kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সুস্থ হার্ট, প্রাণবন্ত জীবন

ডা. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



সুস্থ হার্ট, প্রাণবন্ত জীবন

আজ ২৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ব হার্ট দিবস। কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ (সিভিডি) বা হৃদরোগের কারণ ও ঝুঁকি সম্পর্কে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে এই দিবসটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।

চলতি বছর এই দিবসের প্রতিপাদ্য হলো, ‘পাওয়ার ইউর লাইফ’। এর অর্থ দাঁড়ায়, হার্ট শক্তিশালী করুন, জীবন শক্তিশালী করুন। এর অন্য মানে হতে পারে, সুস্থ হার্ট, প্রাণবন্ত জীবন।

বর্তমানে বিশ্বের এক নম্বর মরণব্যাধি হৃদরোগ। উন্নত বিশ্বে এ সংখ্যা কমে গেলেও নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোয় হৃদরোগজনিত মৃত্যুর হার দিন দিন বেড়েই চলেছে। হৃদরোগ ও স্ট্রোকজনিত কারণে মৃত্যুর পরিমাণ বছরে পৌনে দুই কোটিরও বেশি। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে যত লোকের মৃত্যু হয় তার ৩০ শতাংশের মৃত্যু ঘটে হৃদরোগে। অর্থাৎ প্রতি তিনজনে একজনের মৃত্যুর কারণ হৃদরোগ। ব্রিটিশ কার্ডিয়াক সোসাইটির এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ২০২০ সালের মধ্যে উন্নত দেশগুলোয় হৃদরোগীর সংখ্যা বাড়বে ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ, আর উন্নয়নশীল দেশগুলোয় বাড়বে ১২০ থেকে ১৩৭ শতাংশ।

আমেরিকায় প্রতি পাঁচজনে একজনের মৃত্যুর কারণ হৃদরোগ। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) তথ্যমতে, বাংলাদেশসহ প্রাচ্যের দেশগুলোয়ও এ রোগের প্রকোপ দিন দিন বাড়ছে। সংস্থাটি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছে, হৃদরোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশে মহামারি আকারে দেখা দেবে হৃদরোগ।

স্বাস্থ্য বুলেটিন ২০১১ অনুযায়ী বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের হাসপাতালগুলোয় প্রতিবছর যত লোকের মৃত্যু হয়, তার সাড়ে ১২ শতাংশের কারণই হৃদরোগ। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিসংখ্যান মতে, বাংলাদেশে প্রতি ১০ জনে একজনের হৃদরোগের সমস্যা রয়েছে।

হৃদরোগজনিত মৃত্যুর ৮০ শতাংশ কমানো সম্ভব সচেতনতা ও প্রতিরোধের মাধ্যমে। মনে রাখা দরকার, হৃদরোগ এক দিনে হয় না। বরং দীর্ঘদিন ধরে ধমনিতে কোলেস্টেরল জমতে জমতে এ রোগের সৃষ্টি হয়। এ জন্য দায়ী মানুষের সচেতনতার অভাব। ধূমপান ও তামাক পরিহার, তেল ও চর্বিজাতীয় খাবার বর্জন, সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন ৩০ মিনিট করে হাঁটা, অ্যালকোহল পরিহার করা, হালকা ব্যায়াম করলে ও কিছুটা কায়িক পরিশ্রম করলে হৃদরোগের আশঙ্কা অনেকাংশেই কমে যায়।

