kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের ভালো চাও তো ট্রাম্পকে ঠেকাও

অনলাইন থেকে

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



মাস পনেরো আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন প্রেসিডেন্ট প্রতিযোগিতার দৌড়ে নামেন, বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে নিজের সম্পদ ও টেলিভিশন সেলিব্রিটির পরিচিতি সামনে তুলে ধরেন। দিন কয়েক বাদে যেই তিনি অভিবাসীদের প্রসঙ্গে মুখ খুললেন স্পষ্ট হয়ে গেল যে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় ধরনের গলদ রয়েছে, ঘাটতি রয়েছে রাজনৈতিক দূরদর্শিতায়ও।

তিনি শালীনতার সব ধরনের মাত্রা ছাড়িয়ে প্রতিপক্ষকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করেছেন, রগরগে ভাষায় যৌনতার প্রসঙ্গ টেনেছেন, উগ্র জাতীয়তাবাদের পক্ষে বলেছেন। তিনি বলেছেন, মুসলমানদের জন্য আমেরিকা নয়। মেক্সিকানদের ধর্ষক হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন সীমান্তে দেয়াল তোলারও কথাও। সমস্যা হচ্ছে, এর পরও আমেরিকার বিপুলসংখ্যক মানুষ এই মানুষটিকেই সমর্থন দিচ্ছে।

সোমবার রাতে হিলারি ক্লিনটনের সঙ্গে প্রথম বিতর্কে মুখোমুখি হয়েছেন ট্রাম্প। এ নিয়ে দুই পক্ষেই উত্তেজনা অসীম। তবে এখনো যাঁরা নিরপেক্ষ রয়ে গেছেন, তাঁদের ভাবতে হবে ট্রাম্পের মতো একজন ব্যক্তিকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার ক্ষেত্রে সমর্থন জোগানো উচিত কি না। আমাদের রাজনীতি ও প্রশাসন সংশ্লিষ্ট মহলগুলোরও সামনে সময় এসেছে ট্রাম্পের ব্যাপারে আরো গভীরভাবে ভাবার। ট্রাম্প যে নতুন ধারার রাজনীতিবিদ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছেন, তাঁর এই লক্ষ্যের ভয়াল দিকগুলো আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কারোরই নেই। তা না হলে অচিরেই আমরা দেখব এমন এক ব্যক্তি হোয়াইট হাউসের কর্ণধার হয়ে উঠেছেন, যাঁর কাছে দেশ নয়, নিজের খেয়ালি ধ্যান-ধারণাটাই বড়।

ট্রাম্প তুরুপের তাস হিসেবে কিছু জিনিস সামনে এনে নিজেকে বিক্রি করার চেষ্টা করছেন। একটু গভীরে গেলেই বোঝা যাবে এর আড়ালে কী বিপদ লুকিয়ে আছে।

তুরুপের একটি তাস হচ্ছে ‘ট্রাম্প একজন জাদুর ধনকুবের, যিনি সরকার পরিচালনায়ও জাদুর ধাঁধা দেখানোর শক্তি রাখেন। ’ আসলেই কি তাই! ট্রাম্পের রয়েছে দেউলিয়া ঘোষিত হওয়ার রেকর্ড। রয়েছে তাঁর বিতর্কিত ট্রাম্প ইউনিভার্সিটিও; প্রতারণার অসংখ্য অভিযোগ পাওয়ার পর কর্তৃপক্ষ এ নিয়ে তদন্তে নামতে বাধ্য হয়েছে। আটলান্টিক সিটির ক্যাসিনোর জুয়ার আসরে পরাজয় প্রসঙ্গে তাঁর নামও ওঠে। হিলারিসহ অন্য নমিনিরা যেখানে অনেক দশক ধরে কর শোধ করে আসছেন, সেখানে ট্রাম্প তাঁর ট্যাক্স রিটার্নের তথ্য প্রকাশ করতে নারাজ। নিঃসন্দেহে বলা যায়, কেঁচো খুঁড়তে গেলে সাপ বেরিয়ে আসবে—এই ভয়েই করের তথ্য চেপে রাখার যত কসরত তাঁর। রাশিয়াসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে সন্দেহজনক নানা বিনিয়োগ করলেও এ নিয়ে তাঁর মুখে রা নেই। তিনি প্রেসিডেন্ট হলেন আর তাঁর সন্তানরা সেসব ব্যবসা পরিচালনার দায়িত্ব নিল। তখন জাতীয় স্বার্থও কি ক্ষুণ্ন হতে পারে না?

