kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


পাকিস্তান কি পাল্টা হামলা চালাবে?

অনলাইন থেকে

৩ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ভারত-পাকিস্তান সীমান্তজুড়ে এখন যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব। পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে ঢুকে ভারতের ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের’ পর পাকিস্তান পাল্টা আঘাত হানতে পারে—এ আশঙ্কায় সীমান্তের সব গ্রামগঞ্জ এখন জনশূন্য।

ভারতে হাই অ্যালার্ট জারি আছে। কড়া নজরদারিতে রয়েছে দিল্লিসহ রাজস্থান, পাঞ্জাব, জম্মু-কাশ্মীর, মহারাষ্ট্র ও গুজরাট। ভারতকে প্রত্যাঘাত করলে পরিণাম আরো খারাপ হবে—‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইকে’র দুদিন পর মুখ খুলে পাকিস্তানকে এভাবেই খোলাখুলি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ভারতীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পরীকর। ভারতের সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের পরে যত সময় গড়াচ্ছে, তত কোণঠাসা হয়ে পড়ছে পাকিস্তান। পরমাণু অস্ত্র প্রশ্নে মার্কিন হুঁশিয়ারির সামনে পড়েছে পাকিস্তান। জঙ্গিদের সামাল দিতে একই দিন রাশিয়াও চাপ দেয় ইসলামাবাদকে। উরির ঘটনার পর থেকেই ইসলামাবাদ যেভাবে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি দিচ্ছে, তা যে তারা ভালোভাবে নেয়নি, তা শনিবার স্পষ্ট করে দিয়েছে মার্কিন প্রশাসন। তারা বলেছে, পাকিস্তানি প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোওয়াজা আসিফের পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন ও উদ্বেগজনক’।

তবে অনেক বিশ্লেষকেরই ধারণা, পুরোদস্তুর যুদ্ধ বাধবে না। এ ব্যাপারে নরেন্দ্র মোদি ও নওয়াজ শরিফ দুজনই সতর্ক বলে তাঁরা মনে করছেন। তবে সমস্যা হচ্ছে এপারে সংঘপরিবার, ওপারে পাকিস্তানি সেনা—দুই পক্ষই চাইছে সংঘাত বাড়ুক, চরমে উঠুক। আসলে পাঠানকোট ও উরির ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছিল মোদি সরকারের যোগ্যতা নিয়ে। কিন্তু সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের সাফল্যে সেসব ব্যর্থতা ঢাকা পড়ে গেছে। দেশজুড়ে এখন জাতীয়তাবাদের জোয়ার। তাতে ভর করেই পাঞ্জাব ও উত্তর প্রদেশের ভোটে সুবিধা আদায় করতে চাইছে সংঘ ও বিজেপির একাংশ। তাদের লক্ষ্য, এই আবেগ যত দিন সম্ভব চাঙ্গা করে রাখা। তাই তারা মোদির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।

রণ-উন্মাদনার তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া বনাম বিদেশনীতির মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী সমাধান—এই দুই বিকল্পই মোদির সামনে এখন আছে। তবে কোজিকোডের জনসভায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী এই দুইয়ের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন। একদিকে তিনি জানিয়েছেন ভারত কখনো উরিতে ১৮ জন সৈন্যের আত্মত্যাগ ভুলবে না, অন্যদিকে তিনি চাপের মুখে কোনো রকম হঠকারী অবিবেচক সিদ্ধান্তের আশঙ্কাও নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানকে বিশ্বমঞ্চে কোণঠাসা করতে ভারতের প্রয়াস অব্যাহত থাকবে। বলা যায়, এটিই এ মুহূর্তের জন্য সর্বাপেক্ষা কার্যকর কৌশল। মোদি বক্তৃতায় আরো একটি তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তিনি পাকিস্তানি রাষ্ট্র ও পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি বিভাজনরেখা টেনেছেন। তিনি বলেছেন, রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদে ইন্ধন জোগাচ্ছে আর এর ফলে ওই দেশের সাধারণ মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান রাহিল শরিফ কি সমঝোতার পথে হাঁটবেন? আগামী নভেম্বরে তাঁর অবসর নেওয়ার কথা। তার আগে ভারতের সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের আঘাত খাওয়া—সেনাপ্রধান হিসেবে তাঁর দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলাই যায়। ইসলামাবাদে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠকেও সমালোচিত হয়েছেন রাহিল। এ অবস্থায় ভারতের কূটনীতিক ও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের কারো কারো আশঙ্কা, কর্মজীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে এখন রাহিল। তাই ব্যর্থতার দাগ মুছতে তিনি পাল্টা আগ্রাসী পদক্ষেপ গ্রহণ করতেই পারেন।

