kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


কালান্তরের কড়চা

বাংলাদেশ ও ব্রিটেন, দুই দেশে একই শ্রেণিযুদ্ধ

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



বাংলাদেশ ও ব্রিটেন, দুই দেশে একই শ্রেণিযুদ্ধ

ব্রিটেনে লেবার পার্টির নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে জেরেমি করবিন আবারও জিতে গেছেন। জিতেছেন এবার দলের গ্রাসরুট ভোটারদের আরো বিপুল ভোটে।

দলের বিদ্রোহী পার্লামেন্টারি গ্রুপের মনোনীত প্রার্থী ওয়েন স্মিথ শোচনীয় পরাজয় বরণ করেছেন। এখন দেখার রইল এই বিদ্রোহী লেবার দলীয় এমপিরা মিডিয়া ও এস্টাবলিশমেন্টের সহায়তায় নতুন দল গঠন করে করবিনের নেতৃত্ব ও লেবার পার্টিকে ধ্বংস করার আরো চেষ্টা চালায় কি না!

অতীতেও ব্রিটেনের শ্রমজীবী মানুষের সংগঠন লেবার দলকে বিভক্ত করা অথবা কবজা করার জন্য ব্রিটেনের ক্যাপিটালিস্ট এস্টাবলিশমেন্ট বহু চেষ্টা করেছে। আশির দশকে দলের প্রবীণ নেতা, যেমন—ডা. ডেভিড ওয়েন, রয় হ্যাটার্সলে, শার্লি উইলিয়ামস প্রমুখকে ভাগিয়ে এনে ব্রিটেনের রাজনীতিতে তৃতীয় ধারা সৃষ্টির কথা বলে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এসডিপি) নামে নতুন দল গঠন করা হয়েছিল। পরে লিবারেল পার্টির সঙ্গে যুক্ত হয়ে এই দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি নাম ধারণ করে। ব্রিটেনের রাজনীতিতে এদের ভরাডুবি ঘটেছে। লেবার পার্টি তার নিজ অবস্থানে অক্ষত রয়েছে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপর্যয় এবং রিগানোমিকসের নামে ‘ভালগার ক্যাপিটালিজমের’ অভ্যুত্থানের যুগে (ব্রিটেনে মিসেস থ্যাচারের প্রধানমন্ত্রিত্ব এবং আমেরিকায় রোনাল্ড রিগানের প্রেসিডেন্টগিরির আমলে) ব্রিটেনের লেবার পার্টিতেও তার ধাক্কা লাগে। এই পার্টিতে ভাঙন ধরিয়ে এসডিপি গঠন ব্যর্থ হয় বটে, কিন্তু ব্রিটেনের প্রকৃত শাসক বিগ বিজনেস, বিগ মিডিয়া এবং এস্টাবলিশমেন্টের প্রতিক্রিয়াশীল অংশ লেবার পার্টিতে তাদের ট্রোজান হর্স ঢোকাতে সক্ষম হয়। এই ট্রোজান হর্সদের নেতাই ছিলেন টনি ব্লেয়ার।

টনি ব্লেয়ার বিগ বিজনেসের এবং বিগ মিডিয়ার (তাদের মধ্যে টোরি দলের কট্টর সমর্থক ‘সান’ পত্রিকাও ছিল) সমর্থনে লেবার পার্টির নেতৃত্ব দখল করেন। নেতৃত্ব দখল করার সঙ্গে সঙ্গে তিনি রব তোলেন, ওল্ড লেবার পার্টির ওল্ড নীতি-আদর্শ যুগোপযোগী নয়; তিনি দলের নীতি-আদর্শ বদলাবেন। তাঁর নেতৃত্বে নিউ লেবার গঠিত হবে। এই ধুয়া তুলে তিনি দলের মূলনীতি হিসেবে সমাজতন্ত্র বর্জন করেন। দলের প্রতীক লাল গোলাপ বদলে ফেলেন। দলের একটি প্রধান কর্মসূচি ‘রাষ্ট্রীয় সম্পদে কমন ওনারশিপ’ বাতিল করেন। লেবার পার্টি চালিত হতো দেশের ট্রেড ইউনিয়নগুলোর সমর্থন ও অর্থ সাহায্যে। তিনি ট্রেড ইউনিয়নগুলোর অর্থ সাহায্যের বদলে বিগ ক্যাপিটালিস্টদের বিগ ডোনেশনের সাহায্যে টোরি পার্টির মতো দল চালানোর ব্যবস্থা করেন। বিগ বিজনেস ও বিগ মিডিয়া নিউ লেবারকে জোর সমর্থন দিতে শুরু করে।

