kalerkantho


কর ফাঁকির খবর ট্রাম্পের জন্য সর্বনাশা হবে

ড্যানিয়েল পলিটি

৪ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



কর ফাঁকির খবর ট্রাম্পের জন্য সর্বনাশা হবে

মার্কিন নির্বাচনের গতিধারা মৌলিকভাবে বদলে দিতে পারে, এমন এক প্রতিবেদনই ছেপেছে নিউ ইয়র্ক টাইমস, শনিবার রাতে। ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্ভবত দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে কর ফাঁকি দিয়ে এসেছেন, দেখানো হয়েছে প্রতিবেদনে। নভেম্বরে নির্বাচন। তাই প্রচারণার এই শেষ পর্বে ছাড়া এই প্রতিবেদনকে অনেকেই যে ‘অক্টোবর সারপ্রাইজ’ বলছেন তাতে বিস্মিত হওয়ার বেশি কিছু নেই। এই প্রতিবেদনের জেরে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর অনেক ভোট সত্যিই হাতছুট হয়ে যেতে পারে। এই আশঙ্কার কিছু কারণও আছে।

এক. হিলারি ক্লিনটন যথার্থই বলেছেন যে ট্রাম্পের টেরিবল তথা ভয়াবহ কোনো গোমর রয়েছে। প্রথম বিতর্কে হিলারি মুখের ওপরই বলেছেন, ট্রাম্প আয়করের তথ্য প্রকাশ করছেন না, মানেই নেপথ্যে বড় গলদ রয়েছে। কেঁচো খুঁড়তে গেলেই সাপ বেরোবে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন পড়ে অনেক ভোটার এখন হিলারির অভিযোগকেই সত্যি বলে ধরে নেবে।

দুই. এই তাহলে সফল ব্যবসায়ীর চেহারা? ট্রাম্পকে নিয়ে এমন প্রশ্ন এখন অনেকে করতেই পারেন। প্রচারণার গোড়া থেকেই ট্রাম্প শিবির থেকে বলা হচ্ছে, একজন সফল ব্যবসায়ীকে আপনারা নির্বাচন করুন। অর্থনীতির চাকা সচল রাখার সব জাদুমন্ত্র তাঁর জানা। একবার প্রেসিডেন্ট হওয়ার সুযোগ পান ট্রাম্প, হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করুন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের চেহারাই বদলে দেবেন। কিন্তু নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন বলছে, অনেক ফাঁকা বুলি ছেড়েছেন ট্রাম্প। নিজেকে যতটা সফল ব্যবসায়ী বলে তিনি দাবি করছেন, আদৌ তা নন। বরং তাঁর ব্যবসায়িক ব্যর্থতা বহু মানুষের ভোগান্তির কারণ হয়েছে। হিলারি শিবির ব্যর্থতার এই বয়ানকে ট্রাম্পকার্ড করার সুযোগ হাতছাড়া করবে কেন! তারা এরই মধ্যে বিবৃতি দিয়ে বলেছে, থলের বিড়াল বেরিয়ে গেছে। এত দিন ট্রাম্প মুখেই রাজা-উজির মেরেছেন। পরের বিতর্কে ট্রাম্পকে নাগালে পেলে হিলারি যে এই প্রসঙ্গ তুলে আরেক দফা নাকানি-চুবানি দেওয়ার চেষ্টা করবেন, বলাই বাহুল্য।

ট্রাম্পের বড় বড় কথার সমালোচনাও কম হচ্ছে না। স্লেটের সাংবাদিক জ্যাকব ব্রোগান টুইটারে লিখেছেন, ‘ট্রাম্প এদ্দিন বলে এসেছেন, তিনি যথেষ্ট স্মার্ট বলেই কর গুনতে হয়নি। এবার জানা গেল, ট্রাম্প কর দেননি এ কারণে যে তিনি ইতিহাসের সবচেয়ে নিকৃষ্টতম ব্যবসায়ী। ’

