kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


নির্বাচন কমিশন নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রাখতে হবে

ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



নির্বাচন কমিশন নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রাখতে হবে

নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে বিতর্ক জমে উঠেছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এ বিষয়ে মন্তব্য করার পরে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির দিক থেকেও তার জবাব দেওয়া হয়েছে।

সংসদের বাইরে থাকা প্রধান বিরোধী দল বিএনপি বলার চেষ্টা করেছে, শুধু সার্চ কমিটি না করে সংলাপের দিকে যাওয়া যেতে পারে। যে সংলাপ সব দলের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।

প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের পদক্ষেপ প্রথম চালু করেন। এর পর থেকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এভাবে নিয়োগ হয়ে আসছে। বর্তমানে যিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্বে আছেন, তিনি ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি (১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৭) পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন। ফলে এখনো প্রায় পাঁচ মাসের বেশি সময় তিনি আছেন। অর্থাৎ আমরা নতুন কমিশনার নিয়োগের জন্য এখন প্রায় পাঁচ মাস সময় হাতে পাব। যদিও এরই মধ্যে নির্বাচন কমিশন নিয়োগ নিয়ে বলা যায়, জাতীয় পর্যায়ে বিতর্কের সূচনা হয়েছে। নির্বাচনের অংশীদার হিসেবে রাজনৈতিক দলগুলো প্রসঙ্গটি নিয়ে আলাপ-আলোচনা করছে। এর পাশাপাশি সিভিল সোসাইটির ব্যক্তিরাও মিডিয়া বা নানা মাধ্যমে নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে শুরু করেছেন। এই আলোচনা বা বিতর্ক খুবই সময়োপযোগী বলে মনে হয়। তাই আলোচনা বা ভাবনার জন্য কিছু বিষয় এখনই উপস্থাপন করা যেতে পারে। কমিশনারের ভাবনার খোরাক জোগাবে এমন বিষয়গুলোও এখন সামনে আনা যেতে পারে।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের প্রথম পর্যায় থেকেই আমরা দেখেছি যে এটা ‘অল মেন ক্লাব’-এ পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ এখানে যাঁরা প্রধান কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন তাঁরা সবাই পুরুষ। এই নিয়োগ প্রক্রিয়াগুলো হয়েছে মোটামুটি তিনটি সরকারি বিভাগ থেকে। দীর্ঘদিন এখানে নিয়োগ পেয়েছে জুডিশিয়ারি বা বিচার বিভাগ থেকে। বলা যায় বিচার বিভাগ থেকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ পাবেন—এটি প্রথায় দাঁড়িয়ে গেছে। এর পরে সিভিল সার্ভেন্ট থেকে একজন ও একেবারে শেষ পর্যায়ে সামরিক আমলা অর্থাৎ অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা থেকে নিয়োগ পেতে দেখা গেছে। এই তিন বিভাগের বাইরে অন্য বিভাগ বা ক্যাটাগরি থেকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দেওয়া যায় কি না, সেটি ভেবে দেখা যেতে পারে। একটি নতুন ডাইমেনশন আনা যেতে পারে। যেটা বিশ্বের অনেক দেশেই হয়ে থাকে। অন্য দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন একাডেমিশিয়ান, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, পারফর্মিং আর্টের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি, নির্বাচন পর্যবেক্ষণ বা নির্বাচন গবেষণা বা নির্বাচনসংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিরা। এটা আমাদের এখানে মূল্যায়ন করা যেতে পারে। এর পাশাপাশি নিয়োগের ব্যাপার যে প্রক্রিয়ায় নিশ্চিত করা জরুরি তা হলো নিয়োগে স্বচ্ছতা আনা। কী প্রক্রিয়ায় নিয়োগ হলো তা জনগণের সামনে পরিষ্কার করে বলা। এ জন্যই নির্বাচনসংশ্লিষ্ট আলোচনা সব সময় জাতীয় পর্যায়ে জারি রাখা বা বিষয়টি চাঙ্গা রাখা একান্ত দরকার। কারণ বিষয়টি যেন এখনই শেষ হয়ে না যায়। যখনই নিয়োগে প্রসঙ্গটি আসবে তখনই আমরা যেন সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে পারি। এবং যত দূর পারা যায় বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে পারি। দেখা যায়, সচিবালয়ে শুধু নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরাই এই প্রসঙ্গে আলোচনা করেন। অন্যরা একেবারেই নিশ্চুপ থাকেন। এটি যেন না হয়। কারণ প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সবাইকে কাজ করতে হয়। তাই শুধু কর্তাব্যক্তিদের মধ্যে আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকলে তা সবার হয়ে ওঠে না। এটা বলা যেতে পারে, কমিশনারের কার্যকর অর্থে স্বাধীনতা কতটুকু? সেটা যেমন তাঁর জানা থাকা দরকার তেমনি অন্যদেরও কমিশনের গণতান্ত্রিক পদ্ধতি চর্চার ক্ষেত্রে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান রাখতে হবে। এটা করতে পারলেই আমরা অনেকটা নির্মোহভাবে কাজ করতে পারব।  

