kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


রোমাঞ্চকর ক্রিকেট উৎসব

ইকরামউজ্জমান

৭ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



রোমাঞ্চকর ক্রিকেট উৎসব

আজ ক্রিকেট অন্তঃপ্রাণদের প্রতীক্ষার অবসান হবে। মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে তিন ম্যাচের সিরিজের প্রথম ম্যাচ।

আক্রমণাত্মক আর রোমাঞ্চকর ক্রিকেট উৎসব। বাংলাদেশে আসার আগে ইংলিশ ক্রিকেটারদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়টি বড় বেশি মিডিয়ায় আলোচিত হয়েছে। যাহোক, বাংলাদেশে পৌঁছেই কিন্তু ক্রিকেটাররা খেলার মধ্যে ডুবে গেছেন। জস বাটলারের নেতৃত্বে ক্রিকেটারদের মাথায় এখন একটি চিন্তা কাজ করছে তা হলো, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কন্ডিশনের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেওয়া। যেহেতু দলের কয়েকজন খেলোয়াড়ের এর আগে বাংলাদেশে খেলার অভিজ্ঞতা আছে, আর তাই গরম আবহাওয়াকে উপেক্ষা করে কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে খুব একটা সময় লাগবে না। গত শীতে ইংল্যান্ড দল দুবাইয়ের কন্ডিশনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়ে ভালো ক্রিকেট খেলেছে। ইংল্যান্ড-বিসিবি প্রস্তুতি মাচে বিসিবি একাদশকে চার উইকেটে হারিয়েছে ইংল্যান্ড। এই খেলার মধ্যে কিছু প্রশ্নের উত্তর আছে, যা জাতীয় দল মাঠে সেট হতে কাজে লাগবে বলে মনে করছি।

গত বছর অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে খেলার পর বাংলাদেশ জাতীয় দল সাহস ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দুর্দান্ত ওয়ানডে ক্রিকেট খেলেছে নিজেদের কন্ডিশনে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বিশ্বে পরিচিত হয়েছে সমীহ জানানো দলে। দেশের মাটিতে ধারাবাহিকতা বজায় রেখে জাতীয় দল পাকিস্তান, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়েকে হারিয়ে সম্প্রতি আফগানিস্তানের (আফগানিস্তান আইসিসির সহযোগী সদস্য। সঙ্গে তিন ম্যাচের সিরিজের শেষ খেলায় বাংলাদেশ শততম ওয়ানডে জিতেছে। শততম জয় এসেছে ৩১৫ নম্বর ম্যাচে) বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জিতেছে। ২০১৪ সালের নভেম্বর থেকে যদি বলি, (জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে) তাহলে বাংলাদেশ জাতীয় দল গত দুই বছরে ওয়ানডে সিরিজ জয়ের পতাকা উড়িয়েছে ছয়বার।

উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত বাংলাদেশ জাতীয় দল এখন স্বপ্ন দেখছে সফরকারী ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জয়ের, যা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও অর্থবহ। সিরিজ জিতলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশ পৌঁছে যাবে নতুন এক উচ্চতায়। দুই দেশের মধ্যে বিগত চারটি ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশে জিতেছে তিনটি খেলায়। বাংলাদেশ ইংল্যান্ডকে নিজ কন্ডিশনে ছাড়াও দেশের বাইরে ভিন্ন কন্ডিশনে পরাজিত করেছে। গত বিশ্বকাপে অ্যাডিলেডে বাংলাদেশের কাছে পরাজিত হওয়ায় ইংল্যান্ডকে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হয়েছে। ইংল্যান্ড ও বাংলাদেশ গত দেড় বছরের ওয়ানডে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সফলতার বিচারে বাংলাদেশ এগিয়ে আছে। ইংল্যান্ড ৩০টি ওয়ানডে  (দুটি বৃষ্টিতে ভেসে গেছে) খেলে জিতেছে ১৭টিতে। আর বাংলাদেশ ১৫টি খেলে জিতেছে ১২টিতে। বাংলাদেশের সব জয় অবশ্য নিজ কন্ডিশনে। এ ছাড়া উভয় দলের ক্রিকেটারদের ওয়ানডে ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতার দিক থেকেও বাংলাদেশ এগিয়ে আছে।

