kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সার্কের আকাশে দুর্যোগের ঘনঘটা

ফরিদুল আলম

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



সার্কের আকাশে দুর্যোগের ঘনঘটা

প্রতিষ্ঠার ৩১ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় রকমের ধাক্কা খেল দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা বা সার্ক। গত ২৭ সেপ্টেম্বর ভারত সরকারের পক্ষ থেকে সার্কের বর্তমান সভাপতি রাষ্ট্র নেপালকে আসন্ন ইসলামাবাদ সম্মেলনে তাদের যোগদান না করার বিষয়টি জানিয়ে দেয়।

এর পরপরই তিনটি রাষ্ট্র বাংলাদেশ, আফগানিস্তান ও ভুটানও তাদের অপারগতা প্রকাশ করে। ফলে স্থগিত হয়ে যায় নভেম্বর পাকিস্তানে অনুষ্ঠেয় সার্কের ১৯তম আসর। সেই সঙ্গে সংস্থাটির ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ড ও অস্তিত্ব নিয়ে বড় ধরনের সংশয় দেখা দিল। ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের সেনা ব্রিগেডে সন্ত্রাসী হামলায় ভারত ও পাকিস্তানের টানাপড়েনের জের ধরে শীর্ষ সম্মেলন স্থগিত হয়ে গেল বলে মনে করা হচ্ছে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বিকাশ স্বরূপ তাঁর টুইট বার্তায় লেখেন, ‘আঞ্চলিক সহযোগিতা ও সন্ত্রাস একসঙ্গে চলতে পারে না। ইসলামাবাদে অনুষ্ঠেয় সার্ক শীর্ষ সম্মেলন থেকে সরে দাঁড়াল ভারত। ’ বিকাশ স্বরূপ তাঁর টুইটে বলেন, ‘সার্কের সভাপতি দেশ নেপালকে ভারত জানিয়েছে, এ অঞ্চলে আন্তসীমান্ত সন্ত্রাসী হামলা বেড়ে যাওয়ায় ও সদস্য দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে একটি দেশের হস্তক্ষেপ বেড়ে যাওয়ায় এমন এক পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে, যা ইসলামাবাদে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের জন্য সহায়ক নয়। আঞ্চলিক সহযোগিতা, কানেক্টিভিটি ও যোগাযোগের ব্যাপারে ভারত তার অঙ্গীকারের ব্যাপারে অবিচল আছে। ভারত বিশ্বাস করে, শুধু সন্ত্রাসমুক্ত পরিবেশেই এসব এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ভারতের পক্ষে ইসলামাবাদে প্রস্তাবিত শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেওয়া সম্ভব নয়। ’ যদিও এর আগে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একরকমের সিদ্ধান্ত ছিল যে পাকিস্তানের সঙ্গে সাম্প্রতিক অবনতিশীল সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারপ্রধান হিসেবে শেখ হাসিনা সম্মেলনে যোগ দেবেন না।

নানা দিক দিয়েই এবারের অনুষ্ঠেয় সার্ক সম্মেলনটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। গত ১৮তম কাঠমাণ্ডু সম্মেলনের সময় সিদ্ধান্ত গ্রহণের একেবারে চূড়ান্ত পর্বে গিয়ে আঞ্চলিক যোগাযোগ ও কানেক্টিভিটির বিষয়টি ঝুলে যায়। ধারণা করা যাচ্ছিল যে এবারের সম্মেলনে সেটি আলোর মুখ দেখবে।

