kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


কাদের নিয়ে নির্বাচন কমিশন

ড. হারুন রশীদ

১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



কাদের নিয়ে নির্বাচন কমিশন

বাংলাদেশের রাজনীতিতে পারস্পরিক অবিশ্বাসের মূলে রয়েছে নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা। এ থেকে উত্তরণের সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে সবার আস্থাভাজন একটি শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠন করা।

বিশেষ করে বর্তমান কমিশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রান্তে এসে নতুন কমিশন গঠন নিয়ে আলোচনা সামনে চলে এসেছে। শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য সার্চ কমিটিসহ নানা মাত্রিক উদ্যোগ গ্রহণের জন্য সরকারকে বলছে রাজনৈতিক দল ও বিশ্লেষকরা।

মূলত সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হওয়ার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটেই নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার বিষয়টি সবার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিকল্প হিসেবে নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার কথা সরকারের পক্ষ থেকেও বলা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনের বিকল্প নেই। নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারলে সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে যে তারা সক্ষম—এর প্রমাণ বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে।

এ ছাড়া নির্বাচন কমিশন নির্বাচন অনুষ্ঠানে এরই মধ্যে একটি গুণগত পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকেই এই পরিবর্তনের শুরু। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধি মেনে চলতে বাধ্য হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনও এ ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। আগের মতো ঢাকঢোল পিটিয়ে দলবল নিয়ে এখন আর প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেন না। জনসভা, মিছিল-মিটিং, নির্বাচনী প্রচারণার কাজে মাইক ব্যবহারও সীমিত করা হয়েছে। প্রার্থীরা নির্ধারিত মাপ ও রঙের বাইরে পোস্টার করতে পারছেন না। দলীয় প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারে এমপি, মন্ত্রী কিংবা এ ধরনের পদাধিকারীদের অংশগ্রহণেও বিধিনিষেধ রয়েছে। নির্বাচনী ব্যয়ের ব্যাপারেও কমিশন সীমা বেঁধে দিয়েছে। নির্বাচনের পর প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাবও দিতে হচ্ছে কমিশনে। এর ব্যত্যয় হলে কমিশন ব্যবস্থাও নিচ্ছে। প্রত্যেক ভোটারের আইডি কার্ড থাকায় জাল ভোট প্রতিরোধ করাও এখন সহজ হয়েছে। পঞ্চম সংশোধনী পাস হওয়ার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিলোপ হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো বিকল্প হচ্ছে শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন। সে জন্যই দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার ব্যাপারে সরকার, বিরোধী দলসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিকতা নিয়ে এগিয়ে আসা প্রয়োজন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পর নির্বাচন কমিশন যেন সরকারের প্রভাবমুক্ত থেকে নির্বাচন পরিচালনা করতে পারে সেটি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের আর্থিক স্বাধীনতা, নিজস্ব ভবন, আলাদা সচিবালয়সহ বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করতে হবে।

এ মুহূর্তে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কে হচ্ছেন পরবর্তী প্রধান নির্বাচন কমিশনার। নির্বাচন কমিশনের অপর সদস্যরাই বা কে হচ্ছেন এবং তাঁদের নিয়োগপ্রক্রিয়াই বা কী হবে?

পঞ্চদশ সংশোধনীতে নির্বাচন কমিশনের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে সংবিধানের নির্বাচনসংক্রান্ত অনুচ্ছেদগুলোতে কিছু সংশোধনী আনা হয়েছে। ১১৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং সর্বোচ্চ চারজন কমিশনার নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে (একজন মহিলা কমিশনারসহ)। ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে। ১২৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচন কমিশনকে যুক্তিসংগত নোটিশ ও শুনানির সুযোগ না দিয়ে কোনো আদালত নির্বাচনসংশ্লিষ্ট বিষয়ে কোনো আদেশ-নির্দেশ দিতে পারবেন না।

নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার ব্যাপারে কিছু অগ্রগতি হলেও সামগ্রিক বিচারে এখনো তা যথেষ্ট নয়। রাজনৈতিক দলসহ জনগণের আস্থা অর্জন করতে হলে নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করতে সব বিষয়েই স্পষ্ট বিধিবিধান থাকা প্রয়োজন। সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে কমিশনার নিয়োগের বিধি প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এ রকম বিধি এখনো প্রণয়ন করা হয়নি। অর্থাৎ কারা নির্বাচন কমিশনার হতে পারবেন, তাঁদের যোগ্যতা-অযোগ্যতাই বা কি হবে সে বিষয়গুলো স্পষ্ট করতে হবে। সংবিধানের ১২০ ও ১২৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের চাহিদা অনুযায়ী সরকার জনবল সরবরাহের ব্যবস্থা করবে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, অতীতে সরকারের কাছ থেকে কমিশন এ ব্যাপারে যথেষ্ট সহযোগিতা পায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, সংসদের কার্যনির্বাহী পরিষদ বা সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রস্তাবের ভিত্তিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য কমিশনার নিয়োগের বিধি করা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে সব দলের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। আর ঐকমত্যের ভিত্তিতে সেটি করা গেলে কমিশনকে সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখা সম্ভব হবে।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

harun_press@yahoo.com

 


মন্তব্য