kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


চলে গেলেন আমাদের পরম গর্বের ধন...

আলী যাকের

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



চলে গেলেন আমাদের পরম গর্বের ধন...

সৈয়দ হক চলে গেলেন। যাবেন—এ রকমই তো কথা ছিল? যেই মরণব্যাধি তাঁর দেহে আশ্রয় নিয়েছিল এবং যত দূর তাঁকে আক্রমণ করেছিল সেখান থেকে নিরাময় হয়ে ফিরে আসাটা প্রায় অলৌকিক ব্যাপার।

লন্ডনেও তাঁর চিকিৎসকরা এসব কথাই তাঁকে বলেছিলেন। তিনি ফিরে এসেছিলেন দেশে শেষ কয় দিন নিজস্ব পরিবেশে একটু শান্তিতে থাকতে। কিন্তু বেশি দিন থাকা হয়ে উঠল না। এত শিগগিরই চলে যাবেন, সেটা আমরাও ভাবিনি। যদিও রোগটি অত্যন্ত জটিল। নিরাময় হওয়া দুষ্কর। তবু ভেবেছিলাম সাধারণ মানুষ পারে না এমন অলৌকিক অনেক কিছুই তো তিনি পারেন। তিনি অবলীলায় শব্দ নিয়ে খেলাধুলা করতে পারেন। আমার এক বন্ধু তাঁকে এভাবে বর্ণনা করেন—তিনি ছিলেন ‘শব্দের মাস্তান’। কেবল শব্দ নিয়েই যে খেলা করেন তা নয়। ভাব নিয়ে। যতি নিয়ে। ছন্দ নিয়ে। ভাষা নিয়ে। সর্বত্র তাঁর অবলীলায় বিচরণ।

এসব দেখতে দেখতে, তাঁর লেখাগুলো পড়তে পড়তে, সেই একেবারে আদিকাল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত যা লিখেছেন, হঠাৎ একসময় মনে হতো হয়তো বা জীবন নিয়েও এভাবে খেলতে পারেন তিনি। তাঁকে যখন লন্ডনে বলা হলো যে খুব বেশি দিন তিনি আর নেই, তিনি নিশ্চয়ই বিমর্ষ হয়েছিলেন কিন্তু সেটা কাউকে দেখাননি। কাজ করে গেছেন অবিরত। ওই হাসপাতালের বিছানায় শুয়েই শেক্সপিয়ারের ’হ্যামলেট’ নাটকের এক অনবদ্য অনুবাদ তিনি করেছেন। কী অসাধারণ ইচ্ছাশক্তি একটি মানুষের!

এই কয় দিন আগে, দিন পাঁচ কী ছয়; সারা আর আমি যখন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম হাসপাতালে, তিনি বিছানায় শুয়ে হাতটা বাড়িয়ে দিলেন আমার দিকে। হাত ধরলাম। বললেন, এখনো লিখে চলেছেন এবং অচিরেই একটি নাটক আমাকে দেবেন। বিশ্বাস করা শক্ত হয়েছিল। কেননা, তাঁর রোগের যে অবস্থা তাতে তাঁর পক্ষে নাটক শেষ করে যাওয়া সম্ভব হবে বলে মনে হয়নি। তবু মনে হয়েছিল, কী জানি হয়তো বা পারতেও পারেন। সৈয়দ হকের অসাধ্য তো কিছু নেই! আজকে ঘটনাচক্রে আমার বন্ধু আসাদুজ্জামান নূর যখন আমাদের বললেন, মনে হয় না হক ভাই আর বেশিক্ষণ আছেন। তখন বিকেলেই আবার হাসপাতালে গেলাম। গিয়ে তাঁকে দেখলাম ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে। তখন তাঁর জীবনপ্রদীপটি নিবু নিবু অবস্থায় তিরতির করে কাঁপছে। আনোয়ারা ভাবিকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কিছু নেই। কারণ তিনি আমাদের চেয়েও ভালো করেই জানেন অবশ্যম্ভাবী পরিণতিটি কী। তাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমরা বাইরে করিডরে দাঁড়িয়ে। ভেতরে আইসিইউতে তখন জীবন-মরণ যুদ্ধ চলছে। তারপর তাঁরই ভাষায় বলতে হয়, ‘হায়রে মানুষ, রঙিন ফানুস। দম ফুরালেই ঠুস। ’ চলে গেলেন সৈয়দ হক।

বাড়িতে ফিরে এসে তাঁর অনেকগুলো বই খুলে নিয়ে বসলাম। ইতিউতি ছড়িয়ে একবার এটা পড়ি, একবার সেটা। একবার ’পরানের গহীন ভিতরে রুমালের ছোঁয়া’ হৃদয়ে স্পর্শ দিয়ে যায়। অরেকবার ‘জননীর দুগ্ধের মত চাঁদের রোশনাই’ আমায় অনুপ্রাণিত করে। অবশেষে থিতু হই গিয়ে সেই ‘ম্যাকবেথের’ প্রায় শেষ চরণে, যার অভিনয় করার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। ‘নেভো, নিভে যাও, নিবু নিবু দীপ। এ জীবন নিতান্ত এক চলমান ছায়া। হতভাগ্য এক অভিনেতা রঙ্গমঞ্চে কিছুকাল লাফায়, ঝাঁপায় তারপর আর শোনা যায় না সংবাদ। এ হলো কাহিনী এক নির্বোধ কথিত অলংকারে, অনুপ্রাশে ঠাসা ইতি তাত্পর্যবিহীন। ’

অভিবাদন সৈয়দ হক। আপনি বেঁচে থাকবেন হাজার হাজার বছর আমাদের হৃদয়ে। আমরা চলে যাব, বেঁচে থাকবেন আমাদের সন্তানদের হৃদয়ে এবং তারও পরে, তাদের সন্তানদের।

আবারও বলি, আপনি অমর!      

 

লেখক : নাট্যব্যক্তিত্ব

 


মন্তব্য