নন-কমিউনিকেবল ডিজিজেস রিস্ক ফ্যাক্টর সার্ভে বাংলাদেশ, ২০১০-এ দেখা যায়, দেশের মোট ধূমপানকারী ২৬.২ শতাংশ। ৫৪.৮ শতাংশ পুরুষ ধূমপায়ী। সার্ভে বলছে, এদের মধ্যে ৩৫ শতাংশ ধূমপান শুরু করে ১৫ বছর বা তারও আগে। এর মধ্যে ৪৩ শতাংশ বিড়ি বা সিগারেট খায়। স্মোকলেস টোব্যাকো যেমন জর্দা বা গুল ব্যবহার করে ৩১.৭ শতাংশ। এই জরিপে আরো দেখা গেছে, আমাদের প্রতিদিন ফলমূল খাওয়া উচিত। অথচ দেশের মানুষ সপ্তাহে মাত্র ১.৮ দিন ফলমূল খায়। তবে শাকসবজি খাওয়ার পরিমাণ আনুপাতিক হারে ভালো, যা সপ্তাহে ছয় দিন। কায়িক পরিশ্রম বা ব্যায়ামের বিষয়ে দেখা গেছে, মানুষ গড়ে ১৭৭ মিনিট করে কায়িক পরিশ্রম করে, যা খুবই কম সময়। এ ক্ষেত্রে পুরুষরা করে ২৬৮ মিনিট, নারীরা ৯৮ মিনিট। ৮২ শতাংশ নারী কোনো ফিজিক্যাল এক্সারসাইজ করে না। বডিমাস ইনডেক্সের (BMI) ক্ষেত্রে অর্থাৎ ওজন হিসেবের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ১৪ শতাংশ অতিরিক্ত ওজনের।

হৃদরোগের অন্যতম বড় কারণ হাইপারটেনশন বা উচ্চ রক্তচাপ। এই জরিপে উচ্চ রক্তচাপের মাত্রার পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, শহরে উচ্চ রক্তচাপের রোগীর পরিমাণ প্রায় ২০ শতাংশ আর গ্রামে প্রায় ১৮ শতাংশ।

হৃদরোগের কারণের জন্য উচ্চ রক্তচাপের পাশাপাশি অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণ, ধূমপান, রক্তে উচ্চ কোলেস্টেরল, হৃদরোগের পারিবারিক ইতিহাস, অত্যধিক দুশ্চিন্তা বা মানসিক চাপ, মেদস্থূলতাকে হৃদরোগের জন্য দায়ী করা হয়। তবে এটা ঠিক যে উন্নত বিশ্বে হৃদরোগজনিত কারণে মৃত্যুর সংখ্যা কমছে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের দেশগুলোয় এ হার বাড়ছে। কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ (সিভিডি) থেকে অকালমৃত্যু কমপক্ষে ৮০ শতাংশ এড়ানো যেত, যদি চারটি প্রধান ঝুঁকি—তামাক ব্যবহার, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও অ্যালকোহলের ক্ষতিকর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা যেত। আমাদের দেশে ধূমপানের প্রবণতা কমে এলেও জর্দা, তামাক বা গুলের ব্যবহার কমছে না। বিশেষ করে মহিলাদের মধ্যে এর প্রবণতা বেশি। এ বিষয়ে আরো সচেতন হতে হবে। তা ছাড়া সেকেন্ডহ্যান্ড স্মোক কিন্তু এক-তৃতীয়াংশ ক্ষতি করছে। অর্থাৎ যে ব্যক্তি ধূমপান করছে তার যতটুকু ক্ষতি হচ্ছে তার এক-তৃতীয়াংশ ক্ষতি হচ্ছে যার সামনে ধূমপান করা হচ্ছে তার। আমাদের দেশের আইন যেহেতু পক্ষে আছে, তাই ধূমপানকারীকে কারো সামনে ধূমপান না করার জন্য বলা উচিত।

যে স্থানে আমরা বসবাস করি, যেখানে কাজকর্ম করি সেই পরিবেশ, স্থান বা কাজও হৃদরোগের জন্য দায়ী হতে পারে। যেমন—স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া বা দূষিত ধোঁয়ামুক্ত অঞ্চলে বসবাসের ফলে হার্টের ক্ষতি কম হতে পারে। এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে।

