kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে আর কত তামাশা

ইসহাক খান

৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে আর কত তামাশা

মুক্তিযোদ্ধাদের সমস্যা, তাঁদের স্বীকৃতি, মন্ত্রণালয়ের বিশৃঙ্খলা, জামুকার দুর্নীতি নিয়ে চার পর্বের ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে কালের কণ্ঠে। অত্যন্ত শ্রমসাধ্য একটি কাজ করেছেন প্রতিবেদক।

তাঁকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। আমি সাংবাদিক নই, একজন মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে এই তামাশার গল্পগুলো স্বাধীনতার পরপরই শুরু হয়েছে। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরলেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন। আমরা তখনো ক্যাম্পে তাঁর নির্দেশের অপেক্ষায় আছি। কিছুদিন পর তিনি ঘোষণা দিলেন, মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র জমা দিয়ে যার যার অবস্থানে ফিরে যাও। আমরা তাঁর নির্দেশে অস্ত্র জমা দিলাম। অস্ত্র জমা দিয়ে পেলাম একটি রসিদ, বেতন হিসেবে দেড় শ টাকা। আর পেলাম জেনারেল ওসমানীর স্বাক্ষর করা একটি মুক্তিযোদ্ধার সনদ। বাড়িতে ফিরলাম। কিছুদিন পর দেখি অনুরূপ একটি সনদ আমার চেনা একজন যুবকের হাতে। সে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়নি। এমনকি সে আমাদের যুদ্ধে যাওয়া নিয়ে নানা ধরনের নেতিবাচক কথাও বলেছে। তার হাতে একই সনদ। সনদে তার নাম, বাবার নাম সব ঠিক আছে। আমি দেখে আকাশ থেকে পড়লাম। ওকে জিজ্ঞেস করলাম, এটা তুই কোথায় পেলি?

ও বলল, ‘কেন, এটা তো কিনতে পাওয়া যায়। ’ ক্ষোভে-দুঃখে আমি আমার সনদ ছিঁড়ে কয়েক টুকরো করে পানিতে ভাসিয়ে দিলাম।

তারপর দীর্ঘ সময় কেটে গেছে। ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে কয়েকবার। রাজাকাররা ক্ষমতা দখল করে মুক্তিযুদ্ধকে খোলামকুচি বানাতে চেষ্টা করেছে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা পুনর্গঠন প্রকল্প হাতে নিলে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের দরখাস্ত করতে আহ্বান করে। আমি আমার একজন সহযোদ্ধা আলী আজগারকে সঙ্গে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সংসদে যাই। তখন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের চেয়ারম্যান ছিলেন অধ্যক্ষ আহাদ চৌধুরী। তাঁর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত জানাশোনা ছিল। তাঁকে বললাম, ‘আপনারা মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করছেন। আমরা তো কিনার দিয়ে ছিলাম। আমরা তো দরখাস্ত করিনি। আমরা কি তাহলে বাদ?’

তিনি হেসে ফেললেন আমার কথায়। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনারা ট্রেনিং নিয়েছেন কোথায়?’ বললাম, ‘ভারতের তুরা পাহাড়ে। ১১ নম্বর সেক্টরের অধীন। ’ তিনি বললেন, ‘ভারত থেকে ৭৫ হাজার মুক্তিযোদ্ধার তালিকা উদ্ধার করা গেছে। সেটার পাঁচ খণ্ডে বাঁধাই করা বই লাইব্রেরিতে আছে। আগে দেখেন সেখানে আপনাদের নাম আছে কি না। থাকলে আর দরখাস্ত করতে হবে না। ’ তাঁর কথামতো সংসদের লাইব্রেরিতে গিয়ে পাঁচটি ভলিয়মের পঞ্চম ভলিয়মে আমাদের নাম খুঁজে পেলাম। ফিরে এসে আহাদ সাহেবকে বললাম, ‘ভাই, ভলিয়মে নাম আছে। তবে আমার বন্ধুর নামটি ভুল আছে। ’

