kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ভুট্টায় সাফল্য ও আমাদের খাদ্যাভ্যাস

এ এম এম শওকত আলী

২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ভুট্টায় সাফল্য ও আমাদের খাদ্যাভ্যাস

২৬ সেপ্টেম্বর এক দৈনিকে ভুট্টা উৎপাদনে বাংলাদেশের সাফল্য সম্পর্কে খবর প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, খাদ্যশস্য হিসেবে ভুট্টা উৎপাদনে কৃষি মন্ত্রণালয় উদ্যোগ গ্রহণ করে।

১৯৯৭-৯৮ সালে উৎপাদিত ভুট্টার পরিমাণ ছিল ৬৫ হাজার টন। ১০ বছর পর এ পরিমাণ হয় সাত লাখ ৫০ হাজার টন। অর্থাৎ উৎপাদন ১০ বছরে প্রায় ১০ গুণ বৃদ্ধি পায়। পরবর্তী ছয় বছরে অর্থাৎ ২০১৫-১৬ সালে ভুট্টা উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৭ লাখ ৫০ হাজার টন। অর্থাৎ ২০০৮-০৯ সালের তুলনায় উৎপাদন প্রায় চার গুণ বৃদ্ধি পায়। এ খবরের শিরোনামে মূল মন্তব্য ছিল, চাল উৎপাদনের পরে ভুট্টা দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে। অধিক পরিমাণে ভুট্টা উৎপাদনের অর্থ এই নয় যে এ শস্য বাংলাদেশিদের প্রধান খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। খাদ্যশস্য হিসেবে ভুট্টার স্বীকৃতি হয় নব্বইয়ের দশকের মধ্যভাগে। ওই সময় কিছু দিনের জন্য তখনকার কৃষিমন্ত্রী খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পালন করেন। এ দায়িত্ব পালনকালে তিনি প্রথম ভুট্টাকে সরকারি খাদ্যশস্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেন। এ সময় তাঁর অন্য একটি সিদ্ধান্ত ছিল অনেকটা যুগান্তকারী। গমের আটার সঙ্গে ভুট্টার আটা মিশিয়ে একাধিক শস্যসংবলিত আটা প্রস্তুত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। প্রথমে বেসরকারি পর্যায়ে মিলারদের এ ধরনের আটা তৈরি করতে উৎসাহিত করার চেষ্টা করা হয়। এতে আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যায়নি। মিলারসহ আটা ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা ছিল, এটা ভোক্তারা ব্যবহার করতে চাইবেন না। তাঁরা এ উদ্যোগে ওই সময় সাড়া না দিলেও সরকারিভাবে এ ধরনের আটা খাদ্য অধিদপ্তরের একটি মিলে তৈরি করার নির্দেশ দেওয়া হয়। মিলটি তখন অনেকাংশে অচল ছিল।

খাদ্য অধিদপ্তরের চাহিদা অনুযায়ী কিছু অর্থ বরাদ্দ করে এ লক্ষ্য সীমিতভাবে বাস্তবায়ন করা হয়। এরপর এ উদ্যোগ স্তিমিত হয়। তবে সাম্প্রতিককালে ভারতে এ ধরনের আটা তৈরি ও বিক্রি হচ্ছে। ওই দেশে এটা বেসরকারি উদ্যোগে অনেকটাই সফল হয়েছে। বাংলাদেশেও সাম্প্রতিককালে এক বেসরকারি বাণিজ্যিক সংস্থা এখন এক কেজির প্যাকেটে Multigrain আটা প্রস্তুত ও বিপণনে লিপ্ত। এর অর্থ এই যে এখন ধীরে ধীরে এ প্রথা অন্যরা অনুসরণ করবে। এ অনুমান যদি সঠিক হয়, তাহলে বাংলাদেশিদের খাদ্যতালিকায় ভুট্টার প্রচলন বাণিজ্যিকভাবেই হবে। এ ছাড়া ২০০০ সালের প্রথমার্ধে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের কর্মীদের কাছে শোনা গিয়েছিল, ভুট্টার আটা অল্প হলেও বিভিন্ন বেকারিতে পাউরুটিতে ব্যবহার করা হয়। কারণ বেকারি মালিকদের অভিজ্ঞতা হলো এর ফলে পাউরুটি ভালো হয়। খাদ্য হিসেবে ভুট্টার প্রচলনের উদ্যোগ ১৯৭১ সালের আগে। তবে তা ব্যর্থ হয়। কারণ—এক. তখনকার পূর্ববাংলার বড়লাট বাংলাদেশিদের ভুট্টা খাওয়ার জন্য উৎসাহ করার কথা বলার পরই তাঁর নাম হয় ভুট্টা খাঁন এবং দুই. পাবনার খাদ্যগুদামে রাখা নষ্ট ভুট্টা খাওয়ার পর কিছু ব্যক্তি অসুস্থ হয়। এ নিয়ে শুরু হয় জনবিক্ষোভ। পাবনায় পুলিশের গুলিতে এক ব্যক্তি নিহতও হয়। এর ফলে ভুট্টার প্রচলনের চেষ্টা স্তব্ধ হয়ে যায়। তবে স্বাধীনতার পরে আশির দশকের মধ্যভাগে ফসল বৈচিত্র্যকরণের জন্য বিএডিসি আড়াই হাজার টন ভুট্টা বীজ আমদানি করে। এ বীজ বিএডিসির বীজ খামারসংলগ্ন জমিতে ব্যবহার করা হয়। এ বীজ হাইব্রিড ছিল। পরবর্তী পর্যায়ে বেসরকারি বীজ ব্যবসায়ীরাও সীমিত পরিমাণ আমদানি করা শুরু করেন।

