kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

এপার-ওপার

গোয়ায় গোলমাল

অমিত বসু

৬ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



গোয়া, প্রকৃতির আদরে মোড়া। চমৎকার রাস্তা।

পৌঁছলে স্বাগত জানাবে সমুদ্র। সৈকতের শেষ নেই। কালাস্লুট, কোলভা, ভাগাটোর, বাগা, হারমাল, আমজুনা, মিরামার। বিশ্ব পর্যটকদের প্রিয় জায়গা। মধুচন্দ্রিমার যথার্থ স্থান। এখানেই ১৬ অক্টোবর বৈঠক বাংলাদেশ-ভারতের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-নরেন্দ্র মোদির। ‘বিমসটেক’ শীর্ষ সম্মেলনে আসবেন মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ডের সরকারপ্রধানরা। অর্থনৈতিক সমন্বয়ের নতুন দরজা খোলার চেষ্টা হবে। চুক্তিতে মৈত্রী দৃঢ় করার ইঙ্গিত থাকবে। গোয়ার বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী লক্ষ্মীকান্ত পারসেকর সতর্ক। আয়োজনে যেন ত্রুটি না থাকে। রাজ্যটা ভারতের ক্ষুদ্রতম হলেও কাজটা যে খুব বড়, তিনি জানেন। সামনে নির্বাচন। দ্বিতীয়বার মুখ্যমন্ত্রী হওয়াটা অনিশ্চিত। বিজেপি জিতলেও তার গ্যারান্টি নেই। আগে মোদির মন জয় করা দরকার। বিমসটেক সম্মেলন সুচারুভাবে সম্পন্ন হলে মোদির হৃদয়ে দাগ কাটার আশা। ঝামেলা পাকিয়েছেন পর্যটনমন্ত্রী দিলীপ পারুলেকর। নির্বাচনের মুখে মুখ্যমন্ত্রী সব মন্ত্রীকে সাবধান করেছিলেন। বলেছিলেন, মেপে পা ফেলুন। বিতর্কে জড়াতে যেন না হয়। শেষমেশ ঝঞ্ঝাট পিছু ছাড়ল না। বিরোধী দল কংগ্রেসের নিশানায় পারুলেকর। দুর্নীতির অভিযোগে তাঁর পদত্যাগও দাবি করা হয়েছে। সমস্যার শিকড় সমুদ্রতটেই। পর্যটনমন্ত্রী হিসেবে পারুলেকর চেয়েছিলেন পর্যটনের আকর্ষণ বাড়াতে, সব সমুদ্রসৈকত ঝকঝকে তকতকে করে রাখতে। সেটা করতে গিয়ে নিজেকেই যে কালিঝুলি মাখতে হবে কে জানত। সরকারি কর্মীদের ওপরে ভরসা রাখতে না পেরে সাফাই আর সৌন্দর্যায়নের দায়িত্ব দিয়েছিলেন বেসরকারি সংস্থাকে। সেখানেই গোলমাল। সংস্থাটির সঙ্গে অবৈধ লেনদেনের দায়ে পর্যটনমন্ত্রী। তার সত্য-মিথ্যা যাচাই করা পরের কথা। আগুনে হাওয়া দিচ্ছে বিরোধীরা। সাত সমুদ্রের ক্ষমতা নেই সে আগুন নেভানোর। পাবলিকও ভাবছে, যা রটে কিছু তো বটে।

মুখ্যমন্ত্রী পারসেকর ফাঁপরে। কী করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। পর্যটনমন্ত্রীকে না পারছেন ফেলতে, না পারছেন গিলতে। বিপদ যখন আসে এভাবেই আসে। মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা দিচ্ছে সহযোগী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ বা আরএসএস। তারা কোথায় ঘর বাঁচাবে তা নয়, তারাই ঘর ভাঙতে লেগেছে। গোয়ার আরএসএস প্রধান সুভাষ ভেলিঙ্গকর। তিনি বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত। তাঁর অভিযোগ, সরকার অনৈতিক কাজ করছে। তারা ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোকে অর্থ সাহায্য করছে। আর্থিক অনুদান পাওয়ার কথা একমাত্র আঞ্চলিক ভাষার স্কুলগুলোর। কোঙ্কনি, মারাঠি গোয়ার ভাষা। এ দুটি ভাষার উন্নতিতে সরকারি তৎপরতা দরকার। ইংরেজির জন্য নয়। ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে যারা পড়ে, তারা ধনী ঘরের সন্তান। তাদের জন্য দরদ কিসের। আরএসএস হাইকমান্ড, ভেলিঙ্গকরকে পদচ্যুত করার অবস্থা আরো জোরালো। পদ খোয়ানোর জ্বালায় জ্বলে উঠে ভেলিঙ্গকর জানিয়েছেন নির্বাচনে তিনি বিজেপির বিরুদ্ধে লড়বেন। এটা রাগের কথা না সত্যি কথা, স্পষ্ট নয়। ঘরের ঝগড়া বাইরে গেলে বিরোধীরা সুবিধা পাবে। তারা তখন বলবেই, বিজেপিকে হারাতে আমাদের দরকার নেই। ওরা নিজেরাই নিজেদের হারাবে।

