kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সমন্বিত পরিবহন অবকাঠামো অত্যন্ত জরুরি

ড. মো. মোয়াজ্জেম হোসেন খান

৩ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



সমন্বিত পরিবহন অবকাঠামো অত্যন্ত জরুরি

অবকাঠামো প্রধানত দুই ধরনের : ক) অর্থনৈতিক অবকাঠামো এবং খ) সামাজিক অবকাঠামো। আমরা এখানে মূলত অর্থনৈতিক অবকাঠামো নিয়ে কথা বলব।

অর্থনৈতিক অবকাঠামোকে সাধারণত মানবদেহের রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়ার সঙ্গে তুলনা করা হয়। মানবদেহে রক্ত সঞ্চালনপ্রক্রিয়া কোনো কারণে বাধাগ্রস্ত হলে মানুষ যেমন রুগ্ণ হয়ে পড়ে, অচল হয়ে  যায়, ঠিক তেমনিভাবে অর্থনৈতিক অবকাঠামো সেকেলে হলে, রুগ্ণ হলে, ভঙ্গুর হলে অর্থনীতির স্বাস্থ্যও ভঙ্গুর বা রুগ্ণ হতে বাধ্য। অর্থনৈতিক অবকাঠামোর মধ্যে আবার পরিবহন অবকাঠামো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর এ ক্ষেত্রে আমাদের দেশে একটা নৈরাজ্যকর অবস্থা বিরাজ করছে। এ অবস্থা থেকে আমাদের অবশ্যই পরিত্রাণ পেতে হবে। কারণ তা না  হলে দেশি  ও  বিদেশি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে এবং সুষম উন্নয়নের স্বপ্ন, সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন কল্পনাই থেকে যাবে।

পরিবহন চার ধরনের : সড়ক, নৌ, বিমান ও রেল। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে পরিবহন অবকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আমাদের দেশের শাসক গোষ্ঠী ভুল পথে এগিয়েছে। সড়কপথকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। বাকিগুলো অবহেলা করেছে। ফলে সস্তা শ্রম থাকা সত্ত্বেও আমাদের অর্থনীতি এক অদক্ষ অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। আমাদের দেশে বর্তমানে প্রায় সাড়ে তিন লাখ কিলোমিটার বিভিন্ন ধরনের সড়কপথ রয়েছে, যার বেশির ভাগই প্রায় ব্যবহার অনুপযোগী। দুঃখজনক হলেও সত্য যে পঁচাত্তর-পরবর্তী সামরিক শাসনামলে বিশেষ করে আশির দশকে রেলকে অবহেলা করে সড়ক নির্মাণে বেশি গুরুত্ব আরোপ করা হয়। ১৯৯০ সাল নাগাদ দেশে প্রায় তিন লাখ কিলোমিটার সড়কপথ নির্মাণ করা হয়। এতে কম করে হলেও প্রায় এক মিলিয়ন হেক্টর উর্বর তথা উত্কৃষ্ট ফসলি জমি ধ্বংস করা হয়েছে। অথচ অন্যান্য দেশের মতো যদি রেলপথ নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হতো, তাহলে এ অপূরণীয় ক্ষতি থেকে আমাদের দেশ রক্ষা পেত। এ জমি আর কোনো দিন আমরা ফেরত পাব না। এত রাস্তা নির্মাণ না করে আমরা যদি মাত্র ১০ হাজার কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ করতাম, তাহলে সড়কপথের চেয়ে লাখো গুণ বেশি উপকৃত হতো দেশ এবং এত বিপুল পরিমাণ জমিও হারাতে হতো না। বর্তমান সরকার রেলপথের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে। এটা শুভ লক্ষণ। তবে অত্যন্ত শম্বুকগতিতে চলছে কাজ। আমরা অত্যন্ত সৌভাগ্যবান এক জাতি। কথাটা এ জন্য বলছি, আমাদের প্রিয় রাজধানী ঢাকা বাংলাদেশের একেবারে মাঝখানে অবস্থিত। টেকনাফ থেকে ঢাকার যে দূরত্ব, ঠিক একই দূরত্ব তেঁতুলিয়া থেকে। অন্যদিকে সাতক্ষীরা ও তামাবিল থেকেও ঠিক একই অবস্থা বিরাজমান। রাঙামাটি-সাপাহার এবং কলাপাড়া-হালুয়াঘাটের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। দীর্ঘমেয়াদে আমাদের দেশের সীমান্তবর্তী উপরোক্ত গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোসহ স্থল ও নৌবন্দরগুলোকে আধুনিক রেলপথ নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। মাল্টি ট্রাকবিশিষ্ট রেলপথ নির্মাণ করতে হবে, যাতে পথে ক্রসিংয়ে সময় নষ্ট না হয়। সব ধরনের ক্রসিংয়ে ওভারপাস নির্মাণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। রেলপথকে বিদ্যুতায়িত করতে হবে। প্রয়োজনে নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে, যাতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাধাগ্রস্ত না হয়। রেলের সঙ্গে নৌ ও বিমান পরিবহন তথা পথকে সমন্বিত করে গড়ে তুলতে হবে। আধুনিক ও দক্ষ অর্থনীতি গড়ে তুলতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই। ভারতীয়রা নিজেরাই প্রতিবছর গড়ে ৬০০ কিলোমিটার করে রেলপথ বানাচ্ছে। তার পরও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি চীনকে আরো রেলপথ নির্মাণে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন। চীন এতে সম্মত হয়েছে। আমাদের সরকারও চীনকে সহযোগিতা করতে অনুরোধ জানাতে পারে।

