kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


একটা খেলার মাঠ দিন, প্লিজ

মোফাজ্জল করিম

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



একটা খেলার মাঠ দিন, প্লিজ

আট-ন’ বছরের শিশুটির সকালবেলা ঘুম ঘুম চোখে স্কুলে যাওয়া হয় বিদ্যার জাহাজ হওয়ার জন্য, এক জাহাজ বইপত্রের বোঝা পিঠে বইতে বইতে। সেখানে বন্ধু-বান্ধবদের দেখে ঘুমের চটকা কেটে যায় এক ঝটকাতেই।

তারপর সারা দিন ভালোই কাটে হৈ চৈ, ফুর্তি-ফার্তি আর নতুন নতুন দুষ্টুমিতে। সেই সঙ্গে একগাদা হোম টাস্ক-এর ফরমায়েশ দেন শিক্ষক-শিক্ষিকারা, যা বাড়িতে মা-বাবা-গৃহশিক্ষকের নিত্যদিনের এক অবশ্য পালনীয় দায়িত্ব। স্কুল থেকে ফেরার পর শিশুটির বিকেলবেলাটা-সন্ধ্যাবেলাটা কাটে ওই হোম টাস্ক যুদ্ধে। আর এরই মধ্যে সুযোগ পেলেই—সুযোগ না পেলে রাত জেগে—মোবাইল ফোনে, টিভিতে চলে নানা রকম বয়সভিত্তিক কর্মকাণ্ড। বিত্তশালীদের আবদেরে ছেলেটি বা মেয়েটি মা-বাবার কাছ থেকে শৈশব পার হতে না হতেই একটি মোবাইল ফোন আদায় করে ছাড়ে। সেটা সম্ভব না হলে মা-বাবার মোবাইল সেট তো আছেই। বাধা দিলে বাধবে লড়াই। প্রথমেই সহপাঠী বন্ধু-বান্ধবীর উদাহরণ টানা হবে : ওর আব্বা ওর পুরানো সেটটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে যা সুন্দর একটা লেটেস্ট মডেলের মোবাইল দিয়েছে ওকে, আর তোমরা আজ পর্যন্ত একটা সস্তা মোবাইলও দিলে না আমাকে। খাবো না ভাত, যাও। বলেই মেয়ে হলে বালিশে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না, আর ছেলে হলে রাত ১০টা ১১টা পর্যন্ত নিখোঁজ।

বন্ধু-বান্ধবদের ব্যবহূত নানাবিধ মনোহারী বিলাস-সামগ্রীর আকর্ষণ শিশু-কিশোরদের কাছে তীব্র। এর জন্য শুধু ‘অনশন ধর্মঘটই’ না, অনেক সময় অনেক ভয়াবহ কাণ্ড করে বসে বাচ্চারা। আর এ ধরনের ‘ডেমোস্ট্রেশন এফেক্ট’ শুধু শিশুদের নয়, বড়দের বেলাও প্রযোজ্য। পাশের ফ্ল্যাটের ভাবীর নিত্যনতুন ডিজাইনের জড়োয়া গহনা, বাহারি শাড়ির ঝলমলানি ও উচ্চাঙ্গের হাসি দেখতে দেখতে সীমিত আয়ের একজন সৎ অফিসারের স্ত্রীর মাথাও একদিন বিগড়ে যায়। তাঁর অসহায় স্বামী রোজ ঘ্যানঘ্যানানি শুনতে শুনতে একসময় অফিসে ‘এই খামটা রাখুন, স্যার’-এর দিকে ঝুঁকে পড়েন। বেচারা!