এখানে বলে রাখা ভালো যে বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক কয়েক বছর ধরে বেশ তিক্ততার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল এবং এর মূল কারণ হচ্ছে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার কর্তৃক ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়ায় অনমনীয় অবস্থান, যার ফলে এর মধ্যেই ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া। পাকিস্তান রাষ্ট্র ও সরকারের প্রতি অনুগত এসব ব্যক্তির সাজা দেশটি ভালোভাবে নেয়নি বলেই সে দেশের জাতীয় পরিষদ এ নিয়ে নিন্দা প্রস্তাব পর্যন্ত পাস করতে দ্বিধা করেনি। এ ছাড়া ইসলামাবাদে বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে সে দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে পাঠিয়ে তারা আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ প্রকাশের মধ্য দিয়ে বারবার আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে আমাদের সার্বভৌমত্বে আঘাত করার পাশাপাশি কূটনৈতিক আইন সম্পর্কিত ভিয়েনা কনভেনশনের প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রদর্শন করেছে। বাংলাদেশ বরাবরই পাকিস্তানের এ ধরনের কার্যক্রমকে কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বলে পাকিস্তানকে পাল্টা প্রতিবাদ জানালেও পাকিস্তান নিজেকে এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে নিবৃত্ত করেনি। সর্বসাম্প্রতিক সময়ে যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াতের অপর শীর্ষ নেতা মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর পাকিস্তান একইভাবে প্রতিবাদের ভাষা প্রয়োগ করলে বাংলাদেশও সার্ক সম্মেলনে যোগদান না করার ব্যাপারের নিজের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে থাকে। অবশ্য এ ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান বাংলাদেশ, আফগানিস্তান ও ভুটানকে তাদের সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করেছে; যদিও এ ক্ষেত্রে ভূটান কী কারণে সার্কে যোগদান না করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা স্পষ্ট নয়। তবে এ ক্ষেত্রে ভারতের তরফ থেকে আঞ্চলিক সন্ত্রাসবাদে পাকিস্তানকে দোষী করাটা ভুটানের সিদ্ধান্তের পেছনে যুক্তির দাবি রাখে।

এদিকে দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যুতে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে দূরত্ব বেড়েছে। এই দূরত্বের মূলে আল-কায়েদা ও আইএস ইস্যু মুখ্য থাকলেও এ বিষয়কে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে আরো কিছু টানাপড়েন। গত জুলাই মাসে আফগানিস্তানের তোরখাম (খাইবারপাস) সীমান্তে সামরিক যান মোতায়েন করে পাকিস্তান। আফগানিস্তানও পাকিস্তানি আগ্রাসন রুখতে সেখানে সামরিক বাহিনী পাঠিয়েছিল। তখন উভয় দেশের সেনাবাহিনী সীমান্তে মুখোমুখি অবস্থান নেওয়ায় ওই অঞ্চলে উত্তেজনা বেড়ে গিয়েছিল। আফগানিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানের বৈরিতা বৃদ্ধির মূল কারণ হচ্ছে, দেশটির সেনাবাহিনী ও ন্যাটো বাহিনীর ওপর পাকিস্তানে আশ্রিত তালেবানি হামলা। পাকিস্তান তালেবানকে আইএসআইয়ের মাধ্যমে সহায়তা দেয় বলে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আফগানিস্তান অভিযোগ করে আসছে। এদিকে ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বিদ্যমান পাকিস্তান-আফগানিস্তান সম্পর্কের তিক্ততা কাজে লাগিয়ে ভারত-ইরান-আফগানিস্তানের সম্পর্কের যে নতুন বলয় সৃষ্টি করেছেন তা পাকিস্তান-আফগানিস্তান সম্পর্কের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত রকমের তিক্ততার জন্ম দিয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে মোদি ইরান যান এবং চাবাহার বন্দরের ব্যাপারে ইরানের সঙ্গে চুক্তি করেন। ওই চুক্তিতে আবার আফগানিস্তানকেও সঙ্গে রাখে ইরান ও ভারত। ভারত-ইরান-আফগানিস্তান—এই তিন দেশ মিলে ট্রানজিট চুক্তি করে, যেটা পাকিস্তান মোটেও ভালো চোখে দেখছে না। পাকিস্তান মনে করে, আফগানিস্তানের সঙ্গে পণ্য পরিবহনের ব্যাপারে তারা যে দরকষাকষি করত, এই চুক্তির মাধ্যমে তা ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।