টনি ব্লেয়ার ব্রিটেনের শ্রমজীবী সাধারণ মানুষের সংগঠন লেবার পার্টির নেতৃত্ব হাইজ্যাক করে দলটিকে শ্যাডো টোরি পার্টি হিসেবে গড়ে তুলে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের স্বার্থ ও আধিপত্য রক্ষা করতে চান, এমনকি তাদের সম্প্রসারণবাদী যুদ্ধনীতির সহযোগী হতে চান। ব্রিটেনের লেবার পার্টির বিভ্রান্ত সাধারণ নেতাকর্মীরা তা ভালোভাবে উপলব্ধি করে গালফ যুদ্ধে আমেরিকার রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট বুশ জুনিয়রের যুদ্ধাপরাধে টনি ব্লেয়ারকে যুক্ত হতে দেখে। হাউস অব কমনসেও বহু লেবার এমপি ব্লেয়ারের বিরুদ্ধে চলে যান। ব্লেয়ার টোরি পার্টির সমর্থনে তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্ব রক্ষা করেছিলেন।

লেবার পার্টির জাতীয় ও আন্তর্জাতীয় নীতির সঙ্গে টনি ব্লেয়ারের ক্রমাগত ‘বিশ্বাসঘাতকতাই’ দলের সাধারণ নেতাকর্মীদের সচেতন করে তোলে এবং তারা তাঁর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ইউরোপের অন্য অনেক দেশের মতো ব্রিটেনেও যে সচ্ছল ও শিক্ষিত ওয়ার্কিং ক্লাসের উদ্ভব হয়, এদের একটা অংশই ক্রমে লেবার দলের নেতৃত্বে উঠে আসে। এরাই নিউ লেবার বা ব্লেয়ারাইট নামে পরিচিত। সমাজতন্ত্রে এদের আস্থা নেই। তারা বাজার অর্থনীতিতে বিশ্বাসী এবং টোরি পার্টির অনুকরণে ধনিক শ্রেণির সমর্থন নির্ভর করে লেবার পার্টি গড়ে তুলতে চায়। টাইমস, সানডে টাইমস, ডেইলি টেলিগ্রাফের মতো এস্টাবলিশমেন্টের মুখপত্র বিগ মিডিয়াগুলো ওল্ড লেবারকে হার্ড লেফট (কট্টর বামপন্থী) এবং ব্লেয়ারাইটদের সংস্কারপন্থী আখ্যা দিয়ে সংস্কারপন্থীদের পক্ষে ঢোল বাজাতে থাকে।

গালফ যুদ্ধের মিথ্যাচার ও যুদ্ধাপরাধ টনি ব্লেয়ারের আসল মুখোশটি খুলে দেয়। এসডিপির মতো নিউ লেবারেরও পতনদশা ঘনিয়ে আসে। ব্লেয়ারের পর লেবার গভর্নমেন্টের প্রধানমন্ত্রী হন গর্ডন ব্রাউন। তিনি ছিলেন মধ্যপন্থী। এরপর দলের নেতৃত্বে উঠে আসেন এড মিলিব্যান্ড। তিনি ব্লেয়ারাইট নন। তাঁর বড় ভাই ডেভিড মিলিব্যান্ড ব্লেয়ারপন্থী। ডেভিড নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায় ভাইয়ের কাছে পরাজিত হন। এ সময়ও ব্রিটিশ বিগ মিডিয়াকে দেখা গেছে এড মিলিব্যান্ডকে হার্ড লেফট হিসেবে চিত্রিত করে ব্লেয়ারপন্থী ডেভিডকে সমর্থন জানাতে। কিন্তু লেবার পার্টির সচেতন নেতাকর্মীদের কাছে এবারের প্রচারণা ধোপে টেকেনি।

