kalerkantho


শত মিলিয়ন দর্শকের হিলারি ট্রাম্প বিতর্ক

মাইকেল এম গ্রিনবাম

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



শত মিলিয়ন দর্শকের হিলারি ট্রাম্প বিতর্ক

এবারকার মার্কিন নির্বাচনের প্রচারণা অদ্ভুত রকমের ‘আনসিভিল’। আর এই প্রচারণা এবার নিয়ে এসেছে বিগত কয়েক দশকের মধ্যে বৃহত্তম ‘সিভিক’ তথা নাগরিক জমায়েতের এক উপলক্ষ।

দুই ধারায় বিভক্ত মার্কিন জাতি আজ সোমবার রাতে ৯০ মিনিটের জন্য থমকে যাবে। হিলারি ক্লিনটন ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যকার প্রথম মুখোমুখি বিতর্ক দেখবে তারা বড় থেকে ছোট নানা মাপের পর্দায়।

টেলিভিশন নেটওয়ার্কের কর্মকর্তা ও রাজনীতি বিশ্লেষকদের অনুমান, বিতর্কের মোট দর্শকসংখ্যা হতে পারে ১০০ মিলিয়ন। ১৯৮০ সালে জিমি কার্টার ও রোনাল্ড রিগ্যানের বিতর্ক দেখেছে ৮০ মিলিয়ন মানুষ এবং সেটি ছিল প্রেসিডেন্ট নির্বাচন বিতর্কের জন্য রেকর্ড। সাধারণত ‘ম্যাশ’ ও ‘চিয়ার্স’ অনুষ্ঠানের ফাইনাল এমন বিপুলসংখ্যক দর্শক টানতে সক্ষম হয়।

বিশেষ কোনো উপলক্ষ সামনে রেখে গোটা জাতি পর্দার সামনে জমে যাওয়ার যুগ আজ আর নেই। একটা সময় ছিল ‘ডালাস’-এর ‘হো শট জে আর?’ পর্ব দেখার জন্য মানুষ ঘরবন্দি হয়ে যেত। চাঁদে মানুষের প্রথম পা রাখার দৃশ্য দেখার জন্য মার্কিনিরা টিভির সামনে বুঁদ হয়ে বসেছিল। এখন মিডিয়ার নানা রকমফের হয়েছে; অনুষ্ঠানও এন্তার, একেকজন একেকটায় চোখ রাখে। তবে এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন মানুষকে এমনটাই কৌতূহলী করেছে যে হিলারি-ট্রাম্পের প্রথম দ্বৈরথ দেখার সুযোগ তারা হারাতে চাইবে না। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের বাতাসও তাদের আরো উন্মাতাল করছে। এ ছাড়া ট্রাম্প গতানুগতিক ধাঁচের কোনো প্রার্থী নন—এটাও মানুষকে টানছে। নিউ ইয়র্ক টাইমস ও সিবিএস নিউজের চলতি মাসের জরিপ মতে, ৮৩ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার দুই প্রার্থীর প্রথম বিতর্ক দেখার সিদ্ধান্তের কথা বলেছেন।

সিবিএস নিউজের সাবেক প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু হেওয়ার্ড বলেন, ‘ডিজিটাল মিডিয়ার বিচ্ছিন্নতার এই যুগে একটা অনুষ্ঠানে মানুষের একাত্ম হওয়ার ব্যাপার আজকাল বিরল। এই বিতর্ক তা সম্ভব করছে। ’

ঝোপ বুঝে যথারীতি দাঁও মারছেন বিজ্ঞাপন ব্যবসায়ীরাও। অডি কারস ও টেকেইট বিয়ারসহ বিভিন্ন বিজ্ঞাপনী সংস্থা বিতর্কের থিমকে উপজীব্য করে বিজ্ঞাপন ছাড়ছে, সাধারণত সুপার বউল আয়োজন ঘিরেই এমনটি হয়ে থাকে। দেড় ঘণ্টার বিতর্কের মাঝখানে বিজ্ঞাপন বিরতির কোনো অবকাশ নেই তাতে কি! অনুষ্ঠানের আগে-পিছে তো বিজ্ঞাপন প্রচার করা যাবে।