এর আগে ১৮টি সম্মেলনের মাধ্যমে নানা ক্ষেত্রে কাজ করার অঙ্গীকার থাকলেও কার্যক্ষেত্রে তার দৃশ্যমানতা লক্ষণীয় নয়। বিশেষত দারিদ্র্য বিমোচন ও জনগণের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে এর যাত্রা শুরু হলেও এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায় যে সার্ক এ অঞ্চলের দারিদ্র্য বিমোচনে কোনো ভূমিকাই রাখতে পারেনি। সাপটা চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও এ এলাকায় এর প্রভাব লক্ষণীয় নয়, বরং বাংলাদেশের মতো দেশগুলো ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত ব্যাপক ঘাটতি মোকাবিলা করছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপীয় আঞ্চলিকতার বিকাশ ঘটার পেছনে তখনকার বৈশ্বিক দুই বৃহৎ শক্তির মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধের বাস্তবতা অন্যতম কারণ হিসেবে বিরাজ করেছিল, যার মাধ্যমে আঞ্চলিক সহযোগিতা, বিশেষ করে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে স্বাবলম্বিতার মাধ্যমে বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতি নির্ভরশীলতা হ্রাস করে সম্ভাব্য যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করা ছিল মূল উদ্দেশ্য। ধীরে ধীরে এই আঞ্চলিকতাবাদের ধারণা সামগ্রিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি জনপ্রিয় ধারণা হিসেবে পরিণত হওয়ার প্রেক্ষাপটে এমন আরো কিছু আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণা ধীরে ধীরে বিস্তৃত হতে থাকে; যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোর সমন্বয়ে অর্থনৈতিক কমিশন, উত্তর আটলান্টিক দেশগুলোর মধ্যকার মুক্ত বাণিজ্য এলাকা বা নাফটা, দক্ষিণ আফ্রিকার উন্নয়ন সহযোগিতা, আসিয়ান, সার্ক ইত্যাদি। দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে শান্তি, সহযোগিতা, সমন্বিত আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান পর্যায়ের ১৮টি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের বেড়াজাল থেকে মুক্তি লাভ করে স্বাধীনতা অর্জন করলেও এ অঞ্চলের মানুষের আর্থসামাজিক মুক্তি ঘটেনি; বরং নানা অভ্যন্তরীণ, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ঘাত-প্রতিঘাতের নির্মম শিকার হতে হয়েছে। তাই এ অবস্থায় সংগত কারণেই সার্ককে ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। সার্ক এই সুদীর্ঘ পথ পরিক্রমায় দক্ষিণ এশিয়ার বিশাল জনগোষ্ঠীর আকাঙ্ক্ষাকে কতটুকু ধারণ করতে পেরেছে, সত্যিকার অর্থে কতটুকু আঞ্চলিক সংস্থা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে, এর সদস্য রাষ্ট্রগুলো সার্ককে কেন্দ্র করে কতটুকু সহযোগী মনোভাবের পরিচয় দিতে পেরেছে এবং সর্বোপরি আন্তর্জাতিক রাজনীতি, বিশেষত পশ্চিমা প্রভাব কতটুকু এ সংস্থার দৃশ্যমান উন্নতি না হওয়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছে, তা আজ ব্যাপক বিশ্লেষণের দাবি রাখে। সঙ্গে সঙ্গে সংস্থাটি এই সময়ে এসে যে ধাক্কা খেল তা কাটিয়ে উঠতে কতটুকু সক্ষম হবে, তা নির্ভর করছে একান্তভাবেই সদস্য রাষ্ট্রগুলোর, বিশেষ করে পাকিস্তানের সঙ্গে অপর সদস্যদের সম্পর্ক উন্নয়নের ওপর। বাস্তব পরিস্থিতিতে খুব দ্রুত এই ক্ষত সারিয়ে ওঠা সম্ভব বলে মনে হচ্ছে না।

 

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

mfulka@yahoo.com


মন্তব্য