kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

মনের কোণে হীরে-মুক্তো

আমরা পারছি না কেন?

ড. সা’দত হুসাইন

১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



আমরা পারছি না কেন?

একটি রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা দেশ স্বাধীন করেছি। অনেক চড়াই-উতরাই পার হয়ে দেশ আজ বর্তমান পর্যায়ে এসেছে।

১৯৭২ সালে মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকার বাজেট নিয়ে যাত্রা শুরু করা দেশের বর্তমান বাজেটের আকার দাঁড়িয়েছে সাড়ে তিন লাখ কোটি টাকা। সাড়ে সাত কোটি লোকের দেশে খাদ্যশস্য উত্পন্ন হতো মাত্র এক কোটি টন, যা দিয়ে সবার পক্ষে দুবেলা পেট পুরে খাওয়া সম্ভব হতো না, বিদেশ থেকে মূল খাদ্যশস্য অর্থাৎ চাল আমদানি করতে হতো। আজ দেশের লোকসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ কোটি। কিন্তু দেশ খাদ্যে স্বনির্ভর। খাদ্যশস্যের উৎপাদন সাড়ে তিন কোটি টনের ঊর্ধ্বে; কিছু চাল রপ্তানি করা হচ্ছে। দেশজ পণ্যের উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়েছে, গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বহুগুণ বেড়েছে। একই সঙ্গে মাতৃমৃত্যু, শিশুমৃত্যুর হার কমেছে। মহামারি নেই বললেই চলে। ফলে মৃত্যুহার কমেছে। জন্মহারও কমেছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমে আমরা স্থিতিশীল জনসংখ্যার পথে এগোচ্ছি। এককথায় উন্নয়নের সূচকগুলো ঠিক পথেই রয়েছে। কোনো কোনো সূচকের অগ্রগতি শ্লথ, এই যা।

এতদসত্ত্বেও আমরা খুশি হতে পারছি না। বরং চরম অস্বস্তি আমাদের জেঁকে বসেছে। আমাদের প্রিয় রাজধানী ঢাকা পৃথিবীর নিকৃষ্টতম অথবা দ্বিতীয় নিকৃষ্টতম শহর হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। নগরে, শহরে, হাইওয়েতে সর্বত্র দুর্বিষহ ট্রাফিক জ্যাম। হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সড়ক-মহাসড়ক যাত্রীসাধারণকে স্বস্তি দিতে পারছে না। এক অসুবিধা দূর হয় তো অন্য অসুবিধা এসে হাজির হয়। আমাদের আকাশে অনুমতি ছাড়া লক্কড়ঝক্কড় হেলিকপ্টার উড়ছে, তা আবার ভেঙে পড়ছে, যাত্রী মারা যাচ্ছে। লঞ্চডুবি থামছে না, ঈদের ছুটিতে এটি নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঈদ উৎসবকালে মাত্র ১২ দিনে ২৬৫ জন নাগরিক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে। শোবার ঘরে রাস্তায় চলা বাস ঢুকে স্বামী-স্ত্রীকে একসঙ্গে মেরে ফেলেছে। মায়ের পেটে শিশু গুলিবিদ্ধ হয়েছে। রাজনৈতিক দল-উপদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ডজনে ডজনে লোক খুন হচ্ছে, গর্ভধারিণী জননী ছেলেমেয়েকে খুন করছে, বাবা ছেলেকে আবার ছেলে মাকে খুন করছে, নিজেদের  ঘরে আগুন ধরিয়ে দিয়ে ছেলে বাবাকে খুন করছে, মাকে মারাত্মকভাবে আহত করছে। কোলের শিশুকে ধর্ষণ করা হচ্ছে, মেরে ফেলা হচ্ছে। আমাদের পথে চলতে ভয়, ঘরে থাকতে ভয়। আমরা বাঁচব কিভাবে?

