kalerkantho

মঙ্গলবার। ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ । ৯ ফাল্গুন ১৪২৩। ২৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সৌরবিদ্যুৎ হোক উন্নয়নের চাবিকাঠি

মুহাম্মদ ফারুক খান

৫ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



সৌরবিদ্যুৎ হোক উন্নয়নের চাবিকাঠি

বিদ্যুৎশক্তি যেন জীবনীশক্তির মতোই; জাতির শিরা-ধমনিতে প্রবল ও সক্রিয় উপস্থিতিই তার স্বাভাবিক চলমানতা অক্ষুণ্ন রাখে, গতিময় করে। শিল্প-কলকারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য-অর্থনীতি, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, স্বচ্ছন্দ ও শান্তিময় জীবনযাপন, বিনোদন—সর্বক্ষেত্রেই বিদ্যুতের উপস্থিতি।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে কোনো জ্বালানির প্রয়োজন হয় না, কোনো লোডশেডিং নেই, এমন একটি মাধ্যমের নাম সৌরবিদ্যুৎ।

সূর্যের তাপ সংরক্ষণ করার জন্য অনেক সৌরকোষ একত্রে সংযুক্ত করে একটি সৌর প্যানেল তৈরি করা হয়। ওই সৌর প্যানেলের ওপর সূর্যের আলো পড়লেই এতে ভোল্টেজ সৃষ্টি হয় এবং সংযুক্ত তারের মাধ্যমে এটি থেকে বিদ্যুৎ পাওয়া যায়।

রাতের বেলা সূর্যের আলো থাকে না বলে দিনের বেলায় উৎপন্ন করা বিদ্যুৎ ব্যাটারিতে জমিয়ে রাখা হয়। রাতে ওই ব্যাটারি থেকে টিভি, লাইট, টেবিল ফ্যান, স্ট্যান্ড ফ্যান, ফ্রিজ, ল্যাপটপ, মোবাইলসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক পণ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়ে থাকে।

জীবন যেমন থেমে থাকে না, থেমে থাকে না উন্নয়নের উদ্যোগ-আয়োজনও; সে কারণে বিদ্যুত্ঘাটতি কাটিয়ে ওঠার প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হয়েছে সব সময়। তেমনি বিকল্প শক্তির অনুসন্ধানও করতে হয়েছে আমাদের। গ্যাস ও তেলশক্তির সাহায্যে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুতের দ্রুত জোগান নিশ্চিত করা সহজসাধ্য নয় বলেই বিকল্প বিদ্যুত্শক্তির প্রয়োজন ও প্রাসঙ্গিকতা বেশি করে সামনে এসেছে। এই প্রয়োজন মেটাতেই সম্ভাবনার আলোকবর্তিকা নিয়ে এসেছে সৌরবিদ্যুৎ।

ন্যূনতম রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে বাড়ির যেকোনো রৌদ্রময় স্থানে সহজেই এটি স্থাপন করা যায়। এই বিদ্যুতে উচ্চ ভোল্টেজ না থাকায় বিদ্যুত্স্পৃষ্ট বা তড়িতাহত হওয়ার আশঙ্কা নেই। সৌর প্যানেলের ওপর ভিত্তি করে এটি প্রায় ২০ বছর পর্যন্ত সেবা দিতে পারে। এ ছাড়া রয়েছে শক্তিশালী চার্জার, যা অতিরিক্ত ভোল্টেজ, কম ভোল্টেজ ও শর্টসার্কিট থেকে সব ধরনের বৈদ্যুতিক পণ্য রক্ষা করে।

বাংলাদেশের যেসব এলাকায় পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ নেই, সেসব এলাকার অনেক পরিবারই সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে থাকে। একসময় সৌরবিদ্যুৎ শুধু বাড়িতে ব্যবহার করা হতো। হোম সিস্টেম ছাড়াও এখন বিভিন্ন হাসপাতাল, ক্লিনিক, এমনকি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে মেশিন চালানোর কাজেও সৌর প্যানেল ব্যবহার করা হচ্ছে। সৌরবিদুত্যের আলোয় আলোকিত হয়েছে বেশ কিছু পশ্চাৎপদ এলাকা; বিশেষ করে যেখানে বিদ্যুৎ যাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