এড মিলিব্যান্ড নেতা হওয়ার কিছুদিনের মধ্যে দলের এলিট নেতৃত্ব, যাদের বেশির ভাগই ব্লেয়ারপন্থী এমপি, তাঁদের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে বহু ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারণে পিছু হটে। দলে নেতৃত্বের শক্ত ভিত্তি তিনি গড়ে তুলতে পারেননি। গত সাধারণ নির্বাচনে পরাজয়ের পর তিনি নেতৃত্ব ত্যাগ করেন। নেতৃত্বের জন্য এবার ওল্ড লেবার মনোনয়ন দেয় দলের পরীক্ষিত বাম নেতা জেরেমি করবিনকে। নিউ লেবার তথা ব্লেয়ারপন্থীরা, বিগ বিজনেস, বিগ মিডিয়া, ব্রিটিশ এস্টাবলিশমেন্ট তাঁর বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ হয়। সম্ভবত বাংলাদেশের শেখ হাসিনা ছাড়া ব্রিটেন ও বাংলাদেশের আর কোনো নেতাকে এত অপপ্রচার, এত বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হয়নি।

জেরেমি করবিন হার্ড লেফট, মধ্যপ্রাচ্যের সন্ত্রাসীদের সমর্থনদাতা, ইসরায়েলবিরোধী কমিউনিস্ট অনুচর, ব্রিটেনের সার্বভৌমত্বের বিরোধী ইত্যাদি অপবাদ তাঁকে দেওয়া শুরু হয়। এমন কথাও বলা হয়, ব্রিটেনের স্বার্থ ও নিরাপত্তার জন্য তিনি এক বিরাট হুমকি। এই অপপ্রচার ধোপে টেকেনি। অতঃপর ব্রিটেনের ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ছাড়ার প্রশ্নে গণভোটে দাঁড়ায় দল, জয়ী হলে টোরি প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন পদত্যাগ করেন। তখন সুযোগ বুঝে লেবার পার্লামেন্টারি গ্রুপ, যাদের বেশির ভাগ ব্লেয়ারপন্থী, করবিনেরও পদত্যাগের দাবি জানায়। করবিনকে তাই আবার নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে হয়। বিগ মিডিয়ায় করবিনকে ‘অযোগ্য নেতা’, ‘দেশের শত্রু’, ‘তাঁর নেতৃত্বে লেবার পার্টি ধ্বংস হয়ে যাবে’ ইত্যাদি প্রচারণা চালানো হয়।

তাতে লেবার পার্টির সাধারণ নেতাকর্মী ও ব্রিটিশ জনমত এবার বিভ্রান্ত হয়নি। তারা আরো বিপুল ভোটে জেরেমি করবিনকে দলের নেতার পদে পুনর্নির্বাচিত করেছে। এই পরাজয়ে মুহ্যমান হয়েছে ব্রিটিশ বিগ বিজনেস, বিগ মিডিয়া এবং এস্টাবলিশমেন্টের প্রতিক্রিয়াশীল অংশ। গত রবিবারের (২৫ সেপ্টেম্বর) সানডে টাইমস মনের দুঃখে তাদের লিড এডিটরিয়ালের হেডিং দিয়েছে ‘Mr. Corbyn’s triumph is Labour’s disaster’ (মি. করবিনের জয়ের অর্থ লেবারের বিপর্যয়) আর ব্রিটেনের সাধারণ মানুষ জানে, করবিনের জয়লাভের অর্থ এ যুগের শ্রেণিযুদ্ধে বহুদিন পর ব্রিটিশ ধনিক তথা শাসকশ্রেণির একটা বড় পরাজয়। জেরেমি করবিন হার্ড লেফট মোটেই নন। তিনি লেবার পার্টি জনকল্যাণের যে মৌলিক আদর্শ সামনে রেখে গঠিত হয়েছিল, সেগুলো আবার ফিরিয়ে আনতে চান। ব্রিটেনে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপর্যয়-পরবর্তী ভালগার ক্যাপিটালিজমের একাধিপত্য রুখতে চান।