মানুষের জীবনধারা পরিবর্তন হওয়ার ফলে খাবারে জাঙ্কফুড বেশি ঢুকে যাচ্ছে। কমে যাচ্ছে হাঁটাহাঁটির পরিমাণ। ফরমালিনের ভয়ে ফ্রেশফ্রুটস খাওয়া কমে যাচ্ছে। তবে গত বছর আমরা দেখেছি, ফরমালিনের বিরুদ্ধে সরকার বেশ ভূমিকা রেখেছে। এতে কিন্তু মানুষের ফলমূল খাবার পরিমাণ বেড়েছে। হৃদরোগ প্রতিরোধে এটা বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে। বিশিষ্ট ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদের খাওয়ার স্যালাইন নিয়ে ক্যাম্পেইন ‘দে ঘুটা’ বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। এখন দেশের মানুষ ডায়রিয়া সম্পর্কে অনেক সচেতন। তেমনি হৃদরোগের প্রবণতা কমাতে সোশ্যাল মিডিয়াগুলোকে আরো তত্পর ভূমিকা রাখতে হবে।

একটি সমস্যা হলো ঢাকায় আমাদের ফুটপাত তেমন নেই। কেউ ইচ্ছা করলেই হাঁটতে পারে না। আমাদের শিশুদের জন্য নেই পর্যাপ্ত খেলার মাঠ। স্কুলের বাচ্চারা এখন ফার্মের মুরগির মতো ঘরে বসেই সময় কাটায়। খেলাধুলা বলতে তাদের কাছে কম্পিউটার গেমস জনপ্রিয় হয়ে গেছে। এখানে তো কায়িক শ্রম হচ্ছে না। তাহলে আমার বা ওই শিশুটির হার্ট সুস্থ থাকবে কিভাবে? অথচ আমরাই বিদেশে গেলে প্রচুর হাঁটাহাঁটি করি, কিন্তু এখানে হাঁটি না।

আমরা নিজের ব্যবহৃত গাড়িটিকে ছয় মাস পর পর সার্ভিসিং করাই। অথচ সৃষ্টিকর্তা যে শরীর দিয়েছেন তার কোনো খোঁজ রাখার প্রয়োজন মনে করি না। অথচ আমাদের বয়স ৪০ পেরোলেই নিয়মিত রক্তচাপ মাপা উচিত, ব্লাড সুগার কত, তা মাঝেমধ্যে পরিমাপ করা উচিত। রক্তের কোলেস্টেরল প্রোফাইল, কিডনির ফাংশন কেমন তা বছরে অন্তত একবার হলেও জানা উচিত। অন্তত বছরে দুবারও যদি কেউ রক্তচাপ পরীক্ষা করে, তাহলে এটা দেখা যাবে তার কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না। এ জন্য আমার নিজের স্বাস্থ্যের যত্ন নিজেকেই নিতে হবে। সে প্রেক্ষাপটে এবারের বিশ্ব হার্ট দিবসের স্লোগানটি খুবই তাত্পর্যপূর্ণ। কেননা এ শরীর একান্তই আমার। তাই আমি নিজে আমার স্বাস্থ্যের ব্যাপারে সচেতন হব। নিজে দায়িত্ব নিয়ে আমার ডায়েটের অভ্যাস ঠিক করব, ফিজিক্যাল অ্যাকটিভিটি বা কায়িক পরিশ্রম বাড়াব, ধূমপান ছাড়ব, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করব, প্রয়োজনে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হব।

শুধু জীবনধারা পরিবর্তন করেই নিজের হার্ট সুস্থ রাখা যায়। এ জন্য হার্টকে ভালোবাসতে হবে। নিজের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যতথ্য, যেমন উচ্চ রক্তচাপ, বডি৯মাস ইনডেক্স (বিএমআই), রক্তে কোলেস্টেরল ও শর্করার মাত্রা সম্পর্কে আগেভাগেই অবগত হতে হবে। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করলে বলা যায়, হৃদরোগজনিত মৃত্যুর হাত থেকে  অনেকাংশেই রক্ষা পাওয়া সম্ভব।

লেখক : ক্লিনিক্যাল ও ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট

অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, হৃদরোগ বিভাগ, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল,  drwadud@hotmail.com

অনুলিখন : আতাউর রহমান কাবুল


মন্তব্য