দেশে বিদ্যুতের চাহিদা প্রতিদিনই বাড়ছে। চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এখানে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন করা এখনো সম্ভব হয়নি। এ ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুৎ হতে পারে সম্ভাবনাময়। এরই মধ্যে এ সম্ভাবনার আভাস সর্বত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে। দেশের অনেক প্রত্যন্ত গ্রাম, চর ও পাহাড়ি এলাকায় এখন রাতে সৌরবিদ্যুতে বাতি জ্বলছে। রাতে বাতি জ্বালানো ছাড়াও বৈদ্যুতিক পাখা ও টেলিভিশন চালানোর কাজে সৌরবিদ্যুৎ এসব এলাকার মানুষের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়েছে। একের পর এক এই সুবিধা ছড়িয়ে পড়ছে দেশের নানা এলাকায়।

২০০৩ সাল থেকে দেশে নানা এলাকা ইডকল, গ্রামীণ শক্তি, ব্র্যাক, সৃজনী প্রভৃতি কম্পানি সৌরবিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্ব পালন করে আসছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বাংলাদেশের মতো একটি সৌর আলোকিত দেশে সারা বছরই পর্যাপ্ত পরিমাণ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। এখানে বছরের ৩০০ দিনের বেশি সময় রোদ থাকে। ইউরোপ ও আমেরিকার খুব কম দেশে সারা বছর এত বেশি রোদ থাকে। তা সত্ত্বেও সেখানে কার্যকর অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অনেক বেশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। বাংলাদেশে প্রত্যন্ত অঞ্চলে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা দরকার।

বর্তমানে সৌরবিদ্যুত্চালিত পাম্পের সাহায্যে সেচকাজ চলছে। যদি পরিকল্পিতভাবে সারা দেশেই সৌরবিদ্যুত্চালিত পাম্পের সাহায্যে সেচকাজ করা সম্ভব হয় তাহলে বছরে বিপুল পরিমাণ ডিজেল সাশ্রয় হয়। এর ফলে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা বাঁচবে। এই ব্যবস্থায় কার্বন নিঃসরণ বন্ধের মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব। কারণ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণরূপে পরিবেশবান্ধব।

সেচ মৌসুমে কম খরচে ক্ষেতে পানি দেওয়ার ক্ষেত্রে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে সৌরবিদ্যুত্চালিত সোলার পাম্প প্রকল্প; যা কৃষি অর্থনীতিতে খুলে দিচ্ছে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার। ২০১৮ সালের মধ্যে দেশের প্রায় শতভাগ ডিজেলচালিত পাম্প সৌর প্রকল্পের আওতায় চলে আসবে। বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের আশা, পরিবেশবান্ধব এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে কমবে আমদানিনির্ভরতা।

কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির বাংলাদেশে ডিজেলের ঘাটতি কিংবা বিদ্যুৎ সংকটে প্রায় প্রতিবছরই বিঘ্নিত হয় সেচ কার্যক্রম, ব্যাহত হয় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা। সেচ সমস্যা দূর করতে সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইডকল এরই মধ্যে দেশব্যাপী ফসলি জমিতে স্থাপন করেছে দুই শরও বেশি সোলার পাম্প। বর্তমানে বাংলাদেশে ১৩ লাখেরও বেশি ডিজেলচালিত সেচপাম্প আছে। এসব সেচপাম্পে যদি সৌরশক্তি ব্যবহার করা যায়, তাহলে একদিকে ডিজেলের সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে এটি পরিবেশের জন্যও ভালো। সেচ মৌসুমে ফসল উৎপাদনে ডিজেল পাম্পের জায়গায় সোলার পাম্প স্থাপন করা গেলে বছরে প্রায় ১০ লাখ টন জ্বালানি তেল সাশ্রয় করা সম্ভব।

বর্তমান যুগে বিদ্যুৎ একটি দেশের উন্নয়নের চাবিকাঠি। সৌরবিদ্যুতে কোনো ধরনের খরচ নেই। সূর্যের তাপের সাহায্যে এই বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশের জন্য সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।

 

 

লেখক : সংসদ সদস্য, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং সাবেক মন্ত্রী, বাণিজ্য,

 বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়


মন্তব্য