বিতর্ক দেখার জন্য মার্কিনিদের তর সইছে না ঠিক আছে। তাতে হবেটা কী! নিউ ইয়র্ক টাইমস-সিবিএস নিউজের জরিপ বলছে, নিবন্ধিত ভোটারদের মাত্র ৮ শতাংশ এখনো দোটানায় আছেন। ফলে বিতর্কের মাধ্যমে কারো পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হবে—এ সম্ভাবনা ক্ষীণ। বরং মিসেস ক্লিনটন ও মিস্টার ট্রাম্প বিতর্ক শেষে যেমন ঘরে ফিরবেন, ভোটাররা পছন্দের বিশ্লেষকদের মতামত শোনার জন্য নিজ নিজ ঘরানার চ্যানেলের নম্বর টিপবেন। এমএসএনবিসিতে বামঘেঁষা বিশ্লেষকদের আলোচনা শুনবে এক পক্ষ, অন্যরা যাবে ব্রেইটবার্ট নিউজের আলোচকদের কাছে।

সেই সঙ্গে সামাজিক গণমাধ্যমগুলোয়ও ঝড় বইবে, যার শুরুটা হবে বিতর্ক চলাকালেই। তারা হিলারি বা ট্রাম্পকে নিয়ে চাঁছাছোলা, কাঠখোট্টা মন্তব্য করতেও ছাড়বে না।

‘দ্যাটস দ্য ওয়ে ইট ইজ’ বইয়ের লেখক শার্ল এল পঁ দে লিয়ন বলেন, ফেসবুক লাইক, এনবিসি, ফক্স নিউজ—এককথায় যেই পর্দায় হোক না কেন, মানুষ একটা মুহূর্তে একাট্টা হচ্ছে। তাত্ক্ষণিক বিশ্লেষণ ও মতামত সেই মুহূর্তটিকে দ্রুত ভেঙে দেবে। ’

১৯৬০ সালের প্রথম বিতর্কের পর জন এফ কেনেডি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী রিচার্ড নিক্সনের চেয়ে জনপ্রিয়তায় এগিয়ে গিয়েছিলেন। তবে এবারের বিতর্ক থেকে এ-জাতীয় বড় প্রভাব প্রত্যাশা করা যায় না। তখন মানুষ শুধু বিতর্ক অনুষ্ঠানই দেখেছিল। কোনো গ্রাফিকস, ক্যাপশন বা মন্তব্য দিয়ে দর্শক-শ্রোতাদের প্রভাবিত করার সুযোগ ছিল না। তখন সাংবাদিকরা মনে করতেন, তাদের অপেক্ষা করা উচিত। মানুষ দুই প্রার্থীর কথাই শুনেছে, এখন সময় নিয়ে তাঁরা ভাবুক, বিশ্লেষণ করুক, নিজেরা সিদ্ধান্ত নিক। এক দিন কিংবা এক সপ্তাহ পর সাংবাদিকরা বিতর্ক নিয়ে বিশ্লেষণ করতেন। এখন তো সব চলে গরম গরম, তাত্ক্ষণিক—বলেন দে লিয়ন।

হার্ভার্ড কেনেডি স্কুল অব গভর্নমেন্টে সুধী সমাজের অংশগ্রহণ নিয়ে একটি অনুষ্ঠান পরিচালনা করে থাকেন টম স্যান্ডার। তিনিও এ বিতর্ক নিয়ে বেশি আশাবাদী নন। টম উদ্বেগ ব্যক্ত করে বলেন, মানুষ  নিজ নিজ দলের ঠুলি পরে আছে চোখে। বিতর্কে পরস্পর মুখোমুখি হয়ে প্রার্থীরা যত কথাই বলুন, ভোটারদের চোখ খুলবে না। প্রয়োজনে অন্য দলের প্রার্থীকে ভোট দেব, এ মনোভাব নিয়ে তো তারা পর্দার সামনে বসে না। ভোটাররা স্রেফ নিজেদের বিশ্বাস ঝালাই করতে পছন্দের প্রার্থীর বক্তব্য শোনে।

টক শো অনুষ্ঠানের এক অভিজ্ঞ পরিচালক ডিক কাভেট মনে করেন, অনেকের কাছেই এই বিতর্ক বিনোদন অনুষ্ঠান হয়ে উঠবে। এ যেন মোহাম্মদ আলী ও ফ্লাজিয়ারের মধ্যকার মুষ্ঠিযুদ্ধ!

লেখক : নিউ ইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক


মন্তব্য