kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


রঙ্গব্যঙ্গ

ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার কল্পকাহিনী

মোস্তফা কামাল

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার কল্পকাহিনী

আলিমউদ্দিনের (কাল্পনিক নাম) গ্রামের বাড়ি বাকেরগঞ্জে। তাঁর জন্ম ১৯৬৫ সালে।

তিনি সরকারি চাকরি করেন। নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা আলিমউদ্দিন বলে পরিচয় দেন। কেউ মুক্তিযোদ্ধা আলিমউদ্দিন বলে ডাকলে বেশি খুশি হন। মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ে তিনি সরকারি চাকরিতে ঢুকেছেন। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরকারের সব সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন। কিন্তু কিভাবে সম্ভব? মুক্তিযুদ্ধের সময় যাঁর বয়স ছিল মাত্র ছয় বছর, তিনি কী করে মুক্তিযোদ্ধা হলেন?

এই রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য একজন সাংবাদিক অনুসন্ধান শুরু করলেন। প্রথমেই আলিমউদ্দিন সাহেবের সাক্ষাৎকার নিতে তাঁর দপ্তরে গেলেন। তাঁর দপ্তরের সামনে নেমপ্লেটে ‘মুক্তিযোদ্ধা আলিমউদ্দিন’ লেখা রয়েছে। নিচে ছোট করে লেখা সাবরেজিস্ট্রার। সাংবাদিক সাহেব ভেতরে গেলেন। তাঁকে দেখে আলিমউদ্দিন বললেন, কী খবর ‘সাংঘাতিক’ ভাই? আমার মতো চুনোপুঁটির সাক্ষাৎকার নিতে এলেন?

আপনার নেমপ্লেটে ‘মুক্তিযোদ্ধা’ শব্দটি নামের আগে দেখলাম। নামের আগে এভাবে কেউ লেখে?

আরে ভাই, কে লেখে আর কে লেখে না, তা আমার জানার বিষয় নয়। আমি লেখি। আমার ভালো লাগে, তাই লেখি। মুক্তিযোদ্ধা শব্দটির যে শক্তি, তা একবার চিন্তা করে দেখেন! আমি ভাই ওই শব্দটাকে নামের অংশ বানিয়ে ফেলেছি। আপনি লোকজনের কাছে জিজ্ঞেস করে দেখেন, মুক্তিযোদ্ধা আলিমউদ্দিন ছাড়া কেউ আমাকে চিনবে না। সবাই আমাকে ওই নামেই ডাকে। এটা এখন একটা ব্র্যান্ড হয়ে গেছে। আমি ইচ্ছা করলেও ওটাকে আর বদলাতে পারব না।

তাই?

হ্যাঁ ভাই। বিশ্বাস না হলে এলাকায় যান। সবার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন।

আপনি যুদ্ধ করেছিলেন?

আজব প্রশ্ন! যুদ্ধ না করেই কি মুক্তিযোদ্ধা হয়েছি?

কোথায় যুদ্ধ করেছিলেন?

ওহ্! আপনি তো দেখছি আমার মাথাটা খারাপ করে দেবেন।

না না, মাথা খারাপ করবেন না। প্লিজ বলেন, কোথায় যুদ্ধ করেছেন?

করেছি ভাই, ফরিদপুরে।

কার অধীনে?

মনে নাই।

ট্রেনিং করেছেন কোথায়?

ওসব করি নাই।

তাহলে যুদ্ধ কিভাবে করলেন?

আরে ভাই, অস্ত্র চালানোর জন্য আবার ট্রেনিং লাগে নাকি? আমার এক সিনিয়র মুক্তিযোদ্ধা ভাই শিখিয়ে দিয়েছিলেন।

আপনার জন্ম কত সালে?

আপনি দেখি আমার জীবনবৃত্তান্ত জানতে চাচ্ছেন।

আহা, আপনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। মানুষ আপনার সম্পর্কে জানতে চাইবে না?

