kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ভিন্নমত

জীবনের জন্য কিছু সিদ্ধান্ত

আবু আহমেদ

৪ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



জীবনের জন্য কিছু সিদ্ধান্ত

কার কিসমত কাকে কোথায় নেয় বলা যায় না। অতি ভালো ছাত্রও জীবনের পথে চলতে গিয়ে পথ হারিয়ে শুধুই এক জায়গায় ঘুরেছে।

আর পরীক্ষায় পাস করেনি, এমন অনেকেই জীবনে অনেক সাইন করেছে। জীবনযুদ্ধে কে জয়ী হবে, কে পরাজয় মেনে নেবে বলা যায় না। প্রতিভা থাকলেই শুধু হয় না, প্রতিভাকে কাজে লাগানোর জন্য চাই ইচ্ছা ও সুযোগ। একটা অ্যাক্সিডেন্ট একজনকে শেষ করে দিতে পারে। যতটুকু এগিয়েছে তার পুরোটা কেড়ে নিতে পারে। মসৃণ জীবন সবার ভাগ্যে জোটে না, এলোমেলোভাবের জীবনই হলো অধিকাংশ লোকের সঙ্গী। তবে সেই এলোমেলোর মধ্যেও অনেকে জীবনের জন্য অর্থ খুঁজে পায়, অনেকে পায় না। যারা পায় না তারাই কি পেয়েছে, কি পায়নি এই নিয়ে হিসাব কষে, আর হা-হুতাশ করে। এলোমেলো জীবনের মধ্যে স্বাদ যেমন আছে, তেমনি বিস্বাদও আছে। অনেকে এলোমেলো জীবনকে শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসে। তারা চেষ্টা করে এবং সফল হয়। একেবারে সফল জীবন সবার জন্য মানায়ও না। বরং জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করে যারা  জেতে, তারাই হলো সফল।

সফলতা-ব্যর্থতা এই দুটি শব্দ আপেক্ষিক। কারো কাছে যেটা সফলতা, অন্যের কাছে সেটা ব্যর্থতা। তবে একেবারে আকাশ ছুঁতে চেষ্টা করা উচিত নয়। আকাশ ছুঁতে চাইলে পায়ের নিচের টেবিলটা সরে যেতে পারে। তাই আকাঙ্ক্ষাকে দমন করাও একটা গুণ। উচ্চাভিলাষী হতে বাধা নেই। তবে উচ্চাভিলাষকে যেকোনো প্রকারে হোক অর্জন করতে পাওয়াটাতে দোষের অনেক কিছু আছে। সফলতা বলতে কী বোঝায়? যারা পদ ও অর্থকড়ির পরিমাপে সফলতাকে মাপতে চায় তারা এক ধরনের মূর্খ বটে। বরং সফলতা হলো ওই অবস্থা যে অবস্থাটা এসেছে সততা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে। সেই অবস্থাটা অনেকের নজরে যতই যৎসামান্য হোক না কেন, সেই অবস্থানে পৌঁছা এবং সেটাকে ধরে রাখাই হলো সফলতা। সফলতার ক্ষেত্রে আমার এই দরিদ্র সততার সঙ্গে অনেকে একমত হবে না জানি। তবে এর বাইরে সফলতার যে সংজ্ঞা আছে সেটা ব্যক্তির জন্য যেমন বিপজ্জনক, সমাজের জন্য আরো বেশি বিপজ্জনক। সংবাদমাধ্যমে খবর বের হয়েছে, রোগীদের জিম্মি করে অনেক হাসপাতাল ও ডাক্তার বেশি অর্থ আদায় করছে। এখন ধরে নিলাম ওই সব হাসপাতালের মালিক ও ওষুধ কম্পানির সহযোগী ডাক্তার সাহেবরা অনেক ধনী হলেন। এই ধনী হওয়াকে আপনি কি সফলতা বলবেন?

আমরা যদি সফলতার এই সংজ্ঞা গ্রহণ করে নিই, তাহলে সমাজে আমাদের সবার জন্য বিপদ অনিবার্য। জীবনে চলতে গেলে, জীবন চালাতে গেলে আগে থেকে নাকি প্ল্যান বা পরিকল্পনা করতে হয়। কিন্তু সবাই কি সেটা করে, সবাই কি সেটা করতে পারে? অনেকের পক্ষে পরিকল্পনা করার সুযোগই আসে না। তাদের কী হবে? আসলে পরিকল্পনা বাদেও অনেকে বিখ্যাত হয়েছেন। বিলেতে গেছেন ডাক্তারি পড়তে, ভর্তি হতে না পেরে পড়ে এসেছেন আইন বা ব্যারিস্টারি। পরে দেখা গেছে সেই ব্যারিস্টারিটা তাঁকে যশ-খ্যাতি অনেক বেশি দিয়েছে। এই যে একজন যেটা চাইলেন সেটাতে ভর্তি হতে পারলেন না। যেটা চাইলেন না সেটা নিয়েই পড়লেন এবং ভালো করলেন, এটাকে আপনি কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন? আমার একটা ব্যাখ্যা আছে বটে তবে সেটা সবার কাছে পছন্দের হবে না। আমার সেই ব্যাখ্যা হলো কিসমত বা ভাগ্য। তার প্রভু তার ভাগ্যকে এইভাবে তার কাছে এনে দিয়েছে। অবশেষে মনে হয়েছে সেটাই তার জন্য উত্তম হয়েছে। আমি নিজেও অমুক চাকরি না পেয়ে আপাতত মন খারাপ করেছিলাম। পরে দেখলাম আমি যেটা পেয়েছি সেটাই সেরা। সেই চাকরিতে আমি মনপ্রাণ ঢেলে দিয়েছিলাম এবং মনে হতো এটাই হলো রাজার চাকরি। এটা আমাদের ধর্মগ্রন্থে পরিষ্কার করে লেখা আছে যে যেটা তোমার কাছে আপাতত খারাপ অবস্থা মনে হবে, আসলে সেটাই তোমার জন্য অধিক মঙ্গলজনক, অবশ্য তুমি যদি সেটা বুঝে থাকো। জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে এটা বলা যায়, সব কিছু নিজে ঠিক করা যায় না।

