kalerkantho


ডাক্তারদের প্রতি সেকেন্ডের দাম কত

সৌমিত্র শেখর

২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ডাক্তারদের প্রতি সেকেন্ডের দাম কত

কেউ কি এর উত্তর দিতে পারেন: ‘ডাক্তারদের প্রতি সেকেন্ডের দাম কত?’ একজন ডাক্তার তাঁর রোগীর কাছে বাজারে সবচেয়ে চড়া মূল্যে সেকেন্ড বিক্রি করেন। আর কোনো পেশায় এত চড়া মূল্যে সেকেন্ড বিক্রি আছে কি না আমি জানি না।

সম্প্রতি ফরিদপুরের ডা. জাহেদ মেমোরিয়াল শিশু হাসপাতালে ডা. রিজিয়া আলমও এমন একটি কর্মই করেছেন। রোগীকে সময় না দেওয়া, অমানবিকতা প্রদর্শন ও অদক্ষতাজনিত কর্মের দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী তিনি। এর ফলে সদ্যোজাত একটি জীবিত সন্তানকে মৃত বলে তিনি ঘোষণা করেছেন। সেই জীবিত মানবসন্তানটি গোরস্থানে রাত ৩টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত এমন অবস্থায় পড়েছিল যে শিয়াল-কুকুরেও তাকে নিয়ে যেতে পারত। ভোর ৬টার দিকে তাকে কবর দিতে এসে দেখা গেল সে মৃত নয় জীবিত। এ নিয়ে গত ২৩ সেপ্টেম্বর ‘কালের কণ্ঠ’সহ দেশের বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ করে। পরে এই মানবসন্তানটিকে উন্নত চিকিৎসা দেওয়া হলেও তাকে আর বাঁচানো যায়নি। তার নামকরণ করা হয়েছিল গালিবা হায়াত। ডাক্তারের উপেক্ষা, অবজ্ঞা, অমানবিকতা ও অদক্ষতায় গালিবা হায়াতের জীবন অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই স্তব্ধ হয়ে যায়।

আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলি। গত আগস্ট মাসের ৭ তারিখে আমার অনুজ ক্যান্সারাক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে। চিকিৎসার প্রথম পর্যায়ে সে ঢাকার একটি নামি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের, ময়মনসিংহ শাখায় ডাক্তারের পরামর্শে আল্ট্রাসনোগ্রাম করায়। রিপোর্ট অনুসারে চিকিৎসা চলে। রোগের উপশম হয় না। এভাবে দুই মাস চিকিৎসার পর আবার ময়মনসিংহেই অন্য একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে তার আল্ট্রাসনোগ্রাম করানো হয়। তাতে প্রতীয়মান হয়, আগের যে পরীক্ষা হয়েছে তার ফল সম্পূর্ণ ভুল আর এই ভুল ফলের ওপর চিকিৎসা করানোয় রোগের উপশম হয়নি, বরং বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এই যে এক কাঁড়ি টাকা খরচ করে পরীক্ষা করানো হলো এবং এর ফল ভুল এলো, এর প্রতিবিধান কী? ছোট ভাইয়ের অকালমৃত্যুতে আমি মানসিকভাবে প্রবল আঘাতপ্রাপ্ত হই। এক সুহৃদের পরামর্শে তাই শরণাপন্ন হই ঢাকার ধানমণ্ডিতে এক বিখ্যাত ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্রধান অফিসে বসা নিউরোলজির চিকিৎসকের। তিনি ইব্রাহিম মেডিক্যাল কলেজের অধ্যাপক, বারডেমেও কাজ করেন। ওই সুহৃদ বললেন, সম্প্রতি এই ডাক্তারের বেশ নামডাক হয়েছে, তিনি ভালো চিকিৎসা করতে পারবেন। আমি রীতি অনুসারে তাঁর সহকারীর কাছে ফোনে ‘অ্যাপয়েন্টমেন্ট’ করে নির্দিষ্ট দিনে চিকিৎসা নিতে গেলাম। ডাক্তারের সহকারী আমাকে যে সময়ের কথা বলেছিল, অর্থাৎ সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা—তার অন্তত দেড় ঘণ্টা পরে আমার ডাক এলো। এই দেড় ঘণ্টা আমি অপেক্ষায় থাকলাম। আমার প্রতীক্ষার পালা শেষ। বেল বাজল ডাক্তারের, তাঁর সহকারীর ডাক এলো। আমি ডাক্তারের কক্ষে প্রবেশ করলাম। দুই মিনিট! ডাক্তার লিখে দিলেন, ব্রেইনের এমআরআই করতে এবং তা সেখানেই করা যাবে বলে জানালেন। আমি বললাম, আমার ছোট ভাইয়ের রিপোর্ট ভুল আসার কথা। তাঁকে জানালাম এই ডায়াগনস্টির সেন্টারের ওপর আমার আস্থা কম। তিনি আমাকে আশ্বস্ত করলেন এই বলে যে ঢাকা আর ময়মনসিংহের শাখা এক নয়; আরো বললেন, ঢাকার মেশিন নতুন। অবশেষে তিনি আমাকে এমআরআই করার ওপর ‘কনসেশন’ লিখে দিলেন। বাইরে বের হয়ে ডাক্তারের সহকারীর হাতে ভিজিট বাবদ আমাকে ৮০০ টাকা দিতে হলো। আমি তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। একাই সিদ্ধান্ত নিলাম, ডাক্তার যখন এত করে বলছেন তখন এখানেই এমআরআই করাব। ২০ শতাংশ কনসেশনে আমি আমার ব্রেইনের এমআরআই করালাম। এবার রিপোর্ট দেখানোর পালা। যেতেই ডাক্তারের সহকারী আমার এমআরআইয়ের রিপোর্ট ও ফিল্মগুলো প্যাকেটমুক্ত করে আমার হাতে দিলেন। এতে সময় বাঁচে। আধঘণ্টার মধ্যে ডাক পেলাম। ডাক্তারের কক্ষে ঢুকে দেখি তিনি অন্য রোগীর সঙ্গে কথা বলছেন। আমরা পেছনের চেয়ারে বসলাম। অল্পক্ষণের মধ্যেই আমাদের ডাক এলো। আমরা ডাক্তারের মুখোমুখি চেয়ারে গেলাম। এমআরআইয়ের ফিল্মগুলো আলোয় ফেলে চটজলদি দেখে নেওয়া! এক মিনিটের মধ্যে বললেন : আপনি খুব মন খারাপ করে থাকেন—সেটা চলবে না; হাসিখুশি থাকবেন। রিপোর্ট ভালো; মাথায় কোনো সমস্যা নেই। আপাতত একটি ওষুধ দিলাম, তিন মাস চলবে; এক মাস পরে দেখা করবেন। ওষুধটি খেলে ঘুম একটু বেশি হতে পারে। বাইরে এসে ডাক্তারের সহকারীর হাতে দিলাম ৪০০ টাকা। আমি মনে মনে হিসাব করলাম, আগের দিন সব মিলিয়ে মিনিট তিনেক এবং পরে মিনিট দুয়েক বাবদ এই ডাক্তারকে দিতে হলো এক হাজার ২০০ টাকা। ডাক্তারের কাছ থেকে সাকল্যে এই পাঁচ মিনিটও নিরুপদ্রবভাবে আমি পেলাম না। পাঁচ মিনিট বারো শ টাকায় বিক্রি আর কোন পেশায় আছে, আমি জানি না! ডাক্তারিকে মহৎ পেশা বলে জেনে এসেছি ছোটবেলা থেকে, এই কী মহত্ত্বের নমুনা? এরপর যা হলো, সেটাও অবাক করার মতো। ডাক্তার একটি ওষুধের নামই লিখেছেন। ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্রবেশমুখেই একটি ওষুধের দোকান আছে। ভাবলাম, এখান থেকেই ওষুধটি নিয়ে যাই। আমি ওষুধের নাম পড়তে চেষ্টা করে পারলাম না। দোকানের দুজন চেষ্টা করেও ব্যর্থ। অবশেষে দোকানের একজন আমাকে পাঠাল দোকানের পশ্চিম দিকে, বলল, তার কাছে যান, তিনি পুরনো লোক—তিনি পড়তে পারবেন। অবশেষে তিনি পারলেন এবং আমি কিনতে পারলাম ট্যাবলেট ‘এমিলিন টেন’। প্রিয় পাঠক, আমাদের ডাক্তার সাহেবদের লেখা বেশির ভাগই কি দুষ্পাঠ্য হয়ে ওঠে না? ব্যবস্থাপত্র লেখাতেও তাঁরা সময় দিতে চান না। আপনার অভিজ্ঞতা কী?

মফস্বল শহর ফরিদপুর থেকে রাজধানী শহর ঢাকা—সর্বত্র এক অবস্থা। সদ্যোজাত গালিবা হায়াতের মৃত্যু হয়েছে, সৌমিত্র শেখরেরও মৃত্যু হতে পারত বা পারে। কারণ তাঁরা দুজনই ডাক্তারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সময় পাননি; আপনিও পাবেন না। যেকোনো দিন সন্ধ্যাবেলা ঢাকার ক্লিনিকগুলোতে পর্যবেক্ষণের জন্য আপনি বের হতে পারেন। ডাক্তারের কাছে সুচিকিৎসা, সামান্য সময়, অল্প মনোযোগপ্রার্থী অসংখ্য রোগীর কারণে আপনি ক্লিনিকগুলোতে পা ফেলতে পারবেন না। কিন্তু সত্য এই, আপনি আরো টাকা দিয়েও প্রয়োজনীয় সময় পাবেন না ডাক্তারের। যদি পাওয়াই যেত তাহলে গালিবা হায়াতের এভাবে মৃত্যু হতো না।

 

লেখক : নজরুল-অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

scpcdu@gmail.com


মন্তব্য