নতুন আপদ হিসেবে যোগ হয়েছে জঙ্গি হামলা। হলি আর্টিজান ও শোলাকিয়ার ঘটনা আমাদের জীবনধারায় বড় রকমের ঝাঁকুনি দিয়েছে। আমাদের সুখ-স্বস্তিকে ওলটপালট করে দিয়েছে। ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তত্পরতা প্রশংসনীয়। প্রশ্ন থেকে যায়, জঙ্গিরা দেশের ভেতরে এত অস্ত্র জড়ো করল কিভাবে, তাদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, এত বাসা ভাড়া নেওয়া, অর্থের লেনদেন এসবের ওপর কি কারো কোনো নজরদারি ছিল না? আমার বিশ্বাস, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বর্তমানে যে রকম তত্পর রয়েছে তাতে কোনো সন্ত্রাসী বাহিনী সুবিধা করতে পারবে না। তবে মানুষের মনে অর্থবহ আস্থা ফিরিয়ে আনা সহজ কাজ নয়। আমরা জেনেছি, পবিত্র ঈদুল আজহার জামাতে শোলাকিয়াতে মাত্র এক হাজার, মতান্তরে কয়েক হাজার, লোকের সমাগম হয়েছিল। যেখানে প্রতি ঈদে লাখ লাখ লোকের সমাগম হতো, সেখানে এত ক্ষুদ্র আকারের জামাত অতীব হতাশাব্যঞ্জক। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার অজুহাত এ ক্ষেত্রে বড় একটা গ্রহণযোগ্য হবে না। আস্থা সৃষ্টির জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জনবান্ধব হয়ে জনসাধারণকে সঙ্গে নিয়ে জঙ্গি তত্পরতা মোকাবিলা করতে হবে।

দেশে শিক্ষার প্রসার হয়েছে, সাক্ষরতার হার বেড়েছে। প্রতিবছর লাখ লাখ পরীক্ষার্থী এসএসসি-এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হচ্ছে, সবই খুশির খবর। দুঃখজনক হচ্ছে শিক্ষার মান নিয়ে কেউই সন্তুষ্ট নয়। এমনকি জিপিএ ৫ পাওয়া পরীক্ষার্থীও নয়। সে লজ্জিত বোধ করছে তার উচ্চ গ্রেডের ফল লোকজনকে জানাতে। তার ধারণা, এ ফল দেখে লোকজন হাসাহাসি করবে। পরীক্ষার উচ্চ গ্রেড এখন হাসির খোরাক জোগাচ্ছে। এর আগে দু-একবার ওই পরীক্ষার্থীর চিঠি আমি পত্রিকায় প্রকাশ করেছি বিধায় এবার তা করছি না। এ হতাশার তাত্পর্য সুদূরপ্রসারী। শিক্ষাব্যবস্থার মূল্যায়ন পদ্ধতি যদি দারুণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয় অথবা ভেঙে পড়ে, তবে এ ধরনের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি দেশের সর্বনাশ ডেকে আনে। শিক্ষাব্যবস্থার পুনর্গঠন বা মেরামত আজ সময়ের দাবি। শিক্ষায় নৈরাজ্য চলতে থাকলে মানবসম্পদের মারাত্মক ঘাটতি আমাদের উন্নয়ন প্রচেষ্টা দাবিয়ে রাখবে। আমরা পরদেশ মুখাপেক্ষী হয়ে থাকব।