আধুনিক জীবনের মোবাইল ফোন নামক অপরিহার্য সামগ্রীটির সঙ্গে ন’দশ বছরের শিশুটির সখ্য গড়ে ওঠে প্রথম প্রথম শুধু মজার মজার খেলার জন্য। মোবাইলভিত্তিক এই সব ‘গেমস’ অবশ্যই বিমল আনন্দদায়ক এবং একটি শিশুর বুদ্ধিবৃত্তি বিকাশের সহায়কও বটে। ওই বয়সে গেমসগুলোতে সাফল্য তার কাছে বিরাট একটা অর্জন মনে হয়, আনন্দে, তুষ্টিতে মন ভরে যায় তার। সে তখন লেখাপড়া আহার-নিদ্রা ইত্যাদি সব কিছু ভুলে মোবাইল ফোন নিয়ে মজনু হয়ে পড়ে থাকে। আর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, অর্থাৎ যখন সে ‘টিন এজে’ প্রবেশ করে, তখন তার কাছে ধরা দেয় হরেক রকম নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল। বন্ধু-বান্ধব, ইউ টিউব ইত্যাদির কল্যাণে অনেক রহস্যময় জগতের পর্দা উন্মোচিত হতে থাকে তার কাছে। আর এ সবই ঘটতে থাকে রীতিমত সংগোপনে। সাক্ষী শুধু ওই স্লিম ফিগারের পকেটবুকসদৃশ যন্ত্রটি, যার নাম মোবাইল ফোন—আধুনিক সভ্যতার এক বিচিত্র সৃষ্টি।

মোবাইলের পাশাপাশি আরেকটি গৃহসামগ্রীর উল্লেখ না করলে সেই সামগ্রীটিকে রীতিমত অপমান করা হবে। একটি শিশুর মনোজগতের ওপর তার প্রভাবও কোনো অংশে কম নয়। সেই ক্লাস ওয়ান-এর জীবন থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজের চৌকাঠ পার হওয়ার পরও এই বস্তুটি আমাদের পরিবারের সবার অতি প্রিয় এক সদস্য। সবার বলতে গৃহকর্তা-গৃহকর্ত্রী থেকে শুরু করে কাজের বুয়া পর্যন্ত আবালবৃদ্ধবনিতা। সে হচ্ছে টিভি। হ্যাঁ, আমি টিভির কথাই বলছি। যে বয়সে শিশুটি কেবল আব্বু-আম্মু, আপু-ভাইয়া বলতে পারে, সেই বয়সেই সে ‘কাত্তুন’ (কার্টুন) বলতেও শিখে ফেলে। টিভিতে কার্টুন সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চোখ গোল গোল করে নিঃশব্দে বসে দেখে। দেখে তো না, বলা যেতে পারে বসে বসে ধ্যান করে। তারপর যখন স্কুলে যেতে শুরু করে, তখন স্কুল থেকে ফিরে পিঠের ওপর থেকে বইপত্র বোঝাই আড়াইমণি বস্তা স্কুলব্যাগ ছুড়ে ফেলে দিয়ে টিভির পর্দার সঙ্গে আঠার মত সেঁটে বসে থেকে কার্টুন দেখতে শুরু করে। কোথায় নাওয়া-খাওয়া, কোথায় খেলাধুলা, কোথায় বিশ্রাম।

তারপর? তারপর বাবু যখন এইট-নাইনে ওঠেন, যখন তার নাকের নিচে, ঠোঁটের ওপরটা প্রথমে নীলাভ, পরে কালচে রং ধারণ করে, তখন টিভির চ্যানেল ঘুরাতে ঘুরাতে ধরা খেয়ে যান ইন্ডিয়ান স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোর মায়াবী জগতে। তখন একদিকে মোবাইল ফোনের একান্ত আপন ভুবন, বন্ধু-বান্ধবীর সঙ্গে আলাপ-প্রলাপ-বিলাপ, অন্যদিকে ইন্ডিয়ান চ্যানেলগুলোর দেহ সৌষ্ঠব প্রদর্শন, শরীর উন্মোচন প্রতিযোগিতা, আর না হয় পারিবারিক ‘যুদ্ধ-বিগ্রহের’ নাটক। এই সব উপসর্গ মিলে এই নীলচে-কালচে গোঁফ উঠি উঠি বাবুটিকে একেবারে ডবল-ট্রিপল প্রমোশন দিয়ে রাতারাতি এমএ ক্লাসে ভর্তি করে দেয়। বাবু যেন হয়ে ওঠে রীতিমত সাবালক। অথচ কথা ছিল, সাবালকত্ব আসবে ধীরে ধীরে, বৃক্ষশাখে যেমন কিশলয় আসে। এ যেন সময়ের আগেই ইঁচড়ে পাকা বিদঘুটে স্বাদের কাঁঠাল। দোষ কিন্তু কাঁঠালের নয়, দোষ পারিপার্শ্বিকতার। দোষ যারা তাকে অকালে পাকিয়েছে তাদের।

