kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


হামলা সামলে উচিত জবাব হিলারির

মাইকেল বারবারো ও ম্যাট ফ্লেজেনহেইমার

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



দ্বিধার দোলাচল দিয়ে শুরু, শেষ তীব্র বাক্যবাণে। সাম্প্রদায়িকতার দোষে দুষ্ট ডোনাল্ড—বলেও ঠিক বাগে রাখতে পারেননি বিতর্ককে।

শেষে জেন্ডার প্রসঙ্গের তীর হেনে বধ করা প্রতিপক্ষকে। প্রথম বিতর্কে হিলারি ক্লিনটনের সাফল্য-ব্যর্থতাকে দুই বাক্যে এভাবেই বোঝানো যায়। প্রথমবারের মতো ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখোমুখি হিলারি। তাঁকে দেখাচ্ছিল অনেকটাই দ্বিধান্বিত। যেন অনিশ্চয়তার আশঙ্কা পেয়ে বসেছিল।

অচিরেই তিনি দৃঢ়তায় ঋজু হলেন, ছুড়ে গেলেন একের পর এক যুক্তির তীর। শত্রুকে কুপোকাৎ করতে সমর্থও হলেন প্রথম দ্বৈরথে।

তবে লড়াইয়ের শুরুটা হিলারির জন্য ভালো ছিল না। মনে হয়েছিল, যতই অনুশীলন করে ডায়াসে উঠুন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো একজন মানুষকে বিতর্কে বধ করার কাজটি হিলারি কেন কারো পক্ষেই সহজ নয়। কারণ ট্রাম্প হারিকেনের গতিতে তথ্য পাল্টে দেন, ভুল ব্যাখ্যা দাঁড় করান, মূল প্রসঙ্গে না ঢুকে চারপাশ দিয়ে ঘোরেন।

প্রতিপক্ষ এই জাতীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী হলে কৌশলী হতে হয়, হিলারিও তাই করলেন। তিনি কিছু সময় নিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করলেন এবং পরিস্থিতির লাগাম টানলেন।

১৯৯৬ সালে হিলারি বলেছিলেন ‘কৃষ্ণাঙ্গ শিশুরা সুপারপ্রিডেটরস। সংশোধনাগারে পাঠাতে হয়, অপরাধপ্রবণ এমন কিশোরদের অনেকে সুপারপ্রিডেটরস বলেন, হিলারিও বলেছিলেন। বিতর্কে প্রসঙ্গটি টানলেন ট্রাম্প। বললেন, এ ধরনের কথা মুখে আনা এক কথায় ‘টেরিবল’ ব্যাপার, ‘হরিবল’। সাদা মার্কিনদের প্রতি ট্রাম্পের পক্ষপাতের কথা কারো অজানা নয়। কিন্তু বিতর্কের এই অংশটায় এমন ভান করলেন, যেন কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি তাঁর দরদ অসীম।

দুই দশকের পুরনো কথা হলে কী হবে? হিলারিকে মাঝেমধ্যেই তাড়া করে তাঁর সেই সুপারপ্রিডেটরস উক্তিটি। ট্রাম্প যখন প্রসঙ্গটি তুললেন উত্তর দিলেন না হিলারি। বরং আত্মরক্ষায় তিনি নিউ ইয়র্ক সিটির বর্তমান মেয়র ও তাঁর অপরাধ দমন কৌশলের প্রসঙ্গ টানেন। তারপরই পাল্টা বাণ হিসেবে ট্রাম্পের সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির প্রসঙ্গ টানলেন, যার শিকড় বহু পেছনে।

লং আইল্যান্ডের হফস্ট্রা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপিত মঞ্চে হিলারির প্রবেশের মুহূর্ত থেকেই বাতাসে ছিল চ্যালেঞ্জের আবহ। কিন্তু যে মানুষটির ‘ইনসিভিলিটি’ তথা অসভ্যতার কোনো নজির হয় না, যিনি আংশিক কথা বলে সত্যের বিকৃতি ঘটান, যিনি দৃষ্টিভঙ্গিতে নির্লজ্জভাবে পুরুষবাদী, নারীদের পরিমাপ করেন এক থেকে ১০ পয়েন্টের মাপকাঠিতে; যে ব্যক্তি একটি জাতিগোষ্ঠীর সবাইকে তুচ্ছজ্ঞানই শুধু  করেন না, জাতিগত বিভেদ উসেক দেন—এমন একজন মানুষকে কতটা সম্মান দেখাতে পারবেন হিলারি?

বিতর্কের শুরুর কয়েক মুহূর্তেই হিলারি বুঝিয়ে দিলেন তিনি কঠিন, দীর্ঘ পথেই হাঁটবেন। দৃপ্ত পায়ে ট্রাম্পের দিকে এগিয়ে করমর্দনকালে হাত ঝাঁকালেন, রসিকতাও করলেন, ‘হাউ আর ইয়া ডোনাল্ড?’ বলে।

মিসেস ক্লিনটনের সমর্থকরা আশা করেছিলেন, তূণে অসংখ্য তীর নিয়েই মঞ্চে ঢুকেছেন হিলারি। কারণ ট্রাম্পের দুর্বলতার অভাব নেই। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় ধরনের গলদ রয়েছে, ঘাটতি রয়েছে রাজনৈতিক দূরদর্শিতায়। শালীনতার সব ধরনের মাত্রা ছাড়িয়ে প্রতিপক্ষকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করেছেন। রগরগে ভাষায় যৌনতার প্রসঙ্গ টেনেছেন, মেক্সিকানদের ধর্ষক হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন সীমান্তে দেয়াল তোলার কথাও। ট্রাম্প ট্যাক্স রিটার্নের তথ্য পর্যন্ত প্রকাশ করেননি।