শিল্পে আমাদের উৎপাদন বেড়েছে। শিল্পজাত পণ্য, বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও ওষুধের উৎপাদন ও রপ্তানি আশাতীতভাবে বেড়েছে। শিল্প খাতে প্রচুর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। জিডিপিতে শিল্পের অবদানের অনুপাত আগের তুলনায় লক্ষণীয়ভাবে বেশি, যার অর্থ দাঁড়ায় অর্থনীতিতে আধুনিকতার ছোঁয়া ভালোভাবেই লেগেছে। যে এলাকায় আমরা বারবার হোঁচট খাচ্ছি তা হলো শিল্পাঙ্গন, আরো স্পষ্ট করে বললে শিল্প-কারখানার ভবনগুলোয় শ্রমিকের নিরাপত্তাব্যবস্থা। গত কয়েক বছরে একের পর এক দুর্ঘটনায় শত শত শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আরো বেশি শ্রমিক পঙ্গু হয়ে জীবন কাটাচ্ছে। অতি সম্প্রতি টাম্পাকো ফয়েলসের বিস্ফোরণে ৩৬ জনের বেশি শ্রমিক আগুনে পুড়ে ও ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে মারা গেছে। পুরো ফ্যাক্টরি ভবন জ্বলেপুড়ে গলে ধসে পড়েছে। এর কিছুদিন আগে চট্টগ্রামে ডিএপি কারখানায় বিস্ফোরণে বহু লোক মারা পড়েছে। বিষাক্ত গ্যাসে পরিবেশ মারাত্মকভাবে বিপন্ন হয়েছে। ঢাকায় দেশের অন্যতম বৃহত্তম শপিং মল বসুন্ধরা সিটিতে মারাত্মক আগুন লেগে বেশ কয়েকটি উঁচু তলা পুড়ে গেছে, দীর্ঘ সময় পুরো শপিং মল বন্ধ রাখতে হয়েছে। এর অল্প কয়েক মাস আগে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও নরসিংদীতে বয়লার বিস্ফোরণ ও আগুনে কয়েকটি শিল্প-কারখানায় জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তারও আগে রানা প্লাজা, নিমতলী, তাজরীন ফ্যাশনস, স্পেকট্রার রোমহর্ষক দুর্ঘটনার কথা মনে হলে আজও সুস্থ মানুষ শিউরে ওঠে। এসব ঘটনার জন্য প্রাথমিকভাবে দায়ী বলে চিহ্নিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও আজ পর্যন্ত সেসব মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তির দৃশ্যমান সীমানায় আসেনি। দায়ী ব্যক্তিরা কবে নাগাদ চূড়ান্তভাবে শাস্তি পাবে, সে সম্পর্কে কিছুই বলা যাচ্ছে না।

আমরা বিপুলসংখ্যক প্রকল্প গ্রহণ করেছি। এখনো করে যাচ্ছি। দু-একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প, যা উচ্চতম মহলের সরাসরি পরিধারণের আওতায় রয়েছে, ঠিকমতো এগিয়ে যাচ্ছে। অন্য প্রকল্পগুলো বছরের পর বছর ঝুলে রয়েছে। শামুকের গতিতে কাজ এগোচ্ছে। দৃষ্টিকটুভাবে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ছে, ব্যয় বরাদ্দ মূল প্রস্তাবের কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে। দুর্নীতির সুযোগও বাড়ছে। প্রকল্প নির্মাণের অজুহাতে রাস্তাঘাট-স্থাপনা ভেঙে চুরমার। জনসাধারণ অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও কর্তাব্যক্তিরা বিদ্যমান রাস্তা মেরামত করে চলাচলের উপযোগী করার ওয়াদা দিয়ে পরে পিছিয়ে যাচ্ছেন। ঠিকাদাররা বেপরোয়া বেরোখাভাবে মানুষকে দিনের পর দিন কষ্ট দিয়ে যাচ্ছে। প্রকল্প সম্পন্ন হলেও উদ্দিষ্ট জনতা তার সুবিধা পুরোপুরি ভোগ করতে পারছে না। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত হয়েছে নতুন রাস্তা নির্মিত হওয়ার পর এর দুই পাশে ছোট দোকানদাররা পসরা সাজিয়ে বসে গেছে। সিটি করপোরেশন কর্তৃক নির্মিত পাবলিক টয়লেটে ভাতের হোটেল চালানো হচ্ছিল। মনে পড়ল পুরনো রেললাইনের ওপর নীলক্ষেত-সোনারগাঁও রাস্তা নির্মিত হওয়ার পর সে রাস্তায় সারি বেঁধে গরু পালন করা হয়েছে। দেখে বোঝা যাচ্ছিল না এটা কি ঢাকা শহরের রাস্তা না গরুর খামার! প্রকল্পের আওতায় নির্মিত স্কুল ভবনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সাময়িকভাবে ঠাঁই নিয়েছেন, আবার কোনো ক্ষেত্রে উদ্বাস্তুরা বাসা বেঁধেছে। সম্পন্ন প্রকল্প থেকে উদ্দিষ্ট জনতা সুবিধা পেতে হলে যে ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলা দরকার আমরা অনেক ক্ষেত্রে তা গড়ে তুলতে পারিনি। ফলে দেখা যায়, গ্রামগঞ্জে বহু চিকিৎসাকেন্দ্র থাকলেও সেখানে পদায়িত ডাক্তারদের সিংহভাগ উপস্থিত থাকেন না, অথচ মাসান্তে তাঁরা ঠিকই বেতন তুলে নিচ্ছেন। তাঁদের দেখাশোনার কেউ আছেন বলে মনে হচ্ছে না। যে জনগোষ্ঠীর উদ্দেশ্যে বা যাদের নাম করে বিপুল অর্থ ব্যয়ে এসব চিকিৎসাকেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে তারা এ চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে তেমন কোনো উপকার পাচ্ছে না। ডাক্তারের বদলে সুইপার বা ওয়ার্ডবয় রোগীকে চিকিৎসা দিচ্ছে।