ঠিক আছে, জানতে চাইবে। তাই বলে জন্মতারিখও জানতে হবে! পাবলিকের আর খাইয়া কাম নাই?

আপনি রাগ করছেন কেন, ভাই? আপনারা যখন থাকবেন না তখন তো নতুন প্রজন্ম আপনাদের সম্পর্কে জানতে চাইবে। কোনো তথ্য না থাকলে জানবে কী করে?

হ্যাঁ, তা অবশ্য ঠিকই বলছেন। আমার জন্মতারিখ তো মনে নাই। সালটা বলতে পারি।

বলেন বলেন! তাতেও চলবে।

১৯৬৫।

যুদ্ধ হয়েছে একাত্তরে। আর আপনার জন্ম ১৯৬৫ সালে। তখন আপনার বয়স কত ছিল?

ছয় বছর।

তার মানে ছয় বছরের শিশু!

হ্যাঁ, আমি তো শিশু মুক্তিযোদ্ধাই ছিলাম।

আপনি যে বললেন, যুদ্ধ করেছেন!

না, ঠিক সরাসরি যুদ্ধ করি নাই, তবে সাহায্য করছি, সাহায্য। বুঝতে পারছেন?

কী ধরনের সাহায্য?

এই ধরেন, মুক্তিযোদ্ধাদের ভাত খাওয়াইছি। পানি খাওয়াইছি। আরো অনেক ধরনের সাহায্য করছি।

আপনি যুদ্ধের সময় কোথায় ছিলেন?

আমাদের বাড়িতেই তো ছিলাম।

মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা কিভাবে করলেন?

তাঁরা আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন। তখন তাঁদের খাওয়াদাওয়া করাইছি।

কী করে বুঝলেন, তাঁরা মুক্তিযোদ্ধা?

তাঁরা বাবার কাছে আসতেন। তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করতেন। কথাবার্তা বলতেন।

কী ধরনের কথাবার্তা বলতেন?

বলতেন, পাকিস্তানকে টিকাইয়া রাখতে হবে। যারা পাকিস্তান ভাঙতে চায়, তাদের খতম করতে হবে। তারা আমাদের শত্রু।

ওহ্, তাই নাকি! আপনার বাবা কি শান্তি কমিটি করতেন?

জি জি, এই তো বুঝতে পারছেন। বাবা শান্তি কমিটির সহসভাপতি ছিলেন। আমরা পাকিস্তানের সঙ্গে বেইমানি করি নাই।

শান্তি কমিটির লোকদের তো মানুষ রাজাকার বলে।

কী বলেন?

রাজাকার কেন বলবে? তারাই তো ‘খাঁটি মুক্তিযোদ্ধা’। অখণ্ড পাকিস্তানের জন্য লড়ছে। আমরা ভাই ‘নির্ভেজাল মুক্তিযোদ্ধা’। কোনো ভেজাল নাই।

মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কি জানে, আপনার বাবা শান্তি কমিটির নেতা ছিলেন?

বাবা তো যুদ্ধের সময়ই মারা গেছেন।

মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আপনার কি সনদ আছে?

আছে না! আসল কাজে কি ভুল করি!

কিভাবে নিলেন?

বাংলাদেশে এইটা কোনো ব্যাপার হইল? কথায় আছে না, টাকায় বাঘের চোখও মেলে!

তার মানে টাকা-পয়সা দিয়েছেন।

আবার জিগায়! আপনি এবার যান তো ভাই। অনেক কাজ পড়ে আছে। আর শোনেন, যা বললাম সব অব দ্য রেকর্ড, বুঝলেন তো! কিছুই লেখা যাবে না। আর লিখলেও আমি অস্বীকার করব। বলব, সাংবাদিক ভাই বানিয়ে বানিয়ে লিখেছেন। আমি কিছুই জানি না।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক


মন্তব্য