তবে কিছু অস্ত্র হিলারি ব্যবহার করলেন, কিছু করলেন না। হয়তো তিনি ভেবেছেন, ট্রাম্পের কিম্ভূতকিমাকার ব্যক্তিত্ব মার্কিন জাতির চিনতে বাকি নেই। বিতর্কের প্রথম ভাগে মনে হয়েছিল, প্রতিপক্ষের পাল্টা আক্রমণের মুখে হিলারি কিছুটা হলেও অসহায় বোধ করছেন। তবে দ্বিতীয়ার্ধে মিসেস ক্লিনটন যেন পায়ের তলায় মাটি খুঁজে পেলেন। ট্রাম্প যখন বারবার বলছিলেন বারাক ওবামার জন্ম যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে, অনুষ্ঠান সঞ্চালক হিলারির পায়ে বল ছুড়ে দেন। সঞ্চালক হিলারির পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়েছিলেন। জবাবে হিলারি শান্তভাবেই বললেন, ‘জাস্ট লিসেন টু হোয়াট ইউ হেয়ারড। ’ অর্থাৎ যা এইমাত্র শুনেছেন, তা থেকেই বুঝে নিন। হিলারি আরো বললেন, ট্রাম্পের সাম্প্রদায়িক ভাবনাচিন্তা আজকের নয়। পারিবারিক সূত্রেই তিনি সমস্যা বহন করছেন। সূদূর সত্তরের দশকে তাঁর পারিবারিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মার্কিন বিচার বিভাগ মামলা পর্যন্ত করতে বাধ্য হয়েছিল।

এখানে উপস্থাপক হোল্টই এর আবহ তৈরি করে দিয়েছিলেন। তিনি ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে বলেন, আপনি তো মনে করেন যে হিলারির চেহারা প্রেসিডেন্ট হওয়ার মতো নয়। বলার সুযোগ পেয়ে ট্রাম্প আরো একবার অভিযোগের পুনরাবৃত্তি করেন। তিনি হিলারির শারীরিক প্রসঙ্গ সামনে এনে বারবার বলতে থাকেন, সেক্রেটারি মিসেস ক্লিনটন প্রেসিডেন্ট হবেন কী, তাঁর তো স্ট্যামিনাই নেই!

এইবার ঠোঁটে যেন উত্তর ধরাই ছিল হিলারির। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘তিনি যদি ১১২টি দেশ ভ্রমণ করেন, মধ্যস্থতা করেন একটি শান্তিচুক্তি, একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি ও ভিন্নমতাবলম্বীদের মুক্তিদানের সমঝোতায়, তিনি যদি কংগ্রেস কমিটির সামনে ১১ ঘণ্টা ধরে টেসটিফাই করেন, তাহলেই আমার স্ট্যামিনা নিয়ে বলার যোগ্যতা দাবি করতে পারেন। ’

এ পর্যায়ে ট্রাম্প কথা ঘুরিয়ে বলার চেষ্টা করেন, হিলারির কাজের অভিজ্ঞতা আছে ঠিক আছে, তবে এসবই তাঁর ‘ব্যাড’ তথা বাজে অভিজ্ঞতা। আর যায় কোথায়! হিলারির মোক্ষম জবাব যেন তৈরিই ছিল। বললেন, ‘তিনি চেহারা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে স্ট্যামিনা প্রসঙ্গে চলে এসেছেন। তিনি সেই পুরুষ যিনি নারীকে শূকর, অলস ও কুকুর বলেছেন। ট্রাম্প মনে করেন, নারীরা যেহেতু গর্ভধারণ করেন চাকরিদাতাদের অসুবিধা হয়। পুরুষদের মতো ভালো কাজ করতে পারার পরই তাদের সমান মজুরি দাবি করা উচিত। ট্রাম্প এক সুন্দরী প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী নারী প্রসঙ্গে ‘মিস পিগি’, ‘মিস হাউসকিপিং’ জাতীয় শব্দও ব্যবহার করেছেন উল্লেখ করে হিলারি প্রতিপক্ষের উদ্দেশে বলেন, ‘মিস্টার ট্রাম্প (আপনার বোঝা উচিত), সে নারীর একটা নাম আছে। তিনি এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হয়েছেন এবং এই নভেম্বরে ভোট দেবেন। ট্রাম্প ‘ওহ রিয়েলি!’ বললেন বটে, কিন্তু মনে হলো, এবার তাঁর পায়ের তলায় মাটি নেই।

বিতর্কের মাঝখানে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেছিলেন, আমেরিকার কি ঠেকা পড়েছে পুলিশ হয়ে বিশ্বকে রক্ষা করার! শেষ কথা হিসেবে হিলারি যখন গণতন্ত্রের কাঠামো সমুন্নত রাখার শপথ ব্যক্ত করলেন, ট্রাম্প এবার বললেন, আমি আবারও আমেরিকাকে মহান দেশ হিসেবে গড়তে চাই।

সূত্র : নিউ ইয়র্ক টাইমস; লেখকদ্বয় পত্রিকাটির প্রতিবেদক


মন্তব্য