তা হলে কী দাঁড়াল? যে শিশুটির শৈশবে বিদ্যার্জনের নামে দলিত, মথিত, নিষ্পেষিত না হয়ে আনন্দ-হাসি-গানের ভেতর দিয়ে জ্ঞানের ভুবনে প্রবেশ করার কথা ছিল, রাতদিন টিভির সামনে ধ্যানমগ্ন বক হয়ে বসে থেকে নানা রকম আদি-অনাদি রসের সন্ধান না করে, মোবাইল ফোন নামক যন্ত্রটিকে সারাক্ষণ কর্ণপটলগ্ন অথবা করপুটগত করে সিদ্ধ-নিষিদ্ধ ফলের আস্বাদন না নিয়ে খেলাধুলা, গান-বাজনা, বইপড়ার জগতের অমিয় পান করার কথা ছিল, তাকে আমরা এক অদ্ভুত ছকবাঁধা জীবনে শৃঙ্খলিত করে ফেলেছি। রাত্রি জাগরণে ক্লান্ত বাবুটিকে গুঁতোতে গুঁতোতে সকাল হতে না হতেই শয্যাত্যাগ করাচ্ছি, তারপর জোর করে কিছু একটা গেলানোর চেষ্টা করছেন তার মা, এরপর স্কুল। স্কুল তো নয়, এখন ওটা হয়ে গেছে অপরাহ্নের কোচিং সেন্টার ও সায়াহ্নের গৃহশিক্ষককে মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুতিপর্ব, প্রিপেরটরি স্টেজ। ‘আমরা তোমাকে দেখিয়ে দিলাম, বলে দিলাম কী পড়তে হবে, কী শিখতে হবে, পরীক্ষায় কী আসবে না আসবে, এখন যাও বাছা বাড়ি যাও, কোচিং সেন্টার ও প্রাইভেট টিউটরের কাঁধে চড়ে পরীক্ষা-বৈতরণী পাড়ি দাও’। স্কুলে পরম পূজনীয় শিক্ষক-শিক্ষিকাদের দায়-দায়িত্ব এখন এই পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। আর ওই কোচিং সেন্টার নামক অঘোষিত বিদ্যালয়ের মালিক ও শিক্ষক আবার তাঁরাই। অর্থাৎ, জানতে চাও, শিখতে চাও? সরি, ওটার চারণভূমি তোমার স্কুল নামক জতুগৃহ নয়, ওটার জন্য আছে কোচিং সেন্টার, আছেন গৃহশিক্ষক। ফেলো কড়ি, মাখো তেল। বোঝো না কেন, এই ‘মার্কেট ইকোনমির’ পৃথিবীতে নাথিং ইজ ফ্রি, (একেসপ্ট ‘ডিউটি ফ্রি’, অ্যান্ড ‘কলেস্টরাল ফ্রি’!)

২.

শহরের স্কুলগুলো ছুটি হয়ে যায় বেলা দু’টোর দিকে। বাড়ি ফিরতে ফিরতে কমপক্ষে আড়াইটা-তিনটা। তারপর নাকে-মুখে চারটা গুঁজে দে ছুট কোচিং সেন্টারের উদ্দেশে। বিশ্রাম? খেলাধুলা? বিশ্রামের সময় কোথায়? বিশ্রাম নিতে গেলে হাজার হাজার টাকার কোচিংয়ের কী হবে? আর খেলাধুলা? সেটা আবার কী? সেটাও কি বিশ্রামের মত খাটে শুয়ে করতে হয়? মাঠ কই? বল কই, ব্যাট কই? আগে পাড়ায় পাড়ায় যে ক্লাব ছিল, ছোটবড় পাঠাগার ছিল, শিশু-কিশোরদের সংগঠনগুলোর আয়োজনে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হতো, গানবাজনা, নাটক, আবৃত্তি ইত্যাদির চর্চা হতো, সেগুলো গেল কোথায়? উত্তর : মাঠ গেছে ভূমিখেকোদের পেটে, আর না হয় মাঠের ওপর দাঁড়িয়ে গেছে আলিশান দালান-কোঠা, দোকানপাট। এখন আর খেলাধুলা-গানবাজনা আঞ্জাম দেওয়ার লোক পাওয়া যায় না। তারা চলে গেছে মাঠ দখল করতে, আর কেউ কেউ স্যারদের পা টিপে টু-পাইস কামাতে।