জস বাটলারের নেতৃত্বে সফরকারী ওয়ানডে দলটি অভিজ্ঞ ও তরুণ খেলোয়াড় নিয়ে গঠিত একটি শক্তিশালী নিটোল দল। বিভিন্ন ধরনের অপশনের চিন্তা মাথায় নিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের দুর্বলতা নির্ণয় করে সিলেক্টররা চূড়ান্ত স্কোয়াড ঠিক করেছেন নির্দিষ্ট লক্ষ্য সাধনের জন্য। বাংলাদেশের পর ইংল্যান্ড ভারতে ওয়ানডে সিরিজ খেলবে—এসব কিছুই মাথায় রেখেছেন।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ জয় ক্রিকেটীয় দৃষ্টিকোণ থেকে একটি বড় চ্যালেঞ্জ সন্দেহ নেই। তবে এই চ্যালেঞ্জ জয় অসম্ভব কিছু নয়। খুবই সম্ভব। যদি বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা সবাই মিলে মাশরাফি বিন মুর্তজার ‘টিম বাংলাদেশ’ হয়ে সামর্থ্য, অভিজ্ঞতা ও নিজ কন্ডিশনকে কাজে লাগিয়ে দায়িত্বশীল ভালো ক্রিকেট খেলতে পারেন। ক্রিকেট উপভোগ করেন। সিরিজ চলাকালীন সব কিছু মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে শুধু ক্রিকেটের মধ্যে মনঃসংযোগ ধরে রাখেন। সবচেয়ে বড় কথা হলো নিজের আস্থা ও শক্তির প্রতি বিশ্বাস। ক্রিকেটারদের মনে রাখতে হবে, খেলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশ, দেশপ্রেম, দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা ও জাতীয়তাবাদ। দেশের ১৬ কোটিরও বেশি মানুষ মাঠের বাইরে ক্রিকেটারদের পেছনে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে। এর চেয়ে বড় প্রেরণা, সাহস ও শক্তি আর কিছু কি হতে পারে?

গত বিশ্বকাপ ক্রিকেটে ধাক্কা খাওয়ার পর ইংল্যান্ড দল আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তারা এখন প্রাণবন্ত ও আক্রমণাত্মক ওয়ানডে ক্রিকেট খেলছে। এ ক্ষেত্রে ইংল্যান্ডের নিয়মিত ওয়ানডে অধিনায়ক ইয়ান মর্গানের অবদান আছে। সর্বোচ্চ নিরাপত্তার আশ্বাস পাওয়া সত্ত্বেও মর্গান বাংলাদেশে আসতে চাননি। এই সফরে তাই ওয়ানডে সিরিজে ইংল্যান্ডকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন জস বাটলার। ইতিবাচক ক্রিকেটার হিসেবে তাঁর সুনাম আছে। অধিনায়ক মর্গান ছাড়াও নিরাপত্তা শঙ্কায় অ্যালেক্স হেলসও বাংলাদেশে আসতে চাননি। মর্গান বাংলাদেশে আসেননি; কিন্তু ভারতের বিপক্ষে আবার ওয়ানডের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করবেন। এদিকে বিশ্রাম দেওয়া হয়েছে কৃতী ক্রিকেটার জো রুটকে। চোটের কারণে শেষ মুহূর্তে স্কোয়াড থেকে বাদ পড়েছেন ফাস্ট বোলার জেমস অ্যান্ডারসন ও মার্ক উড। এ দুজনের জায়গায় নটিং হ্যাম্পশায়ারের জ্যাকবেন ও মিডিলসেক্সের স্টিভেন ফিনকে দলভুক্ত করেছে ইংল্যান্ড। ইংল্যান্ড এই মৌসুমে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে পাঁচ ওয়ানডের সিরিজ জিতেছে ৩-০ ম্যাচে। আর পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ জিতেছে ৪-১ ব্যবধানে। গত আগস্টে পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে ক্রিকেটে ৪৪৪ রান করে বিশ্ব রেকর্ড গড়েছে ইংল্যান্ড। ইংল্যান্ড ওয়ানডে ক্রিকেটে গত দেড় বছর প্রতিটি ম্যাচে প্রচুর রান (৩০টি ম্যাচে ১৩ বার করেছে ৩০০ রানের বেশি। দুইবার অতিক্রম করেছে ৪০০ রান। বাংলাদেশে এসে বিসিবি একাদশের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে ৪৬.১ ওভারে ৬ উইকেটের বিনিময়ে করেছে ৩১৩ রান)। এতে বোঝা যাচ্ছে ইংল্যান্ডের ক্রিকেটাররা ওয়ানডে সিরিজে তাঁদের রানের মিছিল আরো দীর্ঘ করার সর্বাত্মক চেষ্টা করবেন। উভয় দেশের রান যখন বেশি হবে দর্শকদের কাছে ক্রিকেট উৎসব হবে অনেক বেশি মোহনীয় ও প্রাণবন্ত। ক্রিকেট মাঠে তো রানের মতো আর গান নেই।

বাংলাদেশ জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের প্রতি আমাদের আস্থা ও বিশ্বাস সব সময়ই আছে। দেশের সম্মানের জন্য তাঁরা লড়বেন সর্বাত্মকভাবে। টিম ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব হলো প্রতিপক্ষের সবলতা, দুর্বলতা ও পাশাপাশি উইকেটের চরিত্র বিচার করে আবেগ ও দুর্বলতা মেনে নিয়ে মাঠে সঠিক একাদশ নামানো এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ।

 

লেখক : ক্রীড়া লেখক ও কলামিস্ট


মন্তব্য