এখন লেবারের ভেতরে জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত ও পরাজিত ব্লেয়ারপন্থীরা কী করবেন? তাঁরা কি করবিন নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আরো ষড়যন্ত্র পাকাবেন, না আশির দশকের এসডিপির মতো নতুন দল গঠন করবেন? যদি তাঁরা তা করতে যান তাহলে আখেরে এসডিপির পরিণতিই যে বরণ করবেন, তাতে সন্দেহ নেই। করবিনের নেতৃত্বে লেবার পার্টি তার আদি শক্তি ও আদর্শের ভিত্তি খুঁজে পাবে; এবং ব্রিটিশ ওয়েলফেয়ার স্টেটকে ‘অস্টারিটির’ নামে সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলার মতো কাজ থেকে টোরি দলকে নিবৃত্ত করতে সক্ষম হবে। এ জন্যই ব্রিটিশ বিগ বিজনেস ও বিগ মিডিয়ায় করবিন নেতৃত্বের বিরুদ্ধে এত ক্ষোভ ও রোষ।

ব্রিটেনে জেরেমি করবিন যেসব চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করে তাঁর নেতৃত্ব ও নীতির প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছেন, বাংলাদেশে শেখ হাসিনাকে নব্য ধনী, এক শ্রেণির বিগ মিডিয়া, এলিট ক্লাসের একটি বড় প্রতিক্রিয়াশীল গ্রুপ, সিভিল ও মিলিটারি এস্টাবলিশমেন্টের একটা প্রতিক্রিয়াশীল অংশের জোটবদ্ধ সেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে আজকের অবস্থানে পৌঁছতে হয়েছে। এখানেও সাধারণ নেতাকর্মী ও জনগণের সমর্থনই তাঁর নেতৃত্বকে রক্ষা করেছে। এখানেও দেখেছি ব্রিটেনের মতো একই শ্রেণিসংগ্রাম, নব্য ধনীদের গ্রাস থেকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সাধারণ নাগরিক শ্রেণির স্বার্থ ও অধিকার রক্ষার সংগ্রাম।

ব্রিটেনে আশির দশকে লেবার পার্টি ভাঙার জন্য যেমন ড. ডেভিড ওয়েনের মতো পার্টির জাঁদরেল নেতাদের দিয়েই এসডিপি গঠন করা হয়েছিল, বাংলাদেশেও তেমনি ড. কামাল হোসেনের মতো প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতাকে দিয়েই গণফোরাম গঠন করে আওয়ামী লীগ ও হাসিনা নেতৃত্ব উত্খাতের চেষ্টা করা হয়েছিল। ব্রিটেনে লেবার পার্টির ভেতরে, ট্রয়ের ঘোড়া ব্লেয়ারপন্থীদের অভ্যুত্থান ঘটানোর মতো বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের ভেতরে এক-এগারোর সময় সংস্কারপন্থীদের জোটবদ্ধ করে হাসিনা নেতৃত্ব উত্খাতের চেষ্টা করা হয়েছিল। সে চেষ্টা সফল হয়নি। করবিনের মতোই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে চলছে অনবরত মিথ্যা প্রচার, অনবরত তাঁর চরিত্রহননের চেষ্টা।

বাংলাদেশে হাসিনা এখনো সম্মুখ সমরে জয়ী। ব্রিটেনে জেরেমি করবিনও গণশত্রুদের সব চক্রান্তের মুখে স্থায়ী জয়লাভের মুখে। দুই দেশেই শ্রেণিযুদ্ধের চেহারাটা প্রায় একই রকম। আশা করা যায়, ব্রিটেনে লেবার দলে নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় করবিনের জয় শান্তি ও গণতন্ত্রের পথে বিশ্বের অভিযাত্রাকে আরো সাহায্য জোগাবে।

লন্ডন, সোমবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬


মন্তব্য