আশ্চর্য! এই ঢাকা শহরেই ছেলেপুলেদের, তরুণদের খেলাধুলার জন্য কত মাঠ ছিল, সাঁতার কাটার জন্য জলাশয় ছিল। এখন আলাউদ্দিনের জাদুই চেরাগের দৈত্য এসে চোখের পলকে সব লোপাট করে দিয়েছে। বেশি দিন আগের কথা না, এই সত্তরের দশকের গোড়ার দিকে বেইলি রোড এলাকায় থাকতাম আমরা। বাসার কাছেই ছিল মোটামুটি বড়সড় একটা পুকুর। সেই পুকুরে আমার স্ত্রী ছেলেমেয়ে দু’টিকে নিয়ে গিয়ে পাড়ে দাঁড়িয়ে থেকে সাঁতার শিখিয়েছেন। এখন সেই পুকুরের চিহ্নমাত্র নেই। সেখানে এখন পাশাপাশি কয়েকটি বিশাল ফ্ল্যাট বাড়ির সদম্ভ উপস্থিতি। ওই সময়ে শান্তিনগরের ভেতরে এক টিনের চালের বাড়ির সামনে ছিল ছায়াঘেরা একটি ছোটখাট জলাশয়। তার স্থির জলে দল মেলে ফুটে থাকত বেশ কিছু লাল পদ্ম। আমি আর আমার প্রয়াত কবিবন্ধু সতীর্থ প্রফেসর আবু তাহের মজুমদার ছুটির দিনে (তখন রোববার ছিল সাপ্তাহিক ছুটির দিন) হাঁটতে হাঁটতে ওই এলাকায় গিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতাম। মনে হতো যেন ঢাকা শহরে নয়, দাঁড়িয়ে আছি বাংলাদেশের কোনো ঘুঘুডাকা ছায়াঢাকা নিভৃত পল্লীর নির্জনতায়। এখন সেই টিনের চালের বাড়িটি, টলটলে কালো জলের পুকুরটি, লাল লাল পদ্মগুলি আর নেই, তারা জেগে আছে শুধু আমার স্মৃতিপটে।