তিন. ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে কলুষিত যাঁরা করে থাকেন, ক্ষতিগ্রস্ত করেন সাধারণ মানুষের, তাঁদের কাতারেও চলে গেলেন ট্রাম্প। শুরু থেকে ট্রাম্প এও বলে এসেছেন, ওয়াশিংটনের গভীর স্তরের এমন অনেক মানুষকে তিনি চেনেন, যাঁরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে আখের গোছান। কিন্তু নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন মতে, ট্রাম্পই বরং সেসব ধনকুবেরের একজন, যাঁরা জানেন নিজের স্বার্থে কিভাবে রাষ্ট্রীয় কাঠামো ব্যবহার করতে হয়। হ্যাঁ, কর বিশেষজ্ঞরা বলতেই পারেন, ট্রাম্প যা যা করেছেন কিছুই অবৈধ বলে গণ্য হবে না। কিন্তু যেখানে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষকে সীমিত আয় সত্ত্বেও গাঁট থেকে কর দিতে হচ্ছে, সেখানে সবচেয়ে ধনী ব্যবসায়ীদের একজন বছরের পর বছর কর দেবেন না—সব ভোটার তা মানবেন কেন!

চার. দান-দক্ষিণা আবার কী, ব্যবসাই সব—এই কথাও বুঝিয়ে দিয়েছেন ট্রাম্প। টাইমসের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৯৫ সালের আয়কর রিটার্নে দেখা যায়, ট্রাম্প নিউ জার্সি ভিয়েতনাম ভেটেরানস মেমোরিয়াল ফান্ড, নিউ জার্সি ওয়ার্ল্ড লাইফ কনজারভেশন ফান্ড অথবা চিলড্রেন ট্রাস্ট ফান্ডের মতো সংগঠনে চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। নিউ জার্সির গভর্নর নির্বাচনে ন্যূনতম এক ডলার চাঁদা দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও তিনি অস্বীকার করেছেন। হিলারি ক্লিনটন বিষয়টি সামনে এনে ভোটারদের এখন বলতে পারবেন—এই হচ্ছেন রিপাবলিকান দলের প্রার্থী, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়দায়িত্বের কানাকড়ি মূল্যও যাঁর কাছে নেই।

পাচ. নির্বাচনে প্রচারণার সঙ্গে সমান্তরালে এত দিন ট্রাম্পের কর ফাঁকির প্রসঙ্গটি আলোচিত হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বিতর্ক এখন আরো জোরদার হবে। মানুষ আরো বেশি করে বলাবলি করবে। বিগত ৪০ বছরে যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পই একমাত্র প্রার্থী, যিনি আয়করের তথ্য গোপন রাখার পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন। আর কর নিয়ে তিনি অর্থনৈতিক কাঠামোর অসৎ ব্যবহার তো করেছেনই। শুধু তাই নয়, নির্বাচনের প্রাইমারি পর্বে তিনি করের তথ্য প্রকাশ করার অঙ্গীকার করেও সেখান থেকে পরে পিছুটান দিয়েছেন। ট্রাম্প একটি খোঁড়া যুক্তি টেনে বলেছিলেন, এখন অডিট চলছে, তথ্য প্রকাশ অসম্ভব। ট্রাম্প যে মিথ্যা বলেছেন কারোর বুঝতে অবশ্য বাকি ছিল না। এ নিয়েও সামনের দিনগুলোয় অনেক কথা হবে।

ছয়. মাত্র সেদিন বিতর্কের ‘টেরিবল’, ‘হরিবল’, ‘ব্যাড উইক’ গেল। সপ্তাহ না ঘুরতেই কর কেলেঙ্কারির প্রতিবেদন। নিউ ইয়র্ক টাইমস যাই বলুক, প্রথম বিতর্কে ভালো করলে ট্রাম্প উতরে যেতে পারতেন। সমস্যা হচ্ছে, হিলারির সঙ্গে প্রথমবারের মতো মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প সুবিধা করতে পারেননি। একজন সাবেক বিশ্ব সুন্দরী প্রসঙ্গে করা তাঁর আপত্তিকর উক্তি সেদিন সামনে নিয়ে আসেন হিলারি। একই সপ্তাহে আরেকটি বোমা ফাটায় নিউজউইক সাময়িকী। এতে বলা হয়, কিউবার সঙ্গেও ট্রাম্পের অবৈধ লেনদেন রয়েছে!

লেখক : মার্কিন কলামিস্ট। ‘সিক্স মেইন রিজনস হোয়াই দ্য টাইমস ট্যাক্স স্টোরি কোড বি ডিভাসট্যাটিং ফর ট্রাম্প’ শিরোনামে ‘স্লেটে’ তিনি এই নিবন্ধ লিখেছেন


মন্তব্য