এবারে আসা যাক নৌপরিবহনের কথায়। ২৪ হাজার কিলোমিটার নদী  অযত্ন ও অবহেলায় হয় মরে গেছে, না হয় মৃত্যুর কাছাকাছি আছে। এর মধ্যে এখনো পর্যন্ত সারা বছর নাব্য থাকে এমন নদীর দৈর্ঘ্য মাত্র সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার। নদীগুলো বেশির ভাগ স্থানেই প্রয়োজনাতিরিক্ত প্রশস্ত। এ ছাড়া রয়েছে অসংখ্য বাঁক। এগুলো কমিয়ে নদীগুলোর প্রশস্ততা হ্রাস করে একদিকে যেমন বিপুল পরিমাণ জমি  উদ্ধার করা সম্ভব, তেমনি নদীগুলোর ভাঙন রোধ করে নৌপরিবহনের গতি বৃদ্ধি করা সম্ভব। নদীর দুই তীরও কংক্রিটে বাঁধাই করে দিতে হবে, যা অবশ্যই একটা দীর্ঘমেয়াদি বিষয়। নদী আমাদের অর্থনীতির জীবন। ২৪ হাজার কিলোমিটার নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে পারলে আমরা অবশ্যই দেশকে বন্যামুক্ত রাখতে সক্ষম হব। এটাও অবশ্য একটা দীর্ঘমেয়াদি ব্যাপার। তবে কাজটি এখনই শুরু করা আবশ্যক। এ জন্য ‘নদী ব্যবস্থাপনা ও নদী খনন মন্ত্রণালয়’ নামে একটি মন্ত্রণালয় এখনই সৃষ্টি করা হোক। এটা সময়ের দাবি। এতে যা খরচ হবে তার তুলনায় আমাদের অর্থনীতির উপকার হবে অনেক বেশি। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত তহবিলের একটা বড় অংশ এখানে খরচ করা উচিত।

দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য পরিবহন মাধ্যমের মতো বিমান পরিবহনেরও চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু আমাদের কি আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর আছে? নাই! কারণ আমাদের রাষ্ট্রের পরিচালকরা ও নীতিনির্ধারকরা স্বল্পমেয়াদি সমাধানে বিশ্বাসী। আমাদের অবশ্যই দীর্ঘমেয়াদে পরিবহন চাহিদা নিয়ে ভাবতে হবে, ১০০ থেকে ২০০ বছরে এ চাহিদা  কোথায় গিয়ে ঠেকবে বা দাঁড়াবে তা মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত গ্রহণ জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার মতে, ঢাকার উপকণ্ঠে অন্তত দুটি (দক্ষিণ ও পশ্চিমে), সাতটি বিভাগীয় শহরের উপকণ্ঠে সাতটি, পর্যটন শহরকেন্দ্রিক আরো কয়েকটি বিমানবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা এখনই গ্রহণ করতে হবে। বিমানবন্দরগুলো শহরকেন্দ্র থেকে ৩০-৪০ কিলোমিটার দূরে হওয়া বাঞ্ছনীয়। উত্কৃষ্ট জমি বাঁচানো ও শব্দদূষণ থেকে রক্ষা পাওয়ার স্বার্থে প্রস্তাবিত বিমানবন্দরগুলো পারতপক্ষে নদীর চরে নির্মাণ করা যেতে পারে। অবশ্যই এর সঙ্গে রেল, সড়ক ও নৌপথের সমন্বয় থাকতে হবে।

এছাড়া পরিবহন মাধ্যমগুলোর জন্য দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টির জন্য অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, একাডেমি, বিশ্ববিদ্যালয় বা  অনুষদ গড়ে তুলতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে এগুলোর প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, মেশিনপত্র ইত্যাদি দেশে উৎপাদনের কথাও আমাদের ভাবতে হবে। সরকারি-বেসরকারি দুই খাতেই এটা হতে পারে। ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স সমস্যা সমাধানের জন্য সম্পূর্ণ পৃথক ও অত্যন্ত শক্তিশালী লাইসেন্সিং অথরিটি গঠন করতে হবে। এতে বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সব জেলায় এর শাখা থাকবে, তবে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহীতে একাধিক কেন্দ্র থাকতে পারে। আর দুর্ঘটনা রোধে সব ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় অনবরত ট্রাফিক আইনসংক্রান্ত বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা চালাতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনে সরকার এটা বাধ্যতামূলক করে দিতে পারে।

লেখক : সাবেক সভাপতি, অর্থনীতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ু

moazzem_hossainkhan

 


মন্তব্য