দ্বিতীয় তুরুপের তাস : ট্রাম্প সোজা কথার মানুষ, উচিত কথাগুলো রাখঢাক ছাড়া বলেন। হ্যাঁ, ট্রাম্প বলছেন, সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেটকে হারানোর পরিকল্পনা তাঁরও আছে। তিনি কিন্তু বলছেন না কিভাবে তা সম্ভব হবে, বা পদাতিক সৈন্য ব্যবহৃত হবে কি না। তিনি বলছেন, আর কোনো মুসলমানকে আমেরিকায় অভিবাসী হিসেবে ঢুকতে  দেওয়া হবে না, ১১ মিলিয়ন অনিবন্ধিত অভিবাসীর ব্যাপারেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বুঝতে অসুবিধা হয় না মধ্যপন্থী ভোটারদের ঘায়েল করা যাবে মনে করে তিনি এই মুলা ঝুলিয়েছেন এবং এসব আদৌ ধোপে টেকে না।

মুখ ফসকে কিছু একটা বলে সেখান থেকে সরে আসার বেলায়ও তাঁর জুড়ি কম। সব কিছুর পরও ট্রাম্প নিজের একটি চেহারা সব সময় স্পষ্ট করে থাকেন। ফলে আমরা একজন ট্রাম্পকে দেখি যিনি একই সঙ্গে অভিবাসনবিরোধী, জাতীয়তাবাদী, এমনকি র‍্যাসিস্টও। সমস্যা হচ্ছে, এই ভাবমূর্তিকে ট্রাম্প নিজের জয়ের কৌশল হিসেবে দেখছেন।

এনবিসি নিউজ হিসাব কষে দেখিয়েছে, প্রচারণা শুরুর পর এ পর্যন্ত ট্রাম্প ২০টি বড় ইস্যুতে ১১৭ বার নীতি বদল করেছেন। এর মধ্যে গর্ভপাতের মতো বিতর্কিত বিষয়ে তিনি তিনবার তিন রকমের কথা বলেছেন। এ বিষয়ে জনসভায় সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে তিনি উল্টো উপহাস করেছেন, হুমকিও দিয়েছেন। ট্রাম্প বলেছেন, যেসব সংবাদ সংস্থা তাঁর বিরুদ্ধে লাগবে, তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার প্রয়োজনে তিনি আইনি কাঠামো আরো নমনীয় করে দেবেন।

তৃতীয় তুরুপের তাসটি হচ্ছে ট্রাম্প মধ্যস্থতার কাজটি ভালো পারেন, ফলে সরকার পরিচালনায় সুবিধা হবে, অন্য বিশ্বনেতাদেরও সহজে ছাড়িয়ে যেতে পারবেন। সত্যটি হচ্ছে, জাতীয় ঋণ হ্রাসে তাঁর দেওয়া পরিকল্পনাটি অবাস্তব। তাঁর করহ্রাসের ভাবনাটিও কম ভয়ংকর নয়। তিনি ন্যাটোকে দুর্বল দেখতে চান। তার মানেই হচ্ছে, তিনি প্রেসিডেন্ট হলে বড় ধরনের কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হবে; চীনের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাঁর ইরান নীতিও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নিরাপদ নয়। তাঁর মতো একজন ব্যক্তির নাগালে থাকবে পরমাণু অস্ত্রের বোতাম—এমন ভাবতে গিয়েও অনেকের গা শিউরে উঠছে। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়েল এক ঘরোয়া অনুষ্ঠানে ট্রাম্পকে বলেছেন, সে তো ‘এক আন্তর্জাতিক মাফিয়া’। উষ্ণায়ন তথা জলবায়ু পরিবর্তনের আঘাত যখন অনেক ভূখণ্ডেই লাগতে শুরু করেছে, ট্রাম্প বলছেন, এ সবই ভুজভাজ, বাজে কথা। ট্রাম্প রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। হিলারির  ই-মেইল ব্যবস্থা হ্যাক করার ক্ষেত্রে ট্রাম্প রাশিয়ার সহায়তাও চেয়েছিলেন। এই ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হলে পুতিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে কী প্রত্যাশা করতে পারেন  ভোটারদের কি ভাবা উচিত নয়?

ট্রাম্প নতুন ধারার রাজনীতির কথা বলে আমেরিকাসহ সারা বিশ্বে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা ঘটাবেন নাকি বিপদ ডেকে আনবেন, তা সবাইকে আগেভাগে, সময় থাকতেই ভাবতে হবে। নতুবা সমূহ বিপদ!

 

সূত্র : নিউ ইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয়


মন্তব্য