তিনি বললেন, ‘এটা হয়তো টাইপের ভুল হয়েছে। আপনারা মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টে গিয়ে মূল দরখাস্ত দেখে নাম সংশোধন করে আনেন। ’ আমরা পরের দিন মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের স্টোররুমে গিয়ে তুরা পাহাড়ে বসে সাদা কাগজে নিজের হাতের লেখা সেই কাগজটি দেখে আবেগ-আপ্লুত হয়ে পড়ি। মূল কাগজে আমার বন্ধুর নাম ঠিকই আছে। টাইপেই ভুল। কল্যাণ ট্রাস্টের পরিচালক আমার বন্ধুর নাম সংশোধন করে সই-সিল মেরে দিয়ে দিলেন। আমরা সেই কাগজ নিয়ে আবার সংসদে এলাম। আহাদ সাহেব দেখে বললেন, ‘এখন আর আপনাদের নতুন করে দরখাস্ত দেওয়ার দরকার নেই। এই ভলিয়ম প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে এক কপি আছে। আর আছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে এবং এই সংসদে। ’ তারপর তিনি একটি ফরম দিয়ে বললেন, ‘এটি পূরণ করে দেন। কয়েক দিন পর প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষর করা একটি সনদ পাবেন। ’

মাসখানেক পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বাক্ষর করা একটি সনদ পেলাম।

কালের কণ্ঠের প্রতিবেদক তাঁর চার পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনে লিখেছেন, বর্তমানে সনদপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা দুই লাখের ওপরে। আরো এক লাখ ৩৬ হাজার আবেদন জমা পড়ে আছে। এ পর্যন্ত জাতীয়ভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের চারটি খসড়া ও একটি চূড়ান্ত তালিকাসহ মোট পাঁচটি তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রতিবার তালিকা করার সময় বেড়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা। এরশাদ সরকারের আমলে ১৯৮৬-৮৭ সালে প্রথম মুক্তিযোদ্ধাদের খসড়া তালিকা প্রণয়ন করা হয়। সেই তালিকায় মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ছিল এক লাখ দুই হাজার ৪৫৮ জন। ১৯৯৩-৯৪ সালে বিএনপি সরকারের আমলে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার [এনএসআই] তৎকালীন মহাপরিচালক আজম আমিনুল হককে মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের আহ্বায়ক করা হয়। তাঁর করা তালিকায় ৮৮ হাজার মুক্তিযোদ্ধা বাড়তি হিসেবে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর প্রথম যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মিলিত তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের তৎকালীন নির্বাচিত চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ আহাদ চৌধুরীর নেতৃত্বে উপজেলা পর্যায়ে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে যে তালিকা, সেটি মুক্তিযোদ্ধাদের ‘লাল বই’ হিসেবে পরিচিত। ১৯৯৭ থেকে ২০০০ সালে প্রণীত ওই তালিকায় এক লাখ ৫৪ হাজার মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত হন। এই তালিকা নিয়ে বিতর্ক কম বলে এটিকে সংশ্লিষ্ট মহল যৌক্তিক মনে করে। [সূত্র : কালের কণ্ঠ]

গোল বাধে সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করায়। চাকরির বয়স বৃদ্ধি করায় বড় বড় কর্মকর্তা নিজেদের নাম মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে নেন। গেজেটেও নাম অন্তর্ভুক্ত করেন। এখানে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং যুগ্ম সচিবও ছিলেন। মানুষ কতটা নির্লজ্জ হলে এমন কাজ করতে পারে? যাচাই-বাছাইয়ের পর তাঁদের নাম গেজেট থেকে বাদ দেওয়া হয়। তাঁদের সনদও প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু তাঁদের এই অপকর্মের কোনো শাস্তি দেওয়া হয়নি। এর মধ্যে মজার একটি সংবাদ চোখে পড়ে। একটি দৈনিকে শিরোনাম করেছে, ‘দুই বেয়াই ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’। খবরে জানা যায়, জামুকার [জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল] সহকারী পরিচালক শাহ আলম তাঁর বাবা ও শ্বশুরকে নিজের ক্ষমতাবলে মুক্তিযোদ্ধা বানিয়েছিলেন। পরে তাঁরা দুজনই লিখিতভাবে জানিয়েছেন, তাঁরা মুক্তিযোদ্ধা নন।

কয়েক দিন আগে সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. সহিদুর রেজার দেওয়া ভুয়া সনদে পুলিশে চাকরি নিয়ে বিপদে পড়া ১৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে দুদক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে কমান্ডার এই ভুয়া সনদ দিয়েছেন, তাঁকে কেন গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না? যাঁর কারণে এই নিরীহ মানুষগুলো শাস্তি পাচ্ছেন, তাঁর বিচার হওয়া অত্যন্ত জরুরি। মুক্তিযোদ্ধারাই ভুয়াদের মুক্তিযোদ্ধা বানাচ্ছেন। এখানে মন্ত্রণালয়ের নীরব ভূমিকায় আমরা বিস্মিত। তারা হাত-পা গুটিয়ে শুধু তামাশা দেখছে।          

                        

লেখক : গল্পকার, টিভি নাট্যকার


মন্তব্য