কিছু সময় ও কিছু বিষয় আছে যেগুলো বিধাতা তাঁর অনুগত বান্দাদের জন্য সঠিকভাবে ঠিক করে দেন। কখন কার জীবনে কী ঘটবে সেটাও কেউ জানে না। কিছু ঘটতেও পারে, আবার নাও ঘটতে পারে। অনেকের জীবনে এমন একটা কিছু ঘটেছে, যেটার ভার সে সইতে পারেনি। সে ভেঙে পড়েছে এবং ভেঙে গেছে। আর উঠে দাঁড়াতে পারেনি। আবার অনেকের জীবনে অনেক ঘটনাই ঘটেছে, প্রতিটি ঘটনাকে সে মোকাবিলা করছে এবং প্রতিটি মোকাবিলার পর আত্মবিশ্বাসে আরো বলীয়ান হয়েছে। ঘটনাকে মোকাবিলা করা এক বিরাট শক্তি। সেই শক্তি সবাই পায় না। শুধু সৃষ্টিকর্তা যাদের প্রতি সদয়, তারাই সেটা পায়। আরেকটা কথা, সব কিছুকে স্বাভাবিকভাবে নেওয়া একটা বড় গুণ। স্বাভাবিকভাবে না নিতে পারলে দুঃখ ভর করবেই। অন্য বিষয় হলো নিজেকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করতে নেই। প্রত্যেক ব্যক্তিই একে অন্যের চেয়ে ভিন্ন। কেউ উঠছে তো উঠছেই, তাতে কি, উঠুক, কিন্তু মনে রাখতে হবে কেউই আকাশ ছুঁতে পারবে না। আরেকটা কথা হলো, বিখ্যাত হওয়ার বিষয়টা অতি সাময়িক। আজ একজন বিখ্যাত আছে, কাল সে অখ্যাত হয়ে যাচ্ছে। যে বিখ্যাত সেও এ পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবে। আর যে বিখ্যাত নয়, সেও এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবে। একজন জানান দিয়ে চলে গেল, আর একজন নীরবে-নিভৃতে চলে গেল। এতে কী পার্থক্য হলো। কে মৃত্যুর ক্ষেত্রে সফলকাম, সেটা আমাদের সৃষ্টিকর্তাই ভালো বুঝতে পারবেন।

আমাদের ধর্মবিশ্বাস হলো ওরাই সফলকাম, যারা সৃষ্টিকর্তার কাছে সব সময় প্রিয় ছিল। অনেকে জোর করে মনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করে। এটা পড়ার ক্ষেত্রেও হতে পারে, চাকরি, ব্যবসা বা জীবিকার ক্ষেত্রেও হতে পারে। কিন্তু যে যেটা পছন্দ করে না সেটা করতে গেলে কাজের মধ্যে প্রাণ পায় না। কাজ করে কিছু অর্থ পায়, সে জন্যই কাজটি করে। আসলে যে যে কাজ পছন্দ করে বা যেটা নিয়ে পড়তে যায়, যেটা শিখতে চায়, সেটাই করা উচিত, সেটাই পড়া উচিত। কেউ বলেছে বলে কোনো কাজ করা উচিত নয়, কোনো বিষয় নিয়ে পড়াও উচিত নয়। আমি আমার ছাত্রদের সব সময় বলি তোমাদের মন যেটা পড়তে সায় দেবে না, সে বিষয় পড়বে না। মনে রাখতে হবে তুমি ওইখানেই ভালো করবে, যেটা পড়তে বা করতে তোমার মন সায় দেবে। কারো সাহিত্য পড়তে ভালো লাগে, কারো অঙ্কের ক্ষেত্রে একটা ভীতি আছে। তার তো অর্থনীতি পড়া উচিত নয়, চাই সে যত ভালো বিষয়ই হোক না কেন। পরীক্ষায় ভালো ফল আর বাস্তব জীবনে ভালো করা এক বিষয় নয়। বাস্তব জীবনে ভালো করা অনেক উপাদানের সামগ্রিক অবদান মাত্র। ক্লাসরুমের বাইরেও অনেক পড়া আছে, যেগুলো জীবন চলার পথে আরো ভালো কাজ দিতে পারে। একজন মৌখিক পরীক্ষায় খুব ভালো করে, কিন্তু ক্লাস পরীক্ষায় মধ্যম ফল অর্জনকারী। কেন, কী জন্য এই ছাত্রটি বা এই লোকটি মৌখিক পরীক্ষায় বারবার ভালো করছে? জ্ঞানে কি সে এগিয়ে? তাও ঠিক, তার পরও সে ভালো করছে। এটার কারণ হলো তার অন্য অনেক গুণ আছে, যেগুলো তার সতীর্থদের অনেকের নেই।

 

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য