অর্থনৈতিক দিক থেকে আমাদের প্রভূত উন্নতি হয়েছে, তথ্য-উপাত্ত সহযোগে সহজেই আমরা এ দাবি করতে পারি। সংকলিত ও বিন্যস্ত পরিসংখ্যান এ ব্যাপারে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। অসুবিধা হচ্ছে মাঝেমধ্যেই এমন সব ঘটনা ঘটে, শূন্য থেকে এমন বজ্রপাত হয় যে সব কিছু ওলটপালট হয়ে যায়। কখনো কখনো এসব দুর্ঘটনাকে দুর্বোধ্য মনে হয়, এর পেছনে সমীকরণ এত উঁচু মাত্রায় উিক্ষপ্ত, এর নেপথ্য নায়করা এত বিস্ফোরক মাত্রায় শক্তিশালী যে আমরা এ-সংক্রান্ত তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করতে দ্বিধাবোধ করি। রিপোর্ট প্রকাশের সময়-তারিখ জাতীয় পর্যায়ে ঘোষণা হওয়ার পর অবশেষে যেন চেনা সুরে শুনতে পাই, ‘লগ্নশুভ, নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেল, সে লগ্নে এসেছি’ পিছিয়ে। ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে, আস্থার সংকটে আরো একটি কালো গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। গুজব এখন লতাপাতা ছড়াবে। অবুঝ বালক হয়তো বলবে, ‘নাদের আলী, আমি আর কত বড় হলে তুমি আমায় তিন প্রহরের বিল দেখাবে?’ নিজের অজান্তেই বুঝি তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসবে, ‘কেউ কথা রাখেনি, ৩৩ বছর কাটল, কেউ কথা রাখে না। ’

আমাদের ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত। এতদসত্ত্বেও আমাদের কৃষকরা প্রযুক্তির যথাসাধ্য সদ্ব্যবহার করে এবং গায়ে-গতরে খেটে কৃষিজ পণ্যের উৎপাদন প্রশংসনীয়ভাবে বৃদ্ধি করেছে। দখল-বেদখলের মুখে অতিকষ্টে তারা কৃষিকাজ চালিয়ে যাচ্ছে। দেশের নদীনালা, খালবিল, মাঠ-ময়দান, বনবাদাড়-রাস্তাঘাট, সড়ক-জনপথ, হাওর-বাঁওড়, সবই দখলদারদের কবলে পড়েছে। পরিবেশ এখন বিপন্ন। উৎপাদন ব্যাহত, পরিবহনব্যবস্থা সংকটাপন্ন, পণ্যের বাজারজাতকরণ কষ্টসাধ্য। সিন্ডিকেটবাজরা বাজার দখল করে নিয়েছে; ওদের ঠেকানো যাচ্ছে না। দখলদাররা অর্থনীতির টুঁটি চেপে ধরছে। ভূমি থেকে শুরু করে সব প্রাকৃতিক সম্পদকে সংকুচিত করছে। ওদের কাছ থেকে ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ মুক্ত করতে না পারলে আমরা দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন ঘাটতির মুখে পড়তে পারি।

