতে দেশ-বিদেশে কৃষিবিজ্ঞানীরা অনেক গবেষণা করেছেন। রান্না করা খাদ্যে এ মাত্রা স্বাস্থ্য হানিকর কি না সে বিষয়টি এখন পর্যন্ত পরিষ্কার বা নিশ্চিত নয়। অনেকটা একই যুক্তি বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক ব্যবহারের ক্ষেত্রে। এসব ঝুঁকি বন্ধ করার উপায় হিসেবে আইনের মাধ্যমে জেল-জরিমানার ব্যবস্থা রয়েছে।

১৫ বা ২০ বছর আগেও মাছে ও ফলমূলে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহারের কথা শোনা যায়নি। জানা যায়, এসব দ্রব্য ব্যবহার করে পচনশীলতা রোধ করা যায়। এ দ্রব্য অর্থাৎ ফরমালিন ব্যবহার বন্ধ করার জন্য মিডিয়া যথেষ্ট খবর প্রকাশ করে। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ এ দ্রব্য মাছ বা ফলে রয়েছে কি না তা নির্ণয় করার সহজ পদ্ধতি আবিষ্কার করে। এ পদ্ধতি যে শতভাগ নির্ভুল নয় সে বিষয়টিও প্রচার করা হয়। এসব নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের খুচরা ব্যবসায়ীরা দাবি করেন, তাঁরা আড়তদারের কাছ থেকে এসব দ্রব্য ক্রয় করেন। তাঁরা কিভাবে জানবেন এতে ফরমালিন মেশানো রয়েছে। অথচ ভ্রাম্যমাণ আদালত তাঁদের জরিমানা করেন। কোনো একপর্যায়ে খুচরা ফল ব্যবসায়ীরা এ নিয়ে এক বা দুদিনের ধর্মঘটও করেছিলেন। এরপর শীর্ষ ব্যবসায়ী সংস্থার উদ্যোগে রাজধানীর বাজারে বাজারে প্রচারসহ সচেতনতা সৃষ্টি করার কাজ করা হয়। কোনো কোনো বাজারকে ফরমালিনমুক্ত বাজার হিসেবে ঘোষণাও দেওয়া হয়। এরপর এ নিয়ে আর কোনো কথা শোনা যায়নি। ধরে নেওয়া হয়েছে এখন আর মাছ বা ফলে ফরমালিন ব্যবহার করা হয় না। সত্যিই কি তাই? অন্যদিকে বিভিন্ন ধরনের ফল বিদেশ থেকেই আমদানি করা হয়। ওই সব দেশের রপ্তানিকারকরা ক্ষতিকর কোনো রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করে কি না সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য কারো কাছে নেই। তবে বাস্তবতা হলো, এখন আর এ নিয়ে কেউ কোনো কথা বলেন না। ফরমালিন এখন আর মাছ বা ফলে ব্যবহার হয় না বলে ধরে নিলে বলা যায় যে একমাত্র জেল-জরিমানা করে এসব দ্রব্যের ব্যবহার বন্ধ করা যাবে না। এর জন্য সচেতনতা সৃষ্টিও অপরিহার্য।

২০০৬ সালের আগে যেসব খাদ্যনীতি প্রণীত হয় তার মধ্যে খাদ্যনিরাপত্তাকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে এরপর খাদ্যনীতিতে নিরাপদ খাদ্যও গুরুত্ব পেয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিত হলো ১৯৯৬ সালে এফএওর উদ্যোগে রোমে যে বিশ্ব খাদ্য সামিট (World Food Summit) অনুষ্ঠিত হয় সে সামিটে খাদ্যনিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে নিরাপদ খাদ্যকে গৃহীত সংজ্ঞায় জুড়ে দেওয়া হয়। ওই সময় থেকে এ সংজ্ঞা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি লাভ করে। গত ২৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত সংবাদে জানা যায় যে নিরাপদ খাদ্যসংক্রান্ত বিষয়ে অতীতের অর্থাৎ ১৯৫৯ সালের পিওর ফুড আইন রদ করে নতুন আইন করা হয়েছে। এর আওতায় বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ সংস্থাও সৃষ্টি করা হয়েছে। আরো জানা যায়, বর্তমানে অন্তত ১৫টি সরকারি সংস্থা নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার কাজে লিপ্ত। নতুন আইনে এখন একক কর্তৃপক্ষ হিসেবে উল্লিখিত সংস্থাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এর জন্য নির্দিষ্ট আদালতও সৃষ্টি করার বিধান রয়েছে। এ বিষয়ে বলা যায় যে অন্যান্য ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আদালত যেমন দ্রুত বিচার আদালত রয়েছে। কিন্তু ফল আশাপ্রদ নয় বলে অনেকেই বলে থাকেন। এ সম্পর্কিত অন্য উদাহরণ হলো শিশু ও নারী নির্যাতন আদালত। আলোচ্য ক্ষেত্রে খাদ্য আদালতের কথা বলা হয়েছে। ১৯৭১ সাল-পূর্ববর্তী সময়ে, বিশেষ করে পঞ্চাশের দশকে এ ধরনের আদালত ছিল। কিন্তু তা ছিল খাদ্য নিয়ে কালোবাজারি বা চোরাকারবারির জন্য। সে অভিজ্ঞতাও ভালো ছিল না। বিশেষ ও নির্দিষ্ট আদালতের অন্য ঝুঁকি হলো ঢালাওভাবে জেলায় জেলায় এ ধরনের আদালত সৃষ্টি করার ইতিহাস। এ অভিজ্ঞতা অন্যান্য ক্ষেত্রে আমাদের রয়েছে। পরে দেখা গেছে বেশির ভাগ জেলায় আদালত মামলাশূন্য বা এত কমসংখ্যক মামলা, যা বিশেষায়িত আদালতের পক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করে না। অহেতুক ব্যয় বাড়ে। যে বিষয়টি প্রয়োজন তা হলো, প্রশাসনিক পরিমণ্ডলে কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়, যা এ ধরনের অপরাধ অঙ্কুরেই বিনাশ করতে পারে।

খাদ্যে ভেজালসংক্রান্ত অপরাধ করার প্রমাণের জন্য যেকোনো আদালতের কাছে গ্রহণযোগ্য যুক্তি উপস্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি। এ ধরনের প্রমাণের অন্যতম উৎস নির্ভরযোগ্য পরীক্ষাগার। প্রকাশিত খবরে জানা যায় যে বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পরীক্ষাগার মহাখালীতে জনস্বাস্থ্য সংস্থায় কাজ শুরু করেছে। এ পর্যন্ত এ পরীক্ষাগারে অন্তত ১৫টি পণ্যে স্বাস্থ্যহানিকর দ্রব্যের অস্তিত্ব নির্ণয় করা হয়েছে। এর অধিকাংশেই অতিমাত্রায় ক্ষতিকারক কীটনাশক রয়েছে। কিন্তু এরপর কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে তা এখনো জানা যায়নি। বিষয়টি এখানেই থেমে থাকলে কোনো ফল হবে না। নবসৃষ্ট এ কর্তৃপক্ষের অন্য বাধা হলো আইনটি প্রয়োগ করার জন্য কমপক্ষে সাতটি বিধি প্রণয়ন করতে হবে, যা এখনো করা যায়নি। বিধি ও জনবল না হলে আইনটি প্রয়োগ করা সম্ভব হবে না।

 

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা


মন্তব্য