পাকিস্তানে সেনাপ্রধান বরাবরই ক্ষমতার একটি অন্যতম ভরকেন্দ্র। আর একটি ভরকেন্দ্র হলো সে দেশের কট্টর মোল্লাতন্ত্র। তারাও ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পক্ষে। জামাত-উদ-দাওয়া জঙ্গি গোষ্ঠীর প্রধান হাফিজ সাইদ ভারতের স্ট্রাইকের পর পাল্টা হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছেন। অনুমান করা যায়, প্রতিশোধমূলক হামলার পক্ষে পাকিস্তানি গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই-ও। আর এই দুই পক্ষের কাউকেই নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা পাকিস্তান সরকারের কার্যত নেই। ফলে এই ত্রিমুখী চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত সার্বিক যুদ্ধ না বাধলেও ভারতের ধাঁচে নিয়ন্ত্রণরেখা পেরিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের পাল্টা সার্জিক্যাল হামলার আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দিচ্ছে না নয়াদিল্লি।

এ পরিস্থিতিতে কী করবে মোদি সরকার? সরকারের ওপরমহল, সেই সঙ্গে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করছে, আর দরকার নেই। সার্জিক্যাল স্ট্রাইক করে ভারত বুঝিয়ে দিয়েছে যে প্রয়োজনে প্রত্যাঘাতে তারা সক্ষম। এর আগেও নিয়ন্ত্রণরেখা পেরিয়ে ভারত হামলা করেছে, কিন্তু প্রকাশ্যে তা জানানো হয়নি। এবার মোদি ঘটা করে হামলার কথা দেশবাসীকে জানিয়েছেন। এই আগ্রাসী কৌশলকে স্বাগত জানাতে বাধ্য হয়েছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। আন্তর্জাতিক মহলের কারো কাছ থেকেও কোনো বিরূপ মন্তব্য শোনা যায়নি। বরং জঙ্গিদের বিরুদ্ধে এই সংযত অপারেশন অনেক দেশেরই প্রশংসা কুড়িয়েছে। যাকে ভারতের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবেই গণ্য করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে সমালোচনার ঝড় সামলে এখন স্বস্তিতে রয়েছে মোদি সরকার। পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন করে সংঘাতে জড়িয়ে পরিস্থিতি জটিল করতে চাইছে না তারা। বিজেপির মতে, দেশকে নিরাপত্তা দিতে নরেন্দ্র মোদি যে সক্ষম সেই বার্তা জনগণকে দেওয়া গেছে। একে মূলধন করেই আসন্ন ভোটে ভালো ফল করা সম্ভব।

এখন প্রশ্ন হলো, পাকিস্তান যদি প্রত্যাঘাত করে? আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে ইসলামাবাদ যদিও ব্যাকফুটে রয়েছে, দেশটির সেনাপ্রধান ইমেজ সংকটে থেকে উত্তরণ চাইছেন। এ অবস্থায় তিনি পাল্টা আঘাতের কৌশল নিতেই পারেন। এ ছাড়া পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে সেনা শাসন কায়েমের লোভও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কারো কারো মধ্যে থাকতে পারে। আর প্রস্তুত ভারতও। সীমান্তে সতর্কতা জারি, শত শত গ্রাম থেকে লাখ লাখ মানুষকে সরিয়ে নেওয়াই তার প্রমাণ। তবে যাই হোক, কিছু যেন সীমা না ছাড়ায়। দুই পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রে যুদ্ধ হলে ক্ষয়ক্ষতি কী হতে পারে, ভাবতে গেলেও গা শিউরে ওঠে।

সূত্র : এই সময়, টাইমস অব ইন্ডিয়া ও আনন্দবাজারের একাধিক প্রতিবেদন ও সম্পাদকীয়


মন্তব্য