আমাদের এখন আত্মজিজ্ঞাসার সময় এসেছে। নির্বাহী ও কর্মী পর্যায়ের ব্যক্তিদের খুব কাছে থেকে দেখে আমার ধারণা হয়েছে যে আমাদের দেশের লোকজন সাধারণভাবে বুদ্ধিমান। বিশ্বে সাড়াজাগানো প্রায়োগিক আবিষ্কারে আমাদের তেমন অবদান না থাকলেও প্রাত্যহিক জীবনে ছোটখাটো উদ্ভাবনীমূলক কাজে বাংলাদেশি নাগরিকদের যথেষ্ট পারদর্শিতা রয়েছে। নিষ্ঠা ও একাগ্রতা নিয়ে কাজ করলে আমরা এলাকাভিত্তিক সমস্যা তো বটেই, জাতীয় জীবনের জটিল সমস্যাও সমাধান করতে পারি। আমাদের যেমন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রকল্প অনুমোদনের রেকর্ড রয়েছে, তেমনি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রকল্প সম্পন্ন করারও দৃষ্টান্ত রয়েছে।

যে কারণে এখন তা করতে পারছি না তা হচ্ছে, আমাদের অগ্রহণযোগ্য কর্মধারা (Work Style) ও কর্মাভ্যাস (Work ethics)। আমরা নিষ্ঠা, একাগ্রতা, যথোপযোগী ব্যবস্থাপনা কৌশল সহকারে কর্মসম্পাদন করছি না। অনড় একাগ্রতা নিয়ে সমস্যার গভীরে যেতে চেষ্টা করছি না, সময় নিয়ে ধৈর্যসহকারে কোনো প্রস্তাব বা কেস পর্যালোচনা করি না। সব সময় তাড়াহুড়া করছি। কত তাড়াতাড়ি কর্মস্থল ত্যাগ করে ঘরে ফিরতে পারি সে নিয়ে ব্যস্ত থাকি। আমাদের দুর্বলতম জায়গা হচ্ছে জনসম্পদ ব্যবস্থাপনা (Personnel Management)। যথাযথ উৎসাহ-কাঠামো নির্মাণ করে কর্মক্ষেত্রে আমরা x-efficiency-র অবদান সুনিশ্চিত করতে পারিনি। পক্ষান্তরে ত্রুটিপূর্ণ নিয়োগ, মূল্যায়ন, পদোন্নতি, পদায়নের মাধ্যমে দক্ষতা, পারদর্শিতা ও কর্মনিষ্ঠাকে অবদমিত করেছি।

কাজে ফাঁকি দেওয়া, পদ্ধতি বিকৃতি ও দুর্নীতি আমাদের অনেকের জীবনে প্রাত্যহিক অনুষঙ্গ হয়ে গেছে। এই অনৈতিক কাজ বন্ধ করার জন্য আমরা কোনো দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করিনি। আমরা সহ্য করেছি, সময় বিশেষে আশকারা দিয়েছি। দীর্ঘ সময় ঝিমিয়ে-কাটিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন কয়েক মাস আগে গা-ঝাড়া দিয়ে উঠেছিল। আমরা আশান্বিত হয়েছিলাম। এখন দেখছি কমিশনের তত্পরতা যেন একটু কমে গেছে। কমিশন আবার তত্পর হলে জনমনে কিঞ্চিৎ হলেও স্বস্তি ফিরে আসবে। জাতির জীবনে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন, দুর্নীতিমুক্ত মানবিক সুপ্রশাসন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক ন্যায়াচরণ। আমরা অবশ্যই পারব যদি উপর্যুক্ত ছয়টি উপাদান দৃঢ়ভাবে ধরে রাখতে পারি।

লেখক : সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান    


মন্তব্য