তেমনি মনে পড়ে আমার শৈশবের (১৯৪০-৫০-এর দশক) প্রত্যেকটি থানা, মহকুমা ও জেলা শহরের মাঠগুলির কথা। জলাশয়গুলির কথা। আমাদের জীবনে তখন প্রাচুর্য ছিল না। চাহিবামাত্র এটা-ওটা মা-বাবার কাছ থেকে পাওয়া যেত না। যা চাইতাম তার প্রয়োজনীয়তা আছে কি না, সেটি কোনো বিলাসসামগ্রী কি না, ওটা পেলে লেখাপড়া শিকেয় উঠবে কি না, এসব ভালো করে বিবেচনা করা হতো। আর মা-বাবা কোনো কিছু দিতে না চাইলে তা নিয়ে উচ্চবাচ্য করা, চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় তোলা—এসব ছিল অচিন্তনীয়। (হায়! এখন একটি মোটরসাইকেল থাকা সত্ত্বেও বাবার কাছ থেকে নতুন মডেলের আরেকটি মোটরসাইকেল না পেয়ে বাবাকে পুড়িয়ে মারে সম্ভ্রান্ত বংশের সন্তান!) আমরা প্রাইমারি ক্লাসে পড়তে প্যাকিং বাক্সের কাঠ দিয়ে ক্রিকেট ব্যাট তৈয়ার করে, রোঁয়া ওঠা টেনিস বলকে ক্রিকেট বল বানিয়ে, থান ইট দিয়ে উইকেট খাড়া করে ক্রিকেট খেলতাম মৌলভীবাজার শহরের মুসলিম কোয়ার্টার্সের ছোট্ট মাঠে। আর জাম্বুরাকে বল বানিয়ে মহা উৎসাহে ফুটবল খেলা, বিকল্পে ন্যাকড়া পেঁচিয়ে গোল করে বলের মত বানানো, অথবা রাবারের ছোট্ট বল নিয়ে খেলা—এগুলো তো ছিল শৈশবের বিকেলগুলোর অপরিহার্য অনুষঙ্গ। বর্ষার দিনে ফুটবল খেলা শেষে কাদামাখা শরীর নিয়ে মৌলভীবাজার শহরের দিলওয়ার ট্যাঙ্কে ঝাঁপাঝাঁপি, অতঃপর সন্ধ্যার আগে গৃহপ্রত্যাবর্তন—‘ভাবিলাম হায়, আর কি কোথায় ফিরে পাব সে জীবন। ’ এখন সেই পাঁড় উঁচু দিলওয়ার ট্যাঙ্কও নেই, তার পুব দিকের সেই খেলার মাঠও নেই। আর খেলুড়েরা? তারা ব্যস্ত মোবাইলে ‘গেমস’ খেলতে, আর না হয় টিভিতে কার্টুন, ‘পোকেমন’ ইত্যাদিতে ডুবে থাকতে। (প্রসঙ্গত, দিলওয়ার ট্যাঙ্কের পুব পাড়ের বাচ্চাদের সেই খেলার মাঠে কর্তৃপক্ষ বহুকাল আগে নির্মাণ করেছে একটি মিলনায়তন। ...সাধু, সাধু!)

তা আমি যে কালের কথা বললাম, সে আজ থেকে ছয়-সাত দশক আগের কথা। তখন দেশের (প্রদেশের) লোকসংখ্যা ছিল কুল্লে চার কোটির মত। তখন ধানক্ষেত, খেলার মাঠ, বনবাদাড় উজাড় করে সড়ক-জনপথ, ঘরবাড়ি বানাতে হতো না। আর এখন ডিজিটাল বাংলাদেশের সুপার চাল্লু লোকেরা অপেক্ষায় আছে, কবে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে বসতি স্থাপনের প্রযুক্তি আয়ত্ত করবে। অবশ্য যে হারে ঢাকা ও দেশের অন্যান্য শহরে নগরায়ণ প্রক্রিয়া চলছে, শহরমুখী গ্রামের মানুষের জনস্রোত বাড়ছে, তাতে বঙ্গোপসাগরকে মনুষ্যবাসোপযোগী করতে পারলে বোধ হয় মন্দ হতো না।

আমাদের শৈশব আর এখনকার প্রজন্মের খোকা-খুকুদের শৈশবের মধ্যে আকাশ-পাতাল প্রভেদ প্রায় সব ব্যাপারেই। এরা এখন নিঃসন্দেহে অনেক বেশি স্মার্ট, অনেক কিছু দেখছে, জানছে, হাতের কাছে চোখের সামনে পাচ্ছে, যা আমরা কল্পনাও করতে পারতাম না। সারা মৌলভীবাজার শহর চষে ফেলে চল্লিশের দশকে একটা বাক্স মতন দেখতে রেডিও পাওয়া যেত কি না সন্দেহ। আর টিভি তো এদেশে এলোই ষাটের দশকের মাঝামাঝি। তাও শুরুতে বোধ হয় মফস্বল শহরগুলোতে যায়নি। পঞ্চাশের দশকে আব্বার চাকরির সুবাদে আমরা বগুড়া ও নোয়াখালীতে (মাইজদী কোর্ট) ছিলাম। সেই শহরগুলোও তেমন কিছু কুলীন ছিল না। নদীবিধ্বস্ত নোয়াখালীর হালত তো ছিল বড়ই করুণ। গত ষাট বছরে বাংলাদেশের চেহারা-ছবি, মানুষের জীবনযাপন প্রণালী—সবই অনেক বদলেছে। কত কত ‘উন্নয়নের ছোঁয়া’, ‘উন্নয়নের জোয়ার’ ইত্যাদি চোখের সামনেই দেখলাম। ভালো। কিন্তু যা কখনোই দেখতে চাই না, তা উন্নয়নের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে প্রাপ্ত কথায় কথায় খুন-খারাবি, নৃশংসতা, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতির করাল ছোবল, আইনের শাসনের অনুপস্থিতি, বিচারহীনতা ও সর্বোপরি বিপথগামী তরুণসমাজ। আমরা তো আমাদের সময় সুখে-দুঃখে পার করে দিয়েছি; কিন্তু এই তরুণদের হাতে কোন দেশ রেখে যাচ্ছি? তাদের কি আমরা যোগ্য, দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলছি? শুধু বস্তা বস্তা জিপিএ-৫ এবং শৈশবেই ইন্টারনেট, গুগল ও স্যাটেলাইট টিভি বিশেষজ্ঞ হওয়াই কি জীবনের মোক্ষ?