এরপর প্রসঙ্গ আসে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য কমিশনারদের মধ্যে সর্ম্পকটা কেমন হবে? প্রধান নির্বাচন কমিশনার অবশ্যই সবাইকে নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। তাঁর অবশ্যই একজন স্পোকসম্যান থাকতে হবে। সব বিষয় নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে কথা বলতে হবে, এটা জরুরি নয়। একজন স্পোকসম্যান বা কথা বলার জন্য লোক থাকাটা জরুরি। কারণ কমিশনের সিদ্ধান্ত টাইম টু টাইম মিডিয়া, জনগণকে জানাতে হবে। জনগণের সামনে তাঁদের নিজেদের উপস্থাপিত হতে হবে। এর পাশাপাশি মূলত অন্যান্য কমিশনার যাঁরা আছেন, তাঁরা যদি নিজেদের মধ্যে কাজ ভাগ করে নেন, তাহলে সবার অংশগ্রহণ থাকে। অন্য কমিশনারদের যোগ্যতা, দক্ষতা অনুযায়ী কাজ ভাগ করতে হবে। তাঁদের অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে। সবাইকে কাজে লাগানোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সবাইকে সুসম্পর্ক রাখতে হবে।  

এ ছাড়া আরো যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, প্রতিবন্ধী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ইত্যাদি থেকে প্রতিনিধিত্ব বা অংশীদারি কমিশনে নিশ্চিত করা যায় কি না তা ভাবা যেতে পারে। আবার জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে নানা ধরনের লোক কাজ করে। সেখানে কেউ পূর্ণ সদস্য আবার কেউ খণ্ডকালীন সদস্য আছেন। সেখান থেকে কাউকে কমিশনের সঙ্গে যুক্ত করা যায় কি না তা ভেবে দেখা যেতে পারে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট যে ধারাগুলো অর্থাৎ সংবিধানের যে আর্টিকেল আছে সেগুলো নিয়ে সংসদ অধিবেশনে আলোচনা বা বিতর্ক হতে পারে। সংসদ অধিবেশন শেষের পর সে ধারাগুলো সংশোধনও করা যেতে পারে। এগুলো সবই আলোচনাসাপেক্ষ বা বাস্তবতার নিরিখে হতে পারে। এ ছাড়া অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারি আমরা। এশিয়ার দেশগুলোর দৃষ্টান্ত বা যারা উন্নত গণতন্ত্র ধারণ করে সেই ইউরোপ বা আমেরিকার নির্বাচনপ্রক্রিয়ার দৃষ্টান্ত থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি।  

আর ব্যক্তিগতভাবে আমার আহ্বান থাকবে বিরোধী দলের কাছে, তারা যেন সফল, গঠনমূলক, ফলপ্রসূ মত প্রদান করে। রাজনৈতিক দলগুলো শুধু ইতিবাচক অবস্থানে থাকলেই সব সমস্যার সমাধান হতে পারে। অবশ্য প্রধান বিরোধী দলকে নিজেদের সীমাবদ্ধতার কথাও মনে রাখতে হবে। সব দিক মাথায় রেখে যতটুকু বাস্তবসম্মত তা অবশ্যই তারা চাইতে পারে। কিন্তু একেবারে তালগাছটি আমার—এমন কঠোর অবস্থানে তারা দাঁড়াবে না, এটাই আমাদের প্রত্যাশা। প্রত্যেকের গঠনমূলক সিদ্ধান্ত কমিশনকে শক্তিশালী করবে সেটাই জনগণের প্রত্যাশা।

সার্চ কমিটি গতবার যেভাবে কাজ করেছে সেখানে এবার আরো বেশি স্বচ্ছতা আনা যেতে পারে। অর্থাৎ যে পার্টি ও ব্যক্তিরা কাজ করছেন তাঁরা যেন বিষয়গুলো খসড়া আকারে সবাইকে জানান দেন। অর্থাৎ স্কোরিংয়ের একটা দৃষ্টিকোণ রাখা যেতে পারে। একজন প্রার্থী কমিশনার হওয়ার জন্য অবশ্যই যোগ্যতার পাশাপাশি দুর্বলতাগুলো হাজির করবেন। পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সেগুলো কিভাবে কাটিয়ে উঠতে পারেন, তা প্রথম থেকেই নির্ধারণ করতে হবে।

পরিশেষে বলতে চাই, নির্বাচনসংক্রান্ত বিষয়ে আমরা কিছু ‘প্রেশার বৃত্তে’ চাপের মধ্যে আটকে আছি। এখানে সবাইকে আইনের লোক হতে হবে—এমন কোনো কথা নেই, সবাইকে পুরুষ হতে হবে, এমনও নয়। এই জায়গাগুলো যেন আমাদের মাথায় থাকে। যাঁদের আমরা একবারে শেষ পর্যন্ত শপথ গ্রহণ করতে দেখব তাঁরা যেন বাস্তবতা মাথায় রেখে নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন, এমন দৃঢ় মানসিকতার হন। কোনো অবস্থাতেই কমিশনার হওয়ার পরে যেন তিনি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে না পড়েন। এগুলো মাথায় রাখলে কমিশন চমৎকার কাজ করবে বলে আমার বিশ্বাস।

লেখক : সভাপতি, জানিপপ

অনুলিখন : শারমিনুর নাহার


মন্তব্য