বিভিন্ন মহলের বিশেষজ্ঞরা ভুট্টা উৎপাদনে কৃষকদের আগ্রহী হওয়ার কারণ চিহ্নিত করেছেন। কারণ বহুবিধ। নব্বইয়ের দশকে বেসরকারি উদ্যোগে মুরগির খামার প্রতিষ্ঠিত হয়। এর সঙ্গে কম সময়ে মাছ চাষও (Aquaculture) শুরু হয়। এদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পায়। উৎপাদনও বৃদ্ধি পায়। এ দুই খাতের খাবারের (Feed) চাহিদা পূরণের জন্য ভুট্টার চাহিদাও বৃদ্ধি পায়। ভুট্টা উৎপাদন বৃদ্ধির এটি একটি অন্যতম প্রধান কারণ। যেকোনো কৃষিজাত পণ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিল্পের যোগসূত্র স্থাপিত হলে সে পণ্যের চাহিদাসহ উৎপাদনও বৃদ্ধি পায়। তবে প্রথম পর্যায়ে এ বিষয়টি অতটা সহজ ছিল না। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সম্প্রসারণ কর্মীরা ভুট্টা চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করলেও পরে উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করা নিয়ে সমস্যা হয়। একসময় কৃষিমন্ত্রী গ্রামীণ ব্যাংকসহ ব্র্যাককেও উৎপাদিত পণ্য নায্যমূল্যে ক্রয় করার অনুরোধ জানান। তাদের ক্রয়ের পরিমাণ ছিল সীমিত। দুই. কৃষকদের জন্য এ শস্য উৎপাদনে ব্যয় তুলনামূলকভাবে বোরো ফসলের চেয়ে কম হওয়ায় অনেক কৃষকই ভুট্টাকে লাভজনক ফসল হিসেবে চিহ্নিত করেন। কারণ বোরোর তুলনায় ভুট্টা উৎপাদনে অপেক্ষাকৃত কম সেচের প্রয়োজন হয়। তিন. আমদানীকৃত হাইব্রিড বীজসহ দেশে উৎপাদিত উচ্চ ফলনশীল বীজ সহজে পাওয়ায়। এর সিংহভাগ বেসরকারি খাতের। তবে বিএডিসিও সীমিত পরিমাণ বীজ বিপণন করে। চার. কৃষিনীতিতে চাল ছাড়া অন্যান্য খাদ্যশস্য উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। পাঁচ. এর জন্য কৃষি গবেষকরাও গুরুত্ব দিয়েছেন। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা সংস্থা এ পর্যন্ত ২২ জাতের ভুট্টা বীজ উদ্ভাবন করেছে। এর মধ্যে ১৩টি হাইব্রিড জাত। কৃষিবিজ্ঞানীদের মতে, উচ্চ ফলনশীল হাইব্রিড বীজ ব্যবহারে হেক্টরপ্রতি ফলন প্রায় ১০ টন, যা বোরোর চেয়ে তিন-চার গুণ বেশি। বিশ্ব কৃষি ও খাদ্য সংস্থা সংক্ষেপে এফএও-র মতে, ভুট্টা উৎপাদন ধান বা গমের তুলনায় ২.৪ গুণ লাভ বেশি করা সম্ভব।