আমরা তো সেই পাঠশালাতেই শিখেছি, সুস্থ দেহে বিরাজ করে সুস্থ মন। আমরা কোনো দিন ভাবতেও পারতাম না, বিকেলবেলা স্কুল থেকে বাসায় ফিরে চুপচাপ ঘরের কোণে বসে থাকব। তাড়াহুড়ো করে চারটা খেয়ে আমরা দৌড়াতাম খেলার মাঠে। কোনো দিন না গেলে আব্বা-আম্মা দুশ্চিন্তায় পড়তেন : অসুখ-বিসুখ করেনি তো? এখনকার তুলনায় সে আমলে সব পরিবারেই বাচ্চা-কাচ্চার সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। বাবা-মার রুজি-রোজগার ছিল সীমিত। মা’রা তো প্রায় সবাই ছিলেন ফুলটাইম গৃহিণী। কিন্তু এত বড় সংসারে, তা ধনীই হোক আর গরিবই হোক, প্রত্যেকটা সন্তানের আদরযত্ন, লেখাপড়া, সে কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে—এসব খোঁজখবর নেওয়া ছিল মা-বাবার প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব। সন্ধ্যার আগে সন্তান বাসায় না ফিরলে খবর ছিল। আর এখন? এখন আমরা এত বেশি বস্তুবাদী হয়ে গেছি, এত বেশি উচ্চাভিলাষী যে যার জন্য বা যাদের জন্য এত ছোটাছুটি, এত দাপাদাপি সে বা তারা কী করছে, কোথায় যাচ্ছে, কেমন আছে, সেটা দেখারই সময় পাই না। ফলে হঠাৎ একদিন খবরের কাগজের পাতায় বা টিভির পর্দায় সন্তানের কোনো হৃদস্পন্দন বন্ধ হওয়ার মত সংবাদ দেখে ‘হায় হাসান, হায় হোসেন’ করতে থাকি। তখন, ডাক্তারি ভাষায়, ‘অলরেডি ইট’স্ ঠু লেট। ’

৩.

তাই বলি, ছেলেটির দিকে, মেয়েটির দিকে একটু তাকান। শুধু জিপিএ ৫-এর সোনার হরিণ তাকে শরীর গঠনে, তার মনোজগত বিকশিত হতে সাহায্য করবে না। তাকে একটি খেলার মাঠ দিন, প্লিজ! তাকে একটি পাঠাগার দিন। একটি গানের স্কুল দিন। প্লিজ! আর শুনুন, তার নৈতিক চরিত্র গড়ে তুলতে ধর্মীয় শিক্ষাকে গুরুত্ব দিন—তা ইসলাম ধর্ম, হিন্দু ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম, খ্রিস্টান ধর্ম, যেকোনো ধর্মই হোক না কেন।

এগিয়ে চলার জন্য শুধু জঙ্গলের ভেতর দিয়ে কণ্টকাকীর্ণ একটিমাত্র পথ নয়, তাকে রৌদ্রকরোজ্জ্বল, আলো ঝলমল আরো পথের সন্ধান দিন। দেখবেন জিতবেন, জাতিও জিতবে।

লেখক : সাবেক সচিব, কবি

mkarim06@yahoo.com


মন্তব্য