মনোহর পারিক্কর গোয়ার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী। বর্তমানে কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ডান হাত। ভেলিঙ্গকরের অভিযোগ, পারিক্করই তাঁর বিরুদ্ধে কলকাঠি নাড়ছেন। বিজেপির ক্ষতির শঙ্কায় দিল্লির হাইকমান্ডও বসে নেই। গোয়ায় বিজেপির বাড়বাড়ন্ত পারিক্করের জন্যই। নির্বাচনী প্রচারে তাঁকে সামনে রাখার পরিকল্পনা।

গোয়ায় বিজেপি, কংগ্রেস দুই জাতীয় দলের লড়াই চিরদিনের। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার সময়েও গোয়া ছিল পর্তুগিজদের শাসনে। ১৯৬১ সালের ১৯ মে তাদের হাত থেকে মুক্ত হয়। ১৯৯২ সাল পর্যন্ত গোয়া, দমন, দিউ একসঙ্গে শাসন করত কেন্দ্র। পরে দমন-দিউকে পৃথক করে দেওয়া হয়। ১৯৮৭ সালের ৩০ মে গোয়া ভারতের ২৫তম রাজ্যে পরিণত। তখন থেকেই বিধানসভা নির্বাচন। প্রথম নির্বাচনে বিজেপির বয়স মাত্র সাত। ১৯৮০ সালে অটল বিহারি বাজপেয়ি লালকৃষ্ণ আদভানির নেতৃত্বে জন্ম দলটি তখনো ডালপালা বিস্তারের সুযোগ পায়নি। ধীরে ধীরে গোয়া আর পাশের রাজ্য মহারাষ্ট্রে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। এখন মহারাষ্ট্র ও গোয়া দুটি রাজ্যই বিজেপির দখলে। মহারাষ্ট্রের রাজধানী মুম্বাইয়ে বিজেপির শক্ত সংগঠন। মুম্বাইয়ের খুব কাছেই গোয়ার রাজধানী পানাজিতে শিকড় ছড়াতে অসুবিধা হয় না। মহারাষ্ট্রের আঞ্চলিক দল শিবসেনার আধিপত্য খর্ব বিজেপির প্রভাবে। কংগ্রেস দুর্বল। সাত বছর আগে ছবিটা ছিল উল্টো। বিজেপির থেকে অনেকটাই এগিয়ে ছিল কংগ্রেস। ২০১৪ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসকে হটিয়ে ক্ষমতায় আসে বিজেপি। মহারাষ্ট্র যার গোয়াও তার, এটাই নিয়ম। সেই হিসেবে দুই বছর আগেই ২০১২ সালে গোয়া বিজেপির দখলে। বিজেপি একাই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। বিধানসভার মোট ৪০টির ২১টি তাদের। কংগ্রেস মাত্র ৯। বিজেপির ধাক্কায় আঞ্চলিক দলগুলোর অবস্থা সসেমিরে।   আগে তাদের যথেষ্ট দাপট ছিল। দলীয় কোন্দলে সেটা খুইয়েছে। মহারাষ্ট্রের ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি কংগ্রেস থেকে ছিটকে আসা নেতা শারদ পাওয়ারের তৈরি। কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধে মহারাষ্ট্রে ক্ষমতায় ছিল দীর্ঘদিন। তাদেরও ভিত নড়েছে। পাঁচ বছর আগে গোয়ায় একটি আসনও পায়নি। অবস্থা উন্নতির কোনো লক্ষণ নেই।

নির্বাচনের আর মাত্র পাঁচ মাস। সব দলই নিজেদের জমি শক্ত করতে চাইছে। বিরোধীদের ভরসা অ্যান্টি ইনকামবেন্সি বা প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়ার ওপর। যে দল ক্ষমতায় থাকে, তাদের বিরুদ্ধে জনমত কিছুটা হলেও সুইং করে। কংগ্রেস ভাবছে, বিজেপির ভেতরে গোলমাল। সেটাকে কাজে লাগিয়ে মানুষকে যদি নিজেদের দিকে টানা যায়। টানবে কে। কংগ্রেসের সংগঠন কোথায়। তাদের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব টালমাটাল। সোনিয়া গান্ধী অসুস্থ। পুত্র রাহুল গান্ধী আকর্ষণশূন্য। কার জোরে লড়বে। গোয়ায় কংগ্রেস অফিস এখনো সুনসান। কর্মীরাই যদি অনাগ্রহী হয় মানুষ সাড়া দেবে কিসের টানে।

লেখক : কলকাতার সাংবাদিক


মন্তব্য