অনেকটা একই ধরনের হিসাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ। তাদের মতে, বাংলাদেশের কৃষকরা ১.৪ ডলার ভুট্টা উৎপাদনে বিনিয়োগ করে হেক্টরপ্রতি ২.২ ডলার আয় করতে পারে। এর তুলনায় বোরো উৎপাদনে হেক্টরপ্রতি ১.৩ ডলার বিনিয়োগ করে আয় করে ১.০ ডলার। অর্থাৎ বোরোতে কোনো লাভ নেই; অথচ ভুট্টায় লাভ আছে। অন্যদিকে সেচ খরচের একটি হিসাব এক কৃষিবিজ্ঞানী দিয়েছেন। বলেছেন. এক কেজি চাল উৎপাদনে তিন হাজার লিটার পানির প্রয়োজন হয়। ভুট্টার জন্য হয় মাত্র ৭০০ লিটার। এর ফলে সেচজনিত ব্যয় ভুট্টায় অনেক কম। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যায় যে অধিকতর ভুট্টা উৎপাদনের মূল চালিকাশক্তি পোল্ট্রিসহ মাছ চাষ। বাজারে এখন উন্মুক্ত জলাশয়ের মাছ খুব কমই পাওয়া যায়। মূলত এসব খাতের চাষযোগ্য প্রাণিখাদ্যের চাহিদার সঙ্গে ভুট্টা উৎপাদনের চাহিদাও বেড়ে গেছে। অন্যদিকে খাদ্যশস্য হিসেবে বিশ্বে ভুট্টা শীর্ষ অবস্থানে; ভুট্টার বৈশ্বিক উৎপাদন এক বিলিয়ন টন। চাল ও গম গড়ে ৭০০ মিলিয়ন টন। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্য পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য খাদ্যশস্য উৎপাদনে ভুট্টার উল্লেখ নব্বইয়ের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে করা হলেও খাদ্য হিসেবে এর ব্যবহার এখনো চাল বা গমের সমতুল্য নয়। দেশে মোট চাল উৎপাদন গত কয়েক বছর ধরে তিন কোটি টন ছাড়িয়ে গেছে। গম এখনো ১১ থেকে ১৫ লাখ টন। দেশের খাদ্যশস্যের চাহিদা পূরণে চাল ও গম প্রতিবছরই বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। এ বাস্তবতা অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই। বর্তমানে ভুট্টার উৎপাদন ২৭ লাখ ৫০ হাজার টন হলেও সাধারণ জনমানুষের খাদ্যতালিকায় এর ব্যবহার অতি অল্পই হবে বলে সবার ধারণা। এ বিষয়ে আরো নির্ভরযোগ্য তথ্য জোগাড় ও বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে।

সম্প্রতি অক্সফাম আয়োজিত এক ওয়ার্কশপে ভুট্টার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ সম্পর্কিত প্রকাশিত সংবাদে বক্তারা যে অভিমত দিয়েছেন, তা উপর্যুক্ত ধারণাকেই সমর্থন করে। তাঁরা ভবিষ্যতে অধিকতর ভুট্টা উৎপাদনের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ভুট্টার স্বল্প বিক্রয়মূল্য, ভুট্টা শুকানো ও গুদামজাত করার ব্যবস্থার অপ্রতুলতা এবং জনমানুষের খাদ্যতালিকায় ভুট্টার স্বল্পতা। এ সম্পর্কে একজন মহিলা ভুট্টাচাষির পর্যবেক্ষণ বা অভিমত প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, ভুট্টা যদি বিধিবদ্ধ সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে বিক্রি করা যায় তাহলে খুব ভালো হবে। অক্সফামের এক উপস্থিত বক্তার মতে, ভুট্টার মোট উৎপাদনের ৯০ শতাংশ খামারের প্রাণীদের জন্য ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে মুরগি ও মাছের জন্য প্রস্তুতকৃত খাদ্যে ভুট্টা ব্যবহার করা হয়। এসব প্রাণী খামারে রোগমুক্ত না থাকলে এদের খাদ্যের চাহিদাও হ্রাস পাবে। অন্যদিকে ভুট্টা ও বোরো প্রায় একই সময়ে হয়। ভুট্টার চাষ বৃদ্ধি এ কারণে খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে যুক্ত। এ প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময়ের ওপর নির্ভর করে।

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা


মন্তব্য